ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজা উদযাপন হয়ে আসছে। প্রথমে শুধু ওই হলের শিক্ষার্থীরা পূজা উদযাপন করলেও পরবর্তী সময়ে এই পূজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগগুলোও অংশগ্রহণ করতে থাকে। করোনার কারণে গত দুই বছর সীমিত পরিসরে হলেও পূজা হয়েছিল। করোনা মহামারি কেটে যাওয়ায় এবার জগন্নাথ হলে আজ বৃহস্পতিবার (২৬ জানুয়ারি) আগের মতো বড় পরিসরে পূজা উদযাপন করা হচ্ছো। পূজার প্রস্তুতি উপলক্ষে জগন্নাথ হলে চলছে বিরাট কর্মযজ্ঞ। গতকাল সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে পূজার প্রস্তুতি।
এবারের পূজায় মোট ৭৩টি মণ্ডপে পূজা উদযাপন করা হচ্ছে। জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে প্রধান পূজা হয়েছে। পাশাপাশি হলের পুকুরে প্রতিবারের ন্যায় চারুকলা শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রতিমা আছে। আর হলের মাঠজুড়ে ৭১টি বিভাগ নির্মাণ করেছে মণ্ডপ।
পঞ্চানন পাল। গত ৩০ বছর যাবৎ সরস্বতী পূজার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে হাজির হন গোপালগঞ্জ জেলার বাজুনিয়া গ্রামের এই মৃৎশিল্পী। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। এবার গোটা পঞ্চাশেক সরস্বতীর প্রতিমা বানানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে সরস্বতীপূজা উদযাপন হয়ে আসছে। প্রথমদিকে কেবল জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীরাই পূজা উদযাপন করতো। পরে জগন্নাথ হল মাঠে বিভিন্ন থিমে প্রতিমা বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগগুলোও অংশগ্রহণ করে এখন। এ কথা আগেই বলা হয়েছ।
এদিকে পূজা ঘিরে বেশ উচ্ছ্বসিত সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। তারা বলছে, দেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা পালিত হয় জগন্নাথ হলে। যা খুবই গর্বের বিষয়।
জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা বলে, জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা তথা দেশের সর্ববৃহৎ পূজা দুই বছর পর হচ্ছে বলে সত্যিই অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করছে।

সার্বিক বিষয়ে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও হলে পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এবার আমরা বড় পরিসরে পূজা পালন করছি। হলের উপাসনালয়ের মণ্ডপে প্রধান পূজা হবে। মোট ৭৩টি মণ্ডপে পূজা পালন করা হবে। পূজার দিন সকলের জন্য প্রবেশপথ উন্মুক্ত রাখা হয়। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সকলে পূজার প্রস্তুতিতে কাজ করছে।
অধ্যাপক মিহির লাল বলেন, ‘হলের সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি আমরা আরও বাড়তি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করছি। আশা করছি সবার সহযোগিতায় আমরা সুন্দর একটি পূজা পালন করছি।’
মণ্ডপ তৈরির কাজে সাহায্য করতে আসে জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

চারুকলা শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে পুকুরে মণ্ডপ সাজানোর কাজে নিয়োজিত আছে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আটদিন-নয়দিন লাগে পুকুরে প্রতীমা তুলতে। আমরা মূলত বাঁশ গেঁড়ে দেওয়ার কাজটুকু করি। শিক্ষার্থীরা অন্যান্য কাজ করে। বৃহস্পতিবারের আগের রাতেই এই কাজ শেষ হয়েছে। পুকুরের মাঝখানের এই পূজা মণ্ডপ নিঃসন্দেহ ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন।

জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও পূজা কমিটির সভাপতি ড. মিহির লাল সাহা থেকে জানা যায়, করোনার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে পূজার আয়োজন করেছি। এইবার আমরা বড় পরিসরে পূজার আয়োজন করছি। মাঠজুড়ে মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে বিভাগ ও ইনিস্টিউটের উদ্যোগে। ২০২০ সালে ৬৬/৬৮টি মণ্ডপ নিয়ে পূজা করা হয়েছিল। করোনার পরে আমরা এক নতুন পৃথিবী পেয়েছি। সেই নতুন পৃথিবীতে পূর্ণ উদ্যমে, সাড়ম্বরে পূজা আয়োজন করা হচ্ছে। একটি কেন্দ্রীয় এবং চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে একটি-সহ বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে মোট ৭৩টি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, তিনি জানান, এই পূজার দুইটি দিক আমরা দেখি। একটি হল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা, সকলের মঙ্গল কামনা করি — বিদ্যাদানের জন্যে। সরস্বতীকে আমরা বিদ্যার দেবী বলি; তাঁর কাছে মঙ্গল কামনা করি যাতে পৃথিবীকে বিদ্যার আলোয় আলোকিত করতে পারি। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা একটা উৎসব করি। এটি হলো বাঙালির উৎসব। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে এতে অংশগ্রহণ করি। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। অবিভাবক হিসেবে তিনি সকলকে পূজায় স্বাগতম জানান এবং সহযোগিতা কামনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা পালন সর্বতোভাবে এক মহামিলন উৎসব।
মনোজিৎ কুমার দাস, লেখক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।