অকপট সত্যানুরাগ। নিপীড়িত মানুষের প্রতি অকৃপণ প্রেম। যুক্তিবাদে আস্থা। এসবের সন্ধান পেতে খুব দূরে যেতে হবে না। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনের যাবতীয় অসঙ্গতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন তিনি, জ্বেলেছিলেন যে প্রাণের প্রদীপ তা আজও নিবাত নিষ্কম্প। আচারের চোরাবালিতে যে ধর্মের সমাধি ঘটতে চলেছিল, সত্য ও প্রেমের প্রাণোচ্ছ্বল স্রতোধারায় তাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন রামকৃষ্ণই। মঙ্গলবার তাঁরই ১৮৮ তম জন্মতিথিতে হাজার হাজার ভক্ত পুণ্যের খোঁজে ঠাকুরের দেশে উপস্থিত ছিলেন।
কামারপুকুর শহর পরিক্রমা করেন হাজার হাজার ভক্ত। ঠাকুরের পুজো ও নাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। প্রসঙ্গত, শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে ধর্ম কখনও আচারসর্বস্ব ছিল না। পরম ঔদার্যে তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন ধর্মে ধর্মে বিভেদের খড়ির গণ্ডি। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাই তিনিই বলতে পেরেছিলেন ‘যত মত তত পথ’। এজন্যই বর্তমানের অন্তিম প্রহরে দাঁড়িয়েও শ্রীরামকৃষ্ণ চর্চায় মেলে মুক্তিপথের সন্ধান। আর সেই মুক্তিপথের সন্ধানে দেশ-বিদেশ ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুক্তিকামী মানুষ আজও ছুটে আসেন কামারপুকুর ও জয়রামবাটিতে। একদিকে হৃদয়শুদ্ধি, অপরদিকে মনের আনন্দ মেটাতে মানুষ আজও ছুটে বেড়ান। ভ্রমণের মাধ্যমে কেবল পাহাড়-সমুদ্র নয়। এরই মাঝে জীবনের মুক্তি পথের সন্ধানে পূণ্যের খোঁজে ঠাকুরের দেশে মানুষ ঘুরে বেড়ান। সেই ঠিকানা দূরে নয়, হাত বাড়ালেই সামান্য সময়ে পৌঁছে যাবেন সেই স্বপ্নের দেশে।

মনে রাখতে হবে প্রতীচ্যের জ্ঞানী গুণীদের কাছে রামকৃষ্ণ প্রতিভাত হয়েছিলেন ‘ফেনোমেনন’ হিসেবে। অলডাস হাক্সলি, ক্রিস্টোফার ইশারউড, আঁদ্রে জিদ, রোমা রলাঁ, আর্নাল্ড টয়েনবি সকলেই বিমুগ্ধ শ্রীরামকৃষ্ণের ভাববিপ্লবে। এঁদের সকলের কাছে এক ‘অত্যাশ্চর্য আবির্ভাব’। মানবের এই ‘অত্যাশ্চর্যকে’ দেখার আগ্রহ চিরন্তন। একঘেয়েমি সংসারবন্ধন থেকে মনের আনন্দ মেটাতে আজও অসংখ্য মানুষ কামারপুকুর ও জয়রামবাটি ছুটে আসেন। দেখা মিলবে খড়ের ছাউনি আর মাটির দেওয়ালে উনিশ শতকের ছাপ। যা আজও অটুট। ঠাকুর রামকৃষ্ণের শোবার ঘরটুকু দেখলে মনে হবে এখনও তাঁর উপস্থিতি বিদ্যমান।
উল্লেখ্য, এদিন ঠাকুরের জন্মতিথি উপলক্ষে সকাল থেকেই উৎসবের মেজাজ। কামারপুকুর মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী লোকোত্তরানন্দ মহারাজ জানান, তিনদিন ধরে চলবে ঠাকুরের উৎসব। পাশাপাশি এখানেই সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের মেলা মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। চলবে পনেরো দিন ধরে।

