| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৩৩নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২২

চতুর্থ পর্ব

গঙ্গার পশ্চিমের যুদ্ধ

৪। দাউদ খানের পাটনা থেকে মালদার দিকে আগমন

এর আগের স্তবকে যে সুজার ‘স্থায়ীভাবে সুজার ভাগ্য বিপর্যয়ের-এর বিষয়টা বললাম, সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে না যদি আমরা মে মাসে সম্রাটের নির্দেশে মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পর থেকে দাউদ খানের কর্মপদ্ধতিটি বুঝতে না পারি। বাঙলা থেকে পাঠানো মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পরে দাউদ তুরন্ত কাজ শুরু করে দেন। তার প্রধান সেনানায়ককে তিন মাসের অতিরিক্ত বেতন দিয়ে সম্রাটের রি কাজ উদ্ধারের জন্য তৈরি বাহিনীর প্রধান করে দেন। দায়িত্ব পেয়ে তিনি বিশাল সেনা বাহিনী তৈরি করেন। মেশি আর দ্বারভাঙ্গা থেকে দু জন পালোয়ান জমিদার আর তাদের বাহিনী, অর্থ এবং সম্পদ চাইলেন। তাছাড়া মানকালী পরিবার এবং ককর নেতাদের ডাকলেন। স্থানীয় মাঝিদের অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে প্রচুর কিস্তি এবং ঘুরাব নৌকো কিনে নেন প্রত্যেকটি নৌকোকে ১০টি কামান আর সেনা এবং যথেষ্ট গোলাবারুদ দিয়ে সাজানোর ব্যবস্থা করলেন।

বিপুল ওই প্রস্তুতি শেষে সম্রাটের নির্দেশ পালনে স্বয়ং দাউদ তার ভাই শেখ মহম্মদ হায়াতকে নিজের সহকারী হিসেবে মনোনীত করে ১৩ মে পাটনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে ১৫০০ রিসালা (অশ্বারোহী), ২০০০ পদাতিক বাহিনী। গঙ্গা পেরোলেন নৌকোর সেতু তৈরি করে [ব্রিটিশদের ভাষায় পন্টুন সেতু] এবং তার পরে ভরা বর্ষার সরযূ আর গণ্ডকে শত্রুর তৈরি করা বিপুল বাধা পেরিয়ে ভাগলপুরের উল্টো দিকের গ্রাম কাজি-কেরিয়ায় উপস্থিত হলেন তিন মাস পরে। রোজবিহানীরা তখন তাঁর বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হতে ভাগলপুরে অপেক্ষা করছে। তাদের আনতে ৯০টি নৌকো পাঠালেন। সেখানে আগেই খাসা এবং ঘুরাব যুদ্ধ জাহাজের বিপুল নৌবহর নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সুজার সেনানায়ক খোয়াজা মিশকি (ইতিবর খান)। সুজার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিনে যুদ্ধে শুধুই গোলাগুলি চলল। রাতে দাউদ ১০টি কামানে সাজানো নৌকো আর ১০টা সাঁজোয়া নৌকো নদী পথের সুরক্ষায় সাজিয়ে রাখতে নির্দেশ দিলেন। পরের দিন লড়াইয়ে খোয়াজার হার হল। ১০ জুন মীর জুমলার রশিদ এবং রোজবিহানী সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া সেনাপতি চিরাগ, দাউদের সঙ্গে দেখা করে সুলতান মহম্মদের শাহী শিবির ছেড়ে পলানোর খবর দিলেন। দাউদ বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজি-কেরিয়া না ছাড়ার মীর জুমলার নির্দেশও প্রধান সেনাপতিকে পৌঁছে দেন। কোশি, কালিন্দি, মহানন্দায় বিপুল বন্যার জন্য দাউদকে সেখানেই বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করেতে হল। দাউদের নির্দেশে তীর জুড়ে রশিদ নিজের বাহিনী নিয়ে বিপক্ষের গোলান্দাজির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিধান করলেন। পরের দিন দাউদকে আক্রমণে সফল না হয়ে মিশকি ভাগলপুর ফিরে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে তিনি মীর জুমলার ফৌজদারকে গ্রেফতার করেন। পরে সুজার দল মীর জুমলার সেনানী আলি কুলির (শামসের) ভাইপোর ১০০ বাহিনীর হাতে হেরে যায়। আলি কুলি ফৌজদারকে ছাড়িয়ে আনেন, যুদ্ধের সঞ্জাম উদ্ধার করে স্থানীয় অঞ্চল খরাজ আদায় করে।

সমান্তরালভাবে ঠিক এই সময়ে, ২২ আগস্ট সুজা রাজমহল দখল করলেন। রাজধানী উদ্ধারের উত্তেজনায় সুজা ফিদায়ি খানকে নির্দেশ দিলেন মুঙ্গেরে গিয়ে ভাগলপুর থেকে সুরাজগঞ্জের মধ্যের এলাকার সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে নদীপথ, গ্রাম দখল করে নদীর ফেরি নিজস্ব সেনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে। তাকে খোয়াজা মিশিকির সঙ্গে যোগ দিয়ে দাউদকে আক্রমন করতেও নির্দেশ দিলেন। দাউদ তখন ভাগলপুর আর কলগঙ্গের মাঝের কোনও এক এলাকায় ছিলেন। আলি কুলির ভাস্তা [ভাইপো] শামসের, বিপক্ষের ফিদায়ি খানের বিপুল বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করে না, ভাগলপুর থেকে জাহাঙ্গিরায় (সুলতানগঞ্জের কাছে) উপস্থিত হয়। ভাগলপুর থেকে তাড়াতাড়ি পৌঁছে শত্রুর ছেড়ে যাওয়া জাহাঙ্গিরা দখল করেন ফিদায়ি ইসমাইলের কবল থেকে, প্রচুর অর্থ এবং রসদ উদ্ধার করে প্রত্যেক গ্রামে তরফদার এবং রহদার নিয়োগ আর ফেরি নিয়ন্ত্রণ করে সুজার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। যুদ্ধে ইসমাইল আহত হন এবং মুঙ্গেরে মারা যান।

দাউদ যতক্ষণ বেঁচে রয়েছেন এবং তার এলাকাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে আসতে পারছেন, ততক্ষণ সুজা নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন না। মুঙ্গেরের দুর্গ মহম্মদ হোসেন এবং তার পাঁচ সাথী নিরাপদে রেখেছিলেন। একজন মারা গিয়েছেন ইসমাইল; অন্য চার জন রাসুল, মির্জা, হাসান এবং শামসের তখনও রয়েছেন। তাকে মুঙ্গেরে দিকে না পাঠিয়ে সুজা নির্দেশ দিলেন সব ফেরি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলতে এবং দাউদের বিরুদ্ধে জলযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু করতে। সেই যুদ্ধে জিতলে দাউদ ছাড়া চার ভাইকে হত্যার নির্দেশও দিয়ে তার বাহিনীকে মীর জুমলার সঙ্গে লড়ায়ের কাজে বাংলায় পাঠিয়ে দিতে। ফিদায়ের হাতে জাহাঙ্গিরা ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন দাউদকে তার বহর দিয়ে ঘিরে ফেলতে।

দাউদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের যুদ্ধ শুরু হল। প্রথম দিনের যুদ্ধে গোলান্দাজির পর দ্বিতীয় দিনে খুব খারাপ টিপ করে সুজার বাহিনী গোলান্দাজি করতে থাকায় দাউদের খুব বেশি ক্ষতি হল না। দাউদের নিষেধ এবং বিপুল গোলান্দাজি সত্ত্বেও বিপক্ষের নৌকোগুলি ক্ষতি করতে নদীতেই প্রচুর ঘোড়া নামিয়ে দেয় রশিদ এবং চিরাগ। সুজার বাহিনী ক্রমে বন্যার প্রকোপে ৭০০ নৌকো বহর নিয়ে জাহাঙ্গিরায় চলে যেতে বাধ্য হয়। এই সংবাদে সুজা হতাশ হয়ে মন্তব্য করলেন ভাগ্যলক্ষ্মী তার প্রতি অপ্রসন্ন হয়েছেন। জাহাঙ্গিরায় মিশকিকে রেখে, মাসুমবাজারে থাকা ফিদায়ি খানকে সুজা নির্দেশ দিলেন সেপ্টেম্বরে(?) মীর জুমলার দখলে থাকা রাজমহল আক্রমন করতে আসা দাউদের অভিযানে নৌকো নিয়ে বাধা সৃষ্টি করতে। এই সময়ে দাউদ আওরঙ্গজেবের থেকে খবর পেলেন মুঙ্গেরে গঙ্গা পার হয়ে দিল্লি থেকে অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদ, ১,০০০ উইঘুর এবং উজবেগ সেনা, আবু নাবির নেতৃত্বে ৫০ জন রোজবিহানী সেনা নিয়ে ফারহাদ খান আসছেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে — এবং সেই অর্থ থেকে সৈনিকদের তিন মাসের অগ্রিম এবং নৌকোয় দিল্লি থেকে আনা ৪০টি কামান বসিয়ে ফিদায়ি এবং মিশিকির প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিতে। তারপর দাউদ খানকে মীর জুমলার সাহায্যে পাঠিয়ে তার নির্দেশ অনুসরণ করতে। দাউদ সম্রাটের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানালেন, পাঁচ মাস ধরে যে নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চলছে, তার জন্য খান সেনাপতিদের কিছু পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রয়োজন। সম্রাট দাউদের এই অনুরোধ মান্য করে সঙ্গে সঙ্গে চিরাগের নেতৃত্বে রোজবিহানী বাহিনীকে পুরষ্কার দিতে নির্দেশ দিলেন এবং স্বয়ং দাউদের পদ আরও ১,০০০ মনসবদারি বাড়ল।

