প্রথম অধ্যায়
এগার
শ্রেণী সংগঠন আর সমুহগুলোর কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা থেকে আমরা প্রাচীন যুগের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিচয় তুলে আনতে পারি। পেশাদারদের শ্রেণী সংঘ ছাড়াও সে সময় আরও বেশ কিছু সামুহিক সংঘ এবং যৌথ ব্যবসায়িক জোট উদ্যমের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। সেই সব আলোচনা তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ব্যবসা বাণিজ্য সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে যৌথ অংশিদারির নীতিতে ব্যবসায়িক জোট তৈরি করে ব্যবসা চালানো হত। এই ধরণের সমবায়িক ব্যবসায়িক জোট কাঠামোর অস্তিত্ব প্রাচীন কাল থেকেই ছিল। বিভিন্ন জাতক আখ্যানে এ ধরণের যৌথ অংশিদারিত্বের ব্যবসায়িক সংগঠনের উল্লেখ পাচ্ছি। চুল্লকসেত্থি জাতকে উল্লিখিত হয়েছে একজন যুবক কীভাবে তার হাতের আঙটি অগ্রিম দিয়ে জাহাজঘাটায় আগত একটি জাহাজের পণ্য বায়না করে। জাহাজের আগমনের সংবাদে বেনারসের ১০০ শ্রেষ্ঠী উপস্থিত হয়ে জানতে পারল জাহাজটির পণ্য অগ্রিম হয়ে গেছে, তারা তখন সেই যুবককে ১,০০০ মুদ্রা অগ্রিম দিয়ে পণ্য বায়না করল। তারপরে তারা প্রত্যেকে আরও ১,০০০ টাকা দিয়ে পণ্য কিনে নিলে যুবকের ১,০০,০০০ মুদ্রা আয় হল। এই উদাহরণ থেকে তৎকালীন ব্যবসা চালানোর নীতি, প্রথা আর কাঠামোর উদাহরণ পাচ্ছি।
আবার কুতবাণিজ্য জাতকে পড়ি দুজন বণিক যৌথ উদ্যমে বেনারস থেকে ৫০০টি গাড়ি পণ্য নিয়ে শহরতলীতে ব্যবসা করার জন্যে অর্থ বিনিয়োগ করছে। সুহানু জাতকে উত্তর অঞ্চলের ঘোড়া ব্যবসায়ীদের কথা আছে। অংশটি পড়ে আমাদের ধারণা যতদূরসম্ভব তারা যৌথ উদ্যমে ঘোড়া ব্যবসা করত। কুতবাণিজ্য জাতকে শ্রাবস্তীর দুজন শ্রেষ্ঠী যৌথ উদ্যোগে পূর্ব থেকে পশ্চিম দেশে ব্যবসা করতে যাওয়ার জন্যে ৫০০ গাড়ি পণ্য বোঝাই করছে। বাভেরু জাতকে ভারতীয় বণিকদের কথা আছে যারা অদ্ভুতদর্শন নানান পাখি ধরে বাভেরু প্রদেশে বিপুল মূল্যে বাণিজ্য করছে। মহাবাণিজ্য জাতকে কয়েকজন শ্রেষ্ঠী কিছু কালের জন্যে যৌথ উদ্যমে ব্যবসা করার পরিকল্পনা করছে। ঈশান ঘোষের জাতকে বলা হয়েছে —
নানান রাজ্য হতে আসি মিলিয়া বাণিজ্যগণ
নেতৃপদে একজনে করিল বরণ।
শকটে পুরিয়া পণ্যে যায় সবে এক সঙ্গে
করিতে বাণিজ্য দ্বারা ধন আহরণ।
ঘটনাবহুল জাতক সাহিত্যে আমরা পরিষ্কারভাবে যৌথ উদ্যমে ব্যবসা চালানোর ছবি পাই। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী এবং মহাজনদের সমবায়িক জোট উদ্যমেরও পরিষ্কার উদাহরণও পাচ্ছি।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই ধরণের ব্যবসা উদ্যমের উল্লেখ করা হয়েছে (Where traders or others carry on business jointly, it is called partnership, which is a title of law)। প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রেও এই ধরণের ব্যবসার কথা উল্লিখিত আছে (সংস্কৃত শব্দটা লিখতে হবে)। নারদও এই ধরণের উদ্যমের কথা উল্লেখ করেছেন এই শ্লোকে —

( Where traders or others carry on business jointly, it is called partnership, which is a title of law. Where several partners are jointly carrying on business for the purpose of gain, the contribution of funds towards the common stock of the association forms the basis (of their undertakings). Therefore let each contributes his proper share. The loss, expenses, and profit of each partner are either equal to those of the other partners or exceed them or remain below them, according as his share is equal to theirs, or greater or less.The stores, the food, the charges (for tolls and the like), the loses, the freight and the expense of keeping valuables must be duly paid for by each of the several partners, in accordance with the terms of their agreements.)।
