গাজনের একটি নবতর উপস্থাপনা নেটজুড়ে অবশ্যপালনীয় সংক্রান্তির দিন থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে — চড়ক পাক নাকী জমিদারদের অবাধ্য রায়তের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শাস্তির প্রতীক। ইতিহাস আমাদের না-ভদ্রলোক ছোটটলোকেদের পিঠে যে ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকিয় স্বার্থান্বেষীদের মারগুলো পড়েছিল তার দাগ এবং রক্তের ছিটা আজও লেগে আছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। আশ্চর্যের নয়, সময়ের ভ্রুকুটি সহ্য করে আজও দাঁড়িয়ে আছি ছোটলোকেরা। লুঠেরা কোম্পানির বন্ধু, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কেন্দ্রে থাকা এবসেন্টি ভদ্রলোক জমিদারেরা আজ নিঃশেষ। আজও গাজন-চড়ক-নীল স্বমহিমায় টিকে আছে, জমিদারদের মগরমাছের চাবুক জাদুঘরে শোভা বর্ধন করছে।
তাই আমাদের, বাংলার সংখ্যাগুরু না-ভদ্রলোকেদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বের গাজনের কোনকাল থেকে চলে আসা ভক্তা দেয়াসীদের কৌম কৃচ্ছসাধন আলোচনা বাখান। বাংলার অমুসলমান ছোটলোকেদের/অভদ্রলোকেদের বাংলা জোড়া উতসব মনসা ছাড়া চৈত্র-বৈশাখজুড়ে পালিত গাজন, গম্ভীরা নীল এবং চড়ক। এতবড় কৌম অকর্পোরেটিয় উৎসব আর নেই। এই কৌমকৃষ্টিকৃতি ছোটলোকেদের ভদ্রলোক না হয়ে ওঠার চিহ্ন নির্দেশ। ঔপনিবেশিক ভদ্ররা স্বাভাবিকভাবে কলকাতায় এই ভৌগোলিক কৃষ্টির ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের মত ঢেলে সাজিয়ে স্বার্থপূরণের চেষ্টা করেছে।

একদা, আজকের সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে গোটা উত্তর কলকাতা ছিল মূলত না-ভদ্রলোক কৃষ্টির অংশ। আইন করে ভদ্রলোকেরা পুলিশ আদালত লেলিয়ে কলকাতায় অভদ্রলোকের কৃষ্টি কেড়ে নেয়। মহিলাদের রোজগার আর কৃষ্টিকে ধ্বংস করেছে পুলিশ লেলিয়ে অবসিনিটি/আশ্লীলতার নামে। এখন আর পুলিশ আদালত লাগেনা, অবসিনিটি, ক্রুয়েলটির দোহাইও লাগে না। ভদ্দরলোকেদের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গীর দখলদারি তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে। লিটল ম্যাগাজিন গ্রন্থাগারের উদ্যোক্তা সন্দীপ দত্ত মনে করিয়ে দিলেন কলেজ স্ট্রিট দীঘিজুড়ে বাণফোঁড়া, নীল, হাজরাকাটা, দণ্ডীকাটা, ফুলখেলা এবং গাজনের মেলা আর সঙ উচ্ছেদ করে চলছে ভদ্রলোকীয় লেখ্য কৃষ্টির সুটেডবুটেডফুটফুটেডদের বইমেলা। ১৮৫৬ থেকে অশ্লীলতা বিরোধী আইনে চড়ক পাক, না-পাক হয়েছে। স্মৃতিনির্ভর ছোটলোকিয়রা কলকাতার স্মৃতিতেই থেকে গেলেন। স্রেফ অদৃশ্য হয়েগেলেন ভদ্রলোকিয় আগ্রাসনে। কলকাতার কৃষ্টি, জাতিরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষণায় এখন ভদ্রলোকের নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু সেই লগুড় ঘুরিয়ে উপনিবেশ সামগ্রিক বাংলাজোড়া গাজন-গম্ভীরা-নীল-চড়কের অবাধ্যতার দ্রোহ রুখতে পারে নি। ভদ্রলোকামির আধুনিকতা, অশ্লীল, অবসিন ক্রুয়েলিটি দাগিয়ে পশ্চিমি সভ্যতা প্রচারের দায় পালন করেও ভদ্রলোকেরা বছর শেষের দেশিয় কৃষ্টিশীলতা দমিয়ে রাখতে চরম ব্যর্থ। উপনিবেশিক আধুনিকতার সমস্ত মদির হাতছানি, পণ্য সভ্যতার চরমতম এককেন্দ্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্রিক অশ্লীলতা ছূঁড়ে ফেলে অভদ্রলোকেরা সেই এক মাস অদম্য এক কৌম তাড়না অবলম্বনে প্রত্যেক বছর জড়ো হন, তার পূর্বজদের তৈরি করে দেওয়া কৃষ্টিচিহ্ন ধারণ করে এবং পরম কৃচ্ছতায় পালন করে চলতে। এটুকুই বাস্তব আর সব অভিচারই কালের হস্তাবলেপনে মুছে থেকে যায় নির্যাসটুকু।
বাংলার বারোমাসে তেরো পার্বনের বর্ষ বিদায় নেয় গাজন, চড়কের পিঠে চড়ে। চৈত্র সংক্রান্তিতে বাংলাজুড়ে শিবের গাজোনোতসব পালিত হয়। গাজনের ছটা অঙ্গ — সন্নাসী বা ভক্তা নির্বাচন, ক্ষৌরকর্ম এবং সংযম যার নাম নিরিমিস্যি, হবিষ্য [ঘটপাতন] মহা হবিষ্য, উপবাস — উৎসব আর নীলের পুজো সকলের শেষে চড়ক। শিবের গাজনই বাংলাজুড়ে অবশ্য পালনীয়। কোথাও তার নাম গম্ভীরা। শিবের এক নাম গম্ভীর। গম্ভীরের উৎসব গম্ভীরা। গম্ভীরা-মণ্ডপে/ঘরে গম্ভীর থাকেন। গোবিন্দ চন্দের গীতে, বর্ধমানের কুড়মুনের ঈশানেশ্বরে বা চৈতন্যচরিতামৃততে গম্ভীরা শব্দটা পাচ্ছি। শিবব্রত পালনে গম্ভীরা মণ্ডপ/ঘর দেখি মালদা, রংপুর, দিনাজপুর, বর্ধমানে। মেদিনীপুর, বীরভূম, চব্বিশপরগণা, খুলনা, যশোহর, ফরিদপুরের উৎসবে গাজন নামই প্রচলিত।

গাজন বা গম্ভীরার চলনের নানান আঙ্গিক আমরা পুরান, মঙ্গলচণ্ডী, তন্ত্রবিভূতি, জগজ্জীবন, বিপ্রদাস, ধর্মমঙ্গল, বৈষ্ণবসাহিত্যে পাচ্ছি – ঘটভরা, ছোট তামাসা, বড় তামাসা, আহারা আর চড়ক পুজো ইত্যাদি। গবেষক হরিদাস পালিত আদ্যের গম্ভীরায় খুবই বিশদে গম্ভীরা তত্ত্ব এবং নানান প্রায়োগিক অনুষ্ঠানের কথা বলেগেছেন। সাধারণত ছোট তামাসার আগের দিনে ঘটভরা বা ঘট পাতন/স্থাপন হয়। শুরু হল গম্ভীরা ঘরে প্রদীপ জ্বালানো। ঘটভরার দিন গ্রামবাসীদের এক বৈঠক, কোথাও যার নাম পঞ্চায়েত, কোথাও ষোলআনা, কোথাও বাইশা ডেকে উপস্থিত প্রত্যেকের থেকে ঘটভরা অনুষ্ঠান আয়োজনের সম্মতি নিতে হয়। এই বৈঠকে গ্রামের মণ্ডল বা তাঁর অভাবে গ্রামের প্রবীণতম মানুষটি ঘটভরার অনুমতি দেন — শুরু হল উৎসবের পালা। ছোট তামাসায় কোনও উৎসব নেই শুধু শুরু হয় হর-পার্বতীর পুজো। শিবের কাছে যারা মানত করছেন, তারা সকলেই সন্ন্যাসী বা ভক্তা নামে অভিহত হবেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গাজন ও গাজন মেলায় ধূর্জটি নস্কর বলছেন, বালক সন্ন্যাসীদের বালা ভক্তা ডাকা হয়। বড় তামাসার দিনে হর-গৌরী পুজো হয়। দুপুরের পর শোভা যাত্রা বের হয় — ‘প্রত্যেক গম্ভীরা হইতে ঢাক সহ ভক্তগণ নৃত্য করিতে করিতে বহির্গত হয়। ভুত, প্রেত, প্রেতিনী, বাজিকর, বাজিকর-স্ত্রী, কেহ রামাত, কেহ তুবড়িওয়ালা, কেহ সাঁওতাল, প্রভৃতি যাহার যাহা ইচ্ছা তদ্রুপ বেশভূষণ করিয়া এক গম্ভীরা হইতে গম্ভীরান্তরে গমন করে। ভক্তমধ্যে কেহ কেহ ত্রিশূলাকৃতি ক্ষুদ্র বাণ উভয় বক্ষঃপার্শ্বে বিদ্ধ করিয়া ত্রিশূলাগ্রে তৈলসিক্ত বস্ত্রখণ্ড জড়াইয়া প্রজ্জ্বলিত করে; অন্য এক ব্যক্তি তাহাতে শূপচূর্ণ নিক্ষেপ করিতে করিতে গমন করে’। কণ্টক শয্যা আর বাণ ফোড়া প্রভৃতি অনুষ্ঠান ধর্মপুরাণে দেখি — কেহ কণ্টক শয্যায় শুইয়া ধর্ম্ম-ধিয়ায়/কেহ বাণে করে অঙ্গ ক্ষত।/ কেহ খড়্গ শয্যা করে ভাবে ধর্ম অবতারে/এইরূপে সেবে ভক্ত যত। বালা ভক্তারা শিব কী মহেশ বা ভোলানাথের চরণে ধ্বনি দিতে দিতে পুকুরে যায়। পরের দিন আহারার মশান নাচের পর হর-পার্বতী পুজারম্ভে হোম এবং ব্রাহ্মণ ও কুমারী-ভোজনও হয়। এই দিনেই বোলবাহি গান আজকে যাকে আমরা গম্ভীরা বলি গীত হয়। সব শেষে চড়ক। দক্ষিণবঙ্গে বহু গ্রামে দেখেছি গাজনতলায় মাটি দিয়ে প্রকাণ্ড কুমীর তৈরি হয়। সন্ধ্যায় মহিলারা নীলের ঘরে নীলের ঘরে দিয়ে বাতি/আমার হোক স্বর্গে গতি ছড়া কেটে বাতি দেন। এবারে চড়ক।

চড়ক পূজা (নীল পূজা)
অমুসলমান না-ভদ্রবাঙ্গালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসবও চড়ক। অর্জুনদেব সেনশর্মা চড়ক আর নীলের তাতপর্য বোঝাতে লিখলেন “চক্র শব্দ থেকে প্রথমে স্বরভক্তি পরে বর্ণবিপর্যয় হয়ে চড়ক শব্দটি জন্ম নিয়েছে। কোন চক্র? রাশিচক্র বর্ষচক্র। রাশিচক্র ও বর্ষচক্র সমাপতিত হবেই এমন কোনো কথা নেই, আবার কথা আছেও। দ্বাদশরাশির প্রতিরাশিতে রবি একমাস + -১ দিন অবস্থান করে, পরবর্তী রাশিতে প্রবেশ করেন। এই গতি ভূ-কেন্দ্রিক গতি, অর্থাৎ পৃথিবীকে স্থির ধরে, সূর্যের গতি। ভারতীয় জ্যোতিষে মেষরাশিকে ভ-চক্রের (অর্থাৎ পৃথিবীর চারদিকে ঈষৎ এলিপ্টিকাল রাশিমালা) প্রথম রাশি ধরা হয়। এই মেষে রবির প্রবেশ, এক সৌরবর্ষ চক্র সম্পূর্ণ হওয়াকে বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করে। এই চক্রসম্পূর্ণের উৎসবই চড়ক। … মহাবিশ্বে ঘটছে,মানুষ তাকেই তার জীবনে অভিনয় করে যাচ্ছে। চড়কের মাঠে সন্ন্যাসীদের(সাময়িকী) কেন্দ্রের চারপাশে বনবন করে ঘোরা ঐ রবি-আবর্তনের দ্যোতক। … ধর্মমঙ্গল পাঠ তাই এইসময়ে দ্বাদশ দিবসীয় কৃত্য। বারোমাসের প্রতীক বারো দিন। কাল সঙ্ক্রান্তিমুহূর্তে নীলব্রত এই সূর্যসন্নিভকালাগ্নিরুদ্রব্রত বা ধর্মকায় বুদ্ধব্রত। মূলত অগার্হস্থ্য। তা, কীভাবে সন্তানের মঙ্গলকর নীলব্রত হল? এ আসলে যোগীর কাছে সন্তানবর চাওয়া।বাংলার রূপকথায় নিঃসন্তান দম্পতিকে যোগীরাই পুত্রবর দিয়ে যান। ব্রহ্মচারীরাই এই দেশের অল্পবীর্য/বিচিত্রবীর্য পুরুষদের ক্ষেত্রে সন্তানের জন্মের জন্য বীর্যভিক্ষা দিয়ে যান।”
চৈত্রের শেষ দিনে চড়ক পূজা। চড়ক পূজা মূলত গ্রামীণ লোকাচার অনুয়ায়ী কৃষি দেবতা শিবের আবাহন। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি, নিঃসন্তান দম্পতির সন্তান লাভ, মনের বাসনা পূরণসহ মহাদেবের সন্তুষ্টিপ্রাপ্তিই এ পূজার উদ্দেশ্য। পূজার নেতৃত্ব দেন একজন গুরু সন্নাসী।

পূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা বা ছুরি বা বঁটির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা ইত্যাদি। ঝাঁপ অনুষ্ঠান যে ব্রিটিশপূর্ব সময় থেকে চলে আসছে তার প্রমান ১৭৪৫-এ নবাব আলিবর্দি খান চব্বিশ পরগণায় অম্বুলিঙ্গ শিবের মাহাত্ম্য যাচাই করেন ভক্তাদের বর্শার ওপর ঝাঁপ দিতে আদেশ দিয়ে। গাজন উৎসবে বটির ঝাঁপের বদলে সৈন্যদের ধারালো বর্শার উপর ঝাঁপ দেওয়ার আদেশ দেন ব্রতধারী প্রধান সন্ন্যাসী কৃষ্ণগিরিকে। শিবের নামে ঝাঁপ দিয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন প্রধান দেয়াসী কৃষ্ণগিরি। বিষ্মিত নবাব আলিবর্দি খান ৫৫০ বিঘা জমি দেবোত্তর দান করেছিলেন। জমি দানের ফার্সি ভাষায় লেখা দানপত্র আলিপুর কোর্টের মহাফেজ খানায় রক্ষিত আছে বলে শোনা যায়। পূজার উদ্যোক্তারা দল বেঁধে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ান। দলে থাকেন একজন শিব ও দু’জন সখী। সখীদের পায়ে থাকে ঘুঙুর। তাদের সঙ্গে থাকে ঢোল-কাঁসরসহ বাদকদল। সখীরা গান ও বাজনার তালে তালে নাচেন, এরা “নীল পাগলের দল”। এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাজনের গান (শিবের গাজন) গান এবং নাচ-গান পরিবেশন করেন। বিনিময়ে দান হিসেবে যা কিছু পাওয়া যায় তা দিয়ে হয় পূজার আয়োজন। চৈত্রের শেষে নীল পূজার পর সন্ন্যাসীরা উপোস থাকেন। পরদিন বিকেলে চড়ক পূজা শেষেই উপোস ভাঙেন তারা, শুরু হয় ‘পাট নাচানি’। চড়কগাছে ভক্ত বা সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কা দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনো কখনো জ্বলন্ত লোহার শলাকা তার গায়ে ফুঁড়ে দেয়া হয়। ১৮৬৫ তে অশ্লীলতা, ক্রুয়েলটির দোহাই দিয়ে ব্রিটিশ সরকার আইন করে বন্ধ করে দেয়, কিন্তু আজও বাংলায় চড়ক ঘোরা বা ঝাঁপ বন্ধ হয় নি।

