| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া : রমেশ চন্দ্র মজুমদার (১৩নং কিস্তি) অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪০৩ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২২

দ্বিতীয় অধ্যায়

রাজনীতিতে ব্যবসায়িক সংগঠন

ছয়

এবারে আমরা শহর বা গ্রাম সংগঠনের ব্যবস্থাপনাকে দুটো পর্বে আলোচনা করব ১। এর ক্ষমতা এবং কাজকর্মের পরিধি ২। এর কাজের প্রশাসনিক পদ্ধতি।

বৈদিক যুগে শহর বা গ্রাম সংগঠনের ক্ষমতা এবং কাজকর্মকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি — প্রশাসনিক এবং বিচার সংক্রান্ত। জাতক আখানগুলিতে গ্রাম প্রধান বা গামভোজকএর বিচারের ক্ষমতা কিছু আগেই আমরা আলোচনা করে এসেছি। সে সব আখ্যানে অবশ্য বলা ছিল না তিনি গ্রামবাসীদের সঙ্গে মিলে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। কুলবাক জাতকে কিছু গ্রাম আলোচনায় এই ধরণের উদাহরণ পেয়েছি। বোধিসত্ত্বের প্রভাবে গ্রামের মদ্যপায়ীদের চরিত্র শুধরে গেলে গ্রাম প্রধান জরিমানা আদায় কমে যাওয়ার জন্যে হাহুতাশ করছেন। আমাদের বলা হয়েছে এই বিষয়ে মূলত গ্রামীনেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অন্যান্য আখ্যানে গল্প লেখক আমাদের জানাচ্ছেন গ্রাম প্রধান দুর্বৃত্তকে শাস্তি দিলেন। এর থেকে ধারনা করে নেওয়া ঠিক হবে না যে গ্রাম প্রধান একাই সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতেন; আখ্যান কথকের উদ্দেশ্য হল অপরাধীর শাস্তিদান বিবৃতি, এর বেশি কিছুই নয়, তার কোনও দায় ছিল না গ্রাম সভার সংবিধান বা কার্যপ্রণালী বর্ণনা করার।

কুলবাক জাতকে আমরা দেখছি তুলনামূলকভাবে জটিল মামলা গ্রাম থেকে রাজদরবারে পাঠানো হত। এই গল্পে গ্রাম প্রধান ডাকাতদলের বিচার করলেন না, যদিও এটা তার এক্তিয়ারেই ছিল কিন্তু তিনি এই মামলা রাজদরবারে বিচারের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এখানে উল্লেখ করে রাখা দরকার পরের দিকে লিখিত ধর্মশাস্ত্রে গ্রামের অধিবাসীরা একসঙ্গে বসেই আইনি বিচার ইত্যাদিগুলি সামলাবেন, কিন্তু হিংসক অপরাধের বিচার করা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে ছিল।

আমরা আগেই দেখেছি কৌটিল্য স্পষ্টভাবে বলছেন গ্রাম প্রধান গ্রাম অধিবাসীদের সঙ্গে মিলে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। চাষী চাষে গাফিলতি করলে তাকে জরিমানা করতে পারতেন, কোনও চোর বা ব্যাভিচারীকে গ্রামের সীমানা থেকে দূর করে দিতে পারতেন। আমরা এখানে গ্রাম সংগঠনের সমবায়িক চরিত্র বিকাশের বিষয়টি আলোচনা করতে পারি। তারা যৌথভাবে পারস্পরিক অধিকার এবং দায়িত্ব একযোগে প্রয়োগ করতেন এবং অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে গেলে রাজা তাদের শাস্তি দিতে পারতেন।

ধর্মশাস্ত্র লেখার সময়ও গ্রামীনদের সমবায়িক সংগঠন বিচার করার অধিকার কায়েম করে রেখেছিল। আগেই দেখিয়েছি মনু এবং এবং বিষ্ণুস্মৃতিতে গ্রাম প্রধানের বিচারের ক্ষমতার উল্লেখ রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে দেখিয়েছি, বৃহস্পতি স্মৃতিতেও গ্রামীনেরা বিচারের অধিকার বজায় রাখছেন।

