সময়টা ১৯৫৯ সাল। সদ্য দিল্লী ঘুরে কলকাতায় এসেছেন বিপ্লবী থেকে কূটনীতিবিদে পরিনত হওয়া এক ডাক্তার। দিল্লীতে থাকাকালীন পিলানার কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট পরিদর্শনকালে চাষিদের মাঝে ডাক্তার চমৎকৃত হন এটা দেখে যে ভারতীয় কিভাবে তার পশুসম্পদের প্রতি দায়বদ্ধ, যা তাঁর মতে ছিল গ্রাম্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাঁর কলকাতায় তোলা ছবিগুলিতেও কল্লোলিনীর রাস্তাঘাটে ট্যক্সি, হাত-রিক্সা ও বিশ্রামরত গবাদি পশুর ফোটোজনিক মেলবন্ধন অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট। আসলে আর পাঁচটা দিলেতাঁত ভারতপ্রেমীর মতই চে পরম্পরা ও আধুনিকতার এমন সহাবস্থান দেখে অবাক হয়েছিলেন। দিল্লীতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সাংবাদিক কে. পি. ভানুমতী যখন ডাক্তারকে জানান যে ভারতের মত নানাবিধ ধর্মে বিভক্ত দেশে কমিউনিস্ট ডগমাগুলিকে ভালো চোখে দেখা হয়না, ডাক্তার উত্তর দেন যে তিনি নিজেকেও কমিউনিস্ট ভাবেন না, বরং সোশালিস্ট মনে করেন এবং সম্মান করেন গান্ধীর অহিংস নীতিকে। এই ডাক্তার আর কেউ নন; তিনি এরনেস্তো চে গেভারা, কিউবার সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম নায়ক। গত বছর ছিল যাঁর পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকী। চে দেশে ফিরে ভারত সম্পর্কে দেওয়া তাঁর রিপোর্টে বলেন, — “ভারতে যুদ্ধ বিষয়টি মানুষের আত্মিক পরিসর থেকে এতটাই দূরে যে স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যায় বিষয়েও তারা হিংসাকে স্থান দেয়না।”
অত্যন্ত অবিপ্লবী কথা! শুধু তাই না; তিনি কলকাতায় এসে বিধানচন্দ্র রায়ের সাথে দেখা করলেও, সেদিন সংযুক্ত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার কলকাতাস্থিত সদস্যদের কেউ খুব একটি উৎসাহ দেখাননি তাঁকে নিয়ে। বরং চে এসে দেখা করেছেন জনৈক ‘কৃষ্ণ’-এর সাথে, যাঁর কথা স্থান পেয়েছে তাঁর রিপোর্টে। অনেকের মতে এই ‘কৃষ্ণ’ সেসময়ের আধ্যাত্মিক গুরু জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তি। ১৯৫৯ সালের চে-এর এই আদ্যপান্ত ‘অমার্ক্সবাদী’ দৌত্য বিষয়ে বাঙালী কমিউনিস্টরা নীরব। ২০০৭ সালে জনসত্তা পত্রিকার সম্পাদক ওম থানভি যখন চে-এর সেই রিপোর্ট অনুবাদ করিয়ে ভারতে নিয়ে আসেন তখন প্রশ্নের মুখে পরে চে-এর সম্পর্কের চিরাচরিত অনেক ধারণা। তাই বর্তমান বছরের চলতি মাসে চে গুয়েভারার কন্যা আলেইদা ও দৌহিত্রী এস্তেফানিয়ার কলকাতা আসা নিয়ে যে ভদ্রলোকি উন্মাদনা দেখা দিয়েছে সে প্রসঙ্গে তেষট্টি বছর আগের সেসময়টির আবেগপূর্ণ স্মৃতিচারণের সাথে সাথে কিছু বাস্তবোচিত সংশয়ও মাথাচাড়া দেয়।
হয়তো এই কারনেই ১৯৫৯ সালে বঙ্গীয় বিপ্লবীদের কাছে চে গুয়েভারা খুব একটা মহান জননেতা ছিলেন না। বরং তখন বঙ্গসন্তানদের হৃদয়ের চেয়ার দখল করেছিলেন ‘চেয়ারম্যান’ মাও। চে তাঁর গেরিলা যুদ্ধের তত্বে সামান্য কয়েক জন দেশপ্রেমিক বিপ্লবী নিয়েই শহর থেকে গ্রামে গিয়ে বিপ্লবে জয়ী হওয়ার যে কথা বলেছিলেন তা মাওবাদী ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো’ নীতির বিরুদ্ধে। আবার চে গেরিলা যুদ্ধে মার্ক্সবাদ কেন, কোন প্রকার সুসংহত তত্বের অপরিহার্যতার বিষয়ে ছিলেন নিশ্চুপ। বাংলায় বিপ্লবে সচেষ্ট গোষ্ঠিদের মধ্যেও তাই গ্রাম্য মাওবাদী ও শহুরে ‘গুয়েভারা’-বাদীদের মতাদর্শগত দুরত্ব ছিল। নকশাল আমলে চারু মজুমদার ও তাঁর বিরোধী গোষ্ঠি একে অপরকে ‘গুয়েভারা’-বাদী বলে গালাগালি করতেন। নকশাল আন্দোলনের সময় অন্ধ্রপ্রদেশের বিপ্লবী নাগি রেড্ডী তাঁর লেখায় চারু মজুমদারকে অতিবিপ্লবী গুয়েভারাবাদী বলেছিলেন। প্রত্যুত্তরে নকশাল নেতা চাণক্য সরকার ১৯৭১-এ লিখছেন চারুবাবু ‘গুয়েভারা’-বাদী নন এবং একই সাথে সহবিপ্লবীদের সাবধান করছেন যে কিউবার সংশোধনবাদী লাইনের থেকে দূরত্ব রাখতে হবে কারন চে ও ফিদেল কাস্ত্রো ‘মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ মাওচিন্তা বিরোধী’। বাংলার মতই কমিউনিস্ট রক্ষণশীলতার প্রভাব চে-এর দক্ষিন আমেরিকার পরবর্তী বিপ্লবী কার্য্যকলাপে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ‘গুয়েভারা’-বাদী হওয়া নকশালি ভাষায় সংশোধনবাদী হওয়ার সমান, কারণ ‘অতিবিপ্লবী’ চে যখন ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার ব্যার্থ বিপ্লবের পর মারা যাচ্ছেন তখনও তাঁর ডায়রীতে উঠে আসছে বলিভিয়ান রক্ষণশীল কমিউনিস্ট পার্টির মারিও মলিনোর সাথে তৈরি হওয়া বিবাদের কথা। ঠিক এই কারনেই গড়পড়তা বাঙালীর মতই চে ঠিক উপযুক্ত পরিমানে মার্ক্সবাদী হতে পারেননি, কারণ রক্ষনশীলতা তার ধাতে নেই। উল্টে চে হিংসাত্মক বিপ্লবের সাথে ভারতীয়দের মানসিক দূরত্ব বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন যা অনেক ভারতীয় বোঝেননি।
তবে বাংলার চে-প্রেম শুরু হল কিভাবে? আসলে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী কমিউনিস্টরা চে-এর স্মৃতিকে পূনর্গঠন করতে শুরু করবে সত্তরের কিছু পর থেকে। জ্যোতি বসু ছুটবেন কাস্ত্রোর সাথে বিমানবন্দরে দেখা করে ‘চে-কাস্ত্রো-কিউবা’-র সাথে সৌহার্দ্য জানাতে। কালীভক্ত সুভাষ চক্রবর্তী মারাদোনাকে কলকাতায় এনে হাতে তুলে দেবেন চে-এর প্রোট্রেট। অবশ্য কালী-গুয়েভারার এই স্ববিরোধী সহাবস্থান নতুন নয়। নকশাল স্মৃতিচারণাতেই আছে যে জনৈক বিপ্লবী, পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নদীয়ার এক মন্দিরে পূজারী সেজেছিল। পরবর্তী জীবনে পুলিশকে বোকা বানাতে তিনি রামপ্রসাদী গাইতেন আর তাঁর কুটিরে মা কালীর পাশেই শোভা পেত চে গেভারার ছবি। বাঙালী ভদ্রলোকের এই উপাদেয় খিচুরীসম ‘চে’-চর্চা তাই বেশ পুরাতন। এই ভদ্রলোকি স্মৃতি এতটাই প্রবল হয়ে উঠবে যে সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-ছবিতে নায়ক সিদ্ধার্থকে গুয়েভারার স্বপ্নে বিভোর করবেন পরিচালক। অবশ্য সত্তরের দশকে বাঙালী কমিউনিস্টরা এক অদ্ভুত দোটানায় ভুগছিলেন। তাঁরা চে-কে স্বপ্নালু বিপ্লবী নায়ক হিসেবে দেখছিলেন ঠিকই কিন্তু আমেরিকায় চে-কে নিয়ে সিনেমা বের হতে শুরু করলে চিন্তিত হয়ে পরছিলেন বিপ্লবী সংস্কৃতির পণ্যায়ণ দেখে । অবশ্য সাংস্কৃতিক পণ্যায়ন কি বাংলা সাহিত্যে হয়নি? তাঁরা বার বার বলতে থাকবেন, চে-কে আধুনিক রবিনহুড হিসাবে দেখানো আসলে চে-এর বিপ্লবী সত্তাকে দূর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা, অথচ বাম কবি-সাহিত্যিকেরা চে-কে প্রেমিক সাজাতে ছাড়বেন না। আবার চে-এর মধ্যের রোমান্টিক ভাববাদী প্রবণতার কথা মাঝে মাঝেই উঠে আসবে বাঙালীর চে-চর্চায়, কিন্তু তা সাম্যবাদচর্চার মূলস্রোতে সহজে আসতে দেওয়া হবেনা, যেমন আসতে দেওয়া হবেনা চে-এর অন্ধকার দিকগুলিকে। এই বামপন্থী ঢাক-ঢাক-গূড়-গূড়ের মাঝেই নব্বইয়ের দশকে বাঙালী মধ্যবিত্তের কসমোপলিটান কমিউনিসমের মানসিকতার প্রকাশ পাবে গুয়েভারা-কাস্ত্রো জিন্দাবাদ বলার মধ্য দিয়ে।
চে অবশ্য বাঙালীদের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে উঠবেন বামঘেষা-মুক্তমনা কবি-সাহিত্যিকদের লেখার মাধ্যমে। আসলে কাব্য-কবিতায় নায়কোচিত ও সুদর্শন বিপ্লবী নাহলে ঠিক চলেনা; বিশেষ করে যার মৃত্যুটিও নায়কোচিত তাঁর থেকে ভাল আইকন কেইবা হবে! সুনীল গাঙ্গুলি সেই কবেই ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ দেখিয়ে গেছেন যে রবীন্দ্রনাথ ও মৌলানা ভাসানীর সাথে বাঙালীর চে ‘গুয়েভারা’ তাকিয়ে থাকে গল্পের দুই চরিত্র অতীন-অলির আধাপ্রেমের সম্পর্কের দিকে। একমাত্র নবারুন ভট্টাচার্য্য তাঁর ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ উপন্যাসে শ্লেষের ঢঙে দেখিয়েছেন ‘যে উঠতি বয়সের পুলিশ অফিসাররা মাও, চে গুয়েভারা, বা কারলোস মারিঘেল্লা ইত্যাদি আওড়াত, কোথাকার কোন টুপামারো গেরিলাদের খবর রাখত—বড়কর্তারা তাদের দিকেই বেশি নেকনজর দিত’। প্রেমিকের অভিসার থেকে পুলিশের প্রহার, সাহিত্যে বাঙালী চে-এর ব্যাপ্তি সর্বত্র; সে একমাত্র ব্রাত্য বাঙালীর বিপ্লবে। আসলে সত্তর ও আশির দশকে অন্যান্য বিপ্লবী শব্দবন্ধের মতই ‘চে গুয়েভারা’ আরো একটি সাংস্কৃতিক যাপনের নাম হয়ে উঠবেন যার জন্য বিপ্লবী না হলেও চলে; বরং শুধু শহুরে ভদ্রলোক হলেই নাগাল পাওয়া যায় যে রোমান্টিক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের মৌতাতের। এই ব্যক্তিত্বের টানে যত না থাকে বাস্তবতা, তার থেকেও বেশী রয়ে যায় ‘বুর্জোয়া’ যুবকোচিত স্বপ্নালু ভাবাবেগ। এপ্রসঙ্গে মনে পরে কমল চক্রবর্তীর ‘প্রথম শনিবার’ গল্পের কথা, যেখানে চরিত্র যোগেন প্রকৃত বিপ্লবী কেমন হয় বলতে গিয়ে বলেছে যে ‘প্রকৃত নকশাল’;
“কথা বলতে বলতে বোম বাঁধবে। পাইপগানে অব্যর্থ টিপ। ঝরঝর জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, মায়াকভস্কি, নেরুদা বলে যাবে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রত্যেকটা গল্প লাইন বাই লাইন। চোখ বন্ধ করে, পৃষ্ঠা খুলেই বলে দেবে রেডবুকের ছত্রিশ পৃষ্ঠা অথবা ছিয়াশি।”
এদিকে যোগেনের বাক্যবাণের উল্টোদিকে থাকা কলকারখানাময় মফঃস্বলবাসী গল্পের নায়ক ‘পাড়ার বিখ্যাত লেখকের ‘চে গুয়েভারা’ পড়ে’ ভাবে, মুখে অল্প দাড়ি আর মাথায় টুপি রাখলে’ আদতে তাকেও চে-এর মত লাগে। আবার সে যোগেনের বলা ‘রাজনৈতিক সচেতন’ নকশাল আর কলকাতার খালাশিটোলার রবীন্দ্রমনস্ক ‘সংস্কৃতি সচেতন’ পাঞ্জাবী ড্রাইভারের কথা শুনে হীনমন্যতায় ভোগে। মফঃস্বলবাসী বাঙালী এভাবেই চিরকাল কলিকাতার বাঙালীর বাকচাতুর্য্যে ভুলেছে; আর চে এই শহুরে চাতুর্যের আরেক উপাদান হয়েই থেকে গেছে। সুদর্শন ও প্রেমিক বিপ্লবীদের মধ্যে সবার উপরে ছিলেন চে, তাই তাঁকে দিয়েই বিপ্লবের হাতেখড়ি হয়েছে অনেক যুবকের, কিন্তু স্বয়ং বিপ্লবের মতই তাঁর বাঙালী সংস্করণটি ছিল কলকাতার শহুরে ভদ্রলোকের সংস্কৃতিযাপনের পরিসরের ব্যাকরণে আবদ্ধ। তার সাথে সাথে তিনি যে ধীরে ধীরে বিপ্লবী যৌনতার প্রতীকে পরিণত হচ্ছিলেন তা বাঙালী সাহিত্যিকদের লেখায় স্পষ্ট হবে। ‘প্রতিমার প্রতিবিম্ব’-এর মত গল্পে লেখকদের ভাষায় ফর্সা-ঝাঁকড়া চুল-অবিন্যস্ত দাড়ির যুবকের সৌন্দর্য বোঝাতে আকছার বলা হবে যে চরিত্রটি ‘চে গুয়েভারা টাইপের’। পরের দিকে অবশ্য মহাশ্বেতা দেবীদের ‘এম ডব্লু বনাম লখিন্দ’-এর মত উপন্যাসে ‘চে-টাইপ’ ‘লাল-নীল’ জামা পরা শহুরে বিপ্লবীদের প্রতি ব্যঙ্গের প্রবনতা বাড়তে থাকবে, যেটা হয়তো পন্যায়িত চে-মার্কা শহুরে ভদ্রলোকি বিপ্লববাদ থেকে সরে আসার প্রতীক। যখন টি-শার্টে মায় বিকিনিতে পৌঁছে যাওয়া চে-এর বিক্রয়যোগ্যতা আর পাঁচজন বিপ্লবীর থেকেও বেড়ে যাবে তখন অন্যেরা অবাক হলেও বাঙালী হয়তো অবাক হয়নি; কারণ সুদর্শন বিপ্লবকে সাংস্কৃতিক পণ্য হিসেবেই সে যাপন করেছে অনেক আগে থেকেই। তাই যখন শিলিগুড়ির সিপিএম থেকে বিজেপি হওয়া শঙ্কর ঘোষ চে-এর ট্যাটু নিয়েই ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দেন তখন যেমন অবাক হওয়ার থাকে না, তেমনই মাথায় চে-এর টুপি লাগিয়ে ভোট চেয়েও ব্যার্থ হতে থাকা বর্তমান বামপন্থা দেখেও অবাক হওয়ার নেই; কারণ নব্য-উদারনীতির জগতে চে আর বামপন্থী নেই।
তথ্যসূত্র :
Om Thanvi, ‘Che in India’, Himal Southasian, December 2007
অভ্র ঘোষ, ‘মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির ভাঙা-গড়া’, পরিচয়, বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৯৯, পৃ-১৩১-১৮২
চাণক্য সরকার, ‘নকশাল আন্দোলনের রিপোর্ট’, দর্পন, ২৪ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১, পৃ-৫-৬