বিবিসির তথ্যচিত্রে গুজরাট দাঙ্গার ছবি আছে। সে তথ্যচিত্র নিয়ে ভয় কেন? আদালত তো মহামহিমকে মুক্ত করে দিয়েছেন। বলেছেন, এতে মহামহিমের কোন ভূমিকা নেই। তাছাড়া, লোকের মন থেকে সে ছবি মুছে গেছে। তাছাড়া, এর মধ্যে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদকুল চূড়ামণি আমেরিকাও এসব তুচ্ছ বিযয় নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। দেশের জনতা জনার্দনও বিশ বছরের ঘটনা ভুলে মেরে দিয়েছেন।
তাহলে ভয় কেন?
কেন জানতে হলে ম্যকবেথ নাটকের ছবিটা আনতে হবে মনে। লেডি ম্যাকবেথ। সাবান দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে তিনি হাতের রক্তের দাগ মুছে ফেলেছিলেন। তবু বারবার মনে হচ্ছে হাতে লেগে আছে রক্ত। আসলে রক্তটা আর হাতে নেই। রক্তটা লেগে আছে মনে।
মহামহিমের মনেও কি লেগে আছে রক্তের ছবি? কিছুতেই মোছা যাচ্ছে না? তাই ভয়? এত বড় জয়। বিরোধী বলে কিছুরই আস্ত রাখছেন না। ছলে-বলে-কৌশলের চাণক্যনীতি প্রয়োগ করে চলেছেন দিবারাত্র। তবু রক্তের ছবির ভয়?
চুপি চুপি দেখা যাক ছবিগুলি।
প্রথম ছবি। ২৭ ফেব্রূয়ারি, ২০০২। সবরমতী এক্সপ্রেস এসে দাঁড়াল গোধরা স্টেশনে। চার ঘন্টা দেরিতে। এই স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ায় মাত্র পাঁচ মিনিট। সেদিন দাঁড়িয়েছিল ২৫ মিনিট। ট্রেন ছাড়ল। কিন্তু স্টেশন থেকে মাইল খানেক যাবার পরে কে বা কারা চেন টেনে থামাল গাড়ি। গাড়ি যেখানে থামল সেটা মুসলমান অধ্যুষিত সিগনাল ফালিয়া অঞ্চল। ট্রেনে আগুন। এস-৬ কামরা পরিণত হল অগ্নিকুণ্ডে। মারা গেলেন ১২ শিশুসহ ৫৮ জন যাত্রী।
কে লাগাল আগুন? জার্মানির রাইখস্ট্যাগের আগুনের কথা মনে করুন। হিটলারি কৌশল। আগুন লাগিয়ে বলা হল কমিউনিস্টরা লাগিয়েছে আগুন। তাই আপনারা জাগুন। যারা লাগাল আগুন তাদের পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখান।
দ্বিতীয় ছবি। ২৭ ফেব্রয়ারি, ২০০২। রাত সাড়ে এগারোটা। আজকের মহামহিম তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। গান্ধীনগরে তাঁর বাসভবনে সেই নিশুতি রাতে ঢুকছে একের পর এক গাড়ি। গুজরাটের ডাইরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ কে, চক্রবর্তী, আমেদাবাদ শহরের পুলিশ কমিশনার পি. সি. পাণ্ডে, মুখ্যসচিব জি. সুব্বারাও, স্বরাষ্ট্র সচিব কে. নিত্যানন্দ, ডিজিপি (আই বি) জি. এস. বাইগার, পি.কে মিশ্র, অনিল মুখিম, এ.কে. শর্মা সমবেত হলেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে।
কিসের আলোচনা? আইন শৃঙ্খলা রক্ষার? তাহলে পরের দিনের ছবিটা এমন হল কেন?
তৃতীয় ছবি। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০২। উঠলেন সূর্যদেব। কিন্তু নেমে এল আলোকিত অন্ধকার। চিৎকার। আর্তনাদ। অসহনীয় গোঙানি। রাস্তা দখল নিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, দুর্গাবাহিনী, শৌর্যবাইনী। প্রতিশোধ নিতে হবে। শায়েস্তা করতে হবে মুসলমানদের। পুলিশ চুপ। তাঁরা দর্শক। সরকারপক্ষ চুপ। খুন হচ্ছে। ধর্ষণ হচ্ছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লুঠপাট হচ্ছে। পুলিশ চুপ। সরকার চুপ। সমস্ত গুজরাট হয়ে গেল গোধরা। মহামহিমের দলের লোক, তখনকার প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারীকেও বলতে হল, গুজরাটে সরকার পালন করে নি রাজধর্ম।
সেই মহামহিম এখন নিজেকে জনগণের চৌকিদার বলেন।
জনতাজনার্দন চুপ করে শোনেন।
সেই মহামহিম বলেন গণতন্ত্রের কথা।
জনতাজনার্দন শুনতে থাকেন।
এমন কোন সাহসী বালক কি নেই যে মহামহিমের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে : রাজা তোর কাপড় কোথায়?
ইতিহাস তো থেমে থাকে না। মহামহিম জানেন সে কথা। চলমান ইতিহাসের আবর্তে হয়তো উঠে আসবে সেই সাহসী বালক, যে রাজাকে ‘ল্যাংটা রাজা’ বলবে অবলীলাক্রমে। মহামহিম সে কথা জানেন বলেই ভয়।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক