১৯৮৬ সালে এই সাক্ষাৎকারটি নেন শৈলজারঞ্জন-এর ছাত্র রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুবিনয় রায়
প্রশ্ন : শৈলজাদা, আপনার মুখ থেকে রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে এবং সেই সঙ্গে শান্তিনিকেতন ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানা কথা শোনার জন্য আমরা সকলেই খুবই উৎসুক— এবং এটা স্বাভাবিক।
আচ্ছা, আপনি তো শান্তিনিকেতনে প্রথমে রসায়ণ-শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবেই নিযুক্ত হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে যাবার আগে রসায়ণ-শাস্ত্রে আপনার শিক্ষা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমরা আপনার কাছে আগেই কিছু কিছু শুনেছিলাম। কিন্তু তা অনেকের কাছেই অজানা। এ-সম্পর্কে আপনি যদি কিছু বলেন, খুব ভাল হয়।
উত্তর : একেবারে শেষের দিকের কথা বলছি। কলকাতা সায়েন্স কলেজের কথা। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি এস সি পাশ করে পিওর কেমিস্ট্রিতে এম এস সির জন্য সায়েন্স কলেজে ভর্তি হই। অর্গানিক কেমিস্ট্রি আমার স্পেশ্যাল পেপার ছিল। ডঃ পি সি মিত্র. ডঃ এইচ কে সেন পড়াতেন, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও পড়াতেন। কলকাতায় একটা মেস-এ থাকতাম। তখন আমি এস্রাজ শিখতাম। এস্রাজ শেখাটা আরম্ভ হয়েছিল গৌরীপুরের ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বাড়িতে। বরিশালের নামকরা এস্রাজী শীতল মুখার্জি শেখাতেন। ব্রজেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে আমাদের বাড়ির খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওই বাড়িতে যাওয়া আসা করতাম। কর্তাবাবু ঘাড়ে ধরে বসিয়ে দিতেন এস্রাজ শিখতে। এ সম্পর্কে একটা মজার ঘটনা আছে। মেস-এ দুজন থাকার মত একটি ঘরে থাকতাম।
রুম-মেট গানের ধারে কাছে যেত না। ও গিয়ে নালিশ করত সুপারিনটেণ্ডেন্ট-এর কাছে যে ওর পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। ডঃ বিধুভূষণ রায় ছিলেন সুপারিনটেণ্ডেন্ট। একদিন আমাকে ডেকে বললেন— “তোমাকে একটা কড়া কথা বলতে এসেছি। তোমার এ মেসে আর থাকা হবে না। তোমাকে তিন দিন সময় দিলাম তুমি অন্যত্র সরে পড়।” পরদিন ১০টার সময় বিজ্ঞান কলেজে গেলাম। স্যার পি সি রায় আমাকে দেখলেই কাছে ডাকতেন। আমি একটু মোটা হচ্ছিলাম, তাই গাল টিপতেন এবং বলতেন যে আমি ‘well-fed’। স্যার পি সি রায় আমাকে দেখে বললেন, “তোকে কেন এরকম লাগছে রে? তোর কী হয়েছে?” আমি বললাম, “আমার তো হয়ে গেছে। আমাকে মেস ছেড়ে দিতে হচ্ছে।” তিনি বললেন — কেন? আমি বললাম “আমি এস্রাজ বাজাই, তাই।” তিনি বললেন, “কি, গুপীযন্ত্র? তাতে কি? তবলা তো বাজাস না, তবলার সঙ্গে অবলার কনেকশন।” পরের দিন সুপার মশাই এসে বললেন, “তোমাকে ছেড়ে দিতে আমাদের ইচ্ছে নেই। তুমি থেকেই যাও। তবে গোলমাল, হৈ-চৈ করে তোমার রুম-মেট বা মেস-এর অন্যদের বিরক্ত কোরো না। আমার ধারণা, স্যার পি সি রায় সুপার মশাইকে ও মেস-এর অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে ‘টিপে’ দিয়েছিলেন। ওঁদের দয়ামায়া ছিল খুবই। সকলকেই ভালবাসতেন এবং আমাকেও। এটা আমার ছাত্রজীবনে একটি উজ্জ্বল ঘটনা। স্যার পি সি রায় ডঃ এইচ এক কে সেন প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসেছি, ওঁদের কাছে পড়েছি এবং পরে গবেষণাও করেছি। আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনাও করেছি কিছুদিন। পিতার আদেশে ‘আইন’ পড়বার জন্য ঢুকতে হল ল’ কলেজে। শুনে স্যার পি সি রায় তো একেবারে ‘তেলে বেগুন’ হয়ে গিয়েছিলেন। বলতেন, ‘আইন? ওটা তো বেশ্যাবৃত্তি’ — এতই খাপ্পা ছিলেন আই সম্পর্কে। ল’ পাশ করে বাবাকে সন্তুষ্ট করেছিলাম। মাস তিনেক ওকালতিও করলাম। কপালে ছিল নানা ঘাটের জল খাওয়া। পরে কোনোটাই টিকল না, হয়ে গেলাম ‘গানের মাস্টার’। ওই সময়ে কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে মেস-এ থাকতাম; সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ পাড়ায় ঘুরে বেড়াতাম, সমাজের উপাসনায় যোগ দিতাম — উৎসবেও যেতাম। ১১ই মাঘ ঠাকুর বাড়ির উপাসনায় জোড়াসাঁকোয় যেতাম।

প্রশ্ন : শান্তিনিকেতন শিক্ষাভবন (কলেজ)-এ রসায়ন অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে দিনেন্দ্রনাথ ও স্বয়ং কবিগুরুর কাছে আপনার গান বাজনা শেখাও তো চলেছিল। সেই সময়কার কথা কিছু বলুন।
উত্তর : ১৯৩২-এর মার্চ মাসে অতিথি হিসাবে যখন শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম, সেই সময়েই দিনেন্দ্রনাথের কাছে ভাল করে গান শিখেছিলাম. তখন ‘নবীন’-এর রিহার্সাল চলছিল। আমার বন্ধু প্রভাতচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন অর্থনীতির অধ্যাপক। উনিই আমাকে দিনেন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। দিনেন্দ্রনাথের ক্লাস-এ তখন শান্তিদেব, রামকিঙ্কর, রমা চক্রবর্তী, সুধীর কর— এঁরা সকলেই যেতেন শিখতে। আমাকে দিনেন্দ্রনাথ কলকাতাতেই চিনতেন। ঠাকুরবাড়িতে যাওয়া-আসা করতাম, সেই সূত্রেই চেনা। সৌম্যর দলে আমাকে দেখেছিলেন। দিনদা, ওখানে ওঁর কাছে তিনটে গান শিখেছিলাম— ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’, ‘দিনের বেলা বাঁশী তোমার’ এবং আরো একটা, কী ভুলে গেছি। আমার আত্মীয়া ‘কুইনী’ (অমলা রায়চৌধুরী) ছিলেন আশ্রমে, সেই সূত্রেই আমাকে চিনতেন দিনদা ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। গুরুদেব শান্তিনিকেতনে আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘কলকাতায় গাইয়ে এসেছে, কবে এসেছ, কবে যাবে?’ বলতেন, ‘তুমি থেকে যাও, গান শিখিয়ে দেব।’ থেকে গেলাম কিছুদিন। ‘নবীন’ ও ‘শাপমোচন’-এর রিহার্সাল চলছিল। ৭ দিনে ১৪টা গান শিখলাম। তারপরে পিরে গেলাম নেত্রকোণায় ওকালতি করতে। এর মধ্যে, অল্পদিন পরেই শান্তিনিকেতনের রসায়নের অধ্যাপক কাজে ইস্তফা দিলেন। দিনদা প্রভাত গুপ্তকে বললেন, ‘শৈলজাকে লিখে দাও কেমিস্ট্রি প্রফেসরের পদ খালি হয়েছে, চলে আসুক, গানও শিখতে পারবে।’ রবীন্দ্রনাথের আহ্বান এবং রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার লোভ— দুই মিলিয়ে ‘শ্যামের বাঁশি’র মতন মনে হল আমার। চলে গেলাম। ১৯৩২ সালের ১ জুলাই কাজে যোগ দিলাম।
‘বর্ষামঙ্গল’-এর রিহার্সাল তখন চলছিল। সেখানেও গেলাম। কিন্তু সেখানে একদিন দিনেন্দ্রনাথকে বললাম, দিনদা, এবারকার মত আমাকে মুক্তি দিন। এবারে আমি গানও করব না, এসরাজও বাজাব না। শ্রোতাদের মধ্যে বসে শুনব। পরের বার থেকে নিশ্চয়ই যোগ দেব। এক মঙ্গলবার সাহিত্যসভার এক বর্ষার গানের অধিবেশনে দিনদা আমাকে দিয়ে ‘গগনে গগনে আপনার মনে’ গানটি একক গাওয়ালেন। ওখানে সাধারণত সব অনুষ্ঠানে মেয়েরাই একক গান করতেন। তাই পুরুষকণ্ঠে গান শুনেই সবাই চমকে তাকালেন। অনুষ্ঠান শেষ বেরিয়ে এসেই নুটুদি (রমা কর)-এর সঙ্গে দেখা। উনি আমাকে বললেন— ‘মেরে দিয়েছেন গো, মেরে দিয়েছেন।’ সেই আমার প্রথম একক গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা। তার পরে প্রতি সন্ধ্যায় প্রভাত গুপ্তর সঙ্গে দল বেঁধে গুরুদেবের কাছে আড্ডা দিতে যেতাম। এর কিছুদিন পরে দিনদা কলকাতায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তারপর থেকেই গুরুদেব আমাকে যেন একটু বেশী টানতে লাগলেন। আমাকে সেই সময় বলেছিলেন — ‘তোমার গান কিরকম চলছে? তুমি তো গানের টানেই আমার কাছে এসেছ। নইলে, তোমার যা গুণ, তোমার তো এখানে আসার কথা নয়, এখানে ভবিষ্যত কী আর আছে?’ শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললুম, ‘গান আমার থেমে গেছে।’ কবি বললেন, ‘কেন’? বললুম, ‘ছোটদের ক্লাসে গেলে ছোটরা সরে বসে।’ তখন কবি বললেন, ‘না, তুমি আমার কাছে এসো গান শিখতে।’ সেই সময় অশেষবাবুও (অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়) আমার সঙ্গে যেতেন গুরুদেবের কাছে গান শিখতে। এইভাবেই আরম্ভ হল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ যোগাযোগ। ক্রমে ক্রমে গান শেখানোর সঙ্গে গান রচনা করে স্বরলিপি তৈরী করতে দিতেন আমাকে। এ-ব্যাপারে অর্থাৎ স্বরলিপি তৈরী করার ব্যাপারে বলি। শান্তিনিকেতনে যাবার আগেই, কলকাতায় আমার কাকা চারু চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি দেখে অর্গান-এ গান তুলে আমাদের গান করাতেন। কাকার কোনো ফরমাল ট্রেনিং ছিল না স্বরলিপিতে, অথচ আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর এ ব্যাপারে। শান্তিনিকেতনে এসে দিনদাকে দেখলাম কী যেন লিখছেন হাতের ‘কর’ গুণে গুণে। সুধীর করকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম — গুরুদেবের গানের স্বরলিপি তৈরী হচ্ছে। ঐ দেখে আমারও স্বরলিপি তৈরী করার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা এলো। সুবীর কর তখন দপ্তরে কাজ করেন। তাঁকে দিয়েই স্বরলিপি তৈরী শিখবার ইচ্ছা দিনদার কাছে জানালাম। দিনদা সুধীরবাবুকে দিয়ে বলে পাঠালেন— ‘একটু ভেবে-চিন্তে এগোতে বোলো। এ জিনিস সকলের হয় না, আর হলেও সহজে হয় না।’ সেই সময়ে হেমেনবাবুর (হেমেন্দ্রলাল রায়) কাছে ‘ক্লাসিক্যাল’ গান শিখি। স্বরজ্ঞান, তালজ্ঞান ইত্যাদি তখন মোটামুটি হয়েছে। জানা গানের স্বরলিপি দেখে দেখে ‘মন মন উপবনে’ গানটির একটি স্বরলিপি খাড়া করে দিনদার কাছে নিয়ে গেলাম। দিনদা তো সেটা দেখে চিৎকার করে বলে উঠলেন — “করেছ কি? এ তো খুব ভাল হয়েছে। তুমি এটা ‘প্রবাসী’তে দিয়ে দাও ছাপতে।” এই প্রথম আমার করা স্বরলিপি ছাপা হল (১৯৩৪ সালে)। তারপর থেকে যখনই গান শিখতে যেতাম গুরুদেবের কাছে, তখনই সঙ্গে সঙ্গে নোটেশন করে ফেলতাম। গুরুদেব বলতেন, ‘অন্যরা গান শেখে, আর শৈলজা গানের টাইপরাইটিং করে।’

প্রশ্ন : রসায়ন শাস্ত্রকে কেন্দ্র করেই আপনার সঙ্গে আমার ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্কটি গড়ে উঠেছিল। ক্রমে ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেও সেই গুরু-শিষ্য সম্পর্ক স্থায়ী ও ব্যাপক রূপ নিয়েছে। কিন্তু এখন জানতে ইচ্ছা করে, রসায়নের প্রতি আপনার সেই পুরোনো অনুরাগ এখনো কি মাঝে মাঝে আপনার মনকে নাড়া দেয়? Chemical Elements. Compounds বা Acidimetry/ Alkalimetry — এ সব কি এখনো মাঝে মাঝে আপনার মনে একটা Nostalgia র ভাব আনে? Inorganic বা Physical Chemistry-র বই-এর পাতাগুলো এখনো মাঝে-মধ্যে উল্টে পাল্টে দেখেন কি?
উত্তর : সত্যি কথা বলতে গেলে উল্টেপাল্টে দেখা আর হয় না। কিন্তু আমার মনের মধ্য একটু-আধটু তোলপাড় হয়, তবে সেটা রসায়নের জন্য নয়, আমার শিক্ষাগুরু যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অকৃপণ স্নেহ, ভালবাসা ও দরদের কথা মনে আসে প্রায়ই এবং সেই সব চিন্তায় মজে যাই, ডুবে যাই। কিন্তু আইন যে পড়েছি, বা ওকালতি করেছি, সে-কথা একেবারেই মনে পড়ে না। সেকথা আমার মনে দাগ কাটেনি মোটেই। এখনো সায়েন্স কলেজের পিওর কেমিস্ট্রি বিভাগের ছাত্র পুনর্মিলন সভায় আমাকে মাঝে মাঝে ধরে নিয়ে যায় — ওরা খবর রাখে আমি প্রথম ব্যাচ-এ পাশ করেছিলাম এম.এস.সি ১৯২৪ সালে। শান্তিনিকেতনে গুরুদেব আমাকে বলতেন— “যদি তোমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি কী পড়াও, তুমি উত্তরে ‘মিশিয়ে’ বলবে ‘musical chemistry’ অথবা ‘Chemical Music’.

শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রশ্ন : এবারে পুরোপুরি সংগীতের প্রসঙ্গে আসি। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতের শিক্ষা, রাগ-রাগিণির পরিচয় ইত্যাদি আপনি কবে, কোথায় এবং কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন?