এই ব্যবস্থার সারমর্মটি হল ব্যবসা এবং লাভ করার জন্যে প্রত্যেকে কিছু কিছু অর্থ প্রদান করে একটি যৌথ পুঁজি তৈরি করে যা দলের পুঁজি হিসেবে পরিগণিত হয়। সামগ্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তির অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা পালন করে, নারদ তাই বলছেন প্রত্যেক অংশীদার নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশিদারিত্বে যৌথ উদ্যমের জোট সংগঠনে বিনিয়োগ করেছে, তারা প্রত্যেকে সেই অনুপাতে ক্ষতি, খরচ এবং লভ্যাংশ ভাগ করে নেবে। বৃহস্পতি, নারদের এই ব্যবসা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নিদানকে সমর্থন করলেও কৌটিল্য এবং যাজ্ঞবল্ক্য একটু অন্যভাবে বলছেন লভ্যাংশ হয় বিনিয়োগের অনুপাতে ভাগ হবে না হয় অংশিদারদের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাগ হবে। মনে হয় অংশিদারদের মধ্যে যৌথভাবে ব্যবসা চালানোর জন্যে একটি প্রথাবদ্ধ চুক্তিতে উপনীত হতে হত। সেই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে ব্যবসা করার পদ্ধতিগুলি স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হত। এই ধরণের চুক্তির বলে যৌথ অংশিদারিত্বে উপনীত হওয়া ব্যবসায়িদের মধ্যে কয়েকজন তাদের দক্ষতা, জ্ঞানের বলে লাভের বড় অংশের হকদার হতেন। লভ্যাংশ শুধুই পুঁজি বিনিয়োগের পরিমানের ওপর নির্ভর করত না।
কৌতুহল আর আকর্ষণীয় বিষয়টি হল, এই অংশিদারিত্বের নীতমালার প্রণয়নের কাণ্ডগুলো কিন্তু জাতকগল্পে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কুত বাণিজ্য জাতকে জ্ঞানী এবং মহাজ্ঞানী অভিজ্ঞান নামে জ্ঞাতি দুই অংশিদার বণিক বেনারস থেকে ৫০০ গাড়ি পণ্য কিনে শহরতলীতে ব্যবসার উদ্যম গ্রহণ করছে। ব্যবসা করার পরে তারা শহরে এসে লাভের বাঁটোয়ারার সময় মহাজ্ঞানী দ্বিগুণ লভ্যাংশ চাইল। জ্ঞানী দাবির যৌক্তিকতা জানতে চাইলে দ্বিতীয়জন বলল আমার নাম মহাজ্ঞানী। ব্যবসায় আমার জ্ঞান প্রয়োগ করে অতিরিক্ত লাভ হওয়ার জন্যে দ্বিগুণ লভ্যাংশ দাবি করছি। প্রথম জন বলল আমরা প্রত্যেকেই ব্যবসায় একই পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করেছি, তাহলে কেন দ্বিতীয়জন দ্বিগুণ লভ্যাংশ দাবি করছে? ক্রমশ তাদের আলোচনা বাদানুবাদে রূপান্তরিত হল। মহাজ্ঞানী বেশি লভ্যাংশের দাবিদারি জানালেও শেষ অবদি তারা লভ্যাংশ সমভাবে বন্টন করে। এই গল্প থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে বিনিয়োজিত পুঁজির অংশদারি অনুযায়ী জোট সঙ্গীদের মধ্যে লভ্যাংশ বন্টনের ধারণা থাকলেও, কোনও কোনও ব্যবসা কাঠামোয় বেশি লভ্যাংশ বন্টনের ধারণাটিও সেযুগে সম্পূর্ণরূপে অজানা/অপ্রচলিত ছিল না।
যৌথ অংশিদারিত্বের ব্যবসায় সফলতা নির্ভর করত একসাথে জড়ো হওয়া বণিকদের কাজের দক্ষতার ওপরে, তাই স্মৃতি গ্রন্থ স্পষ্টভাবে অংশিদার বাছার বিষয়ে স্পষ্ট বিধিনিষেধ জারি করেছে। বৃহস্পতি বলছেন, —
Trade or other occupations should not be carried on by prudent men jointly with incompetf.nt or lazy persons, or with such as are afflicted by an illness, ill-fated, or destitute.
