আমি কি বাঙালি? আমাকে ঘিরে এই প্রশ্নে ‘বিদ্বজন’দের অনেককেই হামেশাই হোঁচট খেতে হয়। ‘কী লিখবো, কেন লিখবো, কিভাবে লিখবো’ শীর্ষক বিষয়ের উপর গত ৯ এপ্রিল বহরমপুর শহরের ২৬ শ্রীশচন্দ্র নন্দী রোডের ‘কস্তুরী অ্যাপার্টমেন্ট’-এ শেখ মফেজুল সম্পাদিত ‘চাতক’ পত্রিকার পক্ষ থেকে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অনেকের সঙ্গে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাদের আলি। তিনি আবার ‘কবি’ও। ‘কবি’, কারণ, তাঁর ছাপানো গ্রন্থ আছে। ৩৩ বছর ধরে তিনি ও আমি পরস্পরের পরিচিত। ৩৩ বছরে তিনি কখনও আমার নাম নিয়ে জিজ্ঞাসা করার অবকাশ পাননি। লোকজন আছে দেখে আমার নাম নিয়ে সবার সামনে জানতে তাঁর বড় ইচ্ছা জাগে। নাকি আমাকে হেটো করতে?
তিনি একা নন, ‘অনল’ ও ‘আবেদিন’ নিয়ে, এই জাতীয় বিড়ম্বনায় আমাকে হামেশাই অনেকের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এটি আসলে জন্মলগ্ন থেকে উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্গের বাঙালিদের অসুস্থ সংস্কৃতিরজাত বিষয়। বাঙালিয়ানা ও বাংলা নববর্ষও তাই এপার বঙ্গে আজও কীটদষ্ট। ওপার বঙ্গেও বঙ্গসংস্কৃতি নিয়ে অসুস্থতা কম নেই। তবে ভাষাশহিদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে রূপান্তরিত করা বাংলাদেশের বঙ্গসংস্কৃতির শত্রুরা এপার বাংলার মতো অবাধে চরে বেড়াতে পারে না। সেখানে রাজাকার-আলবদরদের মতো বাংলার জাতশত্রুদের বর্তমান প্রজন্মকে পদে পদে কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হয়।
আমার নামটি হজরত মহম্মদের নাতির ছেলের নাম জয়নাল আবেদিনের বদলে অনল আবেদিন কেন? ‘অনল’— সংস্কৃত থেকে আগত এই শব্দটি আজ বাংলা শব্দভাণ্ডারের সম্পদ। আবার ‘আবেদিন’ শব্দটিও আরবি থেকে আগত হলেও তা আজ বাংলা শব্দই। ফলে নামবিচারে আমি ‘বাঙালি’, নাকি ‘হিন্দু’? এই ‘গূঢ়’ প্রশ্নে হিন্দু ও মুসলমানের অনেকেই হামেশাই ভাবিত হয়ে পড়েন। এমনকি, নাম বিচারে আমি ‘যথেষ্ট মুসলমান’ নয় বলে রাষ্ট্রায়াত্ব একটি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মতো মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান ‘অ্যাডভান্স’ নিয়েও আমাকে ঘরভাড়া দেননি। কংগ্রেস ঘরাণার ওই ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের মতো বাম ঘরাণার এক হিন্দু, পেশায় স্কুলশিক্ষক আমি ‘বাঙালি’ না হওয়ায় আমার মতো সাতপুরুষের বঙ্গভাষিকে ঘরভাড়া দেননি। তিনি অবশ্য বছরের পর বছর ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিম্দু-মুসলমান’ পড়ান। জল ও পানি দুটি শব্দের আতুরঘর সংস্কৃত হওয়া সত্ত্বেও ‘জলপানি’ নিয়ে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর একুশ শতকেও ছুঁচিবাইগ্রস্থতা কাটেনি। ফলে সেই জাতির বঙ্গভাষি হিন্দু-মুসলমানের ‘অনল’ ও ‘আবেদিন’ নিয়ে স্পর্শদোষ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাঙালির ঘরে ঘরে, যুগ যুগ ধরে লক্ষ্মী বিবি, মেনকা খাতুন পালিত হলেও, এমনকি অভিনেতা নাসিরুদ্দিনের মতোই মোঘলদের কাছ থেকে খোদ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পারিবারিক পদবি ‘শাহ’ প্রাপ্তি সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক শব্দবাতিক আজও কাটেনি। এই চালচিত্রটি আলোচনার নেপথ্যে রাখলে আজকের বাঙালিসত্ত্বার অনুসন্ধান কিছুটা সহজ হবে, বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের হদিশও হয়তো মিলবে।

বাংলার পাল রাজারা (৭৫০-১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। পরধর্মসহিষ্ণু এই রাজাদের রাজত্বে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মাচরণ করা ছিল অবাধ ও স্বাধীন। তার পরে এল কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজাদের আমল (১০৯৫-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)। সংস্কৃতভাষী এই মনুবাদী সেনরাজাদের আমলে বাংলাভাষার আদিরূপ চর্যাপদ, বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও অঙ্কুরসদৃশ বাঙালি জাতি চরম রাজরোষের পীড়নের কবলে পড়ে। তু্র্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপ জয়ের মাধ্যমে বাংলা দখলের সূত্রপাত করেন। তখন থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত ৫৫৩ বৎসর ধরে সুবে বাংলা, অর্থাৎ বাংলা, বিহার ও উড়িস্যা শাসন করেন খলজি ও সুলতান-সহ বিভিন্ন বংশের মুসলমান রাজা-বাদশা-সুলতান-নবাবরা। এই শাসনকালে সুবে বাংলার শাসকরা কখনও দিল্লির বাদশাহের অধীনে ছিলেন, কখনও দিল্লির নিয়ন্ত্রণমুক্ত অবস্থায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছেন। এই পর্বে মুসলমান শাসনের ডামাডোলের প্রথম একশো বছর বাদ দিলে পরবর্তী সময়ে বিশেষত সুলতানি আমলে বাঙালি জাতি, বঙ্গসংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিপুল উন্নতি হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে ওই সময়টা ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। নবজাগরণের যুগ।
ওই যুগের বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যান আরাকান রাজসভা ও সুবে বাংলার মুসলমান রাজা-সুলতানদের আদরলালিত হিন্দু ও মুসলমান কবি-সাহিত্যিকেরা। ওই কালপর্বে আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) চৈতন্য মহাপ্রভূর আবির্ভাব ও সুলতানি সহায়তায় তাঁর ভাব আন্দোলন বাংলার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সাফল্যের চরম সীমায় পৌঁছে দেয়। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের মৃত্যুর ৩৭ বছর পর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির বাদশাহি মসনদে বসেন সম্রাট আকবর। তখন রাজকর্ম সম্পন্ন হতো আরবি হিজরি সন মোতাবেক। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ প্রাণ বাঁচাতে সদলবলে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে চলে গিয়ে মদিনায় আশ্রয় নেন। সেই সময়টিকে হিজরি অব্দের সূচনাবর্ষ ধরা হয়। চান্দ্র মাসের কারণে হিজরি সনের সময়সীমা অনির্দিষ্ট ও অনিশ্চিত। এ ছাড়াও তখন ইরানি, পারসিক ও হিন্দু পঞ্জিকা চালু ছিল। তার ফলে রাজস্ব সংগ্রহ- সহ বিভিন্ন রাজকাজে অসুবিধা দেখা দেয়। সেই সমস্যা সমাধানের জন্য আকবরের নিযুক্ত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ও বিভিন্ন পণ্ডিত মিলে নয়া সৌর পঞ্জিকার জন্ম দেন আকবরের রাজ্যভিষেকের ২৮ বছর পর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে। সেটিই আজকের বঙ্গাব্দ।
১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের রাজ্যাভিষেকের সময়টা ছিল ৯৬৩ হিজরি অব্দ। আকবরের রাজ্যাভিষককে বঙ্গাব্দের শূন্যবর্ষ ধরে তার সঙ্গে মহম্মদের মদিনা গমনের হিজরি অব্দ জুড়ে দিয়ে বঙ্গাব্দের জন্ম হয়। সেই হিসাবে আজ ১৫ এপ্রিল ১৪৩০ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। হিজরি সনের সঙ্গে যুক্ত করে জন্ম দেওয়া বঙ্গাব্দের সূচনা বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল থেকে। পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ ১৫ এপ্রিল থেকে। অমর্ত্য সেনের ‘ইন্ডিয়া থ্রু ইটস ক্যালেন্ডারস’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে ইতিহাস ভিত্তক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কিন্তু সেই সত্য মানতে নারাজ সঙ্ঘ অনুগামী একটি অর্বাচীন সংগঠন। নাম ‘বঙ্গীয় সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদ’। ২০১৯ সালে জন্ম নেওয়া ওই সংগঠনের দাবি, “ষষ্ঠ শতকের শেষ দশকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজা ও গৌড়ের শাসক শশাঙ্ক নিজের শাসনকালের সূচনাকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য বর্ষপঞ্জি হিসাবে বঙ্গাব্দের সূচনা করেন।” (১০.৪.২০২৩ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকা)।
বিভেদজীবীদের এই অনৈতহাসিক দাবি ইতিহাসের যুক্তিতথ্যের কষ্ঠিপাথরে নস্যাৎ করে দিয়েছেন জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক রণবীর চক্রবর্তী। রাজা শশাঙ্ক তাঁর রাজত্বকালে তাম্রশাসনে অন্তত পাঁচটি নিষ্কর সম্পত্তি দান করেছিলেন। রণবীরের বক্তব্য, “তিনি যদি বঙ্গাব্দ জারি করেই থাকবেন, তাহলে তো এই দানে সেই অব্দের উল্লেখ থাকত! কিন্তু কোথাও তা নেই। এমনকি তাঁর অধীনস্থ রাজাদের ভূসম্পদ দানের ক্ষেত্রেও গুপ্তাব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে কোনও প্রবীণ পেশাদার ইতিহাসবিদ শশাঙ্কের সময় থেকে বঙ্গাব্দের সূচনার কথা লেখেননি। তবু অনেক দিন থেকেই কেউ কেউ এটা বলার চেষ্টা করছেন। ওঁরা সূর্যসিদ্ধান্ত নামে এক প্রাচীন গ্রন্থের ভিত্তিতে এই দাবি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শশাঙ্কের রাজত্বকালের সঙ্গে সূর্যসিদ্ধান্ত বইটির সময়কালের মিল নেই। সুতরাং এ দাবি অমূলক।” (১০.৪.২০২৩ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকা)।
কে শোনে ইতিহাসের এই পাথুরে প্রমাণ। আসলে বিদ্বেষজীবীদের জন্মই তো বিভেদ সৃষ্টির এক ও একমাত্র এজেন্ডার গর্ভে। ‘বাঙালির জাতীয় উৎসব’ হিসাবে অধ্ঢ়াপক ইমানুল হকদের ‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’ ২৫ বছর ধরে কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করছে। সংবিধান প্রণেতা বাবা সাহেব আম্বদকর থেকে শুরু করে জালিওয়ানাওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, পান্তাভাত-শুটকি মাছ, সঙ্গীত-নৃত্য-কবিতা, অর্থাৎ ধর্মীয় অনুসঙ্গ বাদ দিয়ে বাঙালিয়ানার প্রায় সবই থাকে সেই উদযাপনে। এবারের ২৫তম বছরের পয়লা বৈশাখের সেই উদযাপনস্থলে, খোল-করতাল সহযোগে, রাজা শশাঙ্ক বঙ্গাব্দ চালু করেছে বলে দাবি করে ‘হুজ্জুৎ’- এর আয়োজন করেছে সঙ্ঘ অনুগামী ‘বঙ্গীয় সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদ’। ধর্মীয় অনুসঙ্গবর্জিত বাঙালির জাতীয় উৎসব হিসাবে নয়, রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসাবে হিন্দুত্ববাদী নববর্ষ উদযাপন করাই ওই পরিষদের উদ্দেশ্য। অখণ্ড বাঙালি সত্ত্বার জন্ম হতে না দেওয়াই তাদেরআসল কাজ, বঙ্গভঙ্গের মূল হোতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভাবশিষ্যদের।
এই বিভেদজীবীদের এটাই আসল লক্ষ্য। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিসংস্কৃতি অনুসারী জাতিসত্ত্বাকে আতুঘরেরই গলাটিপে মেরে ফেলার উৎকট প্রয়াস শুরু হয়েছিল হাজার বছর আগে, মনুবাদী বল্লাল সেন-লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বে। তারপর খলজি, সুলতান, দাস ও মোগল শাসনের আমলে বাংলাভাষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য-সঙ্গীত প্রাণ ফিরে পায়। ১৭৯৩ সালে ইংরেজ শাসক লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত জমিদারির কুখ্যাত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও সিপাহি বিদ্রোহ দমনকারী ইংরেজদের প্রবল সমর্থক ছিলেন কবি ও ‘সংবাদ প্রভাকর’ সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও ‘আনন্দমঠ’: প্রণেতা সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়দের মতো ব্রিটিশপুষ্ট অনেকে। সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃতি অনুসারী ও মুসলমান বিদ্বেষী লেখক ও রাজনীতিবিদদের মদতে তাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি ফুলে ফেঁপে ওঠে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ফারসি, আরবি, উর্দু ও হিন্দুস্থানী শব্দ মিশ্রিত কথ্য বাংলাভাষাকে বিদায় দিয়ে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মদতে বানানো হয় সংস্কৃতভাষা অনুগামী নয়া বাংলাভাষা। এই এজেন্ডায় বিদ্যাসাগরও সামিল ছিলেন। হিন্দুধর্ম আশ্রিত ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি তুলে ও গীতা ছুঁয়ে ইংরেজ বিতাড়নের শপথ নেওয়ার পন্থা চালু হওয়ায় অখণ্ড বাংলার মুসলমান ধর্মাবলম্বী আধেক বাঙালির মনে দূরত্ব রচিত হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তুরস্কের খিলাফত আন্দোলনের মতো ধর্মাশ্রয়ী আন্দোলন জুড়ে দিয়ে মহাত্মা গাঁধি ভারতের মাটিতে রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের মিশেলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
বাঙালি জাতির অতিনগন্য অংশ, যাঁরা ব্রাহ্মণ্যবাদ অনুসারী বর্ণবাদী ও উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত, তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনে সমাজের অতিক্ষুদ্র অংশের ধর্ম সংস্কার করেন। তাকে সখ করে নাম দেওয়া হয় বাংলার নবজাগরণ। বাংলার রেনেশাঁস। এটা যে কতটা ভণ্ডামি তার আজও দগদগে প্রমাণ মেলে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের রবিবাসরীয় পাতায় পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপনে জাতপাতের ৩৬ কিস্তি আহ্লাদি দাবিদাওয়াতেই। বিধবাবিবাহ চালু, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্যপ্রথা রদ এবং নারীর সম্পত্তির অধিকারের দাবি-সহ উনিশশতকে হিন্দুধর্মের যেসব সংস্কার শুরু হয়, যার সবগুলোই প্রায় ১৩০০ বছর আগেই আরবমুলুকের মরুপ্রান্তরে নয়া ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ সমাধা করেছেন। গরিব, দলিত ও নিন্মবিত্তের হিন্দু ও মুসলমানকে তাই ছুঁতে পারেনি জলঅচল কালচারে পুষ্ট ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আহ্লাদের ওই রেনেশাঁস।
ফলে উচ্চবর্গের ও উচ্চবিত্তের নগন্য সংখ্যক হিন্দুদের প্রয়োজনে সংঘটিত ধর্মসংস্কার, যা নবজাগরণ নামাঙ্কিত, তা বাঙালি মুসলমানদের আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই ভাষা, খাদ্যাভাস, দু-পোশাক ও লৌকিক আচারে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান প্রায় এক হওয়া সত্ত্বেও তেলেজলে মিলমিশ না হওয়ার মতো অবস্থানে রয়েগেল। দুধে ছানা কেটে ছাড়া ছাড়া অবস্থায় থাকার মতো বাঙালি সত্ত্বা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে রয়েগেল বঙ্গভাষি হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের নামে। তার মূল দায় কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ের উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্গের। হিন্দুপক্ষের সেই দায়ের হোতা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র। সেকথা আগেই বলা হয়েছে। তার পরবর্তী কালে একই রকম দায়ের জন্ম দিয়েছে বাংলার উচ্চবিত্ত মুসলিম অংশ।
ইসলাম ধর্মে জাতিগত উচ্চ-নীচ ভাগ না থাকলেও ভারতের মাটিতে মুসলমানরা আশরাফ ও আতরাফ শ্রেণিতে বিভক্ত সেই কয়েকশো বছর আগে থেকে। রাজভাষা প্রথমে ফারসি ও পরে উর্দু-ইংরেজিতে সমৃদ্ধ ও বাংলাভাষার প্রতি উন্নাসিক অভিজাত উচ্চবিত্ত মুসলমানরা আশরাফ। আর হতদরিদ্র, বঙ্গভাষি কৃষিজীবী ও মাঝিমাল্লা পেশার মুসলমানরা আতরাফ। কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরাই বঙ্গভাষি মুসলমানদের অবাঙালি বলে দেগে দেয়নি, আশরাফ মুসলমানরাও বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে একদা অসম্মত ছিল। বাংলার মুসলমানের শিক্ষার মাধ্যম হবে কোন ভাষা? এই প্রশ্নে ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশনের কাছে ফরিদপুরের নবাব আব্দুল লতিফ উর্দুর পক্ষে সওয়াল করেন। (তাঁর নবাবি ছিল না। বিদ্যা চর্চার কারণে ইংরেজরা তাঁকে সাম্মানিক নবাব উপাধি দেয়।) আব্দুল লতিফ, এ কে ফজলুল হক, সারওয়ারদি পরিবার- সহ বাংলার অভিজাত মুসলমানরা পরিবারেও বাংলাভাষা ব্যবহার করতেন না। এই প্রবাহের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ, অথবা পরোক্ষ প্রতিবাদে সরব হয়েছেন কুমিল্লার নবাব ফৈজুন্নেশা চৌধুরী, রোকেয়া সাখওয়াত হোসেন, মির মোশারফ হোসেন, কবি জসিমুদ্দিন এবং কাজি নজরুল ইসলাম, ‘শিখা’ পত্রিকা গোষ্ঠী প্রমুখ।
মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা আদায়ে কেবল আধুনিক যুগেই নয়, বঙ্গভাষি মুসলমান কবিরা সেই মধ্যযুগ থেকেই ঘরে-বাইরে জেহাদ জারি রেখেছিলেন। চট্টোগ্রামের কবি সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দ) আরবির বদলে বাংলাভাষায় হজরত মহম্মদের সাত আশমান পরিক্রমা (সবে মিরাজ) লিখে মুনাফেক (ভণ্ড) হিসাবে গালিগালাজ পেয়ে থাকেন। ১৫৮৬ সালে প্রতিবাদী কবির প্রতিক্রিয়া, “যারে যেই ভাষে প্রভু করিলেন সৃজন/ সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন।” সপ্তদশ শতকের কবি আব্দুল হাকিমের প্রতিবাদের সুর আরও চড়া। তিনি লেখেন, “যে জন বঙ্গেতে জন্ম হিংসে বঙ্গবাণী/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির স্বাধিকার আদায়ে মুসলিম ধর্মীয় মৌলবাদকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন মধ্যযুগের আর এক কবি মুজাম্মিল। তিনি লেখেন, “আরব ভাষায় লোঁকে না বুঝি কারণ।/ সভানে বুঝিতে কৈলুঁ পয়ার বচন।।/ যে বলে বলৌক লোকে করিলুঁ লিখন।/ ভাল মন্দ মদ ন যাএ খণ্ডন।।/ রচিলেক মুজাম্মিলে পাঞ্চালি সুছন্দ।/ দেশি ভাষে রচিলুং মাঝে মৃদু মন্দ।।”
মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাঙালি মুসলমান কবিদের একাংশের শত শত বছরের প্রাচীন এই সুমহান জেহাদের ঐতিহ্য তথাকথিত সেক্যুলার ও নবজাগরণের ‘পথিকৃৎ’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়দের মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী লেখকদের হৃদয়মন্দিরে, বিদ্বেষজীবী মগজের অভ্যন্তরে সাড়া জাগাতে পারেনি। তাই বঙ্গভাষি মুসলমানরা তাঁদের লেখায় বাঙালি হতে পারেনি, বিদেশি মুসলমানই থেকে গিয়েছেন। তাঁর ভাষণে তিনি সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়কে ধর্ষক হিসাবে দেগে দিতেও কসুর করেননি। সেই খণ্ডিত বাঙালি সত্ত্বার উত্তরাধিকার সূত্রে, সংবিধানগত ভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভবনে প্রথম প্রবেশের সময় হিন্দুরীতি মেনে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেন। সংসদ থেকে বেরিয়ে গঙ্গাতীরে রাজকীয় তর্পন করেন। আর আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের আধেকের কম (মুসলমান ও আদিবাসী বাদ দিলে) জনসংখ্যার ধর্মীয় আচরণ দুর্গাপুজোকে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব বলে দাগিয়ে দেন। তার জন্য সরকারি ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। এর চেয়ে মিথ্যা আর কী হতে পারে!
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ইমাম-মোয়াজ্জিম-পুরোহিত ভাতা বিলোবে কেন? কেনইবা রাষ্ট্র ধর্মীয় তীর্থভ্রমণ ও হজের জন্য ভর্তুকি দেবে? কেনই বা পুজোর নামে ক্লাবগুলোকে খয়রাতি দেওয়া হবে? মন্দির-মসজিদ-গির্জা-গুরুদুয়ারা নির্মাণ করা রাষ্ট্রের কাজ নয়। ধর্মাচারণ তো ব্যক্তিগত বিষয়। ভোটের সময় কোনও কোনও বিরোধী দলকে বাংলায় ‘বহিরাগত’ বলে বাঙালি অষ্মিতা ভাঙিয়ে ভোট চাইবে, আর পয়লা বৈশাখকে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হিসাবে সরকারি ভাবে পালন করবে না। এর মতো দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি খুব কমই আছে। অথচ পদ্মাপারের বাংলাদেশ? বিশ্বের মোট বাঙালি জনসংখ্যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশের রাষ্ট্র বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাংলা নববর্ষের আলোচনা অসম্ভব এবং অবাস্তবও।
মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধানে নবীন রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ আখ্যা দেওয়া হয়। শেখ মুজিবরের বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রধর্ম ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রধান হন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশে সংবিধান সংশোধন করেন। সেই সংশোধনীতে সংবিধান শুরু হয় কোরানের আয়াত ”বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ (দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি) দিয়ে। ১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেন। সব দেশের মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও পরমতসহিষ্ণুদের কাছে এটা একটা হৃদয়বিদরক ঘটনা। সেই দুঃখ জয়ের অন্যতম প্রক্রিয়ার সংবাদও শুনিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশ।
সংবিধানগত ভাবে বাংলাদেশকে ইসলামিকরণের প্রতিবাদে ঢাকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী, লেখক, সাহিত্যিক ও বিদ্বজন সমাজের অনেকে ইসলামি রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮৯ সালের পয়লা বৈশাখ বর্ষবরণের নামে আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু করেন। পরে তার নাম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ক্রমে সেই ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রা আজ বাংলাদেশের ও সেদেশের বাঙালির রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। তা আজ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। সেই বিবর্তনের ইতিহাস খুঁজতে যেতে হবে ৮৬ বছর আগের ১৯৩৭ সালে। ওই বছর মুসলিম লিগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে ভারতবর্ষের মুসলমানদের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’@, অর্থাৎ যোগাযোগের ভাষা হিসাবে উর্দুকে তুলে ধরা হয়। এ কে ফজলুল হকের তীব্র প্রতিবাদে ওই পরিকল্পনা তখনের মতো ভেস্তে যায়।
১৯৪৭ সালের ১৪ অগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্থানের জন্ম হলে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাকিস্তান জন্মের ১৬ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ‘তমুদ্দিন মজলিস’ নামে সংগঠন গড়েন। তার এক মাস পর ১ অক্টোবর তমুদ্দিন মজলিস সভা ডাকে। সেই সভায় বাংলা ভাষার পক্ষে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রতিবাদসভা করা হয় ও পাকশাহির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। তার পর ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক প্রতিবাদ, রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ, নজরুলের ‘আমরা গড়িব মহাশ্মশান’ বাতিল করে লেখা হয় ‘আমরা গড়িব গোরস্থান’। এই সন স্বৈরাচারী তুঘলকি কাণ্ড, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মাহুতির বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম– এসব সবার জানা ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের, মুক্তিযুদ্ধের এবং ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র রক্তক্ষয়ী-মরণপণ লড়াই-সংগ্রামের সরণি বেয়েই পদ্মাপারের বঙ্গজীবনে পয়লা বৈশাখ এসেছে বর্ষবরণের মতো অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব।
গণআন্দোলনই এই ধারাবাহিকতাই পারে সাম্প্রদায়িক দাঙাবাজদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে। ২০২১ সালে কুমিল্লার নানুয়া দিঘি পুজো মণ্ডপে অষ্টমীর রাতে হনুমানের পায়ের উপর কুরান রেখে আমাদের দেশের বিদ্বেষজীবীদের ওদেশের সহোদর ভাই-বেরাদররা দাঙ্গা বাধাতে চেয়েছিল। গণমাধ্যয়মের দৌলতে সারাবিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশের সম্মিলিত শুভবোধ ও সেদেশের সংবাদমাধ্যম কী আন্তরিকতার সঙ্গে সেই নষ্টামির প্রতিরোধ করেছে। সেই প্রতিরোধের প্রতি অভিনন্দনের বদলে এই বহরমপুর শহরের একটি বিজ্ঞান বিষয়ের পত্রিকার সম্পাদক, তথা এক প্রাবন্ধিককে দেখেছি ওই সংকটকালে এদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উসকানোর জন্য ফেসবুকে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে ‘জাগাও পথিককে সে যে ঘুমে অচেতন’ ও ‘ঘুম ভাঙুক এবার’ জাতীয় বিদ্বেষবাণী বিতরণ করতে।
সেই ‘বিজ্ঞানসাধক’ই কয়েক দিন আগে হানাদার মারাঠি বর্গিদলের হোতা ভাস্কর পণ্ডিতকে ‘নায়ক’ শব্দে অভিহিত করে তাঁর হৃদকম্দের সযত্নে লালিত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবিষের পরিচয় ব্যক্ত করেছেন। সেই মারাঠা লুঠেরাদের আক্রমণে লাখ লাখ বাঙালির জান ও মাল নিকেশ হয়েছে। সেই নিষ্ঠুরতার আভাষ মেলে ছেলে ভুলানো ছড়ায়— “ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গীবএল দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেন কিসে?” শোলে সিনেমার লুঠেরানগব্বর সিং সদৃশ এই ভাস্কর পণ্ডিত মনুবাদীদেরন ভাষ্যে ‘নায়ক’ বনে যায়। এটা বিচ্ছিন্ন কোনও ব্যক্তি বিশেষের মনোভঙ্গি নয়। এটা মনুবাদী টোলের সার্বিক শিক্ষা উপজাত। তাই বিনাদোষে এদেশের সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ও প্রাণ হরহামেশাই বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিলেও ওই ‘বিজ্ঞানসাধক’রা নীরবে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন।
বিপরীতে আজ দেখি পদ্মাপারের সংগ্রামী বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাষ্ট্রীয় উৎসব বাংলা নববর্ষ, অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ এবং মূদ্রার নাম টাকা। মৌলবাদী মুসলমানদের হুমকিকে মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ওপার বাংলা আগের মতোই গতকাল ১৪ এপ্রিল, পয়লা বৈশাখ সারাদেশকে রং-বাহারি আলপনা, রংবাহারি মুখোশ, দেবদারু-আমপাতা আর নকশাকাটা রঙিন কাগজে মুড়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-বাউল-ভাটিয়ালিতে ভাসিয়ে দিয়েছে নদীনালা অজনপ্রান্তর। সেই মহোৎসবে সংযোজন পান্তাভাত, শুটকি মাছ, আলুপোস্ত, ইলিশভাজা, আমপোড়া ও ছাতুর সরবত, বাতাসা, মিষ্টান্ন, হালখাতা — আরও কত আয়োজন!

তাই সাবঅলটার্ন ইতিহাস চর্চার অন্যতম পুরোধা অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী অতি সহজেই বলতে পারেন, ‘সংবাদ ও সাংস্কৃতিক মাধ্যমের বাংলা ভাষার মধ্যে এখনও আঞ্চলিক বাংলা প্রান্তিক হয়ে থাকে। আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি-অবাঙালি মুসলমানরা আজও আমাদের ভোটব্যাঙ্ক না দেশের শত্রু, রাজনৈতিক বিতণ্ডা এখনও সেই বিতর্কের বাইরে বেরোতে পারে না।…জাতি হিসাবে ওঁরা (বাংলাদেশিরা) বাঙালি হবেন, না আরও বৃহত্তর অর্থে বাংলাদেশি হবেন, এই নিয়ে ওঁরা সোৎসাহে তর্কে মাতেন। পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির তথা পশ্চিমবঙ্গবাসীর আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি আজবরাজনূতির আঙুনায় অবজ্ঞাত, অবহেলিত।” (১৫.৪.২০২৩ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকা)।
ফলে ঈদ ও রোজার মতো অনেক ধরণের ধর্মীয় বিষয়কে শিকেয় তুলে রেখে ৯০ শতাংশ মুসলমানের ইসলামি রাষ্ট্র বাংলাদেশ বর্ষবরণকে বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত করতে পেরেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো মিশ্র ধর্মসম্প্রদায়ের রাজ্যে, আহ্লাদ করে সাংস্কৃতিক শহর বলে ডাকা কলকাতাকে কেবল ইমানুল হকদের মতো জনাকয়েক মানুষকেই কেন বর্ষবরণ নিয়ে তনছট করতে হয়? ব্রাহ্মণ্যবাদই কি তবে পয়লা বৈশাখকে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হতে বাধ সাজছে, রাবনপুত্র ইন্দ্রজিতের মতো মেঘের আড়াল থেকে? হাজার বছরের পুরনো বল্লাল সেন- লক্ষ্মণ সেন নামক মনুবাদী অচলায়তন পাহাড়ই কি আজও পালের গোদা?
অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি মনুবাদীদের রাহুগ্রাসে এই একুশ শতকেও কতটা আক্রান্ত তার অজস্র উদাহরণের মধ্যে মাত্র একটি তুলে ধরব। অখণ্ড বাংলায় জন্ম নেওয়া একটি বাংলা পত্রিকা শতবর্ষ পূর্ণ করেছে ২০২২ সালে। সেই শতবর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ওই প্রকাশনা সংস্থা গত বছর একটি বৃহাদাকার উপন্যাস সংকলন প্রকাশ করেছে। তাতে ঠাঁই পায়নি বিশ্বের মোট বঙ্গভাষিদের তিন ভাগের দু ভাগের বাঙালি মুসলমানের লেখা কোনও উপন্যাস। সেই গ্রন্থে লেখক, চিত্রশিল্পী ও সম্পাদক মিলিয়ে পুরো তালিকায় একজনও বাঙালি মুসলমান জায়গা পায়নি। বসু, মজুমদার, বন্দ্যোপাধ্যায়, চৌধুরী, সেন, ঘোষ ও গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বামুন-কায়েত-বদ্দ্যিদেরই ভিড় সেখানে। এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার দিকে আঙুল তুললে বর্ণবাদী ও বর্গবাদীরা সমস্বরে প্রশ্নকর্তাকেই সাম্প্রদায়িক হিসাবে দাগিয়ে দিতে প্রাণপাত করতে বিলম্ব করবে না। চোরের মায়ের বড় গলা কিনা।
এরকম পরিস্থিতে ধর্মসংস্কৃতি ও ধান্দাবাজির রাজনীতি বর্জিত বর্ষবরণের মতো সর্বজনীন উৎসব ছাড়া বাঙালি সংস্কৃতির গতি নেই! হিন্দু-মুসলমানের এই যৌথ সাধনার বিকল্প নেই। সেই যৌথ সাধনায় মগ্ন ছিলেন লালন ফকির, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্ষিতিমোহন সেন, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক অনেক বাঙালি। সেই পথেই আছে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব, বর্ষবরণের চাবিকাঠি। প্রায় চতবর্ষ আগে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির উদ্দেশ্যে ডাক দিয়েছিলেন, “ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো…।” শতবর্ষ পরেও বিশ্বমানবের সেই আহ্বান কি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছে? নইলে কীসের নববর্ষ!