প্রথম অধ্যায়
ছয়
এবার আমরা ধর্মশাস্ত্র সংকলন সময়ের শেষের দিকের সময়ের নারদ এবং বৃহস্পতির স্মৃতিশাস্ত্র সংকলনের সময় (পঞ্চম থেকে সপ্তম খ্রিঃপূ) নিয়ে আলোচনা করব। শ্রেণী সংগঠন এই সময়েও বিকাশলাভ করছিল নিজের গতিতে। নারদ এবং বৃহস্পতি আইনের সীমালঙ্ঘন বিষয়ে (সম্বাদ ব্যতিক্রম) একটি আলাদা অধ্যায় ব্যয় করেছেন। আমরা দেখছি কীভাবে শ্রেণী সংগঠনগুলো প্রভাবশালী হয়ে উঠছে এবং রাষ্ট্র পরিচালকদের তাদের ওপরে নজর পড়ছে। নারদ স্পষ্ট লিখছেন — ‘রাজা শ্রেণী সংঘ এবং অন্যান্য সংগঠনের ব্যবহারবিধি রীতিনীতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাদের স্বশাসন আইন যাই হোক না কেন, তাদের ধার্মিক দায়িত্ব যাই হোক না কেন, তাদের হাজিরা এবং জীবিকা বিষয়ে যে সব নীতি প্রণীত হয়েছে, সে সব নীতি রাজার সম্মতিতে আবশ্যিকভাবে অনুমোদিত হতে হবে’। তাছাড়াও স্মৃতিকারেরা বলছেন — ‘যারা সমিতির সদস্যদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করবে, তাদের কঠোরতম সাজা দিতে হবে; কারন তাদের শাস্তি না দিলে তারা মহামারীর মত মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’ ধর্মশাস্ত্রে স্পষ্ট উল্লিখিত শাস্তিবিধান আমাদের বুঝতে সাহায্য করে মধ্য যুগের সমাজ সংগঠনে কীভাবে শ্রেণী সংগঠনগুলি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই সময়ের নানান লিখিত সাহিত্য থেকে আমরা শ্রেণী সংগঠনের উদ্ভব আর বিকাশ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা উদ্ধার করতে পারি। বৃহস্পতি বলছেন —

জলির অনুবাদে, গ্রামবাসী, কোম্পানী (কারিগরদের) এবং সমিতির মধ্যে গঠিত কমপ্যাক্টকে বলা হচ্ছে চুক্তি; এই ধরনের (একটি চুক্তি) দুঃসময়ে এবং ধর্মাচরণের কাজে যৌথভাবে পালন করা আবশ্যক (A compact formed among villagers, companies (of artizans) and associations is (called) an agreement; such (an agreement) must be observed both in times of distress and for acts of piety.)
ডাকাত বা চোরদের (লুঠ আর চৌর্যবৃত্তি) থেকে উদ্ভুত আসন্ন বিপদ সকলের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে; এই ধরণের (বিপদ) আবির্ভূত হলে সকলকেই প্রতিহত করতে হয়, একা মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার একার পক্ষে সেই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব (When a danger is apprehended from robbers or thieves, it is (considered as) a distress common to all; in such a case, (the danger) must be repelled by all, not by one man alone whoever he may be.)