প্রসঙ্গত, উনিশ শতকের আরামবাগের সুখলালগঞ্জ আজকের কামারপুকুর। ১৮৩৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গদাধর জন্মগ্রহণ করেন। এখানে যেটা দেখার বিষয় তা হল — ঠাকুর যে ঢেঁকিশালে জন্মেছিলেন, সেখানেই শ্বেতশুভ্র মন্দিরে ঠাকুরের শান্ত-স্নিগ্ধ অপূর্ব মূর্তি। যা দেখলে হৃদয়শুদ্ধি তো ঘটবেই, সেইসঙ্গে পুণ্য সঞ্চয় হবে। মন্দিরের সামনেই নাটমন্দির। উল্লেখ করতেই হয় ঠাকুরের মন্দিরটির কথা। এই মন্দিরটি ১৯৪৯ সালে ১ মার্চ বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর পরিকল্পিত। পাশেই খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির দুটি ঘর আজও অটুট। একটি ঘরে ঠাকুরের জন্য বিছানা পাতাই আছে। অপর ঘরটিতে থাকতেন ঠাকুরের মধ্যম ভ্রাতা রামেশ্বর। পুত্র ও কন্যা নিয়ে বসবাস করতেন। ঠিক তার উল্টোপাশে রঘুবীর মন্দির। এই মন্দিরে এখনো রঘুবীর শিলা, শীতলাদেবীর ঘট। এখানে রামেশ্বর শিব পূজিত হন।

উপনয়নের পর ঠাকুর এখানে রঘুবীরের পুজো করেছিলেন। গেটের মুখেই ঠাকুরের স্বহস্তে লাগানো সেই আমগাছ এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো ফল দেয়। এবার দেখা যাবে ঠাকুরের বাসভবনের উত্তরদিকে রাস্তার পাশেই যুগীদের শিবমন্দির। রামানন্দ যুগী এই মন্দিরটি প্রস্তুত করেছিলেন। মন্দিরটির গায়ে এখনো পোড়া মাটির শিল্পকলা চোখে পড়বে। কথিত, এই শিবের নাম শান্তিনাথ। ঠাকুরের মাতৃদেবী চন্দ্রমণীদেবী এখানে প্রার্থনা করেছিলেন। মন্দির থেকে এক দিব্যজ্যোতি চন্দ্রমণীদেবীর দেহে পবেশ করেছিল। এই ঘটনার পরেই ঠাকুরের জন্ম হয়। রাস্তার পাশেই হালদার পুকুর। যেখানে ঠাকুর স্নান করতেন। এই পুকুরের চারপাশে ভেষজ গাছের উদ্যান। আর এই পুকুরের পাশেই লক্ষ্মীজলা। উল্লেখ্য, এখানেই প্রতিবছর রথের দিন মঠের সাধুরা প্রথম ধান রোপণ শুরু করেন। তারপর মঠের অনান্য জমিতে রোয়ার কাজ শুরু হয়। এমনকি গ্রামের আশপাশের চাষিরাও শুরু করেন চাষ।

এখানে এখনো দেখা মিলবে রামকৃষ্ণ যে পাঠশালাতে পড়তে যেতেন। এখানে পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হন গদাধর। এই পাঠশালাতেই গদাধরকে পড়িয়েছেন যদুনাথ সরকার, রাজেন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখরা। এখানেই লাহাদের চণ্ডীমণ্ডপ। এই মণ্ডপে এখনো প্রতিবছর দুর্গা পূজা হয়। ঠাকুরের কিশোর বয়সে পাশেই পাইনদের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল। এই বাড়িটিতে একটি বিষ্ণু মন্দির ছিল। এখানে গদাধর একবার যাত্রায় শিবের অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় করতে করতেই ধ্যানস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই জায়গাটি এখনো সযত্নে রাখা আছে। এছাড়া চিনুশাঁখারির ভিটে, ধনীমাতার মন্দির এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। যেখানে রামকৃষ্ণের স্মৃতিচিহ্ন কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।