উত্তর : শান্তিনিকেতনেই। এর আগে আমি এ সম্পর্কে কখনো খেয়ালও করিনি। এটা ঘটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথই। এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনিই আমাকে সচেতন করিয়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন। জোর করে আমাকে এবং আরো অনেককেই তিনি ঝেঁটিয়ে হেমেন্দ্রলাল রায়-এর ক্লাসে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় সকলে বলত, রবীন্দ্রসংগীত ousted হয়ে গেছে। একে একে সকলেই পালিয়ে গিয়েছিল হেমেনদার ক্লাস থেকে। শেষ পর্যন্ত আমিই টিকে গেলাম — কিন্তু সেটা রবীন্দ্রসংগীতের জন্যই। তুমি জান বোধ হয় আমি তবলাও শিখেছিলাম (বলে ঢিমে একতালার তবলার বোল মুখে বলে শোনালেন)। একদিন তবলচি পাওয়া যাচ্ছিল না, আমি গুরুদেবের সামনেই অনুষ্ঠানে তবলা বাজিয়েছি।
প্রশ্ন : আপনি তো গোড়া থেকেই তানপুরা ও এস্রাজ নিয়ে সংগীত চর্চা করেছিলেন এবং রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায় আপনি এ-দুটি অনুষঙ্গ-যন্ত্রই ব্যবহার করে থাকেন। আচ্ছা, এস্রাজ বাদন আপনি কোথায় এবং কার কাছে শিক্ষা পেয়েছিলেন?
উত্তর : শীতল মুখার্জির কাছে শিখেছি কলকাতাতেই। কলকাতাতেই আমার গোড়াপত্তন সব কিছুতেই। সে সব তো আগেই বলেছি।
প্রশ্ন : শান্তিনিকেতনে পাঠক্রম অনুযায়ী রবীন্দ্রসংগীতের ধারাবাহিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গোড়া থেকেই তো আপনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। কীভাবে, এবং কবে থেকে সেখানে এই পাঠক্রম ভিক্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ডিগ্রী, ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেবার প্রথা চালু হয়েছিল? রবীন্দ্রনাথ নিজে ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে কতখানি জড়িত ছিলেন, বলবেন? ইন্দিরা দেবী, শুনেছি (এবং কিছুটা দেখেছি) এই অ্যাকাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ সক্রিয় অংশ নিদেন। একটু বলুন।
উত্তর : পরীক্ষা, সিলেবাস ইত্যাদি তো আমিই করলাম। ১৯৪০-এ শুরু হয়েছে। এবং রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণাতেই তা হয়েছে। ইন্দিরা দেবীকে প্রণেত্রী করেই আনা হয়েছিল। এবং আমাদের এই পাঠক্রম অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থায় উনি আমাকে যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন। স্বরলিপি শিক্ষা পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন উনিই। এবং এতে অনেকে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আমি গুরুদেবের কাছে গিয়ে এই কথা জানালাম। গুরুদেব বললেন, “সে কি? বাংলা ভাষা শিখতে গেলে অ, আ, ক, খ ও ব্যাকরণ তো শিখতে হবেই, সুতরাং তুমি জোর দিয়ে এটাকে চালু করবে।”
প্রশ্ন : শান্তিনিকেতনের বাইরে, ধরুন, এই কলকাতায় বা অন্যত্র, রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায়তনগুলিতে বহুদিন ধরেই পাঠক্রম অনুযায়ী ধারাবাহিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এবং এই সকল প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষালাভ করে বিভিন্ন যুগে বহু ছাত্র-ছাত্রী ও শিল্পী যথেষ্ট যোগ্যতা ও সুনাম অর্জন করে রবীন্দ্রসংগীত জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। নামী শিক্ষায়তনগুলি ও তাদের কর্মধারা যোগ্যতা সম্পর্কে আপনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আছেন, কেননা, আপনি এই সকল শিক্ষায়তনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন। রবীন্দ্রসংগীতের যথাযথ শিক্ষা ও তার প্রচার-প্রসারের কাজে এই সকল শিক্ষায়তনগুলি কতদূর সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এদের উন্নততর মান ও অধিকতর যোগ্যতা অর্জনের জন্য কী করণীয়, আপনার মতে?
উত্তর : আমি প্রথমেই বলি রবীন্দ্রসংগীতের কপাল ভালো। কেননা, রবীন্দ্রনাথের নামে দু’দুটো ইউনিভার্সিটি আছে। একটা রবীন্দ্রভারতী (রাজ্য সরকারের) এবং বিশ্বভারতী (কেন্দ্রীয় সরকারের)। এটা খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে যে তাদের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়।তবে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “নীড়ে শিক্ষা— তার একটা আলাদা মূল্য আছে।” আমি সেজন্য এখানকার (কলকাতার) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যখন যাই, তখন তাদের বলি — এখানে তো আশ্রম নেই— তাই তোমরা অন্তত ঋতু উৎসবগুলির আয়োজন কর— বিশেষ করে বর্ষামঙ্গল ও বসন্ত উৎসব। শুধু সিলেবাস অনুসরণ করা ও পরীক্ষা নেওয়া যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন : যাঁরা শান্তিনিকেতনে বা কলকাতায় থাকেন না, অথবা যাঁরা বহুকাল ধরে দেশ ছাড়া হয়ে বিলেত আমেরিকা প্রভৃতি দেশে বাস করছেন, তাঁদের অনেকেই তো ভারতীয় সংগীতের ও রবীন্দ্রনাথের গানের অত্যন্ত অনুরাগী এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পারদর্শীও বটে। রবীন্দ্র সংস্কৃতি ও রবীন্দ্র আদর্শ সম্পর্কে তাঁদের অনেকেই আগ্রহী ও আলোকপ্রাপ্ত। তাঁরা অনেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও অনুশীলন করেন। স্বরলিপি থেকে তাঁরা গানের সুর মোটামুটি ভালোই তুলতে পারেন। তাঁদের রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায় ও সাধনায় আমরা এখান থেকে কী উপায়ে এবং কতদূর সাহায্য করতে পারি?
উত্তর : ক্যাসেট বা রেকর্ড বিদেশে পাঠানোর দ্বারা সাহায্য হতে পারে। শুধু স্বরলিপি থেকে রবীন্দ্রসংগীতের গায়কী তো ঠিক আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। যথাযথভাএব গীত (সুর এবং গায়নভঙ্গীর বিশুদ্ধতা সম্পন্ন্) রেকর্ড বা ক্যাসেট যদি তাঁদের হাতে পৌঁছয় তাতে তাঁরা রবীন্দ্রসংগীতের ফুল প্রুফ চেহারাটির সঙ্গে পরিচিত হবেন। সুতরাং রেকর্ড, ক্যাসেট এবং স্বরলিপি— এই তিনের সমন্বয়ে প্রবাসী শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথের গানের সঠিক গীতরূপটি ধরতে পারবেন। অবশ্যই এগুলি অথেন্টিক হওয়া চাই।

প্রশ্ন : আজকাল রেডিও, টিভিতে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশন ও তার প্রচার কি আপনি নিয়মিত শোনেন? শুনে আপনার কী মনে হয়? ভাল ও মন্দ— দু দিকই বিচার করে কিছু বলুন।
উত্তর : রেডিও প্রোগ্রাম ও অনুষ্ঠান (কিছু কিছু) তো আমি অনেকদিন ধরেই শুনি। তার মধ্যে আমি যে সুর শিখেছি, বা জানি, সে রকম কেউ গাইলে ভালো লাগে, কারণ, সেগুলি অথেন্টিক বলে জানি। অন্যরকম শুনলে ভালো লাগে, না, কারণ, এটা তো ঠিকই যে রবীন্দ্রনাথের গান যথাযথভাবেই গাওয়া উচিত। কথাটা সাধারণভাবেই বললাম।
প্রশ্ন : রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্যান্য গানের নামী শিল্পীরা— যাঁরা রাগসংগীতে, বাংলা কাব্যধর্মী গানে বা কীর্তনে সাধনার মাধ্যমে ও নিজগুণে যথেষ্ট পারদর্শিতা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, তাঁদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশন ও প্রচার সম্পর্কে আপনি কি উৎসাহী বা আগ্রহী? কী উপায়ে তাঁদের মতন গুণী শিল্পীদের রবীন্দ্রসংগীতে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা সুনির্দেশ দেওয়া যায়?
উত্তর : যিনি শিখবেন বা করবেন, তাঁর রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে শ্রদ্ধা, আগ্রহ ও সদিচ্ছাই সবচেয় বড় কথা। খাঁটি জিনিসকে ঠিকমত নেবার purity of mind যাঁদের আছে, তাঁরাই সঠিকভাবে আয়ত্ত করে গাইতে পারবেন। মূল সাঙ্গীতিক দক্ষতা ও গুণাবলী তো তাঁদের আছেই।
প্রশ্ন — আপনাদের মতন আদর্শ শিক্ষাগুরুদের অবর্তমানে রবীন্দ্রসংগীতের সঠিক সুর এবং বিশুদ্ধ বা প্রামাণ্য গায়ন-পদ্ধতি ভবিষ্যতকালের ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের জন্য কী উপায়ে সংরক্ষণ করা যাবে— এ সম্পর্কে নিশ্চয়ই চিন্তা করেছেন?
উত্তর : সুযোগ্য শিক্ষক ও শিল্পীদের গাওয়া রেকর্ড ও ক্যাসেট এবং তার সঙ্গে স্বরলিপি— এ সবের দ্বারাই এটা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
প্রশ্ন : শোনা যাচ্ছে যে আগামী ১৯৯১ সালের পর থেকে রবীন্দ্রসংগীতের সুরের ‘কপিরাইট’ (বা ঐ ধরনের কিছু অধিকার) আর থাকবে না। তার মানে, সুরের প্রামাণ্যতা বা authenticity বলে আর কিছু থাকবে না। তাতে কি এই বোঝায় যে গুরুদেবের গানগুলি যে-কেউ নিজের ইচ্ছামত সুরে গাইতে পারবেন? এ ব্যাপারটি আমাদের কাছে ঠিক পরিষ্কার হচ্ছে না। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড কি এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কিছু ব্যবস্থা করছেন? আপনি নিজেই বা এ সম্পর্কে কী মনে করেন?
উত্তর : এটার জন্য আমি খুব একটা চিন্তিত নই। সৎ-প্রচেষ্টার দ্বারা এই মহান শিল্প সৃষ্টিকে ঠিকভাবেই বাঁচিয়ে রাখা যাবে। খাঁটি জিনিসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সৎ ব্যক্তির ও সৎ প্রচেষ্টার অভাব কখনোই হবে না— এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রশ্ন : একটা টেকনিক্যাল কথা জিজ্ঞেস করি। রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষায়, বিশেষ করে তার পরিবেশনে হারমোনিয়াম যন্ত্রটি তো খুবই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আজকাল। হারমোনিয়াম শ্রুতি-মীড়বিহীন যন্ত্র, সন্দেহ নেই। তবে আগেকার দিনের (ধরুন, রবীন্দ্রনাথের যুগের) তুলনায় আজকাল যে উন্নতমানের হারমোনিয়াম তৈরী হচ্ছে, তার আওয়াজের উৎকৃষ্টতা, মাধুর্য ও মসৃণতা বিচার করে রবীন্দ্রসংগীতে এই উন্নতমানের হারমোনিয়ামের ব্যবহার সম্পর্কে আপনার সুচিন্তিত মতামত একটু বলবেন?
উত্তর : আমি হারমোনিয়ামের ‘পোকা’ ছিলাম। শান্তিনিকেতনে দেখলাম হারমোনিয়াম নেই। তাই আমি হারমোনিয়ামকে জীর্ণ বস্ত্রের মত ত্যাগ করলাম। আমার এস্রাজ বাজানো জানাই ছিল। সুতরাং আমার কোনোই অসুবিধা হয়নি।আর গুরুদেবও বলতেন, “এস্রাজ ছাড়া তোমাকে মানায় না।” গুরুদেব আমাকে একটি সারেঙ্গীও কিনে দিয়েছিলেন, আজও আছে সেটি। এখনকার হারমোনিয়ামের উন্নতমানের উৎকৃষ্ট ও মসৃণ আওয়াজের আবিষ্কারকে আমি অভিনন্দন জানাই। শ্রুতি ও মীড়বিহীন হারমোনিয়াম যন্ত্রে কবির গানের melody flowটা বাধা প্রাপ্ত হয়। শিল্পী নিজ ক্ষমতায় সেই বাধা উত্তরণ করবেন— এটাই কাম্য।
প্রশ্ন : ভারতীয় কণ্ঠসংগীতে তানপুরা ও হারমোনিয়াম-এর দোষ গুণ সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ও বিপ্লবী সঙ্গীত শাস্ত্রবিদ কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘গীতসূত্রসার’ গ্রন্থে একাধিক স্থানে তানপুরার ব্যবহার একেবারেই অনুমোদন করেননি। তানপুরা ব্যবহারে গলায় জোয়ারীর আধিক্য ঘটে বলে, এবং অন্যান্য কারণে গলায় ‘গোল’, ‘সুমিষ্ট’ ও ‘নিটোল’ আওয়াজ অর্জন করার জন্য কৃষ্ণধনবাবু সুরেলা ভাল হারমোনিয়ামের ব্যবহারই অনুমোদন করেছেন। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য শুনতে চাই।
উত্তর : হ্যাঁ, আমি এগুলি সবই পড়েছি। কিন্তু আমি এগুলি তেমন ভালো বুঝি না। এ সম্পর্কে আমার কিছু বলা উচিত নয়। তবে আমি তো হারমোনিয়াম তানপুরা উভয়ই ব্যবহার করেছি।
প্রশ্ন : আপনার কাছ থেকে সবেশেষে — ‘Last but not the least’ — জানতে চাই রবীন্দ্রসংগীতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত কী? শিল্পে, সাহিত্যে, সংগীতে বিবর্তনে কি আপনি বিশ্বাসী? সে যাই হোক, আজ থেকে, ধরুন, পঞ্চাশ-ষাট বছর পরে রবীন্দ্রসংগীতের সুর ও গায়নভঙ্গী স্বাভাবিক নিয়মেই কিছু কিছু বদলে যাবে কি? নাকি ‘ক্লাসিক’ হিসাবে সযত্নে সংরক্ষিত হয়ে থাকবে? আপনি কী মনে করেন, কোনটি হওয়া উচিত?
উত্তর : এ বিষয়ে কবির উক্তি, ‘আমার কবিতা বা গান আমার মত করে কোরো।’ এটি একজনের সৃষ্টি — ক্লাসিকাল গানের মত অনেক ঘরানার মিশ্রণ নয়। শেক্সপীয়ার, মিল্টন, গ্যেটে প্রভৃতি মনীষীদের সৃষ্টির মতই ‘ক্লাসিক’ সৃষ্টি হিসাবেই রবীন্দ্রসংগীত বিশুদ্ধভাবে বেঁচে থাকবে — বুদ্ধিমান, সৎ ও সংস্কৃতিবান মানুষের কাছে।