অনুবাদটা আমার খুব একটা পছন্দ হয় নি — such (an agreement) must be observed both in times of distress and for acts of piety এই লাইনটার কোনও সন্তোষজনক মানে আমি খুঁজে পাই নি। আমার মনে হয়েছে এই স্তবকটার মর্মটা লুকিয়ে আছে এখানেই — এই দেশাচারটি প্রযুক্ত হবে তাদের কাজ রুদ্ধ করার বিরুদ্ধে কোনও বিপদ আবির্ভূত হলেই।
পরের স্তবকটিতে জলি ‘চাট চৌর’র মানে করেছেন চোর এবং ডাকাত। সংস্কৃততে চার অর্থে চোর বোঝায়, কিন্তু চাত/চাট-এর অর্থ আমার কাছে অন্তত পরিষ্কার হয় নি।
চাট শব্দ উল্লিখিত হয়েছে a chata-bhata prdvesya তে এবং এই সময় অন্যান্য ভূদান লিপিতে যে ক-বার শব্দটা উল্লিখিত হয়েছে, সেখান থেকে ড বুহলার এবং ড. ফ্লিট শব্দটার মানে করেছেন ‘অনিয়মিত বাহিনী’। এছাড়াও জলির শেষ অংশটার অনুবাদও বিন্দুমাত্র সন্তোষজনক নয়। এর অর্থ হতে পারে, কোনও এক ব্যক্তি যাতে বার বার সাধারণ বিপদের কাজ না করে, তার জন্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা। এর অর্থকে এভাবে ভাবা যায়, একমাত্র যৌথ সঙ্ঘ, কোনও ব্যক্তি নয়, সে ব্যক্তি যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, (সঙ্ঘই) বিপদকে প্রতিহত করতে পারে (it is the united body, not a single individual, whoever (i.e., however great) he may be, that is able to repel the danger)।
ক্রমশ আমাদের সামনে ওপরের স্তবকের মর্মবস্তু পরিষ্কারভাবে উন্মোচিত হচ্ছে। প্রথম দুটি বাক্যে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে কেন শ্রেণী সংঘ বা অন্যান্য সমিতির সদস্যদের মধ্যে নিশ্ছিদ্র ঐক্য রাখা দরকার। দুটি কারন আবির্ভূত হল প্রথমত দুর্ঘটনা এড়ানো দ্বিতীয়ত যথাযোগ্যভাবে ধার্মিক এবং অধার্মিক দায়িত্ব পালন করা।
শেষ দুটি বাক্য চোর, লুঠেরা আর অনিয়মিত সেনা বাহিনী (যুদ্ধের পরে যারা বাহিনী থেকে ছাড়া পেলে জনপদে ঢুকে এসে বিপদ সৃষ্টি করে) থেকে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে। স্মৃতিকারেরা মনে করছেন, একা একা এই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না; তাই তাঁরা সংঘের সদস্যদের শ্রেণী সংঘে একত্রিত থাকার যুক্তি পেশ করেছেন।
ওপরের আলোচনা থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি সমবায়িক আদর্শের গুরুত্বটি; এই আদর্শ ব্যবহার করে নানান সঙ্গঠন নানান সাধারণ বিপদ থেকে উদ্ধার পেত। সমবায়িকভাবে জোট বেঁধে থাকার দর্শন জনগণের মানসিকতায় চারিয়ে গিয়েছিল বলেই শ্রেণী সংঘের উদ্ভব ঘটেছিল এবং শ্রেণী সংঘের যথাযোগ্য বিকাশ ঘটেছিল।
এই শাস্ত্রে নতুন শ্রেণী সংঘ তৈরি করার পদ্ধতি বিশদে উল্লিখিত হয়েছে। বৃহস্পতি বলছেন (৪৯ পাতার শ্লোক) অগ্নিপরীক্ষা মার্ফৎ পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে পবিত্রতার পরিবেশে লিখিত শর্তে মধ্যস্থ মার্ফৎ [সংগঠন তৈরি হবে বা সদস্যতা বিবেচিত হবে], তারপর [সেই সংগঠন] শুরু করবে (Mutual confidence having first been established by means of (the ordeal by) sacred libation, by a stipulation in writing, or by umpires, they shall then set about their work)।
এই শ্লোক থেকে বোঝা যায় শ্রেণি সংঘ তৈরি করার প্রথম ধাপ হল ইচ্ছুক সদস্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জারিত করা। এটি করা হয় নিম্নলিখিতভাবে
১। কোষ — দোষ পরীক্ষা (অর্ডিয়াল) সূত্রে। পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে বিশদে বাক্যব্যয় করেছেন নারদ এবং যাজ্ঞবল্ক্য উভয়েই। সংগঠনে যোগ দেওয়া কোনও ব্যক্তিকে পরীক্ষা করার উপায় হল, তার উপাস্য দেবতার মূর্তি ধোয়া জল তিনবার পান করানো। এক সপ্তাহ বা এক পক্ষ কালের মধ্যে সে যদি দুর্দশাগ্রস্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে মানুষটি অপবিত্র বা অযোগ্য। অন্যথায় মানুষটিকে পবিত্র গণ্য করতে হবে। এরপরেই মানুষটা শ্রেণী সংগঠনের সদস্য হওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
২। লেখ ক্রিয়া — যতদূরসম্ভব এটি সম্মতি/চুক্তি পত্র, যেখানে সংঘের নিয়ম বিশদে লিখিত হবে এবং সেগুলি সকলে মান্য করবে।
৩। মধ্যস্থ — মধ্যস্থর অর্থ এখানে কী বোঝানো হয়েছে সেটা আন্দাজ করা মুশকিল। আজকে যেমন কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি অন্য কারোর হয়ে জামিন থাকেন, এটা হয়ত সেরকম কিছু একটা।
পরস্পরের মধ্যে আস্থার ভাব জাগিয়ে তোলার পরে সংঘের কাজ শুরু হয়। সংঘের কাজকর্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল সমাজের পেশাদারি কাজকর্ম সম্পাদন করা এবং নথিপত্রে এগুলি লিখিত হয় এবং প্রত্যেক সদস্য এই নথিতে সম্মতি প্রকাশ করতে হয়।
শ্রেণী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মগুলির মধ্যে অন্যতম হল জনকৃত্য সম্পাদন করা, অর্থাৎ সদস্যদের কর্ম সম্পাদনের জন্যে একটি বাড়ি তৈরি করা যেখানে সাময়িকভাবে কর্মসম্পাদন করতে আসা মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। এছাড়াও জলাশয়, মন্দির, এবং বাগান তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হত। বলা হয়েছে সংগঠন পবিত্র শাস্ত্রে বর্ণিত পদ্ধতি মেনে গরীবদের জন্যে সংস্কার কর্ম বা বলি দেওয়ার কাজেও সহায়তা করবে।
এই সব ইচ্ছামূলক কাজকর্ম একটি প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে লেখা হবে এবং তবেই আইনের চোখে এই চুক্তিটি বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। শ্রেণী সংঘের এই ধরণের কাজকর্মের বর্ণনা জুন্নার শিলালেখতে উল্লিখিত হয়েছে। আমরা আগেই উল্লেখ করে দেখিয়েছি যে ভুট্টা/দানা শস্য ব্যাপারীদের শ্রেণী সংগঠন জলধারক তৈরি আর গুহা কাটারও কাজ করছে। মান্দাসোর শিলালিপিতে উল্লিখিত হয়েছে রেশম তাঁতিরা গুরুত্বপূর্ণ সূর্য মন্দির তৈরি করেছেন এবং সেটিকে ৪৭৩-৭৪ সনে সারিয়েছেন।
সাত
