ওস্তাদজীর সেই বউবাজারের বাঈজী হীরুর শিক্ষা সম্বন্ধে কৌতুহল প্রকাশ করেন। ঠিক করা হয় হীরুকে বাঈজীর কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। সে যুগের পটভূমিকায়, বিশেষ করে হীরুবাবুর পারিবারিক পরিবেশের কথা ভাবলে সন্তানকে স্বয়ং বাঈজী বাড়ি নিয়ে যাওয়া অচিন্তনীয়। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে মন্মথবাবুর কাছে সঙ্গীতের জন্য যে কোন ত্যাগই সহনীয়। হীরুকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাবা, হেমাঙ্গবাবু ও বিজয় মুখুজ্জে। বিরাট তাকিয়ায় বিশালকায় চৌধুরান বাঈজী বসে আছেন। গড়গড়ায় তামাক খাচ্ছেন। হীরু সত্যি একটু ঘাবড়ালেন। যাই হোক, তারপর তিনি বাজালেন তিন তালের লহরা। বড় বাঈ ওস্তাদজীকে বলেলন, ‘ছেলে ভালই বাজায় তবে তুমি ঘরের জিনিস কাফেরকে দিয়ে দিলে?’ ওস্তাদজী বুকে হাত দিয়ে উত্তর দিলেন, ‘কি করি, এই বাচ্চা যে আমার হৃদয় ছিনিয়ে নিয়েছে।’
ওস্তাদজী একবার হজ করতে যান ১৯২১ সালে। ফিরে এসে মনে হয় তবলা বাজানো গুনাহ, বাজানো বন্ধ করলেন। হীরুকে শেখানোর পাট তখনকার মতো ঘুচল। বাবা নিরুপায়, হীরুর জন্য অন্য ওস্তাদ খুঁজতে লাগলেন। দুই জন ওস্তাদ শেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও পিছিয়ে গেলেন। এই ভাবে কয়েক মাস কাটল। লক্ষ্নৌ-এ এক গোয়ালিয়ার বাসী গাইয়ে এলেন। তাঁর হামবড়াই যে, লক্ষ্নৌয়ে তাঁর সঙ্গে সংগত করার উপযুক্ত কেউ নেই। লক্ষ্নৌর রইস আদমীরা গেলেন ওস্তাদজীর কাছে, ‘তোমার দেশের মুখে, বংশের মুখে যে কালি পড়েছে।’ ওস্তাদজীর আত্মসম্মানে ঘা লাগল। বাজালেন এবং এমন বাজালেন যে অনুষ্ঠানের শেষে গোয়ালিয়ারের সেই ওস্তাদ তাঁর পায়ে পড়লেন এবং ওস্তাদজীকে গুরু বলে মানলেন।
পুজোর সময় সটান বাড়িতে হাজির হলেন ওস্তাদজী। বাড়িতে পুজো। আর মুসলমান অতিথি! অনেকে বাবার নিন্দায় সোচ্চার হলেন। পড়ার ঘরে ওস্তাদজীকে বসানো হলো। গুণীর সম্মান দিতে মন্মথবাবু তুচ্ছ ছুৎমার্গর পরোয়া করলেন না। হীরুবাবুর বাড়িতে গড়গড়া আসে পরে। যখন ওস্তাদজী বাজাতেন, সৎ ব্রাহ্মণ হেমবাবু তাঁর মুখে থেলো হুঁকোও ধরতেন। এতে এঁদের ধর্মহানি বা অসম্মান বোধ ছিল না।
ওস্তাদজীর চেহারা কিছু ভাল ছিল না। শীর্ণকায়, কালো, মাঝারি গড়নের সরু গোঁফ ছিল তাঁর। তামাক ছাড়া অন্য নেশা ছিল না — শেষের দিকে ধরেছিলেন আফিং।

হীরুবাবুর বাবা আর ওস্তাদজী দুজনে মিলে হীরুবাবুকে চারচে ‘না’ শিখিয়েছিলেন —
১) গুরু যতদিন না বলেন যে তুমি শিক্ষা দেওয়ার উপযুক্ত ততদিন কাউকে শেখাতে যেও না। যখন শেখাবে যথোচিত শিষ্য করে নাড়া বেঁধে শেখাবে।
২) তবলাকে কখনও পেশা করবে না।
৩) মহিলার সঙ্গে বাজাবে না।
৪) কোন শিল্পীর সঙ্গে সংগতে তাঁকে অপদস্থ করবে না।তাঁর গুণগ্রাহী হবে। দোষগ্রাহী হবে না।
হীরুবাবু সারা জীবন কথাগুলি মেনে চলেছেন। রেডিও এবং টি ভি তে কয়েকবার অংশ গ্রহণ করেছেন, বিনা পারিশ্রমিকে। রেডিও ও টি ভি কর্তৃপক্ষ তা ঘোষণায় স্বীকার করেছেন। অপেশাদার থাকবেন এই প্রতিজ্ঞার জন্য তাঁকে সাম্মানিক স্বীকৃতি এবং অর্থ অপহার প্রত্যাখ্যান করতে হতো।
‘মহিলা’ বলেত তাঁর বাবা এবং ওস্তাদজী তৎকালীন সমাজবর্হিভূতা মহিলা শিল্পীদের উদ্দেশ্যেই ওই কথা বলেছিলেন।