এমত আলোচনা থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি, গ্রাম সভা সে সময়ের ভারতবর্ষের চার থাকবন্দী বিচার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। গুরুত্বের দিক থেকে তাদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় এবং কারিগরদের শ্রেণী সংঘের বিচারের মামলা তারা শুনত। হিংসক অপরাধের মামলাও বিচারের অধিকার নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করত।

নিচে উদ্ধৃত নারদ স্মৃতির উক্তি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে প্রাচীন সময়ের আইন রক্ষকেরা চেষ্টা করত, আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের ওপরে যে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, সেগুলি ব্যবহার করে দুর্বিপাকে পড়া মানুষের সমস্যাগুলি সমাধান করতে।

Either the judicial assembly must not be entered at all, or a fair opinion delivered. That man who either stands mute or delivers an opinion contrary to justice is a sinner —

“One quarter of the iniquity goes to the witness; one quarter goes to all the members of the court; one quarter goes to the king.

“Therefore let every assessor of the court deliver a fair opinion after having entered the court, discarding love and hatred, in order that he may not go to hell.” (S. B. E., Vol. 88, pp. 38-39.)

নারদ স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত আরও কিছু স্তবক থেকে আন্দাজ করি, জ্ঞানী, প্রবীণেরা বিচারসভায় সুস্পষ্টভাবে অংশ নিতেন এবং তাদের মধ্যে কোনও একজন প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন —

As an experienced surgeon extracts a dart by means of surgical instruments, even so the Chief Justice must extract the dart (of iniquity) from the lawsuit.

“When the whole aggregate of the members of a judicial assembly declare, ”This is right” the lawsuit loses the dart, otherwise the dart remains in it.

”That is not a judicial assembly where there are no elders. They are not elders who do not pass a just sentence” (Jbid, pp. 89-40.)

ওপরে উল্লিখিত দ্বিতীয় স্তবকটি ঠিক পরিষ্কার নয়। তবে আমার মনে হয় বিচার ব্যবস্থায় সর্বজনমান্য সিদ্ধান্তের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

দশম এবং দ্বাদশ শতে দক্ষিণ ভারতীয় নথির [মূলত শিলালেখ] কিছু উদাহরণে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের বিচার ব্যবস্থার ক্ষমতার পরিচয় পাচ্ছি। এর মধ্যে কয়েকটার সারাংশ তুলে দেওয়া গেল

১। জনৈক গ্রাম আধিকারিক এক মহিলার কাছে রাজস্ব দাবি করলে মহিলা জানান আইনত তিনি রাজস্ব দিতে বাধ্য নন। আধিকারিক তাকে বাধ্য করে, মহিলা বিষ পান করে মারা যান। এই ঘটনা উপলক্ষ্যে চারটি দিকের, ১৮টা জেলার এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের বৈঠক ডাকা হয়। এই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় আধিকারিককে আত্মহত্যার ঘটনার জন্যে সরাসরি দায়ি করা হয়। জরিমানা হিসেবে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালাবার খরচ হিসেবে তাকে ৩২ কাসু অর্থ দিতে হয়।

২। জনৈক শূদ্র শিকারে লক্ষ্য মিস করে জনৈক ভেলাল্লাকে [ভেলাল্লা মূলত জমির অধিকারওয়ালা শূদ্র, চাষী] অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে। ৭৯টা জেলা থেকে কৃষকেরা একত্র হয়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং জরিমানা হিসেবে মন্দিরের জন্যে ৬৪টা গরু দান করার নির্দেশ দেয়।

৩। এই শিলালেখটি ভালভাবে পড়া যাচ্ছে না। কিন্তু যতটুকু পড়া যাচ্ছে, সেখান থেকে জানতে পারছি জনৈক পুরুষ স্ত্রীকে বলপ্রয়োগ করে ঠেলে দিলে, মহিলা পড়ে মারা যান। চার দিকের ১,৫০০ মানুষ বিচারের জন্যে জড়ো হন এবং স্বামীকে দোষী সব্যস্ত করা হয় এবং জরিমানা হিসেবে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