এই ধরণের বহুধা ব্যপ্ত কাজ সমাধা করতে যে প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন হত, সেটি বৃহস্পতিতে বিশদে বলা হয়েছে। সংগঠনে প্রেসিডেন্ট বা সমিতি প্রধান হিসেবে একজন ব্যক্তি থাকতেন, তাঁকে সাহায্য করার কাজ করতেন দুই থেকে পাঁচজন আধিকারিক (গোয়ালিয়রের বৈল্লাভট্ট স্বামী মন্দিরে যে শিলালেখ পাওয়া গিয়েছে, তাতে নানান শ্রেণী সংঘের কার্যকরী পদাধিকারিকের কথা উল্লিখিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তেল উৎপাদন করা কলু সমাজের শ্রেণীগুলির সংগঠন, শ্রেণী সংঘের প্রধান কর্মাধ্যক্ষ্য পদের নাম বলা হয়েছে তৈলিকামাহট্টক, তার পরের কয়েকজন আধিকারিকের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা কয়েকটি তেল মাড়াই করা পেশাদার সংঘের কাজ সুষ্ঠূভাবে চালাবার জন্যে সঙ্ঘ প্রধানের সঙ্গে শ্রেণীর সদস্যরূপে কাজ করবেন। কলুদের অন্যান্য শ্রেণী সংঘর আধিকারিকের সংখ্যা ছিল — একটিতে ৪ জন, আরেকটিতে ২ জন এবং আরেকটিতে ৫ জন)। বৃহস্পতি নির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন আধিকারিকদের গুণ — যে সদস্য সৎ, বেদজ্ঞানী আর নিজের কাজকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত, দক্ষ, স্বনিয়ন্ত্রিত, অভিজাত পরিবারজাত এবং প্রতিটি ব্যবসায় দক্ষতা প্রদর্শনো করেছেন, তাকেই আধিকারিক হিসেবে নিযুক্ত করতে হবে।
শ্রেণী সংঘের আধিকারিকেরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সদস্যদের কাজকর্ম ইত্যাদির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করত। বৃহস্পতি বলছেন, যদি দেখা যায় কোনও সদস্য ইচ্ছা করে প্রতিশ্রুত চুক্তি ভঙ্গ করছেন, তাহলে তার সম্পত্তি দখল করে নেওয়া হবে এবং তাকে শহর থেকে বহিষ্কার করা হবে। কোনও সদস্য অন্য সদস্যকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অথবা তার কাজে শৈথিল্য প্রকাশ করে তাহলে তাকে ৬ নিষ্ক ৪ স্বর্ণ জরিমানা করা হবে। যদি কেউ সংগঠনের ক্ষতি করে অথবা চুক্তি ভঙ্গ করে তাহলে তাকে শহর থেকে বহিষ্কার করা হবে।
ক্ষতিকারক সদস্যদের মোকাবিলা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং অধিকার ছিল আধিকারিকদের ওপর — প্রথমে হালকা জরিমানা, সর্বশেষে শহর থেকে বহিষ্কারের সাজা। আধিকারিকেরা অকম্পিত চিত্তে এই ধরণের কড়া শাস্তি দেওয়ার অধিকারী হত। বৃহস্পতি বলছেন তাদের (শ্রেণী সংঘের আধিকারিকেরা) শাস্তি, সে কম বা যতই অতিরিক্ত হোক না কেন, সেটি যদি সংঘের নিয়মনীতি মেনে নেওয়া হয়, এবং সেটি যদি রাজার সম্মতিতে নেওয়া যায়, সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে — কারন তাদের এই সঙ্ঘ ব্যবস্থাপনার জন্যে নিয়োগ করা হয়েছে।
রাজা কিছু কিছু মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন। তার পরের শ্লোকে বলা হয়েছে, সংঘের আধিকারিকেরা যদি বিদ্বেষ বশে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, অথবা কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সম্মানহানিকর কোনও পদক্ষেপ করে থাকেন, রাজা তাদের সেই কাজ করতে সংযত করবেন এবং তারা যদি তারপরেও সেই ধরণের কাজ চালিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন। মনে হয় সদস্যদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আধিকারিকের নেওয়া যে কোনও শাস্তির বিরুদ্ধে রাজার কাছে আবেদন করা যেত। রাজা যদি তদন্ত করে বুঝতেন শাস্তি শ্রেণী সংঘের নিয়ম নীতি মেনে প্রযুক্ত হয় নি, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ফলে ঘটনাটি ঘটেছে, তাহলে রাজা সে শাস্তি রদ করতে পারতেন। আলোচ্য দুটি স্তবক থেকে মনে হয় যদিও রাজা শ্রেণী সংঘের স্বাধীনতাকে সম্মান করতেন, কিন্তু কোনও গণতান্ত্রিক সংঘে, সংঘ প্রধানের ব্যক্তিগত দ্বেষের বিরুদ্ধে সাধারণ সদদ্যকে বাঁচানোর ঢাল হিসেবে তিনি মাঝেমধ্যেই নিজের রাজনৈতিক ওজন প্রয়োগ করতেন। হয়ত এইভাবেই ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সমিতির অধিকারের মধ্যে উদ্ভুত সংঘাতের সমন্বয়সাধন করা হয়ে থাকবে।
শ্রেণী সংঘের আধিকারিকদের কর্তৃত্ব প্রকাশের কিছু উদাহরণ থাকলেও এই সময়ের শ্রেণী সংঘের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ খুবই লক্ষ্যণীয় বিষয় ছিল। এই সময়ের শ্রেণী সংঘের সাধারণ সদস্যরা মাঝেমধ্যে একত্রিত হয়ে সংগঠনের কাজকর্ম সম্পাদন করতেন। নারদ সূত্রে পাওয়া যাছে, সাধারণ সদস্যরা কীভাবে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিতে পারবে, তার নির্দিষ্ট নিয়ম নীতি তৈরি করার নির্দেশাবলী পাওয়া যাচ্ছে এবং রাজা এই নিয়মগুলোর অনুমোদন যে দিতেন সেটাও জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে টিকাকার মিত্র মিশ্র বলছেন — বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ ছড়ানোর মাধ্যমে সমিতি গৃহে সদস্যদের জড়ো হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হত। উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত ভাষণ দেওয়া হত এবং এই ধরণের সমাবেশে কথা বলার অধিকার সে সময় অজানা বিষয় ছিল না। কাত্যায়নের বিবাদরত্নকর থেকে ছন্দেশ্বর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, —

শ্রেণী সংঘের আধিকারিক যদি সদস্যের যুক্তিযুক্ত বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেয় (বলতে না দেওয়া হয়, বক্তব্যের সময় মাঝ পথে থামিয়ে দেওয়া হয় ইত্যাদি) অথবা অনুচিত কিছু বলেন তাহলে তাকে পূর্ব purvasahasadanda পূর্বসহসাদণ্ড নামক শাস্তি দেওয়া হবে।
বেশ কিছু ছোটখাট নিয়মকানুনের মাধ্যমে শ্রেণী সংগঠনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হত। প্রধান আধিকারিক অথবা অন্যান্য আধিকারিক, যাদের শ্রেণী সংঘের দৈনন্দিনের নানান ধরণের কাজকর্ম বিষয়ে যেমন উপার্জিত নানান সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে (যেমন সংঘের মাঠ বা বাগানের সীমান্ত নিয়ে বিবাদ আদালতে পৌঁছলে), অথবা রক্ষা করার (চৌর্যবৃত্তি থেকে) বা সংঘের ঋণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অথবা রাজা সংঘ বা সমাজকে যা কিছু উপহার হিসেবে দিয়েছেন, বৃহস্পতি নিদান দিচ্ছেন, সে সব সম্পদ সদস্যদের সঙ্গে সমভাগে ভাগ করে নিতে হবে। শ্রেণী সংগঠনের কাজের জন্যে নেওয়া ঋণ আধিকারিকেরা যদি শ্রেণীর স্বার্থ না দেখে স্বস্বার্থে ব্যয় করে, তাহলে তাদের সেই পরিমান সম্পদ সঙ্ঘকে ফেরত দিতে হবে।