“A man should carry on business jointly with persons of noble parentage, clever, active, intelligent, familiar with coins, skilled in revenue and expenditure, honest, and enterprising.”
ব্যবসায় যৌথ সমবায়িক চেতন ভাবনা নিয়ে বলা হয়েছে —
”Whatever property one partner may give (or lend) authorised by many, or whatever contract he may cause to be executed, all that is (considered as having been) done by all.
যৌথ সংগঠনের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে —
“When (a single partner acting) without the assent (of the other partners) or against their express instructions injures (their joint property) through his negligence, he must by himself give a compensation to all his partners.
“When any one among them is found out to have practiced deceit in a purchase or sale, he must be cleared by oath (or ordeal).
‘They are themselves pronounced to be arbitrators and witnesses for one another in doubtful cases, and when a fraudulent act has been discovered, unless a (previous) feud should exist between them’
ব্যবসায়ী গোষ্ঠীতে অংশিদারের অবহেলার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিতে হয় এবং অন্য অংশিদারেরা সে সব শিথিলতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে, কার্যকত প্রমান জোগাড় করতে পারে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা হলে নানান পরীক্ষা মার্ফৎ তার মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করা হত। প্রমানিত দুষ্কর্মের জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয় এবং তাকে গোষ্ঠী থেকে দূর করে দেওয়া হয়, তার লভ্যাংশ তাকে আর দেওয়া হয় না। সার্বিকভাবে এই বিষয়টা গোষ্ঠীই সিদ্ধান্ত নেয় এবং দুষ্কর্মে জড়িত থাকা অংশিদার/সদস্যকে অন্য আলাদতে বিচারের জন্যে হাজির করা হয় না। আবার উল্টো দিকে তার সদ্গুণগুলির জন্যে বণিক জোট তাকে পুরস্কারও দেয়। এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতি স্মৃতি বলছেন, — That partner, on the other hand, who by his own efforts preserves (the common stock) from a danger apprehended through fate or the king, shall be allowed a tenth part of it (as a reward)।
সমবায়িক বণিক সংগঠন, অংশিদারের মৃত্যুর পরেও তার স্বার্থ দেখত। বৃহস্পতি বলছেন, “Should any such partner in trade happen to die through want of proper care, his goods must be shown (and delivered) to officers appointed by the king.”। নারদের চতুর্থ শ্লোকের টিকা করতে গিয়ে ছন্দেশ্বর বলছেন, a partner, if necessary, could draw from the common fund an amount regulated by the share he paid।
জমি চাষ করা কৃষক, এবং নানান ধরণের শিল্প এবং কারিগরি যেমন সোনা রূপো সুতো কাঠ পাথর বা চামড়ার কারিগরেরা একই নিদান মেনে অংশিদারির সংগঠন তৈরি করতেন। তবে ব্যবসায় যেমন পুঁজি অত্যাবশ্যক, কারিগরির যৌথ উদ্যমের ভিত্তি দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তির উত্তরাধিকার যা দিয়ে নানান পণ্য তৈরি হতে পারে। দক্ষতা জ্ঞান ইত্যাদি যেমন কারিগর থেকে কারিগরে পালটে যায় তাই লাভের অংশিদারি এখানে তৈরি হয় অন্য নীতিতে — বৃহস্পতি বলছেন —
When gold-smiths or other (artists) [i, e., workers in silver, thread, wood, stone or leather] practice their art jointly, they shall share the profits in clue proportion, corresponding to the nature of their work। একই নীতিতে the headman among a number of workmen jointly building a house or temple, or digging a pool or making articles of leather, is entitled to a double share (of the remuneration), and among the musicians he who knows how to beat the time shall take a share and a half, but the singers shall take equal shares.” একই ঘটনা ঘটে যখন চোরেরা বা লুঠেরারা তাদের অপহৃত অংশ ভাগ করতে চায় Four shares shall be awarded to their chief; he who is (specially) valiant shall receive three shares ; one (particularly) able shall take two; and tile remaining associates shall share alike. এই কাজ করতে গিয়ে কেউ যদি ধরা পড়ে তাহলে তাকে ছাড়াবার খরচ সক্কলে সমান অংশিদারিত্বে ব্যয় করে।
একইভাবে পুরোহিতদের বলি বা পুজোর কাজের অংশিদারিত্বের লভ্যাংশ একইভাবে ভাগ করে নেওয়ার নিদান দেওয়া হয়েছে। ষোল জন পুরোহিত যদি বলির কাজ করে তাহলে পুজোর কাজের নেতৃত্বে থাকা চার জন পুরোহিত অর্ধেকের কাছাকাছি অংশিদার হবে, তার পরের তিনটে চারজনের দল পাবে যথাক্রমে পাবে বাকি অংশের অর্ধেক, এক তৃতীয়াংশ এবং এক চতুর্থাংশ। টিকাকার বলছেন, উপরের সূত্র অনুযায়ী ১০০ গরু বলি দেওয়া চার দল পুরোহিতের শ্রমমূল্যপ্রাপ্তি হবে ১২, ৬, ৪ এবং ৩টি গরু।
প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক জীবনে আরেক ধরণের (শ্রেণী সংগঠনের তালিকায় আমি এর আগে ব্যবসায়ীদের অঙ্গীভূত করেছি। কিন্তু সাধারণ কারিগর শ্রেণী সংগঠনের চরিত্রের সঙ্গে ব্যবসায়ী শ্রেণী সংগঠনের চরিত্র যেহেতু আলাদা, এবং বিশেষ করে যেহেতু এই ধরণের ব্যবসায়িক সংগঠনের অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করছেন রিজ ডেভিস তাই এই দুটি বিষয় আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করা উচিৎ) সমবায়িক উদ্যম নেওয়া হত যাকে আমি ট্রেডার্স লিগ নামে অভিহিত করছি। এর আগে আমরা দেখয়েছি প্রাচীন ভারতে বেশ কয়েক ধরণের অর্থনৈতিক জোট বেঁধে ব্যবসা করত শ্রেষ্ঠী ব্যবসায়িরা। কিন্তু রিচার্ড ফিক বা রিজ ডেভিসের মত যে সব পণ্ডিত প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে বিশদে কাজ করেছেন, তারা এই লিগ ধরণের জোটবাঁধার চরিত্রের অস্তিত্বকে বিন্দুমাত্রও স্বীকৃতি দেন নি। তাঁদের মত জ্ঞানীরা নিজেদের তত্ত্বের সমর্থনে যুক্তি সাজিয়েছেন মূলত জাতক আখ্যান, আর খুব বেশি হলে আরও কিছু বৌদ্ধ সাহিত্য অবলম্বনের। অথচ তাদের দেওয়া এই সূত্রগুলির সঙ্গে আরও অন্য সূত্র মিলিয়ে আমরা পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করতে পারি প্রাচীন ভারতবর্ষে আমি যাকে ট্রীডার্স লিগ বলছি, সেই ধরণের জোটের সবল অস্তিত্ব বর্তমান ছিল।
বেশ কয়েকটা জাতক আখ্যান থেকে আমরা স্পষ্টভাবে সমুদ্রে যাওয়া সওদাগরের কথা পাচ্ছি। ভাল্লাস জাতক যে ৫০০ সওদাগরের কথা উল্লেখ করছে তারা প্রত্যেকে জাহাজে পণ্য সাজিয়ে সিংহল দেশে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। পাণ্ডারা জাতকে একশ সওদাগরের নৌকো সাজিয়ে যাত্রার কথা বলা হছে। সুপ্পুরক জাতকে পাচ্ছি ৭০০ জন সওদাগর (এই সংখ্যার বণিক ছিল কি না বলা মুশকিল, কিন্তু জাহাজে যে মাঝি মাল্লা সহ ৭০০টি আত্মা ছিল এটা পরিষ্কার) জাহাজ খাড়া করল এবং একজন জেত্থকের নেতৃত্বে যাত্রা করে সম লভ্যাংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল।
অন্যান্য জাতক আখ্যানে রাজপথ ধরে ব্যবসা করা ব্যবসায়ী সংগঠনের কথা বলে। জারুদাপন জাতকের দুটি গল্পে এবং পাচুপ্পন্নভাত্তু গল্পের মুখবন্ধে শ্রাবস্তী এবং বারানসীর বহু সংখ্যক ব্যবসায়ী একজন জেত্থকের নেতৃত্বে গাড়ি ভর্তি করে পণ্য নিয়ে বাণিজ্য যাত্রা করছে। গল্পের ভূমিকায় বলা হচ্ছে, ব্যবসা করে বিপুল পরিমান অর্থ সঞ্চয় করে ফিরে এসে সওদাগরেরা বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করতে যান, ঠিক যেমন করে তারা যাত্রা শুরুর আগেও তাকে সম্মান জানাতে গিয়েছিলেন। গুট্টিলা জাতকে বেনারসের কয়েকজন শ্রেষ্ঠী উজ্জয়নীর পানে বাণিজ্য যাত্রা করে। এটা একটা সমবেত উদ্যম ছিল। তারা একই সঙ্গে থাকত। তারা পরস্পরের সঙ্গ পছন্দও করত, একসঙ্গে সময় কাটাত।
ওপরের যে ক’টা উদাহরণ পেশ করলাম, তাতে পরিষ্কার ব্যবসায়ী, শ্রেষ্ঠীরা দূর দেশের ব্যবসা, একযোগে সংগঠিতভাবে সমাধা করার স্পষ্ট উদ্যম নিয়েছেন। আরও কিছু সূত্রে আমাদের মনে হয়েছে মাঝে মাঝে এই ধরণের বহু জোট সংগঠন স্থায়ীভাবে দীর্ঘসময় ধরে টিকেছিল।
বৌদ্ধ সাহিত্যে বহুবার আমরা সেত্থি শব্দটার মুখোমুখি হচ্ছি। এই সেত্থি শব্দের পিছনে থাকা মানুষটিকে ব্যবসায়িকদের সংগঠনের আধিকারিক হিসেবে ধরে নিতে পারি। চুল্লবগ্গ [বিনয়পিটকের পাঁচটি গ্রন্থর অন্যতম চুল্লবগ্গ; অন্যগুলো পারাজিকা, পাচিত্তিয়া, মহাবগ্গ ও পরিবার] থেকে জানতে পারছি অনাথপিণ্ডক ছিলেন রাজগাহ সেত্থির বোনের স্বামী। এখানে রাজাগাহ সেত্থি নাম উল্লেখের অর্থ হল গল্পে ঐ নামাঙ্কিত ব্যক্তির গুরুত্ব বোঝানো — সাধারণ শ্রেষ্ঠী বোঝাতে শব্দটা নিশ্চয়ই গল্পে ব্যবহার করা হয় নি। আবার মহাবগ্গ’তে পাচ্ছি এক সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসক রাজগাহ সেত্থির মৃত্যুর সংবাদের ভবিষ্যদ্বাণী করলে জনৈক শ্রেষ্ঠী, রাজা এবং শ্রেষ্ঠী কৌমের জন্যে মৃত্যুমুখী শ্রেষ্ঠীর উত্তম কর্মের কথা ভেবে —