৪। রাজা কেশরীবর্মণের রাজত্বে গ্রামের এক বাসিন্দা অন্য এক বাসিন্দাকে ভুল করে হত্যা করে। জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট গ্রামের মানুষ একসঙ্গে জড়ো হন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে পাল্টা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না বরং রোজ মন্দিরে প্রদীপ জ্বালাবার দায়িত্ব দেওয়া হবে। জরিমানা হিসেবে ১৬টি গরুর চর্বি থেকে তৈরি ঘি দিয়ে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালাবার কাজ দেওয়া হল।

৫। আরেকটি শিলালেখ সূত্রে জানাযাচ্ছে শিকারে গিয়ে জনৈক লক্ষ্য ভুল করে একজনকে খুন করে। স্থানীয়রা জড়ো হয়ে জরিমানা হিসেবে স্থানীয় মন্দিরে ১৬টি গরু দান করার নির্দেশ দেয়।

যখন কোনও মামলায় কোনও প্রতিষ্ঠিত আইন প্রযুক্ত হয় না, সে সময় প্রাচীন আইন প্রদানকারীরা বিশেষ বিচার সভার আয়োজন করতেন। গৌতম বলছেন এই ধরণের বৈঠকে মোট দশজন উপস্থিত থাকতেন — ৪ জন চার বেদ বিশেষজ্ঞ, ৩ জন তিন বর্গ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং বাকি ৩ জন তিন ধরণের আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ (গৌতম XXVIII ৪৮-৪৯)

কখন একটি ফৌজদারি মামলা বিশেষ বিচার সভায় বিবেচনার জন্যে অর্পণ করা হবে সে সিদ্ধান্তের সূত্রটাও দক্ষিণ ভারতের শিলালেখতে পাওয়া যায়। হরিণ শিকারের সময় জনৈক ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে আরেক ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তার জরিমানা কি হবে এটা ঠিক করতে ওলাক্কুর গ্রামে ব্রাহ্মণেরা এবং অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরা একসঙ্গে জড়ো হয় এবং ঠিক হয় স্থানীয় উপাসনা গৃহে তাকে প্রদীপ উপহার দিতে হবে।

আরেকটি দ্বন্দ্বের উদাহরণ হল আরাগুর মন্দিরে পুজো দেওয়ার অধিকার বিষয়ে। বিচারপতি এই জটিল বিষয়টি বিভিন্ন অগ্রহরের মহাজনের সম্মুখে বিচারের জন্যে এই মামলাটি পাঠিয়ে দেন।

ঠিক এই উদ্দেশ্যে পঞ্চমণ্ডলী, পঞ্চালী, পঞ্চালিকা ইত্যাদি শব্দবন্ধ শিলালেখতে বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। ফ্লিট বলছেন আজকে আমরা যাকে পঞ্চায়েত বলি সে সময় গ্রামের পাঁচজন (বা তদূর্ধ) বিচারককে নিয়ে স্থানীয় নানান দ্বন্দ্ব আলাপআলোচনার মাধ্যমে, সাক্ষী এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করে মেটানোর উদ্যম নেওয়া হত।

২। গ্রাম সভার প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল একযোগে আজকের দিনের কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট এবং মিউনিসিপ্যালিটির কাজ সম্পাদন করা। খরসর জাতক সূত্রে আগেই বলেছি গ্রাম প্রধানের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কাজ হল রাজার প্রতিনিধি হিসেবে রাজস্ব আদায় করা এবং স্থানীয়দের সহায়তায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা। এখানে বলা দরকার যতদিন গ্রাম সভার অস্তিত্ব ছিল, ততদিন সে গ্রাম প্রধানের নেতৃত্বে এই দুটো কাজ সম্পাদন করে এসেছে। ধর্মশাস্ত্র স্পষ্টভাবে বলছে ওপরে আলোচিত দুটি দায়িত্ব ছাড়াও প্রাচীন গ্রাম সভা পৌর প্রশাসনিক কাজগুলিও সম্পাদন করত। গ্রাম সভার কাজ হিসেবে বৃহস্পতি স্মৃতি তালিকা দিচ্ছে, সংগঠনের সদস্যদের বৈঠকের ঘর তৈরি করা, ভ্রমণকারীদের জন্যে জলের/ধর্মঘট, মন্দির, পুকুর আর বাগানের ব্যবস্থা করা, অসহায় আর গরীবকে সহায়তা করা যাতে তারা শাস্ত্রীয় পুঁথির নিদান অনুযায়ী নানান সংস্কারের কাজকর্ম সম্পাদন করতে পারে, গ্রামে পুকুর, কুঁয়ো খোঁড়া এবং জল বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা করে দেওয়া ইত্যাদি।