কাজি কেরিয়ায় থেকে ডিসেম্বরের শুরুতে অর্ধেক বাহিনী এবং নিজেকে নৌবহরে চাপিয়ে, রশিদকে বাকি অর্ধেক সেনা নিয়ে শীঘ্র ঘোড়ায় চেপে মুঙ্গেরের দিকের গঙ্গার বাঁদিকের তীরে টহল দিতে বললেন। জাহাঙ্গিরায় মিশকি দাউদের অগ্রগমণ রোধ করলেন যতদূর সম্ভব পর্তুগিজ আর মেস্টিকোজদের নেতৃত্বে নিজের নৌবহর নিয়ে। মিশকির আক্রমণ চিরাগ বেগের বাহিনী রুখে দিলে, ৩ রাত ৩ দিনের চেষ্টায়। দাউদ মুঙ্গেরের বাঁদিকের তীরে খুব কষ্টে উঠলেন। দুর্গের হাবিলদার শত্রুর অগ্রগতি গোলান্দাজি এবং চিরাগের নেতৃত্বে ৪০টি নৌকো দিয়ে আটকে দেয়। সুজার বাহিনী ৪০টি কামান ও ১০,০০০ রকেট হারিয়ে জাহাঙ্গিরায় পালিয়ে যায়। কিন্তু সেখানেও মুঙ্গের থেকে ঘোড়ায় দাউদ নিজে এবং ৭০০ নৌকোয় দুভাগে বিভক্ত আক্রমন শানিয়ে জাহাঙ্গিরা ছাড়া করেন। দাউদ সেখান থেকে মীর জুমলার বাহিনীকে সাহায্যের জন্য আবুন নবি, হাসান, মির্জা, শামসের এবং মহম্মদ রসুলকে পাঠান। তবে মিশকি মাঝেমধ্যেই দাউদকে আক্রমন করতে থাকে। এর মাঝে মীর জুমলা তাকে নির্দেশ দিলেন গঙ্গা পার হয়ে তাণ্ডায় অভিযান করে শত্রুর ধনসম্পদ দখল করে তার জন্য অপেক্ষা করতে। আর যদি তিনি বাঁদিকের তীর পার হন, তাহলে সুজাকে ধরার কাজ শুরু করতে। এর উত্তরে দাউদ বললেন এই কাজগুলি সম্পাদন করতে তার দেরি হয়ে যাবে। চিরাগের গোয়য়েন্দাদের হাতে খবর পেয়ে ভাগলপুরে সুজার সেনাপতির য়ুসুফ খানের শিবির লুঠের আক্রমন প্রতিহত করেন। মীর জুমলা দাউদের নেতৃত্ব, তার সফলতার প্রশংসা করলেন।

কলগঙ্গে যাবার দিনই মিশকি ৭০০ নৌবহর নিয়ে দাউদের বাহিনীকে আক্রমন করে। কিন্তু প্রতিহত হয়ে পালানপুরে পালিয়ে যায়। তাণ্ডার দিকে যেতে গিয়ে গড়িতে (তেলয়াগড়ি) দেখলেন রাজমহলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে সুজার সেনাপতি বারহার সৈয়দ তাজুদ্দিন, মিশকি এবং জামাল ঘোরি। সেই মুহূর্ত্তে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তিনি বেলদারদের নদী থেকে একটা খাল কাটতে নির্দেশ দিলেন যাতে নৌকো নিয়ে তাদের বাধা কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। দুদিক থেকে শত্রুপক্ষ তাড়াতাড়ি এসে পড়লে দাউদের পুত্র হামিদ, কাদির এবং চিরাগের নেতৃত্বে কোশিতে যুদ্ধ শুরু হল। জামাল সেই যুদ্ধে মারা যায়। মিশকি পালিয়ে গিয়ে সমধে (রাজমহলের বিপরীতে) কামান নিয়ে নতুন করে বাধা সৃষ্টি করে। মুঘল, শেখ এবং পাঠানদের নিয়ে দাউদ কোশি পার হলে পুর্ণিয়ার এক ঘোড়সওয়ার তাকে খবর দেয় যে তার বক্সী ফাতাউল্লা ৫০০ জনের বাহিনী নিয়ে পুর্ণিয়ার সুজাপন্থী ফৌজদার থেকে ৩০,০০০ দিরহাম, কামান সহ ২০টি কোষা নৌকো, হাতি সুইভেল এবং প্রচুর হাউই উদ্ধার করে সম্রাটের বাহিনীর সেবার জন্য উদ্দিষ্ট করেছেন। এই বিশাল পরিমান রসদ নিয়ে নদী পেরিয়ে দাউদ অপ্রতিহত গতিতে এগোতে থাকলেন। সিক্রিগলির পূর্ব দিকে আকবরপুরে দারাইসিয়া (কালিন্দি) পার হয়ে আরও এগোবার আগে নতুন রসদ আসার জন্য অপেক্ষা করলেন।

৫। পূর্ব তীর থেকে সুজাকে হঠিয়ে দিলেন মীর জুমলা

পালাতে থাকা সুজার সেনানায়ক খোয়াজা মিশকির কাছে সমধার বড় চরের সুরক্ষা বিধান করা আবশ্যিক ছিল। তিনি সেই বড় চরে ঘাঁটি গাড়লেন। সুজার বাহিনীর নিরাপত্তা আর রাজমহল ধরে রাখার দিক থেকে সমধার চরের গুরুত্ব অসীম। অভিজ্ঞ সেনানায়ক হিসেবে মিশকি জানেন চারদিকে জলে ঘিরে থাকা চরটি চরম অসুরক্ষিত। অথচ এই চর সুজার বিরুদ্ধে ধেয়ে আসা আক্রমণকারীদের হামলা রোখার শেষতম স্থলভাগ। সমধার চর হারানোর অর্থ ছিল তাণ্ডার দিকে দাউদের অবাধ আক্রমণের রাস্তা খুলে যাওয়া। রাজমহলের সম্পদ, রসদ ভাণ্ডার আর সুজার পরিবারের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। সংবাদ পেয়ে উদ্বিগ্ন সুজা যুদ্ধ সমিতির বৈঠক ডাকলেন। মিশকির হাত শক্ত করতে চরে বাহিনী পাঠানো দরকার। অথচ চরে বাহিনী পাঠাবার অর্থ বর্তমান যুদ্ধ এলাকায় যুদ্ধদক্ষ সেনা হারানো এবং মীর জুমলার হাতে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করা। সেই মুহূর্তে মীর জুমলাকে আক্রমন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক হল সৈন্য নিয়ে সুজা মালদার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, সমধা সুরক্ষা নিশ্চিত করে দাউদের অভিযান রুখবেন। তাদের ধারণা হোল, বর্ষার সময় নিশ্চয়ই পূর্ব পাড়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না এবং বর্ষার শেষের আগেই তিনি ফিরে এসে আবার সম্রাটের বাহিনীর মহড়া নিতে পারবেন। সুজার অবর্তমানে বাহিনীর পিছনের অংশটা হাতির বাহিনীর দ্বারা সুরক্ষিত করার নির্দেশ দিলেন এই হুঁশিয়ারি দিয়েই, যারা পালাবার কথা ভাববে তাদের পরিবারকে কতল করা হবে এবং সমস্ত সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে। শত্রু যদি আক্রমণ করতে আসে তাহলে কামান দিয়ে তাদের রুখতে হবে। ২৬ ডিসেম্বরের নসিপুরে সুজা ভাগীরথী পার হলেন তাণ্ডার পথে যেতে সুতিও পেরলেন।

