সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে চরণদাসের ভুমিকায় রবীন মজুমদারের অমর সংলাপ, ‘গান শেষ আর জান শেষ তো একই কথা রাজামশাই,’ এখনও মনে আছে দর্শকের। অত বড় অভিনেতা হয়েও কিভাবে নিজেকে মাটিতে মিশিয়ে চরণদাসের মত এক সাধারণ পল্লীগায়ক হয়ে গিয়েছিলেন, তা ১৯৮০ সালের ছবিটি না দেখলে লিখে বোঝানো কঠিন। সেই ছবিতেই বিশিষ্ট গায়ক অমর পালের কণ্ঠে প্রায় কাল্ট হয়ে যাওয়া গান ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’-তে লিপ দিয়েছিলেন রবীন মজুমদার। অমরবাবু পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওনার গানে রবীনবাবুর লিপ দেওয়া তার কাছে এক বিরাট সন্মানের ব্যাপার। রবীনবাবুর বোন গৌরী ঘোষ এই কথা শুনে দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি অন্য গায়কের গানে লিপ দিলে?’ অর্থাৎ, গায়ক রবীন মজুমদার অন্য কারোর কণ্ঠে লিপ দিতে পারেন, এ ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।
রবীন মজুমদার ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে হুগলির চোপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম অমূল্যকুমার মজুমদার। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি কাটিহারে বেড়ে উঠেন। ছোটকাল থেকেই তিনি সঙ্গীতের সাথে ছিলেন। বাবা তাঁকে একটি হারমোনিয়াম কিনে দেন। বারো-তেরো বছর বয়সে উত্তরবঙ্গ-রাজশাহী বিভাগ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। পরে পণ্ডিত বীরেন নিয়োগীর কাছে গানের তালিম শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনটে বিষয়ে লেটার মার্কস নিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করে, কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
১৯৩৯ সালে মেগাফোন রেকর্ডে রবীন মজুমদারে ‘আজি এ বিদায়ক্ষণে’ আর ‘ওগো অনেক দিনের কথা’ গান বের হয়, যার কথা লিখেছিলেন এম সুলতান ও সুর দেন ভবানীচরণ দাস। উদ্যোগটা ছিল সঙ্গীতাচার্য ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর কাছেই তখন গান শিখছিলেন রবীন। তবে ‘শাপমুক্তি’ তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

শুনতে অবাক লাগলেও এ কথা সত্যি যে রবীন মজুমদার সর্বমোট ৭৩টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। অভিনেতা হিসেবে তিনি ছিলেন প্রভূত জনপ্রিয়। তাঁর প্রথম ছবি ‘শাপমুক্তি’ মুক্তি পায় ১৯৪০ সালে। এরপর একে একে আসে ‘গরমিল’, ‘নন্দিতা’, ‘সমাধান’, ‘কবি’, ‘বন্দিতা’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘ঢুলি’, ‘কড়ি ও কোমল’, ‘তাসের ঘর’, ‘চুপি চুপি আসে’, ‘ভগিনী নিবেদিতা’, ‘মোমের আলো’ ও আরও অনেক ছবি। কবি ছবিতে তাঁর অনবদ্য অভিনয় সেই সময় সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তাঁর শেষ ছবি হীরক রাজার দেশে।
জনপ্রিয় নায়ক হওয়ার পাশাপাশি রবীনবাবু গায়করূপেও বাঙালি দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিলেন। কমল দাশগুপ্তর সুরে তাঁর গাওয়া ‘এই কি গো শেষ দান’ ও ‘বালুকাবেলায় মিছে কি গড়িস খেলাঘর’ সুপারহিট হয়েছিল। এছাড়াও ‘এই যে এলাম শঙ্খনদীর তীরে’, ‘কালো যদি মন্দ তবে’, ‘নাবিক আমার নাবিক ওগো’, ‘দেখা হলো কোন লগনে’, ‘মোর প্রেমগান’, ‘আমি রজনীগন্ধার মতো’ ও আরও বহু গান গেয়েছেন তিনি।
তাকে দিয়ে গান গাওয়ানোর জন্য সঙ্গীত পরিচালকরা মুখিয়ে থাকতেন এক সময়। একবার সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায় গেছেন তাকে দিয়ে একটি গান গাওয়াবেন বলে। কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না জনপ্রিয় নায়ক-গায়ক। বার বার বলছেন, ‘এই গান আমি গাইবই না।’ সুরকারও নাছোড়। বলছেন, ‘এই গানের জন্যই মানুষ আপনাকে মনে রাখবে।’ অবশেষে জেদ ভাঙলেন রবীন মজুমদার। গাইলেন ‘আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাই বা জ্বলে।’ সঙ্গীত পরিচালকের কথা মিথ্যে হয়নি। এত দশক পেরিয়ে গানটি আজও সমান জনপ্রিয়।

নায়করূপে বহু ছবিতে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু একটা সময়ের পর যখন বাংলা সিনেমার জগতে দখল নিচ্ছেন একে একে বসন্ত চৌধুরী, অসিতবরণ, বিকাশ রায়, উত্তমকুমারের মতো শক্তিশালী অভিনেতারা, তখন ধীরে ধীরে চরিত্রাভিনয়ের দিকে সরে আসেন রবীনবাবু। অসিতবরণের সঙ্গে ‘জয়দেব’ ছবিতে তাঁর অভিনয় বাঙালি বহুদিন মনে রাখবে। এছাড়া আরও বহু প্রথম সারির ছবিতে তিনি সহঅভিনেতা হিসেবে নজর কেড়েছেন।
তবু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না এককালে জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা এই গায়ক-নায়কের। শেষ বয়সে অর্থাভাব গ্রাস করে তাঁকে। শোনা যায় একবার সুরকার নচিকেতা ঘোষ তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। সামান্য কাজের আশায় বিভিন্ন স্টুডিয়োয় ঘুরে বেড়াতেন অতীত দিনের মেগাস্টার। সত্যজিৎ খুঁজে বার করেছিলেন রবীনবাবুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের জন্য। সেই তাঁর শেষ ছবি। ১৯৮০ সাল। এর তিন বছর পর ১৯৮৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর লোকচক্ষুর আড়ালে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন মজুমদার। শেষ হয়ে যায় সাদাকোলা ছবির যুগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাঙালি খুব একটা মনে রাখেনি তাঁকে।
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।