সেদিন সন্ধ্যেয় কাজ থাকলেও বাইরে যেতে পারিনি। সকাল থেকেই ঘোর বৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটুজল। লোকজন নেই। গাড়িঘোড়ারও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যমনস্কভাবে টিভিতে খবরের চ্যানেলগুলো ঘোরাচ্ছিলাম। ভালো লাগছিল না। সেই একই রাজনৈতিক তরজা। চেঁচামেচি। কেউ কারোর কথা শোনে না। খুব বিরক্তিকর লাগে। এরই মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল মাঝেমাঝে দেখি। তাদের উপস্থাপনা, দেশবিদেশের নানা রোমাঞ্চকর খবর মন কেড়ে নেয়।
সেসময় ঐ চ্যানেলটিতে দেখাচ্ছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউক্রেনের বুচা শহর। এত নৃশংস ছবি সাধারণতঃ আমি সহ্য করতে পারি না। কিন্তু সেদিন কি যে হল আমার! হাজার হাজার মাইলের দূরত্বে থাকা মানুষগুলোর অসহায় যন্ত্রণা বুকে কাঁটার মত বিঁধতে লাগল। বর্ষারাতে একলা ঘরে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে আমি এ কি দেখছি!
দেখলাম গোটা বুচা শহরটা যেন এক অভিশপ্ত বিভীষিকা। আমি একলা হেঁটে যাচ্ছি ফার-ওক-পাইন গাছে ভরা সবুজ শহরতলীর পথ দিয়ে।সে পথ জমাটবাঁধা শুকনো রক্তের দাগে কলঙ্কিত হয়ে আছে। পথের ধারে সুন্দর সাজানো ছোটবড় কটেজগুলো ভাঙাচোরা। প্রায় বেশিরভাগই পরিত্যক্ত। কটেজের রঙিন জানলাদরজায় বুলেটের কঠিন চিহ্ন। বাগানে, পার্কে মরশুমী ফুলের গাছ লুটিয়ে পড়ে আছে। বাগানের মাটিতে ভারি বুটের ছাপ এখনো স্পষ্ট। বাতাসে বারুদের গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। যে নদীর নামে শহর, যে নদী শহরের প্রাণ, সেই বুচা নদীর ছোট্ট সুন্দর ব্রীজটি বিধ্বস্ত। গাড়ির ভেতরে এখনো রয়ে গেছে কিছু অসহায় মানুষের মৃতদেহ। ফুলে ফেঁপে তাতে পচন ধরেছে। শহর ছেড়ে এই মানুষগুলো তড়িঘড়ি পালিয়ে বাঁচতে চাইছিল। নারকীয় হত্যা তাদের গতি স্তব্ধ করে দিয়েছে।
আশ্চর্যভাবে সে শহরে জয়স্তম্ভ তুলে অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র এক প্রাচীন গীর্জা। প্রাচীন গথিকশৈলীতে গড়া সে গীর্জার ছুঁচলো চূড়ায় কিসের ইঙ্গিত?
আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম গীর্জার সামনে। গীর্জার সবুজ লনে কেমন নিশ্চিন্তে ওড়াওড়ি করছে ঘাসফড়িঙের দল। ঘাসফড়িংদের নৃত্যসভার মাঝখান দিয়ে পথ করে নিলাম। তারপর গীর্জার নক্সা করা ভারী কাঠের দরজা খুলে সন্তর্পণে ভিতরে ঢুকলাম। শেষ বিকেলের আলো তখন রঙিন কাঁচের মধ্যে দিয়ে গীর্জাঘরে এক অদ্ভুত মায়াময় জগত তৈরি করেছে। এক বিপন্ন নীরবতা প্রভু যীশুর করুণাময় বিশালমূর্তিতে। ঝাড়লণ্ঠন, মোমবাতিদান, অয়েল পেন্টিংয়ে সাজানো প্রার্থনাঘর। আমার উপস্থিতি টের পেতেই কেউ যেন ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল কে, কে? সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হল নিস্তব্ধ চার্চের দেওয়ালে দেওয়ালে। ছায়ামূর্তির মত ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন গীর্জার পাদ্রী। তাঁর পরনে শ্বেতশুভ্র লম্বা জোব্বা।সৌম্য চেহারায়, সাদা দাড়িতে তিনি যেন ঈশ্বরের প্রতিরূপ। কিন্তু সে ঈশ্বরের চোখেও ভয়ার্ত দৃষ্টি। আমি নিজের পরিচয় দিলাম। সৌজন্য বিনিময় করলাম। ভাঙা ভাঙা ইংরিজীতে ফাদার ল্যাকসান্দ্রা স্মিত হেসে বললেন,
—”অনেকদিন পরে গীর্জায় মানুষের পদধ্বনি শোনা গেল”।
আমি সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন, আপনি তো ছিলেন এখানে ফাদার”।
বিষণ্ণ ফাদার ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, “না চল্লিশ বছর ধরে যে কাজ করে এসেছি, প্রাণের ভয়ে সে কাজ বন্ধ করতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন”।
—”তার মানে আপনি এখানে ছিলেন না? না, এখানেই কোথাও লুকিয়ে ছিলেন, চার্চের মধ্যেই?”
—”শহরের উপান্তে এক বেসমেন্টে আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল এই প্রিয় শহরের আমার প্রাণাধিক প্রিয় মানুষগুলো। সেখান থেকেই আমি শুনেছি ধর্ষিতা মেয়েদের আর্তনাদ। শিশুদের অবুঝ কান্না। কঠিন, কঠোর নৃশংস মানুষের উল্লাস। গোলাগুলির শব্দ। সামান্য খাবার আর জলে বেশ কয়েকটা দিন সেখানে কাটাতে হয়েছে। আত্মগোপন করে থাকতে থাকতে সারাদিন চোখের জলে প্রার্থনা করেছি।
“হে, প্রভু অসহায় নিরীহ মানুষগুলোকে রক্ষা কর। কেমন যেন মনে হয়েছে, ঈশ্বরই ধর্ষিত হচ্ছেন ।তিনি আবার নির্যাতিত হলেন দুর্বৃত্তদের হাতে। ক্রুশবিদ্ধ করা হল তাঁকে। রক্ত ঝরে পড়ছে তাঁর সর্বাঙ্গ দিয়ে। অপরিসীম বেদনায় সহ্য করছেন সমস্ত নিপীড়ন”, একথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
গোটা প্রার্থনা ঘরে তখন নিঃসীম নীরবতা। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি বললাম, “ফাদার আপনি আবার উপাসনা, পাঠ শুরু করুন। গীর্জার ঘন্টা বেজে উঠুক। মোমবাতির আলোয় ঘুচে যাক সব অন্ধকার। কাল রবিবার। প্রভুর দিন। যে মানুষগুলো এখনো এ শহরে বেঁচেবর্তে আছে, তাদের মানসিক শান্তির প্রয়োজন। তাদের হতাশা — দুঃখ থেকে পরিত্রাণ করতে পারেন একমাত্র মুক্তিদাতা ঈশ্বর। আপনিই পারেন তাদের সে পথ দেখাতে।”
—”ঠিক ,ঠিক। ঠিক বলেছ।আমাকে করতেই হবে এ কাজ। ঈশ্বর আমাকে সেজন্যেই এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমি কাল ভোরবেলা উঠে সব প্রস্ততি সেরে ফেলব।”