কারাওয়ালদের (চর) থেকে সুজার পশ্চাদপসরণের খবর পেয়ে মীর জুমলা তুরন্ত প্রতিআক্রমনে গেলেন। গিরিয়ায় সেনাপতিদের মন না দিয়ে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তিনি প্রত্যেক সেনানায়ককে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন, যারা ভয়ে পিছনে থেকে যাবে তাদের জন্য কফিনের দরজা খোলা রাখা থাকল। ২৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় তিন মাইল এগিয়ে তিনি বাঙলার সুবাদারকে দেখলেন একটি কাদাওয়ালা জমিতে নালার পিছনে দাঁড়িয়ে তার দুপাশে কামান সাজিয়ে রেখেছেন। এই ধরণের হাওর এলাকায় মীর জুমলার এগোনো সম্ভব ছিল না। সন্ধ্যে পর্যন্ত আক্রমনের পরিকল্পনা মুলতুবি রেখে শিবিরে ফিরে এলেন। সম্রাটের পাঠানো রসদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ২৮ ডিসেম্বর সুজা পালালেন। সকালে সেনাপতিরা দক্ষভাবে নালাটা আর হাওর পেরিয়ে গিয়ে সুজার পিছু নিলেন। চরেরা খবর আনল সুজা তরতিপুরে ফেরি পার হবেন। দুমাইল এগোনোর খবর পেলেন (এটি ভুল তথ্য) সুজা সুতির দিকে যাচ্ছেন। ইখলাস খান তথ্যটা যাচাই করে দেখার পর মীর জুমলা নিজে পলাতক শাহজাদার পিছন ধরলেন। পাঁচ মাইল ধাওয়া করে তিনি ফতেপুরে বিশ্রাম নিলেন। মহম্মদ মুরাদ বেগের কামান বাহিনী রাতে এল। পরের দিন সকালে সুতি পেরিয়ে আধ মাইল গিয়ে চিলমারিতে সুজার মুখোমুখি হলেন মীর জুমলা।

সন্ধ্যে পর্যন্ত মীর জুমলার বাহিনীর ওপরে গোলান্দাজি চালালেন সুজা। সম্রাটের বাহিনীর আবদুল মজিদ ডেকানি, পীর মহম্মদ উইঘুর এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে ১০০ জনের একটি ডাকাবুকো বাহিনী তরোয়াল হাতে সুজার বাহিনীর ডানদিকের দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে গেল। রাত একটা নাগাদ যুদ্ধ শেষ হল। সুজার পক্ষে আর জেতা নয় বুঝে নুরুল হাসান মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেন। সুজা বুঝলেন যে তার পক্ষে আক্রমন আর গোলান্দাজি সমানতালে শানানো সম্ভব নয়। সুজার প্রধান লক্ষ্য মীর জুমলাকে নদী পার হতে না দেওয়া।

রোজ দুপক্ষের হাতাহাতির অসংখ্য ঘটনা ঘটতে লাগল। মীর জুমলার নজরদারি থাকায় নদী পার হওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে সুজা ১ জানুয়ারি ১৬৬০-এর রাতে উত্তরে দুনাপুরের (দানাপুর?) দিকে পালানোর পরিকল্পনা করলেন। প্রচুর নালা পেরিয়ে নালার ওপর তৈরি সেতু পেরোনোর পর পিছনের সেওতু ভেঙ্গে দুনাপুর থেকে দোওগাছিতে পালালেন বিপক্ষের দেরি করিয়ে দেওয়ার রণনীতি নিয়ে। মীর জুমলা তার পিছনে পড়ে রইলেন কিন্তু হাওর, নালা, ভাঙা সেতু অগ্রগতি রোধ করছিল। দুনাপুরে মীর জুমলার পদাতিক বাহিনী আর গোলান্দাজি বাহিনীকে নালা পেরোতে হল সেটিকে ভরাট করে। সেতু তৈরি করে, খুব ধীরে কামান পার করা হল। এখানে সুজার ছেড়ে যাওয়া কিছু নৌকো, গোলাবারুদ, ১০টি কামান ২০০টি হাউই উদ্ধার করলেন মীর জুমলা।

