রামশরণ তার বাপু রামপরসাদকে শীতকালে দেখেছে সত্তুকা ভুরকুন্ডা খেতে। কাঁচা পেঁয়াজ, নুন, তেল দিয়ে মায়ের হাতে ছাতু মাখা খেয়ে হিন্দমোটরের কারখানা যেত বাপুজী। সে কারখানা বন্ধ পড়ে রইল কতকাল! সংসারের পেট চালাতে বাপু অন্য ধান্ধা শুরু করল।
গরমের দিনে বেচত সত্তুকা শরবত আর শীতের সন্ধ্যেয় সত্তুকা লিট্টি আর চোখা। ঠেলায় নতুন মাটির ঘড়ায় জল, পেলাসটিকের ডাব্বায় কালানমক, ভুনা হুয়া জীরা আর ধনিয়া পাত্তি। কাঠের ঘুঁটনা দিয়ে ঘোঁটা, মশলাদেওয়া সত্তু-পানি গরমে গেলাস গেলাস উড়ে যেত ছেলেদের ইসকুলের সামনে, বাজারে, খেলার মাঠে।

শীতে রামপরসাদের মা ঢিমি ঢিমি কাঠকয়লার আগুনে নিজে হাতে বানাত আচারের মশলা দিয়ে সত্তু ভরকে লিট্টি। আলু-বেগুন-টম্যাটর কা চোখা। মা’জীর হাতে বানানো গরম গরম লিট্টি নিমেষে খতম হয়ে যেত তাদের বস্তিতেই। বাপুকে আর এদিক-সেদিক যেতে হত না।

রামপরসাদ নিজে এখন বাজারে সত্তুকা দুকান দিয়েছে। তার দোকানে ছোলার ছাতু, যবের ছাতু ছাড়াও ছোলাভাজা, মুড়ি, চিঁড়েভাজা, বাতাসা সব পাওয়া যায়। ছাতুর শরবতের উপকারিতা জেনেছে বাঙালিও। রামপরসাদের এখন অনেক বাঙালি খরিদ্দার। গরমের দিনে তার দোকানে বিক্রি হয় যবের ছাতুও। এক বুড়া মাস্টারমশাই এসে হার সাল লিয়ে যান যবের ছাতু, মুড়কি, গুড়। চৈত সংক্রান্তিতে তাদের ঠাকুরের ভোগ লাগানো হয় যবের ছাতু, গুড়, মুড়কি আর দই দিয়ে। সে পরসাদ মাথায় ঠেকিয়ে খেয়েছে রামশরণ। মাস্টারমশাই খাইয়েছে। বড় সোয়াদ তার। মাস্টারমশাই কত পড়ালিখা। তিনিই বলেছেন যব বা যো’ই হল এই দুনিয়ার প্রথম আনাজ। তাই বোধহয় তাদের গাঁওয়ে চৈত নবরাত্রিতে দুর্গার থানে যো বোয়া হয়। মাটির সরায়। ভক্তদের জল পেয়ে ন-দিনে তারা বেড়ে ওঠে। তারপর তাকে ঠান্ডা করা হয় নদীর জলে। কোনো কোনো বছর নবীন কিশলয় ন-দিনে লকলকিয়ে বাড়ে। সরল গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে, সেবছর অন্নপূর্ণা কৃপা করবেন। ফসল ভালো হবে। অন্যথা হলে বিপদের আশঙ্কা করে। কি জানি, মাতাজী কেন রুষ্ট হলেন!

যবের ছাতুর তাই বোধহয় এত মাহাত্ম্য! মাস্টারমশাই রামশরণের দোকান থেকে পোয়াটাক ছাতু কিনে প্রতিবছর বলতে বলতে ঘরে যান, — “শত্রুর মুখে দিয়া ছাই / ছাতু উড়াইয়া ঘরে যাই”।
হার সাল শুনে শুনে রামশরণের সে ছড়া এখন কণ্ঠস্থ হয়ে গেছে।
দেশগাঁওয়ের কথা বলতে বলতে মাস্টারমশাই কেমন উদাস হয়ে যান। মেয়েবৌরা নাকি এসময় ঢেঁকিতে পার লাগাত। সে শব্দে ছিল উৎসবের আমেজ। যব কুটে শুদ্ধ ছাতুর ভোগ লাগানো হত গাঁও দেবতাকে।

মাস্টারের এক বহিনভি ছিল। সে সংক্রান্তির দিনে নাহাধো’কে ভাইয়ার কপালে তিলক করত। অনেকটা রাখি বা ভাইদুঝের মত। তারপর তার হাতে তুলে দিত মিঠাই, সত্যুকা প্রসাদ। বছরের শেষ সূর্যকে সাক্ষী করে গোধূলি বেলায় ভাইবোন মিলে রাস্তার চারমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছাতু উড়িয়ে ছড়া আওড়াত। পুরনো বছরের যত রোগবালাই, দুঃখকষ্ট সব যেন উড়ে যায় চৈতি হাওয়ায়। রাত পোহালেই নয়া সাল আসবে। সব শুভ শুভ হবে।
এখন আর এসব কিছুই নেই। শুধুমাত্র নিয়মরক্ষা। এক’থা বলতে বলতে বুড়া মাস্টার ধুতির খোঁটে চোখ মোছে। রামশরণ মাস্টারের একাকিত্ব, মুলুক ছেড়ে আসার কষ্ট অনুভব করে। অশিক্ষিত বিহারী ছাতুওয়ালা কেমন করে জানি বাঙালি শিক্ষকের সুখদুঃখের ভাগীদার হয়ে যায়!
এমন অপূর্ব করে জীবনের পরতে পরতে ভালোবাসা মিশিয়ে হিন্দিরাজ্যের শুখা গ্রামের অজানা তথ্য কথা মানুষের আদি অকৃত্রিম আবেগে সিঞ্চিত করে পরিবেশন আমাকে বার বার বিভূতিভূষন আর বুদ্ধদেব গুহকে মনে করয়ে দেয়।
অনবদ্য…!!!
এমন পাঠপ্রতিক্রিয়ায় পুলকিত হই ❤️