এই সব কাজের খরচ সম্ভবত সংগ্রহ করা যৌথ সম্পদ থেকে ব্যয় করা হত। এর পূর্বের জাতক আখ্যান এবং কৌটিল্যর শাস্ত্র থেকে উদাহরণ তুলে দেখয়েছি বাসিন্দাদের থেকে গ্রাম শহর প্রশাসন জরিমানা ধার্য করতে পারত এবং এই বিষোয়টি গোয়ালিয়র শিলালেখতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

এবারে আমরা বিবেচনা করব উপরে উল্লিখিত যে সব কাজকর্ম গ্রাম সভা সম্পাদন করত তার প্রশাসনিক কাঠামো কি ছিল। গ্রাম সংগঠনের মাথায় যিনি থাকতেন তার পদের নাম শিলালেখতে উল্লিখিত হয়েছে গ্রামাধিপ, গ্রামনী, গ্রামকূট, গ্রামপতি এবং পাট্টাকিলা ইত্যাদি আর জাতকে বলা হয়েছে গ্রামভোজক। যদিও মাঝেমধ্যে রাজা তাঁকে নিযুক্ত করতেন, কিন্তু নানান সূত্রে মনে হয় এটা বংশপরম্পরার পদাধিকার হয়েউঠেছিল। তাকে সাহায্য করার জন্যে দুই তিন বা পাঁচজন সহকারী থাকতেন। নারদস্মৃতি বা বৃহস্পতিস্মৃতিতে তার সাংবিধানিক ক্ষমতার বিস্তৃতি উল্লিখিত হয়েছে। শ্রেণী সংঘ নিয়ে পূর্ব আলোচনায় এই বিষয়গুলি উঠে এসেছিল ফলে সেগুলি পুনরাবৃত্তি করছি না। সেখানে যে সব বিষয় আলোচনা করেছি, সেগুলি গ্রামীন সভা আলোচনায় সমভাবে উঠে আসবে। যদিও গ্রাম প্রদান এবং গ্রাম সভা তাদের যথেষ্ট কর্তৃত্ব নিয়েই ক্ষমতা প্রয়োগ করত, কিন্তু তারা শেষ অবদি দায়বদ্ধ ছিল গ্রামের গ্রামের মানুষের কাছে জবাব্দিহি করার জন্যে, যে মানুষেরা নিয়মিতভাবে একটি বড় ঘরে জমায়েত হয়ে তাদের সমবায়িক দায়িত্ব পালন করত। তাদের অধিকার ছিল নিজেদের সংবিধান তৈরি করে নিয়ম আর প্রথা রচনা করার যাতে সদস্যরা নিয়মিত উপস্থিত হতে পারে। এই বৈঠকে নিয়মিত নানান বিষয় আলোচনা হত এবং যতপদূরসম্ভব অবাধে মত প্রকাশের অধিকার অজানা ছিল না।

মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় আমরা এই সমবায়িক সংগঠনের কর্মপদ্ধতির কিছু বর্ণনা পাই। তিনি পাটলিপুত্র শহরের ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে যে সব কথা লিখেছেন সেগুলি অন্যান্য এলাকার শহরেও ঘটত এমন একটা সিদ্ধান্ত করাই যায়। সমগ্র ব্যবস্থাপনার মর্মটি ছিল পৌর প্রশাসনে একটি সভা এবং সভাগৃহ ছিল এবং তার সঙ্গে ছিল বহু ছোট ছোট কমিটিও যারা এক একটি দপ্তর পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। মেগাস্থিনিসের বর্ণনার সঙ্গে আমরা মেলাতে পারি এর আগে উল্লিখিত ভাট্টিপ্রলু মঞ্জুষে লিখিত বয়ানের সঙ্গে।দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি প্রাচীন যুগের শেষ সময় পর্যন্ত এই ব্যবস্থপনাটি কার্যকর ছিল।

সাত

গ্রাম সভার অধিকাংশ বর্ণনা আমরা পেয়েছি দক্ষিণ ভারত থেকে। বেশ কিছু শিলালেখ প্রমান করে সেখানে এই সংগঠনগুলি চরমতম বিকাশলাভ করেছিল এবং প্রাচীনকালের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গ্রাম সভা খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে। উক্কলের বিষ্ণু মন্দিরের ১৪টি শিলালেখ প্রকাশিত হয় সাউথ ইন্ডিয়ান ইন্সক্রিপশন, তৃতীয় খণ্ড, প্রথম অংশে এবং সেখানে গ্রাম সভা পরিচালনার বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। সে শিলালেখগুলির যেকটা আমার গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া গেল।

১। কয়েকটি গ্রাম, ১২ ব্রাহ্মণকে খাওয়ানোর জন্যে এবং অন্যান্য কাজ সমাধা করার জন্যে অন্য একটি গ্রামের এক আধিকারিকের থেকে কিছু সোনার বিনিয়োগ লাভ করল।

২। জনৈক ব্যক্তি গ্রাম সভাকে ভগবানের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পরিমান চাল সরবরাহ করার জন্যে কিছু পরিমান জমিদান করল, এই দান পঞ্জীকরণ করার তথ্য শিলালিপিতে উল্লিখিত হয়েছে এইভাবে ‘গ্রাম সভায় বিষয়টি উত্থাপন হওয়ায় এবং তাদের নির্দেশ আমার কাছে আসায়, আমি মধ্যস্থ এই বয়ানটা লিখছ…

৩। জনৈক ব্যক্তি গ্রাম সভার থেকে একটি নির্দিষ্ট খণ্ড জমি কিনে গ্রামীনদের ব্যবহার করতে দল ফুলের বাগান তৈরি করার জন্যে।

৪। অঞ্চলের পুকুর কাটা এবং জনগণকে জল সরবরাহ করা মানুষদের ধান সরবরাহ করার জন্যে গ্রাম সভা কিছু জমি দান পেল।

৫। গ্রাম সভা নির্দিষ্ট কিছু ধান সঞ্চয়ের উদ্বৃত্তে প্রত্যেক বছর নির্বাচিত হওয়া মহান মানুষকে (পেরুমক্কল) চাল সরবরাহ করার জন্যে।

৬। একটি গ্রাম সভার বৈঠকের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে যে বৈঠকে দানধ্যান করার জন্যে নির্বাচিত মানুষকে এবং গ্রামের Sattan দেবতার মন্দির দেখাশোনার আলোচনাও হবে। সভা দৈনিক চাল এবং তেল মন্দিরের জন্যে আলোচনা করে। উপসংহারে বলা হচ্ছে বিখ্যাত ব্যক্তিটি পুকুর দেখাশোনার জন্যে উদ্দিষ্ট হলেন এবং পুকুরের জন্যে একটি তহবিল তৈরির জন্যে পান পাতা বিক্রেতাদের ওপর এক কালানজু পরিমান সোনা জরিমানা ধার্য করা হবে কারন তারা পিদারি মন্দির বাদ দিয়ে অন্যান্য জায়গায় পান পাতা বিক্রি করেন।

৭। শিলালিপিটি বিকৃত হয়েগিয়েছে; এটির মর্মার্থটি কী সেই বক্তব্যটা পরিষ্কার হচ্ছে না — গ্রাম সভার সমুদায়ের জমি তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট শর্তে গ্রাম সভা সেটি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করল। সে বছর এই মহান মানুষটি নির্বাচিত হলেন … তারা যদি সেই চরিত্রের কাজ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে… তারপরে আর বোঝা যাচ্ছে না

