সুদূর বাঁকুড়ার বন থেকে দলছুট হয়ে নদী পেরিয়ে আরামবাগে ঢুকে পড়েছিল দাঁতাল বুনো হাতি। তার আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে গোঘাটের প্রসেনজিৎ ধারা (৩২) নামে এক ব্যক্তির আহত বেশ কয়েকজন। চার পাঁচটি ঘর ভেঙেছে, ভেঙেছে বেশ কয়েকটি মোটরবাইক স্কুটার। শনিবার ভোর থেকে সারাদিন দাপিয়ে বেরিয়েছে আরামবাগ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। ছারখার করে দিয়েছে সবজি বাজার থেকে শুরু করে বয়েজ স্কুলের মাঠ। ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার তুমুল চেষ্টা করেছে। বুনো হাতিটি গরবেতা, মেদিনীপুর, কলকাতা ও বর্ধমান থেকে আসা হুলা পার্টি ও বন দপ্তরের আধিকারিকদের প্রায় নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে সারাদিন। তাকে জব্দ করা তো দূরের কথা তার গতি নিয়ন্ত্রণ করারও কোন প্রচেষ্টা সফল হয়নি। রাতে বাঁকুড়ার বনাঞ্চলের দিকে ফিরতে ফিরতে সেই হাতি পুনরায় পথ পরিবর্তন করে বর্ধমানের লোকালয়ের দিকে ঢোকার চেষ্টা করেছে। অবশেষে বর্ধমানের মাধবদিহি থানার বুলচন্দ্রপুরে হাতিটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে ঘুমের ইনজেকশন গুলি করে। রবিবার দিনভর এই প্রক্রিয়া চলার পর হাতিটিকে ক্রেনে তুলে, ট্রাকে চড়িয়ে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার ভোরে। প্রথমে হাতিটি দেখা যায় আরামবাগের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে কালিপুর এলাকায়। সেখানে অত্যুৎসাহী মানুষের ভিড়ে এবং চেঁচামেচিতে ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দেয় হাতিটি। কালিপুরের বাসিন্দা মিলন ফটিক নামে এক ব্যক্তি হাতির সামনে বসে পড়ে তাকে প্রণাম করতে যায়। এই সময় হাতিটি তাকে পায়ে পিছে শুঁর দিয়ে তুলে আছাড় মারে, গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় মানুষ এবং পুলিশ তাকে উদ্ধার করে আরামবাগ হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর নদী পার হয়ে সে আরামবাগ শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আরামবাগের পুরপিতা সমীর ভান্ডারীর অভিযোগ, “এই সময়ে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অথবা অন্য কোনভাবে হাতির গতি নিয়ন্ত্রণ করলে শহরের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। কিন্তু বন দপ্তরের কর্মীরা তাতে ব্যর্থ হয়েছে।”
কার্যত, বন দপ্তরের আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিলম্বের ফলেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় মানুষজন। শনিবার সন্ধ্যায় আরামবাগ থেকে ফেরার পথে গোঘাটে কুমুড়শা এলাকায় প্রসেনজিৎকে সামনে পেয়ে সুর দিয়ে তুলে আছাড় মারে হাতিটি। তারপর তাকে পায়ে পিষে দেয়। গুরুতর যখন অবস্থায় তাকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রবিবার সেখানে তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।

রবিবার বর্ধমানের ডিএফও নিশা গোস্বামী জানিয়েছেন, “আমরা খবর পেয়েছিলাম শনিবার হাতিটি আরামবাগ শহরে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। ওকে তাড়িয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ সে পথ পরিবর্তন করে বর্ধমানের লোকালয়ের দিকে চলে আসে। যেহেতু ওর গতিবিধি খুব দ্রুত ছিল তাই ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে খুব বেগ পেতে হচ্ছিল আমাদের। শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে ঘুমের ইনজেকশন গুলি করা হয়। দুটি ইনজেকশন দেওয়ার পর হাতিটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। এরপর তাকে ট্রাকে তুলে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে ছাড়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
আরামবাগের রেঞ্জার অফিসার আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য, “হাতিটি দেখতে বহু মানুষ ভিড় করে। তাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। এর ফলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা খুব কঠিন হয়ে যায়। এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পেয়েছি হাতির হামলায়। অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। তবে সরকারিভাবে তার পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে ।

আরামবাগে একেবারে শহরের মধ্যে ঢুকে হাতির তাণ্ডবের ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলে মনে হয় না। একেবারে চোখের সামনে আস্ত একটা বুনো হাতি দৌড়াতে দেখে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে সারা আরামবাগে। প্রথমে সাধারণ মানুষ একে মজা হিসেবে নিলেও পরে রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। পশুদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ফলেই তারা লোকালয়ে এভাবে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের আশঙ্কা, মানুষ এখনো সতর্ক না হলে এই ঘটনা বারবার করতে থাকবে।