মিত্র মিশ্রের কিছু মন্তব্য থেকে মনে হয় শ্রেণী সংঘের নতুন সদস্যের অন্তর্ভূক্তি এবং পুরোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা যেত একমাত্র সমিতির সাধারণ সভার সিদ্ধান্তে। কাত্যায়নের কিছু শ্লোক তুলে তিনি বলছেন নতুন সদস্য শ্রেণী সংঘের সম্পদ এবং দায়ের সম-অংশিদার হবে এবং বিভিন্ন দানধ্যান এবং ধার্মিক কাজকর্মেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। আবার উল্টোদিকে সংঘ থেকে বেরিয়ে যাওয়া সদস্য স্বাভাবিকভাবে সংঘের কাজে অংশ নিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বিবাদরত্নাকরের রচয়িতা চণ্ডেশ্বরও কিছু শ্লোক উল্লেখ করে বলছেন শ্রেণী সংঘের সদস্য হতে গেলে প্রত্যেক সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন ছিল কিন্তু সংঘ ছাড়ার জন্যে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট ছিল।
ওপরে যে শ্লোক উদ্ধৃত করেছি সেখান থেকে আমরা পরোক্ষে আন্দাজ করতে পারি শ্রেণী সংঘগুলির চরিত্র অনেকটা গণতান্ত্রিক সংগঠনের চরিত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে
১। আদালত শ্রেণী সংগঠনকে সমবায়িক সংগঠনের স্বীকৃতি দিয়েছিল, কারন সংগঠন তার সদস্যদের বাগান মাঠ ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের কাজকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্বাচিত করত;
২। শ্রেণী সংগঠনে বহু স্থায়ী সম্পত্তি তৈরি হত যেমন মাঠ, বাগান ইত্যাদি;
৩। প্রধান আধিকারিক সংঘের জন্যে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারত;
৪। সংগঠনের হয়ে ধর্মীয় এবং দানধ্যানের কাজ করা যেত, প্রত্যেক ব্যক্তি সদস্য পূণ্যের নানান কাজের ভাগিদার হত;
৫। যে কোনও সদস্য শুধুই তার নিজের সিদ্ধান্তেই শ্রেণী সংঘের সদস্যপদ ছেড়ে যেতে পারত।
কিন্তু এই ব্যবস্থার সব থেকে আকর্ষণীয় গণতান্ত্রিক চরিত্রটি ছিল সর্বোচ্চ আধিকারিক/দের সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা। বিষয়টা নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন মিত্রমিশ্র।তিনি যাজ্ঞবল্ক্যর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৮৭ সংখ্যার শ্লোক তুলে কাত্যায়নের বক্ষ্যমাণ শ্লোকে মুখ্যের ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করে বলছেন সদস্যরা সভায় একসাথে যোগ দিয়ে প্রধান আধিকারিককে শাস্তি দিতে পারত —

শ্রেণী সংঘের যে কোনও আধিকারিক সংঘে বিভেদ তৈরির মত বা সংঘের সম্পদ ধ্বংস করার মত জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন তাকে সংঘের পদ থেকে বহিষ্কার করা যেত। এবং এই কাজটি করার জন্যে সংঘ প্রকাশিত প্রতিবেদনই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে রাজার অনুমতি অপ্রয়োজনীয়। সর্বোচ্চ আধিকারিক যেহেতু বিপুল ক্ষমতাধর ছিলেন এবং বিশেষ মানসিকতা সম্পন্ন ছিলেন, তাই তাকে পদ থেকে সরানো সব সময়ে খুব সহজ কাজ ছিল না। বৃহস্পতি সংহিতায় বলা হচ্ছে এমতাবস্থায় বিষয়টি রাজার গোচরে আনা হত

When a dispute arises between the chiefs and the societies, the king shall decide it, and shall bring them back to their duty
সাধারণত রাজা দুপক্ষের বক্তব্য শুনতেন এবং পূর্বে আলোচিত শ্রেণী সংঘের বিশেষ আইন বলে সিদ্ধান্ত নিতেন। তারপরে তিনি ফরমান জারি করে তার সিদ্ধান্ত প্রচার করতেন। (চলবে)