ওস্তাদ আলাউদ্দিনের সঙ্গে হীরুবাবুর আলাপ তিমিরবরণের-বাড়িতে, তাঁর বড়ো ভাই মিহিরকিরণের মাধ্যমে। ১৯৩৪ সালে জমিদার শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ উপলক্ষ্যে আসরে প্রথম হীরুবাবু, আলাউদ্দিনের সঙ্গে বাজান। এরপর বহু জায়গায় দুজনে একত্রে বাজিয়েছেন। ১৯৩৪ সালে — এলাহাবাদ অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে হীরুবাবুকে অপ্রচলিত (পঞ্চম সোয়ারী) তালে লহরা বাজাবার জন্য বিশেষ অনুরোধ করলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোক সরকারের নেতৃত্বে তাঁর সঙ্গীতরসিক বন্ধুরা। কিন্তু সমস্যা হলো সারেঙ্গী বা বেহালায় মুখ রাখবার জন্য কোন শিল্পীকে পাওয়া যাচ্ছে না। উদারচরিত্র ওস্তাদ আলাউদ্দিন এই কথা শুনে বললেন হীরা বাবার সাথে (হীরুবাবুকে উনি হীরা বাবা বলতেন) তাঁর বুড়া ছেলে অর্থাৎ তিনি বাজাবেন এতে ছোট বড়ো কথা নাই। সমস্ত শ্রোতাদের চমকিত করে উনি বেহালায় মুখ রাখলেন। সেই যুগল বাজনা শ্রোতাদের মোহিত করেছিল। হীরুবাবুর মতে তাঁর সঙ্গীতিক জীবনে এটি একটি স্মরণীয় দিন ছিল।
১৯৫২ সালে তানসেন সঙ্গীত সম্মেলনে আলাউদ্দিন বাজালেন বেহালা ও সরোদ। বেহালা বাজালেন একজন প্রথিতযশা তবলাশিল্পীর সঙ্গে। তারপর হীরুবাবু ও আলাউদ্দিন — তবলা ও সরোদ, প্রত্যেক সমের মুখে আলাউদ্দিন জড়িয়ে ধরে হীরুবাবুকে তাঁর অপূর্ব সঙ্গতের জন্য আদর জানান। তানপুরায় ছিলেন রবিশংকর। আলি আকবর আসরে বসেছিলেন। আলাউদ্দন সম্বন্ধে আরেকটি স্মৃতি মাঝে মধ্যই হীরুবাবু বলতেন। আলমবাজারে গঙ্গার ধারে রাম ব্যানার্জীর গুরুর আশ্রম — আরতি হচ্ছে — সামনে কালী মূর্তি। একদিকে রামকৃষ্ণ একদিকে সারদাদেবী, ব্যাক গ্রাউন্ডে স্বামীজি। সেখানে বসে বাজাতে বাজাতে আলাউদ্দিন কেঁদে ফেললেন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন তারপর ভজন গাইলেন সবার অনুরোধে। প্রত্যেকের চোখে জল এসে গিয়েছিল সেদিন। বলা ভালো, আলাউদ্দিনের গলায় একদিকে রামকৃষ্ণ ও আরেক দিকে সারদা দেবীর ছবি সহ লকেট ছিল।

বাবা আলাউদ্দিন, রবিশঙ্কর, আলি আকবর খান।
১৯৫৩ সালে আরেকবার আলাউদ্দিন, আলি আকবর ও আশিস বসেছেন, সঙ্গে হীরুবাবু। আলাউদ্দিনকে মনে হলো সবচেয়ে যুবক। দুনে বাজাচ্ছেন — ছেলেকে বলছেন আরো বাজাও দুনে — নাতিকে বলছেন, নাতি চল বুড়োর সাথে। সংহত আবেগের কী পরম প্রকাশ! হীরুবাবু বাজাতে বাজাতে লক্ষ্য করছেন বৃদ্ধের দুর্বার বেগের কাছে রসনীয় কলা প্রকাশের নিপূণতায় পরবর্তী দুই পুরুষ কত পিছিয়ে পড়েছে।
তিমিরবরণের সঙ্গে হীরুবাবুর আলাপ বহুদিনের। দুই পরিবারে একটি মধুর আত্মীয়তা গড়েও উঠেছিল। হীরুবাবুর বাড়িতে এসে তিমিরবাবু বাজিয়েও গেছেন। মিহিরকিরণ বেহালা বাজাতেন, শিশিরশোভন তবলা বাজাতেন। দলে ছিলেন শ্রীসুধীন দত্ত, দুর্গাদাশ ও আরও অনেকে। হীরুবাবুর আরেক সঙ্গী মন্টু ব্যানার্জী। ওঁদের আদি বাড়ি ছিল পটুয়াটোলা লেন। মন্টু ব্যানার্জী হারমোনিয়াম বাজাতেন, শচীন দাস মতিলাল ও ভীষ্মদেবের সঙ্গে। হীরুবাবু, মন্টুবাবু জুটি বহু জায়গায় একসঙ্গে বাজিয়েছেন। মন্টু ব্যানার্জী এক সময় হীরুবাবুর কাছে তবলাও শিখেছেন।
১৯৩৫ সালে হীরুবাবু এলাহাবাদ কনফারেন্সে বিচারক নিযুক্ত হন। সহযোগীরা হলেন আলাউদ্দিন খাঁ, পণ্ডিত শম্ভু মহারাজ, বিনায়ক রাও পটবর্ধনজী, এ দেওধর, এন জি মতিলাল, নারায়ণ রাও ব্যাস ইত্যাদি। সেবার বেহালায় প্রথম হয়েছিলেন ভি জি যোগ আরগানে শ্রীপন্থ। ১৯৩৪ সালে রামকিষেণ মিশ্র ও গিরিজাশংকর চক্রবর্তীর সঙ্গেও তাঁকে বাজাতে হয়েছে। ওই বছরই ফৈয়াজ খাঁর সঙ্গে হীরুবাবুকে বাজাতে হয়। ফৈয়াজ খাঁর সঙ্গে পাখোয়াজে ছিলেন পর্বত সিং, হারমোনিয়ামে ছিলেন গোলাম রসুল হীরুবাবু বাজানোর কথা ছিল না। পাবলিক থেকে ‘হীরুবাবু’ ‘হীরুবাবু’ চীৎকারে হীরুবাবুকে উঠতে হলো। ব্যাবস্থাপকদের অনুরোধে ফৈয়াজের সঙ্গে বাজানোর জন্যে তিনি মঞ্চে উঠলেন। ফৈয়াজের মেজাজ নষ্ট হয়ে গেল। তিনি হীরুবাবুকে বাজিয়ে নিতে গেলেন। হীরুবাবুও গেলেন প্রতিবারই উৎরে। আসলে ফৈয়াজ ছিলেন শিশুর মতো। কে বুঝি তাঁকে বুঝিয়েছিল — ২৪ বছরের ছোকরাকে তাঁর সঙ্গে বসিয়ে রসিকতা করার মতলব করেছে কেউ। এতেই তাঁর রাগ। তারপর যখন অনুষ্ঠান শেষ হলো, চারদিক করতালিতে মুখর। এরপর ফৈয়াজ কলকাতায় এসেছেন, হীরুবাবুর ‘সঙ্গীত সাহিত্য বিতান’ প্রদত্ত অভিনন্দন গ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠান করেছেন বহুবার একত্রে। ফৈয়াজ বলতেন, ভারতে দুজন তবলাবাদক আছে। বোম্বাইয়ে আহম্মেদজান খেরাকুয়া আর বাংলায় হীরুবাবু।

গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী
সঙ্গীত জগতে সঙ্গীতাচার্য গিরিজাশংকর চক্রবর্তী কণ্ঠসঙ্গীতে আর এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কণ্ঠসঙ্গীতের প্রতি বিভাগে তিনি একজন অনন্যসাধারণ শিল্পী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে হীরুবাবু ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল, সঙ্গীতাচার্যের মৃত্যু অবধি, বহুবার সংগত করেছেন এবং অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছেন।
আজকের দিনে বাঙ্গালীর সঙ্গীত ইতিহাসে কণ্ঠসঙ্গীতে গিরিজাবাবু, যন্ত্রে আলাউদ্দিন আর তবলায় হীরুবাবু যে দান রেখে গেছেন তা শুধু অবিস্মরণীয় নয়, তারই উপর ভিত্তি করে বর্তমান আর ভবিষ্যতে সঙ্গীত সাধনা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে দিন দিন। হীরুবাবু ছিলেন একজন খাঁটি বাঙ্গালী সন্তান, ভদ্রলোক, বন্ধুবৎসল, অজাতশত্রু এবং পরশ্রীকাতরতা শূন্য। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ যিনি জীবনে শেষ কয়েক বছর নিয়মিত দিনের বেলা একবার করে কফি খাওয়া ছাড়া কোনও নেশা করেননি, পছন্দ করেছেন সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি, শাল। এমনকি চাকুরী ও কর্মজীবনে স্যুট বাদ দিয়ে চোগা চাপকান। হীরুবাবু জীবনে অনেক দিয়েছিলেন। অনেক শিল্পীর জীবনে উত্থান ও পতন হয়। তাঁর জীবনে পতন আসেনি কারণ তার জীবনের গড়নটাই হয়েছিল নির্বিকার ও প্রশান্তিময়। প্রবল খ্যাতি আর প্রশংসাকেও তিনি সহজ সরল আর পাঁচটা বিষয়ের মতো মনে করেছেন। এছাড়া পতন না আসার আর একটি কারণ, জীবনে শিল্পের ক্ষেত্রে খাঁটি অপেশাদার থাকার মনোভাব। হীরুবাবুকে নিয়ে হইচই হয়নি বেশি কারণ, স্তাবকতায় তাঁর বিশ্বাস ছিল না। ক্ষোভ বিষণ্ণতাও তাঁর প্রায় ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন সঙ্গীতে নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিতে — শুধু মাত্র মানসিক প্রশান্তির জন্য। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী তাঁকে মনে রেখেছে? কলকাতা শহরে কজন মানুষ হীরুবাবুর নাম জানেন সেটা সার্ভে করে দেখলে আমাদের হতাশ হতে হবে না তো? (শেষ)