রবিবারের সকাল। গীর্জার দরজা উন্মুক্ত সবার জন্যে। যীশুর মূর্তির পায়ের তলায় মোমবাতি জ্বলছে। ফুলের স্তবক দিয়ে সাজানো হয়েছে মা মেরী আর তাঁর পুত্রকে। গীর্জার ঘন্টা ধ্বনিত হচ্ছে বারেবারে। ফাদার ব্যস্তসমস্ত হয়ে পায়চারি করছেন। অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছেন ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোর জন্যে।
কিন্তু একি? এরা কারা? প্রার্থনাসভায় অর্ধ উলঙ্গ নারীর দল! অপমানিতা-ধর্ষিতা নারীদের ক্ষুব্ধ চাহনি যেন আমাদের বিদ্ধ করে ফেলবে। রক্তাক্ত শিশুরা যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আর্তনাদ করছে। লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। পিছমোড়া করা, মুখে কাপড় বাঁধা কত কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধ গোঙাতে গোঙাতে ভরিয়ে ফেলেছে গোটা গীর্জা। তাদের বুকে পিঠে বুলেটের ক্ষত দিয়ে রক্ত ঝরছে! মুহূর্তের মধ্যে চার্চের শান্তিপ্রিয় পরিবেশ যেন এক ভয়াবহ রক্তাক্ত দৃশ্যে পরিণত হল। এই অত্যাচারিত, অগণিত আবালবৃদ্ধবনিতা কোথায় ছিল? কাতারে কাতারে এই মানুষগুলো কিভাবে পৌঁছল এখানে? আমরা তো গীর্জার প্রধান দরজা দিয়ে এক জনকেও ঢুকতে দেখিনি! ফাদার চিৎকার করে বলছেন, “হা ঈশ্বর, এই তো দুবছর আগে ঐ বাচ্ছাটা জন্মাল, ওর নামকরণ করলাম আমি বোডাস্কা। ব্যাপটাইজ করলাম ওকে। এমন নিষ্পাপ শিশুর এমন দুর্দশা কি করে করল পিশাচের দল! আর ঐ যে নীলনয়না সুন্দরী মিলা! মাত্র ছ-মাস আগে ওর বিয়ে দিলাম আমি। দুধসাদা কনের পোশাকে কি সুন্দর যে লাগছিল ওকে! কি দুর্দশা হল ওর”, কপালে করাঘাত করে বললেন ফাদার।
“ঐ ছেলেটার নাম ইভান। কি সুন্দর কণ্ঠস্বর ওর। প্রতিবার বড়দিনে ক্যারল গেয়ে কত হাততালি পায়! ঐতো বোডানকো, ফ্যাদে, কুজমা, নাদিয়া, অ্যানা, আন্দ্রিয়ে… এদের সবাইকে চিনি আমি। এরা সব্বাই কি মরে গেছে! এমন অদ্ভুত চাউনিতে চেয়ে আছে কেন আমার দিকে? কি চায় ওরা আমার কাছে? এ কি কান্ড ঘটে গেল!” বলতে বলতে ফাদার জ্ঞান হারালেন। আমারও তারপরে আর কিচ্ছু মনে নেই।
সম্বিত ফিরতে দেখি, দুজনে পাশাপাশি হাসপাতালের দুটি বেডে শুয়ে আছি। শহরের মেয়র এসেছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। ফাদার ল্যাকসান্দ্রা হাতজোড় করে বিনতি করলেন মেয়রকে, “স্যর,শহরের অলিতে গলিতে, পরিত্যক্ত বাড়িতে এখনো কত মৃতদেহের সংস্কার হয়নি। আপনি আর একটু উদ্যোগ নিয়ে সে শবদেহগুলির খোঁজ করুন। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের কবরস্থ করব। বাইবেল পাঠ করে তাদের অন্তিমসংস্কার করব। মন্ত্রপূত জল ছড়িয়ে ঐ অভিশপ্ত, মৃত মানুষগুলির শান্তি কামনা করব। আমার যে এখন অনেক অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে।” এ কথা বলে হাসপাতালের শয্যা ছেড়ে উঠে, হাঁটতে শুরু করলেন ঋজু, ধর্মপ্রাণ মানুষটি। তাঁকে বাধা দেবে, সে স্পর্ধা কারোর ছিল না।
আমি জানলা দিয়ে দেখলাম দীর্ঘদেহী ফাদারের শরীর আরো লম্বা হতে হতে যেন আকাশ ছুঁতে যাচ্ছে।
খুব সুন্দর অন্য রকম বেদনায় ভরা
ধন্যবাদ। খুব খুশি হলাম ????