হীরুবাবু ১৯৫৮-১৯৬৫ পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া রেডিও সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় কেন্দ্রের (দিল্লী) বিচারক ছিলেন।
হীরুবাবু যখনই বাজাতে যেতেন, সঙ্গে যেতেন তাঁর বাবা, মাতামহ বা হেমবাবু। একবার যখন মামার বাড়ি আছেন তাঁর মামা তাঁকে নিয়ে যান এন্টালী দেবদের বাড়ি। হীরুকে বাজাতে বলা হয়। হীরু কিছুতেই বাজাবেন না। এদিকে মামাও রেগে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত বাজাতেই হলো। বাবা এসে সব শুনলেন, ডাক ছাড়লেন, ‘হীরু, তুমি মহীনদার (ভাল নাম মহেন্দ্রনাথ রায়) সঙ্গে গেলেও বাজাতে পারো।’
বিশ দশকের গোড়ায় হাইকোর্ট-এর বিচারপতি আশুতোষ চৌধুরীর অনুরোধক্রমে বালক হীরুকে তাঁর বাবা নিয়ে যান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে। উপলক্ষ্য একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত বিদ্যালয়ের উদ্বোধন। সেই সভায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। ষষ্ঠীবাবুর সঙ্গে ওই বালকের উপযুক্ত সঙ্গত সমস্ত শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করে। ইন্দিরা দেবী কোলে করে রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গেলে রবীন্দ্রনাথ সাদর স্পর্শ দিয়ে হীরুবাবুকে আশীর্বাদ করেন।
১৫ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে হীরুবাবুর বাবার মৃত্যু হয়। হীরুবাবুর বাবা বলতেন, ‘জপতপ কর কি মন মরতে জানলে হয়।’ মৃত্যুযন্ত্রণা তিনি চাননি। বাস্তবিক অজ্ঞান অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে। হীরুবাবুর জীবনে তাঁর বাবা যে কি ছিলেন তা বলতে গিয়ে হীরুবাবু আত্মহারা হয়ে যেতেন। তাঁর সমস্ত সত্তা যেন পোষিত বর্ধিত আর লালিত হয়েছিল বাবারই প্রাণরসে, আর কী সমুন্নত ছিল তাঁর চরিত্র, কি অপার মহিমা তাঁর। হীরুবাবু বলতেন, বাড়িতে যখন আসর বসত একজন কুলি রোজ এসে শুনত আর মাথা নাড়ত। বাবার চোখে এড়ায়নি, একদিন প্রশ্ন করেছেন, কিছু বোঝ? লোকটি হাতজোড় করে বলে, হাঁ হুজুর। লোকটি জাতে মেথর ছিল। বাবা তাকে বাইরে বসিয়ে তবলা দিলেন — বললেন, শিখবি? সে এরপর নিয়মিত শিখত মৃত্যু পর্যন্ত। কত তাঁর দান ছিল যার সম্বন্ধে কোন কিছু তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশই হয়নি। যাই হোক, জীবন থেকে কঠিনতম আঘাতের পরেও হীরুবাবু অবশিষ্ট শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন। আবদ্ধ হলেন বিবাহবন্ধনে। তবলায় কি কোন এক সময় তাঁর ধৈর্য্য আর মানসিকতায় ছিড় খেয়েছিল ? চীফ জাস্টিস সুধীররঞ্জন দাশ একবার এই প্রশ্ন করেছিলেন — ‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে না যে, তোমার বাবা সঙ্গীতের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তুমি সঙ্গীতকে অবহেলা করছ কেন?’ এর উত্তরই হীরুবাবু দেন ১৯৫২ সালে হাইকোর্ট-এর রমরমা প্রাকটিস ছেড়ে অ্যাসিস্টস্ট ট্যাকসিং অফিসার পদে যোগ দিয়ে। তাঁর এই খেয়ালের কারণ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জিজ্ঞাসা করলে হীরুবাবু জবাব দেন, ‘আমি আমার বাবার প্রদর্শিত পথই অনুসরণ করতে চাই। সঙ্গীতকেই আমার জীবনের আরাধ্য করতে চাই।’ (চলবে)