দেওগাছিতে মীর জুমলা আত্মরক্ষায় পরিখা কাটলেন। সুজার বিরুদ্ধে এর আগে যে সব সফল যুদ্ধ নীতি তিনি নিয়েছিলেন সেগুলও এবারেও অনুসরণ করার চেষ্টা করতে চাইলেন। তার অন্যতম উদ্দেশ্য হোল দেওগাছি আর গিরিয়ার উল্টোদিকের চর দখল। বাহিনীকে অযথা গোলা বারুদ নষ্ট না করতে লুকিয়ে থাকতে নির্দেশ দিলেন। যদি শত্রুরা আক্রমণ করে তাহলেই জবাব দেওয়ার নির্দেশ জারি হল। বিপক্ষের সেনাপতি মীর জুমলার চালাকিতে পা দিলেন না। খবরটি তিনি আগেই কারাওয়ালাদের থেকেই পেয়েছিলেন। যেহেতু গোলান্দাজিতে মীর জুমলা সুজার তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন, সেহেতু তিনিও বিপক্ষকে উপযুক্ত জবাব দিতে উতসুক হলেন না। ফতে জং এবং ইসলাম খান খোঁজ খবর না নিয়ে পথ দেখানো বাহিনীকে নিয়ে হঠাৎ দেওগাছির নালার কাছে চলে গেলে সুজার বাহিনী গোলা বর্ষণ করে তাদের পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।

ফিদায়ি খান এবং জুলফিকারকে সঙ্গে নিয়ে মীর জুমলা চাপ দিতে শুরু করলেন এবং চেষ্টা করলেন যদি সুযোগ আসে তো তিনি নালাটা পার হয়ে বিশাল পদাতিক বাহিনী নিয়ে বিপক্ষের ওপর আক্রমন করে তাদের পালাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু বিপক্ষের তীব্র গোলান্দাজিতে তার এই রণনীতও বিফল হল। হাল্কা কামান নিয়ে মীর জুমলা ভারি গোলান্দাজির বিরুদ্ধে দিনের শেষ থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত লড়ার যথাযাধ্য চেষ্টা করলেও প্রচুর ক্ষতি হল। তা সত্ত্বেও মীর জুমলা আক্রমণের ঝাঁঝ বজায় রাখলেন। শত্রুকে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিলেন না, এবং পড়ে পাওয়া কোন সুযোগ এসেগেলে সেসব তিনি ছেড়ে দেন না। উলটো দিকে ক্রমশ সুজার বাহিনী হতোদ্যম হয়ে পড়তে থাকে। সুজার তীব্র আক্রমনের মুখে মীর জুমলার জোরদার প্রতিরোধ সুজাকে এতই হতোদ্যম করে দেয় যে, সে দাঁতে নখ কাটতে শুরু করল।

মীর জুমলার বাহিনীতে বহু প্রতীক্ষিত ভারি কামান এসে গেল। কামান থেকে মীর জুমলা গোলান্দাজি করা শুরু করলেন। সেই গোলাবাজির ধাক্কা সুজার বাহিনীর পক্ষে প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াল। বহু সেনা মারা গেল। সুজার পক্ষে আর হাতাহাতি লড়াই দেওয়া সম্ভব হল না। মাঝরাতে সুজার গোলান্দাজি বন্ধ হল। মীর জুমলা গোলান্দাজি বন্ধ করলেও কামানের মুখ শত্রু শিবিরের দিকে তাক করে রাখলেন।

পরের দিন ২ জানুয়ারি পূর্ব পাড় ধরে সুজা এগোতে শুরু করলে, পশ্চিম পাড়ের নালা বরা বর মীর জুমলা সুজাকে অনুসরণ করে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হলেন। সুজা বিপুল সমস্যায় পড়লেন। তীরে শত্রু, ফলে তার পক্ষে নদী পার হওয়া কঠিন। তিনি যদি নিজে সেনার আগে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে তার বাহিনী থেকে তিনি দূরে চলে যাবেন, আর যদি তার আগে সেনা নদী পার হয়, তাহলে তাদের শত্রুর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ভয় থাকবে। সুজা তার শিবির ঘিরে গভীর পরিখা কেটে কামানের সারি বসিয়ে দিলেন। মহম্মদ সুলতানের মতিগতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাকে তাণ্ডায় পাথালেন। সুজা নৌকো সেতু গড়ার চেষ্টা করলে মীর জুমলা তার দিকে বৃথাই গোলা ছুঁড়লেন, কাজের কাজ কিছুই হল না। ৯ জানুয়ারি ১৬৬০, সেই সেতু করে সুজা নদী পার হলেন, নৌকোও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev