বাংলা নবজাগরণের সংস্পর্শে এসে বাঙালার সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতিতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সমাজের একটি শাখা যুক্তিবাদী ও ভারতীয় ঐতিহ্যবাদী ধারাকে মেলানোর চেষ্টা করেছিল অন্যদিকে একটি শাখা রক্ষণশীল চিন্তাধারা, পৌত্তলিকতা ইত্যাদি ধারাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সেই পরিবেশে সমাজে প্রচলিত রক্ষণশীল ও যুক্তিবাদের দুই ধারার সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা করেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ঠাকুর একদিকে যেমন মা ভবতারিণীর আকুল হয়ে পূজো করবেন অন্যদিকে হিন্দুধর্মের কু প্রথা, রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে কঠিন সমালোচনাও করতেন। রামকৃষ্ণ দেবের সহজ সরল ভাষায় ছোট ছোট গল্পের মধ্যে দিয়ে বলা ধর্মীয় শিক্ষা, জনমানসে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বহু বিশিষ্ট বাঙালি শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তাঁরা কেবলমাত্র রামকৃষ্ণের ভক্ত-সূত্রে বিখ্যাত হননি— তাঁরা স্ব স্ব-কীর্তিতে সমুজ্জ্বল। ভারতীয় ডাকবিভাগ তাঁদের অমর কীর্তিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেন। রামকৃষ্ণকে শ্রদ্ধা করতেন এমন কয়েক বিখ্যাত বাঙালির কথা নিবন্ধে উল্লেখ করা হলো।

শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎ হয় বঙ্কিমচন্দ্রের বন্ধু অধরলাল সেনের বাড়িতে। দিনটা ছিলো ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর।
অধরলাল ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ঠাকুর তাঁকে অতিশয় ভালোবাসতেন।অধর ঠাকুরকে প্রায়ই শোভাবাজারের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। ঠাকুরকে দেখতে অনেক ভক্তরা আসতেন। তিনি একবার তাঁর কয়েকটি বন্ধু ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে নিমন্ত্রণ করে আনলেন।
অধর (বঙ্কিমকে দেখিয়ে ঠাকুরের প্রতি)— মহাশয়, ইনি ভারি পন্ডিত, অনেক বই-টই লিখেছেন। আপনাকে দেখতে এসেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)— বঙ্কিম! তুমি আবার কার ভাবে বাঁকা গো!
বঙ্কিম ( হাসতে হাসতে)— আর মহাশয়! জুতোর চোটে, সাহেবের জুতোর চোটে বাঁকা।
শ্রীরামকৃষ্ণ — না গো, শ্রীকৃষ্ণ প্রেমে বঙ্কিম হয়েছিলেন। শ্রীমতীর প্রেমে ত্রিভঙ্গ হয়েছিলেন।
বঙ্কিম চন্দ্র সেদিন ঠাকুকে ধর্ম বিষয়ে নানান প্রশ্ন করেন এবং যথাযথ উত্তর পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
বিদায়ের সময় শ্রীরামকৃষ্ণের মধুর কথাগুলি স্মরণ করতে করতে ঠাকুরের প্রেমের ছবি হৃদয়ে নিয়ে ফিরলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পর ২৭ শে ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ পঞ্চবটিমূলে দক্ষিণেশ্বরে ভক্তসঙ্গে বঙ্কিম প্রণীত দেবী চৌধুরানীর কতক অংশ পাঠ করে শোনান এবং গীতার নিষ্কাম কর্মের বিষয়ে আলোচনা করেন।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সম্মানে ডাকবিভাগ ১লা জানুয়ারি ১৯৬৯ একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেন ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ স্নেহধন্য। ঠাকুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে জয়গোপাল সেনের বাগান বাড়ীতে। এই সময় থেকেই উভয়ের মধ্যে অন্তরঙ্গতার সূত্রপাত ঘটে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করতেন— ‘কেশববাবু কেমন লোক?’
ঠাকুর বলতেন— ওগো, সে দৈবী মানুষ।”
ঠাকুর বেশিদিন কেশবচন্দ্র কে না দেখতে পেলে অধীর হয়ে উঠতেন। তখনকার দিনে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন এই বাগ্মী। বিধবা বিবাহের প্রবর্তন, স্ত্রীশিক্ষার উন্নতিসাধন ইত্যাদি প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার সমর্থক ছিলেন। প্রথম জনসাধারণের সম্মুখে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘ইন্ডিয়ান মিরার’ পত্রিকাতে তিনি ঠাকুরের কথা প্রকাশ করেন। দি কোয়ার্টারলি রিভিউ, সুলভ সমাচার প্রভৃতি পত্রিকায় ঠাকুরের কথা প্রচার করতেন কেশবচন্দ্র। কেশবের ‘ কমল-কুটির’ নামের বাটিতে (বর্তমানে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন) ঠাকুরের কয়েকবার শুভাগমন হয়েছিল এবং এখানেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম ফটো তোলা হয়।একবার তাঁর অসুখ সারানোর জন্য ঠনঠনের সিদ্ধেশ্বরী কালীকে ডাব-চিনি মানত করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনকে ভারতীয় ডাকবিভাগ শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। খয়েরি রঙের ডাকটিকিটের মূল্য ছিলো তিরিশ পয়সা।
স্বধর্মত্যাগী মাইকেল মধুসূদন দত্তও শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপা-সান্নিধ্য লাভ করেন। মধুসূদন সমাজের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আধুনিক চিন্তাধারা আনতে চেয়েছিলেন। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের একটি বাগান সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা করছিলেন মধুসূদন দত্ত। সেই সময় মথুরামোহন বাবুর জ্যৈষ্ঠ পুত্র দ্বারিকানাথের সঙ্গে সেই ব্যাপারে আলোচনা করতে দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন তিনি। দ্বারিকানাথবাবু তাঁকে তাঁর ইচ্ছানুসারে রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করান।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর সঙ্গে কোনরূপ বাক্যালাপ করতে পারেননি ঠাকুর।পরে ঠাকুর জানিয়েছিলেন, মা কালী তাঁর মুখ চেপে ধরেছিলেন— স্বার্থের জন্য ধর্মত্যাগী মধুসূদনকে কিছু বলতে পারেননি।
কিন্তু মাইকেলের দুঃখ পরম করুণাময় ঠাকুরের বুকে বেজেছিলো। তিনি মাইকেলকে দুটি রামপ্রসাদী গান শুনিয়েছিলেন। মধুসূদনের নিমীলিত চোখের নীরব অশ্রুবর্ষনে মিশেছিলো তাঁর অন্তরের কৃতজ্ঞতা।
মাইকেল মধুসূদন দত্তকে তাঁর অমর সাহিত্যকীর্তির জন্য ভারতীয় ডাকবিভাগ ২১ জুলাই ১৯৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

বর্তমান বাংলাদেশের সাগড়দিঘী জন্মস্থান মধুসূদন দত্তের। এবং সেই জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর মহাকবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ২৯ জুন ১৯৯৬ একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছানুযায়ী ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট কথামৃত-প্রণেতা শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের সহায়তায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে ঠাকুরের যোগাযোগ ঘটে।ঠাকুর স্বয়ং বিদ্যাসাগরের বাড়ী গিয়ে সাক্ষাৎকার করেন। ঠাকুর তাঁকে বলেন : “এতদিন খাল বিল হদ্দ নদী দেখেছি, এইবার সাগর দেখছি।”
বিদ্যাসাগরও হেসে বলেছিলেন ,”তবে নোনা জল কিছুটা নিয়ে যান।”
ঠাকুর বললেন, “নাগো! নোনা জল কেন? তুমি তো অবিদ্যার সাগর নও, তুমি যে বিদ্যার সাগর! তুমি ক্ষীরসমুদ্র!”
বিদ্যাসাগরের জন্মের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ভারতীয় ডাকবিভাগ ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে ৩.৯১×২.৯০ সেন্টিমিটারের ২০ পয়সা মূল্যের একটি রঙিন ডাকটিকিট প্রকাশ করেন। এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলকাতার বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজের ১২৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ডাকটিকিটে তাঁকে আবার দেখা যায়।
ডাকটিকিটের মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য। আজ এই প্রবন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ, তাঁর পরিমণ্ডলী এবং বিভিন্ন সময় তাঁর সংস্পর্শে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ডাকটিকিট প্রকাশ করার কথায় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হলো।।
তথ্যসূত্র : শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত, শোভেন সান্যালের লেখা ডাকটিকিটের আড়ালে ও সম্পর্কিত তথ্য।
বাহ! অসাধারণ। চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।
ধন্যবাদ।
খুবই সুন্দর লাগলো।
Asadharan ekta lekha..sotti jotoi apnar lekha gulo pori obak hoe jai…you are genious…