যে কোনও বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থাকে জুড়ে থাকে সেই ব্যবস্থাজাত কৃষ্টি। তাই গাজনে দেখি আহারার দিন কেউ ধান ছড়াচ্ছেন, কেউ হাল চালান, কেউ বীজ বপন করেন বা ধান কাটছেনও। শিব তো বাংলায় মূলত ধানের দেবতা, তাই শিবের গাজনে দেখি তিনি ইন্দ্রালয়ে গিয়ে জমি চদাইছেন ‘তুমি ভূমি দিলে আমি চাষি গিয়া চাষ।/পূর্ণ হয় তবে পার্ব্বতীর অভিলাষ’। তাছাড়া বীজধানের জন্যেও শিব চিন্তা করেন ‘কাত্যায়নী কন কান্ত কিছু নাই কেন। কুবেরের বাটী বীজ বাড়ি করে আন’।
মাথায় রাখতে হবে যে কোনও অভদ্রলোকিয় কৃষ্টি উৎসবের বার্তা স্পষ্ট এবং চোখা – তার যেহেতু ক্ষমতায় যাওয়ারও ইচ্ছে নেই, রাষ্ট্রের দয়ায় তার চাকরিবাকরি পাওয়া বা দালালি করার ইচ্ছে উৎসাহ বা প্রণোদনা কিস্যু নেই তাই সে যে কোনও উতসবেই, তার প্রকাশভঙ্গীতে ক্ষমতাকে বিঁধতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। সমাজের যে কোনও দুর্নীতি, দুষ্কৃতি, অভিচার, অপচার, মানুষের সে নানান ভাবে নানান রূপে সমাজের সামনে উপস্থিত করে। নানান স্খলন, পতন, অবিচার, অত্যাচার কোনও কিছুই সে রেহাই দেয় না। বাংলার পলিমাটির ছোটলোকেরা সেই পাল আমল থেকেই বুলগাখানায় বাস করার অভিযোগে অভিযুক্ত। আজও কলকাতায় ছোটলোকেরা কোণঠাসা। কিন্তু বাংলায় — জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে যে আজও ১৮৬৫-র গাজন বন্ধের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৪২৮-এও সজীব, সাকার এবং জীবিত।

শেষ করি লেখক শিক্ষক সুব্রত ঘোষের মন্তব্য দিয়ে “যে দেশে ধর্মাচরণে ক্রুসিফিকশনের পুনর্নির্মাণ করা হয় সে দেশের লোকজন বাংলায় এসে চড়ক দেখে বিড়ম্বনায় পড়েছে। ইংরেজরাই চড়ক নিষিদ্ধ করেছে। কোলকাতা সংলগ্ন এলাকায় চড়ক বিলুপ্ত হয়ে গেছে ক্রমে ক্রমে। আত্মনিগ্রহ আর আত্মহত্যা এক নয়। জোর করেও বাণ ফুঁড়ে দিচ্ছে এমন নয়। যারা এতটা যন্ত্রণা স্বেচ্ছায় সহ্য করতে পারে তারা তো শাসকের মারধর হাসতে হাসতে গায়ে মেখে নেবে। জমিদারের অত্যাচার নিষিদ্ধ হয় না, ইংরেজের অত্যাচার খুব ভালো, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আরো ভালো, যত দোষ এই চরমপন্থী আত্মনিগ্রহীর! জীবন এক নরক যন্ত্রণা। ঈশ্বরের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ না নরক যন্ত্রণা লাঘব করতে এই ধর্মাচরণ তার হিসাব করবে কে?”