নালন্দা (৪২৫ খ্রিঃপূঃ – ১২০৫ খ্রি)
অবৌদ্ধ এবং বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা নেওয়ার সময়, শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়ার জন্যে কোনও মূল্য নেওয়া হত না। শুধু যে সব শিক্ষাকেন্দ্র অপেশাদার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিত, সেই সব সংগঠন ছাড়া শিক্ষা গ্রহণ অর্থমূল্য বিযুক্ত ছিল। বৌদ্ধ আমলের কোনও কোনও নথিতে উল্লিখিত হয়েছে যে সব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের থেকে সাম্মানিক নিতেন না, তারা শিক্ষার্থীদের আশ্রম এবং বিহারে গায়েগতরে খাটিয়ে নিতেন। অতীতে যে সব বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র দান পেত না সেই সবে এই ধরণের ব্যাপার ঘটলেও ঘটতে পারত কিন্তু পাল আমলের শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের থেকে প্রতিষ্ঠানের সাম্মানিক নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
মাথায় রাখতে হবে বুদ্ধিজম ডিপ্লোম্যাসি এন্ড ট্রেড বইতে তানসেন সেন বলছেন, দক্ষিণ, পশ্চিম, পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় রেশমপথের গম্য অগম্য স্থানে বৌদ্ধ মঠ তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বুদ্ধের সমসাময়িক কাল থেকেই। সম্রাট অশোকের সময় সে প্রচেষ্টা আরও গতি পায়। পাল রাজারা অন্যান্য পন্থের সঙ্গে বৌদ্ধপন্থ অনুগামী হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল পূর্বঅঞ্চলের কারিগরি উৎপাদন এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রেশমপথ মার্ফৎ জুড়ে যেতে থাকে। প্রত্যেক অঞ্চলের পুরোনো, নতুন এবং ভবিষ্যতের মঠের পরিচালনা, শিক্ষাদান, পন্থনীতি প্রচার প্রসার ইত্যাদির জন্যে কেন্দ্রিভূতভাবে বিপুল পরিমান প্রশিক্ষিত ভিক্ষুর প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। পাল আমলে এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো সেই দায় পালন করেছে। বিক্রমশীলা শিক্ষাকেন্দ্র আলোচনায় বলেছি, তিব্বতে যখন রাজা বৌদ্ধপন্থে আশ্রয় নিলেন, তখন বিক্রমশীলায় মূলত তিব্বতের সমাজ, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রিক বাস্তবতার দিকে লক্ষ্য রেখে বৌদ্ধ শিক্ষাদান, মঠ পরিচালনা আর ধর্মবার্তা ছড়ানোর কাজে প্রশিক্ষিত মানব সম্পদ তৈরি করা হচ্ছে। যেহেতু বৌদ্ধপন্থের দুটি বড় ঠ্যাকনা ছিল রাজা/রাষ্ট্র এবং বিদেশে বাণিজ্য করা অতুল সম্পদের অধিকারী শ্রেষ্ঠী, তাই এই মঠগুলি থেকে রাষ্ট্রীয় এবং কর্পোরেট বিনিয়োগে বিপুল সংখ্যক ছাত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে বিহার এবং মঠগুলি যখন স্বচ্ছল শ্রেষ্ঠীদের এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণা পেতে শুরু করল, সে সময় থেকে মঠগুলো শিক্ষার্থীদের থেকে সাম্মানিক দেওয়া বন্ধ করে এবং তাদের সব ধরণের সুযোগসুবিধে দেওয়া শুরু করে। ছাত্রদের যে আবশ্যিকভাবে ভিক্ষা করতে বেরতে হত, সেই প্রথাটি প্রতিষ্ঠানের অস্বচ্ছলতার কারণে নয়, মূলত ধার্মিক নির্দেশে।

পাঠ্যক্রমগুলি খুবই বিশদাকার ছিল। পাঠ্যক্রম আবশ্যিকভাবে ইনক্লুসিভ ছিল, বাছবিচার না করে প্রায় সব ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাই পড়ানো হত – সাধারণত জ্ঞান আহরণে কোনও ধর্মীয়/সামাজিক/সামাজিক/কাঠামোগত বাধা মানা হত না। নির্দিষ্ট বৌদ্ধপন্থীয় শিক্ষাকেন্দ্র/মঠ/বিহার কিন্তু হীনযান, মহাযান এবং অন্যান্য অবৌদ্ধ পাঠ্যক্রম একসঙ্গে পড়িয়েছে। বাংলায় মহাযান বিষয়ে পাঠ নেওয়া প্রায় আবশ্যিক ছিল। একইসঙ্গে বৌদ্ধধর্মের ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন ধারাও আবশ্যিকভাবে শিক্ষার্থীদের জানতে হত।
মহাযানীরা শূন্যবাদ এবং বিজ্ঞানবাদের প্রবক্তা। স্কাই-ফ্লাওয়ার বা খ-পুষ্প মতবাদ(শামীম আহমেদের দেওয়া সূত্র – স্কাই-ফ্লাওয়ারএর প্রতিশব্দ খ-পুষ্প বা আকাশকুসুম বা গগনপুষ্প। যদি কোথাও স্কাই লোটাস লেখা হয়, তখন বলতে হবে গগনপদ্ম। এগুলো কোনো কালেই সৎ নয়। যেমন, বন্ধ্যাপুত্র বা শশশৃঙ্গ। ত্রিকালে বাধিত (cancelled)। পক্ষান্তরে, ব্রহ্মকমল বা Saussurea obvallata ব্যবহারিক সৎ। এই ফুলের জাগতিক অস্তিত্ব আছে) হল সব অভিষ্ট ঘটনা খ-পুষ্প মত অবাস্তব, চতুষ্কোটি ও বিনির্মুক্তি। খ-পুষ্প মতবাদ সে সময় বহু বৌদ্ধ গোষ্ঠী অবশ্যিকভাবে অনুসরণ এবং চর্চা করত। হীনযানীরা খ-পুষ্প মতবাদের সক্রিয় বিরুদ্ধাচরণ করেছে। কিন্তু প্রত্যেককে পড়তে হয়েছে। খ-পুষ্প মতবাদ মহাবিদ্যালয় পরিচালনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। জ্যোতির্বিদ্যা, পাঠের আবশ্যিক বিষয় ছিল। প্রতি পাঠকক্ষে আবশ্যিকভাবে জলঘড়ি রাখা থাকত। হিউএনসাং বলছেন মগধের জলঘড়িগুলো ঠিকঠাক সময় দিত।
মহাবিদ্যালয়ে তন্ত্র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ-বিষয় ছিল। আমরা বিক্রমশীলা বিদ্যালয়ের আলোচনায় বলেছি বহু পণ্ডিত তন্ত্র বিষয়ে বই লিখেছেন এবং প্রায় সক্কলে তিব্বতি, সংস্কৃত এবং নানান উত্তর ভারতের ভাষায় সেগুলি অনুবাদ করতেন। তন্ত্রের সঙ্গে ভোজবাজি, মুদ্রা, মন্ত্র, ধারণী, যোগ ইত্যাদি প্রথম দিকের বৌদ্ধধর্মের তত্ত্বের মধ্যে ছিল না বা বুদ্ধপুজায় ব্যবহার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হত না। বৌদ্ধপন্থ যত ছড়িয়েছে, নতুন নতুন গোষ্ঠীর সঙ্গে যত সংযোগ ঘটছে তত বেশি নানান ধরণের তন্ত্রবিদ্যা বৌদ্ধধর্মে অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে এবং বৌদ্ধ পাঠদান, উপাসনা এবং পুজাপদ্ধতিও পান্টেছে দ্রুতলয়ে। অন্যান্য আবশ্যিক পাঠবিদ্যার মধ্যে ছিল ছটি আলাদা আলাদা চিকিৎসাবিদ্যা, ব্যকরণ, সাংখ্য, ভাষাতত্ত্ব, স্মৃতি, দর্শন এবং অন্যান্য বিষয়ও। নানান পরস্পর বিরোধী শাস্ত্র যেমন ব্রাহ্মণ্যবাদী ও বৌদ্ধ, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ[যদিও আজকে সংজ্ঞায় ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্ম শব্দদুটি সেদিন ব্যবহার হত না, ধর্মনিরপেক্ষতা একটি নিতান্তই অর্বাচীন শব্দ এবং ধারণা], দার্শনিক এবং বাস্তববাদী, বস্তুবিদ্যা এবং শিল্পকলা একযোগে পাঠ দেওয়া হয়েছে।

নালন্দায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হয়। এটিতে ছয় বছরের শিশুদের ভর্তি করা হত। এদের বাধ্যতামূলভাবে সংস্কৃত ব্যকরণের শব্দবিদ্যা শিখতে হত, কারণ নালন্দা মহাবিদ্যালয়ে পড়তে চাওয়া বৌদ্ধ এবং অবৌদ্ধদের সংস্ক্রৃত শিক্ষা জরুরি ছিল। ছ’মাস প্রাথমিক ব্যকরণ শিখে তারা পাণিনির থেকে সূত্রপথ এবং ধাতুপথ শিখত। দশ বছর বয়সে তাদের তিন খিলার ব্যকরণ পড়ানো হত। পরের পাঁচ বছর আরও গভীরে ব্যকরণ শিখতে হত। ব্যকরণ শেখাতে যে বই ব্যবহার করা হত তার নাম বৃত্তি-সূত্র – ব্যাকরণ বিষয়ে তৎকালীন সব কিছু জ্ঞান এই বই ধারণ করত। স্মৃতিতে দীর্ঘকাল অধীত জ্ঞান ধরে রাখা আর যে কোনও পাঠ হৃদয় দিয়ে শেখাকে অতিরিক্ত আবশ্যিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলি ছাড়া পড়ানো হত কাব্য, তর্কশাস্ত্র এবং অধিবিদ্যা। বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে ছাত্ররা কেউ পতঞ্জলির চুর্ণি কেউ ভর্তৃহরির শাস্ত্র অধ্যয়ন করত। ক্ষত্রিয় ছাত্রদের জন্যে আবশ্যিক পাঠ ছিল চিকিৎসাবিদ্যা, বেদ, বেদাঙ্গ, সাংখ্য, ন্যয় এবং বৈশেষিক। এগুলোর পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে ধনুর্বিদ্যা শিখতে হত।
মহাবিদ্যালয়ের পরিচালন প্রধান হতেন চরিত্রবান, জ্ঞানী, পণ্ডিত এবং প্রবীণ ভিক্ষু। তিনি বিভিন্ন সংঘ দ্বারা নির্বাচিত হতেন। প্রধান ভিক্ষুকে বিহারের ছাত্রদের ভর্তি হওয়ার এবং তারপরের ছাত্র ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক দিকটি দেখতে হত। পাঠদান বিষয় পরিচালনায় তাঁকে সাহায্য করত দুটি বড় সমিতি। প্রশাসনিক সমিতির বিষয় ছিল ছাত্র ভর্তি বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যক্রম ঠিক করা, শিক্ষদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট এবং সঠিক সময়ে পরীক্ষা নেওয়া, পুথি ইত্যাদি দেখাশোনা করা, সেগুলি নকল এবং সংরক্ষণ ইত্যাদি। পুথি নকলের বিপুল চাহিদা ছিল। অন্য সমিতিটি দেখত আর্থ ব্যবস্থা, বিহারের পাঠ এবং আনুষঙ্গিক কাঠামো তৈরি, সংরক্ষণ, বাসিন্দাদের জন্যে খাবার নিশ্চিত করা, পরিধেয় এবং ওষুধ নির্দিষ্ট করা, শিক্ষক এবং ছাত্রদের ঘর বরাদ্দ করা এবং ছাত্রদের দিয়ে মহাবিদ্যালয় সংক্রান্ত নানান শারীরিক কাজ করানোর পরিকল্পনা ইত্যাদি। সংঘের জমিজমা ইত্যাদিতে কড়া নজর রাখত সমিতি। কৃষকদে জমি ভাগে দেওয়া, ফসল তোলা এবং সঞ্চয় করা এবং সেগুলি আবাসিক এবং অন্যান্যদের বন্টন করা খুব বড় কাজ ছিল।
কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও বিভিন্ন যৌথ সমিতি একতাবদ্ধ হয়ে যেমন কাজ করতে বাধ্য হত, তেমনি তাদের প্রত্যেকটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সেগুলি রূপায়ন করার স্বাধীনতাও বজায় রাখা হত। এই সমিতিগুলিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করত একঝাঁক ছাত্রও। দায়িত্বপাওয়া শিক্ষকের নেতৃত্বে ছাত্ররা তাদের স্বাস্থ্য বিচার, পড়াশোনা বিচার, পাঠ অগ্রগতি, মঠের প্রতি মনোভাব ইত্যাদি মনোযোগ দিয়ে বিচার বিবেচনা করত। ছাত্ররা সমিতিতে কাজ করতে করতে বৃহত্তরভাবে মহাবিদ্যালয়েরর পঠনপাঠন এবং ব্যবস্থাপনার মত কাজে দীক্ষিত হত এবং ভবিষ্যতে দেশে বিদেশে মঠের পরিচালনায় তারা অনপনেয় আবশ্যিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিত। অবৌদ্ধ বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা সাধারণত আলাদা আলাদাভাবে ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্বপালনের কাজ করতেন। কিন্তু বৌদ্ধ বিদ্যালয়ের কাজের ভিত্তি ছিল যৌথতার সিদ্ধান্ত। কোনও বিহারের সমিতিগুলির কাজকর্ম শুধুই সেই বিহার পরিচালনাতেই আবদ্ধ থাকত না, বহু বিহারকে এক সূত্রে বেঁধে, বিহারগুলির যৌথ পরিচালন ব্যবস্থা তৈরির জন্যে প্রত্যেক বিহারের কয়েকটা সমিতি থেকে নির্দিষ্ট কিছু সদস্য বেছে একটা যৌথ বিহার পরিচালন সমিতি তৈরি করা হত। শিক্ষক ছাত্রদের সম্পর্ক ইত্যাদির নিয়ম-প্রথা ঠিক হত এই বৃহত্তর সমিতির নেওয়া যৌথ সিদ্ধান্তে। প্রত্যেক শিক্ষক উপাধ্যায় বা আচার্য আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে থেকে এই যৌথ সমিতির নানান কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, এমন কী জরিমানা করতে পারতেন যদি চুরি, প্রাণহানি, ভেজাল মেশানো, মিথ্যা বলা, মদ্যপান, বুদ্ধ ধর্ম, সংঘ, নির্দেশনামা নকল করা, অপমান করা এবং ভিক্ষুণীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হত। কাজে, পাঠে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা এবং একইসঙ্গে যুথবদ্ধতার নীতি পালন করা ছিল বিহারগুলোর চ্যালেঞ্জ। (চলবে)