রাজা বিম্বিসারের সমীপে উপনীত হয়ে রাজবৈদ্যকে দিয়ে শ্রেষ্ঠীর চিকিৎসার আবেদন জানান। তার আবেদন মঞ্জুর হল এবং সেত্থিকে রাজবৈদ্য সুস্থ করে তুললেন। সুচিকিৎসার বিদায় হিসেবে রাজবৈদ্য সুস্থ হওয়া সেত্থির থেকে ২,০০,০০০ কাহাপন দাবি করেন এবং সেই অঙ্কটি তাঁর এবং রাজার মধ্যে সমভাবে ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। এই ঘটনা থেকে আমরা সেত্থির সম্পদ এবং সামাজিক অবস্থান নির্নয় করিতে পারি। যতদূর সম্ভব সেত্থি ছিলেন রাজ দরবারে শ্রেষ্ঠীদের প্রতিনিধি। পরের দিকের সাহিত্যে সংস্কৃত ভাষায় শেঠি শব্দটি শ্রেণী সংঘের নেতৃত্ব হিসেবে বোঝানো হয়েছে। ফিক এই পদটিকে রাজকীয় আধিকারিক বলছেন। এবং আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দাবি করছেন, পদটি রাজদরবারে শ্রেষ্ঠীদের প্রতিনিধত্ব করে। জাতকের অনুবাদক একই দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করছেন এবং বহু জাতক আখ্যানে বলা হয়েছে সেত্থি রাজার অপেক্ষায় রয়েছে। গৌতম সেত্থির চরিত্র বর্ণনা করে বলছেন — Cultivators, traders.., (have authority to lay down rules) for their respective classes. Having learned the (state of) affaiis from those who (in each class) have authority (to speak he shall give) the legal decision.
আমরা এর আগে ব্যবসায়ীদের সংগঠিত ব্যবসাকর্মের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি এবং গৌতমের ওপরে উদ্ধৃত নির্দেশটি সূত্রে বলা যায় শ্রেষ্ঠীদের সংঘ দেশের আইনের চোখে স্বীকৃতি লাভ করল। রাজা শ্রেষ্ঠীদের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, রাজদরবারে তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে পরামর্শ করে নিতেন। এই তথ্য থেকে পরিষ্কার, কেন জাতকে প্রধান শ্রেষ্ঠীরা বহুবার রাজার সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়েছেন। সেত্থিদের চরিত্র বিশ্লেষণ এবং তার সঙ্গে গৌতমের উপরিউক্ত নিদান মিলিয়ে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি প্রাচীন ভারতে শ্রেষ্ঠীদের স্থায়ী সংগঠন ছিল।
ব্যবসায়ী, মধ্যস্থ এবং দালালদের ব্যবসা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে রিজ ডেভিস বলছেন, — ‘There is no instance as yet forthcoming pointing to any corporate organisation of the nature of a guild or Hansa league. তিনি জাতকের বেশ কিছু উদাহরণ তুলে ধরে সেগুলিকে সাময়িক সংগঠন হিসেবে গণ্য করছেন এবং একবার মন্তব্য করছেন, Nor is there any hint of Syndicate or federation or other agreement existing between the 500 dealers। তিনি মানছেন না প্রাচীন ভারতের সেই সময়ের তৈরি আইনের ধারা উপধারায়, যে সংগঠনগুলির অস্তিত্বের প্রতিফলন জাতক আখ্যানেও পাওয়া যায়, এই সংঘগুলি নিজেদের নীতি প্রথা তৈরি করে এবং রাষ্ট্রীয় সংবিধানে নির্দিষ্ট অবস্থান অর্জন করে। আমি মনে করি, গৌতমের ধর্মসূত্র লেখার আর জাতক আখ্যান তৈরি হওয়ার সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘ সময়ের সমবায়িক ব্যবসায়িক সমাজের অস্তিত্ব ছিল এবং সেই প্রতিফলন ওপরের দুটি সাহিত্যে দেখতে পাই।
সমবায়িক সমাজ আরও দুটি শতাব্দধরে বিকশিত হবে এবং অনেকটা আধুনিক সমিতির মত করেই। কৌটিক্যের অর্থশাস্ত্রে পাচ্ছি to traders Avho unite in causing rise and fall in the value of articles and live by making profits cent per cent (১ পাদটিকায় সংস্কৃত শ্লোক); এই ব্যবস্থাটি অনেকটা আধুনিক কালের অছি সংগঠনের সঙ্গে তুলনীয়। (চলবে)