৮। গ্রাম সভা নির্দিষ্ট পরিমান ধান দান পেল, যার সুদ থেকে সে দুজন ব্রাহ্মণকে খাদ্য দান করবে।

৯। গ্রাম সভাকে রাজ নির্দেশ জমি বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হল, যার জন্য দুবছরের জন্যে কোনও রাজস্ব দিতে হবে না, এবং এই জমিটি গ্রামের সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হবে।

১০। গ্রাম সভার বৈঠকে একটি বিক্রি কোবলা পঞ্জীকৃত হল, যে জমিটি ছিল সমুদায়ের সম্পত্তি, রাজার এক সেবকের অধীনে থাকা ৫ জন জলবন্ধু গ্রামের জলাধারে ২টি নৌকোর দেখাশোনার জন্যে সেই জমির উৎপাদন ব্যয় করা হবে।

১১। মহান গ্রাম সভা এবং নির্বাচিত মহান মানুষেরা এবং বিখ্যাত মানুষেরা যারা পুকুর দেখাশোনার কাজে নির্বাচিত হলেন, তারা মন্দিরের এক ব্যবস্থাপকের অনুরোধে একযোগে বসে মন্দিরের জন্যে একটি জমি বরাদ্দ করা হল যাতে মকন্দিরের কিছু কাজ সমাধা করা যায়।

১২। গ্রাম সভা, মন্দির কর্তৃপক্ষকে একটি ফুলের বাগান সহ একটা গ্রাম দান করল মন্দিরের পুজার্চনা চালিয়ে যাওয়ার জন্যে। দানের শর্তগুলি হল ‘আমরা গ্রাম থেকে কোনও রাজস্ব আদায় করব না। আমরা (মহান মানুষেরা) নির্বাচিত হয়েছি পুষ্করণী দেখাশোনার জন্যে, আমরা (মহান মানুষেরা) নির্বাচিত হয়েছি বাগান দেখাশোনা করার জন্যে, আমরা গ্রাম সভার নির্দেশে গ্রামের শ্রমিকদের মাগনা খাটিয়ে নিতে পারব না।

যদি কোনও দুষ্কর্ম, পাপকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়ে ভগবান (অর্থাৎ মন্দির কর্তৃপক্ষ) একাই এই গ্রামের অধিবাসীদের শাস্তি দিতে পারবে।এই শর্তে আমরা একমত হয়ে এই শিলালেখটি তীরি করতে দিলাম।

আমরা গ্রাম সভা যদি এই কাজে বর্থ হই তাহলে আমরা দৈনিক একশ আট কানম সোনা জরিমানা হিসেবে দিতে বাধ্য থাকব।

১৩। এটা অসম্পূর্ণ। যেটি আমরা পেয়েছি তাতে বলা হয়েছে মহান গ্রাম সভা ‘এবং এই বছর যে সব মানুষ নির্বাচিত হয়েছেন, যে সব মহান ভট্ট পুকুর দেখাশোনার কাজে নির্বাচিত হয়েছেন এবং অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তি।

১৪। এক চাষীর পুত্রকে পাশের অঞ্চলের একখণ্ড জমি দেওয়া হল এই শর্তে যে এই জমির উদ্বৃত্তে সে মন্দিরের ব্রাহ্মণদের জন্যে জল এবং আগুণ জ্বালাবার পাত্র সরবরাহ করবে এবং মণ্ডপের সামনে একটি জলাধারে জল তোলার যন্ত্র তৈরি করে দেবেন

যে সব মহান মানুষ প্রত্যেক বছর গ্রাম সভার কাজ দেখাশোনা করেন, তারা এই দানকর্মে নজরদারি করবেন।

নবম দশম এবং একাদশ খ্রিতে প্রত্যেক গ্রাম সভা থেকে জারি করা ওপরের ১৪টি শিলালেখ গ্রাম সভার চরিত্র, তার কাজকর্ম এবং এই সংগঠনের গুরুত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev