| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নন্দিনী অধিকারীর ছোটগল্প ‘ফোন ভুবন’

Reporter
নন্দিনী অধিকারী / ৯৯৮ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৩

“নমস্কার, আমি কি বিনীতা বসুর সঙ্গে কথা বলছি?”

ফোন নম্বরটা আগে থেকেই সেভড্ ছিল। সময়টাও জানা ছিল। তাই কণ্ঠস্বর অপরিচিত হলেও বুঝতে অসুবিধে হয়নি বিনীতার।

“নমস্কার। আমি বিনীতা বসুই বলছি”।

“সুপ্রভাত ম্যাডাম। আমি সুমিত মিত্র। আশিস আপনাকে আমার কথা নিশ্চয়ই আগে বলে রেখেছে। ব্রীফ করতে পেরেছে তো পুরোটাই?”

আশিস অবশ্য সবটাই আগে বলে রেখেছিল। সেইমত সুমিত মিত্রের ফোনটা এল ঠিক সকাল এগারোটায়। বিনীতা অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু একেবারে নিরুদ্বেগ ছিল, একথা জোর করে বলা যায় না।

সুমিত মিত্রের কণ্ঠস্বরটিতে কোনো বিশেষত্ব নেই। তবে পরিষ্কার, মার্জিত উচ্চারণ। সামান্য কথাতেই ভদ্রতা প্রকাশ পায়।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ আশিস বলেছে। তবে…….”, কুন্ঠা যায়নি বিনীতার।

একটু কি নার্ভাস লাগছে তার? কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা আনার চেষ্টা করল বিনীতা। প্রায় কুড়ি বছর ধরে কেদারনাথ বিদ্যামন্দিরে ইংরিজী পড়াচ্ছে সে। কত ছাত্র, অভিভাবক, কলিগদের সঙ্গে তার প্রতিদিনের কথোপকথন। অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলায় তার তো এরকম ঘাবড়ে যাবার কথা নয়!

যদিও ফোনালাপের এমন অদ্ভুত প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে বিনীতা যথেষ্ট অবাক হয়েছিল। তার ইস্কুলের জুনিয়র সহকর্মী আশিসের তিনচারদিন আগে একটা ফোন আসে।

“দিদিভাই, কেমন আছেন?”

“ভালোই। কি ব্যাপার আশিস? এতদিন পরে দিদির হঠাৎ খোঁজ? ভাবছ করোনায় দিদিটা ওপরের টিকিট কাটল নাকি?”

“আরে না না। আমি জানি ভালো আছেন। আসলে আপনি ভালো থাকতে জানেন।”

“ভনিতা না করে আসল কথা বলো দেখি।”

“হ্যাঁ দিদি বলি, আপনি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?”

” কি উপকার আমাকে করতে হবে? আগে শুনি তো, সেটা কি!”

আশিসের এই ‘উপকারী কাজ’ ব্যাপারটা সত্যিই একটু অদ্ভুত লাগল বিনীতার। এক সম্পূর্ণ অপরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে নাকি ফোনালাপ করতে হবে! না, সেখানে কোনো সাধারণ বন্ধুত্বের আহ্বান নেই। প্রতিদিনের খুঁটিনাটি দরকারী অদরকারী কথার তো জায়গাই নেই।

সুমিত মিত্র একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকুরে। তিনি তাঁর পছন্দের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে চান একজন সমমনস্ক মানুষের সঙ্গে। স্ত্রী বা পুরুষ, সেসব নিয়ে অবশ্য তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই।

আশিসের কথায়, বিনীতা আর সুমিতের রুচি, পছন্দগুলি অনেকটা একরকম। তাই বিনীতাকেই বেছে নেওয়া। ভদ্রলোক বিনীতাকে এজন্যে সম্মানদক্ষিণা দেবেন। সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন কথা বললেই হবে। দিনে একঘন্টার বেশি নয়।

বিনীতার ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগলো। আজকাল লোকজনকে বিশ্বাস করাও যায় না। তবে আশিসের পরিচিত যখন….। একটু ভেবে, দোনোমনা নিয়ে বলল,

“এ কাজ তো তুমিই করতে পারতে ভাই, আমি কেন?”

“না দিদি, একাজের জন্যে তুমিই সবথেকে উপযুক্ত”।

“ভালো ঠাউরেছ আমায়। ঠিক আছে। ভাবতে দাও আমায় একটু। দেখি”—

“না না দেখিটেখি নয়। রাজি হয়ে যাও”।

“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি একেবারে নাছোড়!” বলে ফোন রেখে দিল বিনীতা।

লকডাউনের জেরে সর্বত্রই স্কুল বেশ কিছুদিন বন্ধ রয়েছে। কোথাও যাওয়াআসা নেই। তাই কারোর সঙ্গে দেখাসাক্ষাত হবার প্রশ্নই ওঠেনা। কাজের মেয়েটিও আসছে না। চারদেওয়ালের বন্ধঘরে দিনগত পাপক্ষয়। টিভিতে করোনার ভয়াবহ খবর শুনতে শুনতে বিনীতা যেন আজকাল মানসিক অবসাদের ভার বয়ে চলেছে। তাই কি দুটো কথা বলার লোভে বিনীতার একলা জীবন, ক্লান্ত মন এমন সায় দিল!

ছেলে বাপন উচ্চশিক্ষার্থে দু’বছর হল ইউ.এস-এ তে রয়েছে। তাকে এই অদ্ভুত প্রস্তাব এবং দ্বিধার কথা জানাতেই হো হো করে হেসে বলল, “কাম অন মা, এটা কোনো একটা ব্যাপার? জাস্ট চিল!”

সত্যিই তো একটা ছোট ব্যাপারে এত কিসের সংশয়? বিনীতার পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে ওঠাপড়া তো কম দেখেনি। সাতবছরের বিবাহিত জীবন ভেঙে গেছে কবেই। ছেলেকে একলা হাতেই প্রায় মানুষ করেছে। সেই ছেলে বাপন উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ চলে গেল। কতদিন হয়ে গেল, একলা জীবনের ভার তো নিজেকেই সামলাতে হয় তার।

বিনীতা শেষপর্যন্ত রাজি হল। আজকাল সপ্তাহে তিনদিন সকাল এগারোটায় কাজকর্ম, স্নানটান সেরে রেডি থাকে। প্রথমদিকে তার একটু আড়ষ্টতা ছিল। কিন্তু ক্রমশঃ সহজ হচ্ছে সে। হয়তো ফোনের ওপারের মানুষটার জন্যেই।

বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যায় তাদের কথাবার্তা। না, ব্যক্তিগত প্রশ্ন কখনোই করেন না ভদ্রলোক। বিনীতার মনে অনেক প্রশ্ন থাকলেও সে কৌতূহলের সীমানা কখনো পেরোয় না। কোনো কারণে ফোন করতে না পারলে একটা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করে জানিয়ে দেয় দুজনেই দুজনকে। ক্বচিৎ পছন্দের বইয়ের নাম বা সিনেমার লিঙ্ক শেয়ার করেন ভদ্রলোক। মাসের প্রথমে বিনীতার অ্যাকাউন্টে একটা নির্দিষ্ট টাকা মসৃণভাবে ঢুকে যায়। সেটা নিয়েও একটু কুণ্ঠা আছে বিনীতার।

ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাবার্তায় বিনীতা তাঁকে এইটুকু বুঝেছে তিনি একটু ঘরকুনো। কল্পনায় তিনি মানসভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিদেশী সিনেমা, সাহিত্য-সংগীত নিয়ে সুমিতের অগাধ কৌতূহল আর পড়াশোনা। তিনি যা পড়েন, যা বোঝেন, তাই নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন।

বিনীতার আবার অন্যতম শখ বেড়ানো। একা বা দলের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়ে।পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, মন্দির কোনো বাছবিচার নেই। এই তো করোনার প্রকোপ ছড়ানোর আগে সে গেছিল তামিলনাড়ুর চেট্টিনাড, তাঞ্জোরের রাজরাজেশ্বর মন্দির।

বিনীতা আশ্চর্য হল, ঐ অপরিচিত জায়গায় ঘুরে এসে বিনীতা যত না জেনেছে, সুমিত মিত্র বই পড়ে তার থেকে অনেক বেশি জানেন।

“চেট্টীনাডের কোন গ্রামে গেছিলেন ম্যাডাম? জানেন নিশ্চয়ই চেট্টিয়াররা হচ্ছে তামিলনাড়ুর এক বিজনেস কমিউনিটি। ‘চেট্টি’ শব্দ সংস্কৃত ‘শ্রেষ্ঠী’ শব্দের অপভ্রংশ। দক্ষিণ ভারতে তারা চোলরাজবংশের সময় থেকেই যথেষ্ট ধনী এবং প্রভাবশালী”।

“আপনি এত কি করে জানলেন? সত্যিই চেট্টিয়ারদের গ্রামের প্রাসাদগুলো দেখার মত। কি বিশাল, সুন্দর। এখন সেগুলো দু’একটা হেরিটেজ হোটেল হয়েছে। আমরা সেরকমই একটাতে ছিলাম”।

“হবেনা কেন? ওদের বিজনেস দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে, বিশেষতঃ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। সমুদ্র যাত্রায় পারদর্শী ছিল। আর ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কি জানেন, ভারতে ট্রেড ইউনিয়নের কনসেপ্ট চেট্টিয়াররাই প্রথম আনে”।

বিনীতা যত বিস্মিত হয় এসব কথা শুনে, ততই তার আগ্রহ বাড়ে নতুন নতুন বিষয়ের প্রতি। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসের বাইরে গিয়ে তার আবার পড়াশোনা করতে ভালো লাগছে। বই পড়ার অভ্যেস বাড়ছে। চিন্তার জগৎ প্রসারিত হচ্ছে। কাটছে একঘেয়েমির দিনগত অবসাদ।

এরইমধ্যে একদিন তাদের ফোন গরম হয়ে উঠল করোনা রাজনীতির তর্কবিতর্কে! তারপরে দুজনেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা কেমন যেন টিভির বিতর্কসভার মত হয়ে যাচ্ছে। এত উত্তেজনা! ফোন করার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। শেষে সুমিত হেসে বললেন, “আচ্ছা, আমরা এরকম পলিটিশিয়ানদের মত ঝগড়া করছি কেন?” সেদিনের মত রণে ভঙ্গ দিল দুজনেই।

এরকম অনেক বিষয়ে তাদের মতামত মেলেনা। প্রবল তর্ক হয়। আবার কোনোকোনো ব্যাপারে তাদের ভালোলাগা একেবারে মিলে যায়।

রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া এদের কারোরই দিন কাটেনা। বিনীতার পছন্দ কণিকার নরম, সুরেলা কণ্ঠ। সুমিতের কাছে সুচিত্রা মিত্রের গান খোলা হাওয়া। তবে জর্জ বিশ্বাস ছোটবেলা থেকেই দু’জনকেই এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছেন।

বিনীতা সিনেমার পোকা। হিন্দি, বাংলা পুরনো, নতুন সব ভালো ছবি দেখতে ভালোবাসে। একাই আইনক্স বা মাল্টিপ্লেক্সে চলে যায়। এখন ছেলের ব্যবস্থাপনায় ওটিটিতে দেখছে। সুমিত তাকে বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড সিনেমা, ক্লাসিক মুভির লিঙ্ক পাঠায়। বিনীতা অবাক হয়, কত ধরনের বিষয় নিয়ে সিনেমা হতে পারে! এইসব সিনেমার বিষয়, চরিত্র নিয়েও দিনের পর দিন আলোচনা চলতে থাকে।

বৃষ্টিভেজা একটি দিনে সুনীল-শক্তি জায়গা করে নিলেন তাদের আলাপচারিতায়। বিনীতা পড়ে,

“তোমাকে যখন দেখি/ তার

চেয়ে বেশি দেখি

যখন দেখি না।

শুকনো ফুলের মালা যে-রকম বলে দেয় সে এসেছে/

চড়ুই পাখিরা জানে

আমি কার প্রতীক্ষায় বসে আছি—”

সুমিতের নির্মেদ, স্পষ্ট উচ্চারণে উচ্চারিত হয়,

“আমার কাছে এখনো পড়ে আছে/

তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি/

কেমন করে তোরংগ আজ খোলো?/

থুতনিপরে তিল তো তোমার আছে/

এখন? ও মন নতুন দেশে যাবি?”

এরপর বিনীতার সারাদিনে কাব্যের জোয়ার। বহুদিন পরে বৃষ্টিধারার মত কবিতার আবেশে ভেসে গেল সে। শেষমেশ মেঘের গর্জন তাকে ফিরিয়ে আনল বাস্তবের মাটিতে। বিনীতা সম্বিত ফিরে পেল। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুঝি তার। এমন করে চিন্তার আদান প্রদান এর আগে কেন হয়নি কখনো?

কেন জানি বহুদিন আগে ভেঙে যাওয়া দাম্পত্য জীবনের কথা তার আবার মনে পড়ল। একটা ভুল বিয়ের শিকার হয়েছিল সে। সম্বন্ধ করে বিয়ে। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। প্রথম দিকটা ঠিকঠাক চললেও কোনো রোমান্স ছিল না সেখানে। উল্টে স্বামী রণজিতের মারধোর, অত্যাচার শুরু হল। অনেক কষ্টে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ভাগ্যিস চাকরিটা ছিল! বয়স কম ছিল বিনীতার তখন, তাই অনেকেই বিয়ের কথা বলেছিল। ছেলের কথা ভেবেই আর রাজি হয় নি। একটা রুটিন জীবন শুরু হল বিনীতার। স্কুল, সংসার আর ছেলে। কেমন যেন একটা কঠিন আবরণে নিজেকে মুড়ে ফেলল। বন্ধু বান্ধব ও তেমন ছিলনা। মা ছেলের বেড়াতে যাওয়াটাও তখন খুব সহজ ছিল না। বাপেরবাড়িও মুখ ফিরিয়ে নিল। ছাত্র-ছাত্রীরা অবশ্য প্রথম থেকে তাকে খুব ভালোবাসে। বিনীতাও নিজেকে উজাড় করে পড়ায় তাদের। সে খুব জনপ্রিয় টীচার।

ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বুক ভেঙে গেছে। তবু বাধা দেয়নি। ছেলে বাইরে চলে যাবার পর থেকে খুব একা লাগতে শুরু করল। ছেলের উৎসাহেই এখন চারদিকটা একটু দেখতে শিখেছে। সিনেমা যায়। বেড়াতে যাচ্ছে। যদিও সে মেয়েদের দলের সঙ্গেই বেড়াতে ভালোবাসে। এখন আবার সব বন্ধ। সুমিত মিত্রর ফোন এই দমবন্ধ করা অবস্থায় একমাত্র খোলা জানলা। তার শুষ্ক, প্রেমহীন জীবনে একটু যেন ভালোলাগার ছোঁওয়া।

খবরে বলছে করোনার এই ভয়ঙ্কর আবহাওয়ায় পৃথিবী তার ভারসাম্য ফিরে পাচ্ছে। এই মধ্যবয়সে বিনীতাও কি তাই?

প্রকৃতি স্বচ্ছ হচ্ছিল। নির্মল আনন্দে পাখিরা গান গাইতে লাগল। জনশূন্য পথে নির্ভয়ে নাচল ময়ূর। অন্যদিকে কাজহারা কত শ্রমিক ঘরে ফিরতে গিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। ছোট্ট একটা জীবাণু গোটা পৃথিবীর স্বাস্থ্যবিভাগকে নাজেহাল করে দিল। অন্তিম সংস্কারের জন্যে অন্তহীন অপেক্ষায় পচতে লাগল অসংখ্য মৃতদেহ। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ভাঙাগড়ার খেলা।

বিনীতা-সুমিতের আলাপচারিতাতেও কোথাও যেন ছেদ পড়ছিল আজকাল। এক তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাচ্ছিল বিনীতা। একটি তীক্ষ্ণ, মহিলা কণ্ঠস্বর। যথেষ্ট সীরিয়াস সুমিত অন্যমনস্ক হয়ে পড়ত সেসময়। যদিও কথাগুলি প্রথমদিকে স্পষ্ট ছিল না বিনীতার কাছে। একদিন চরমে উঠল সে আওয়াজ। অত্যন্ত অভদ্র, নোংরা ইঙ্গিত।

“তুমি কি আর ফোন করার, কথা বলার লোক পাও না? তোমার এসব ন্যাকামি আমি বুঝি না বলতে পারো? নোংরা লোক একটা! কই আমার সঙ্গে তো এমন মিষ্টি করে কথা বলতে পারো না? ফোন দাও। আমি ঐ মেয়েটার সঙ্গে কথা বলি। এত আশনাই কিসের? আমার ঘর ভাঙতে এসেছে!”

সুমিতের দাম্পত্যের অসুখী ছবি ধরা পড়ে গেল বিনীতার কাছে। ফোন কেটে দিল সুমিত। পরপর ক’দিন রাতে বিনীতাকে ঘুমের ওষুধ খেতে হয়েছিল।

না, সকাল এগারোটায় আর কোনোদিনও ফোন আসেনি। সোম, বুধ, শুক্রর ঐ সময়টা বিনীতা উৎকীর্ণ হয়ে থেকেছে। ফোনটাকে কাছছাড়া করেনি। ঐ বুঝি ফোনের ঘন্টি বাজল! অপেক্ষার মুহূর্তরা সকাল থেকে গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। শোনা যায়নি পরিচিত ভদ্র কন্ঠস্বর, “হ্যালো ম্যাডাম। সুপ্রভাত”।

বিনীতা নিজের মনকে অনেক প্রশ্ন করেছে। যদিও কখনো নিজে যেচে ফোন করার প্রগলভতা করেনি। আশিসকেও কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। আশ্চর্যজনকভাবে সেও নীরব এব্যাপারে।

ভদ্রলোক একটা তো মেসেজ করেও দুঃখপ্রকাশ করতে পারতেন! এটুকু ভদ্রতা তো আশাই করা যায়, অন্ততঃ ঐ সৌম্য, ভদ্র মানুষটার কাছ থেকে।

সেদিনের পর থেকে ফোনটাই যেন গুরুত্ব হারালো বিনীতার কাছে। যে শব্দরা ধীরে ধীরে এক অন্য ভুবন তৈরী করেছিল তার, তা ক্রমশঃ মিলিয়ে গেল। শব্দই তো শব্দকে জাগিয়ে রাখে। তার থেকে নতুন শব্দের জন্মের হয়। ভাবনার আকাশ বিস্তৃত হয়। চিন্তার বিনিময় হয়। যুক্তিরা তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হয়।

কিন্তু নৈঃশব্দ …. সে কি কখনো জাগে? নীরবতার কি কোনো ভাষা আছে? আছে গভীর উপলব্ধি? কিংম্বা শব্দের মত ক্ষমতার শক্তিশেল? যা হৃদয় বিদ্ধ করে। মস্তিষ্ক আলোড়িত করে? চেতনাকে জাগ্রত করে! বিনীতা ভাবতেই থাকে, ভাবতেই থাকে….

আপনার মতামত লিখুন :

8 responses to “নন্দিনী অধিকারীর ছোটগল্প ‘ফোন ভুবন’”

  1. Sujit kumar datta says:

    নতুন এক অভিজ্ঞতা ,নতুন এক অনুভূতি ।বেশ লাগল নতুন গল্প ‘ফোন ভুবন”

  2. Nandini Adhikari says:

    ধন্যবাদ ????

  3. প্রবণ পালন চট্টোপাধ্যায় says:

    একটা ভিন্ন স্বাদের গল্প। গল্পের চলন খুব সুন্দর।
    হুড়মুড় করে পড়ে ফেললাম।
    এমন নিভৃত পদচারণা, দহন, মুক্তি, খোলা জানলার আকাশ সহজে আসে না, অনেকদিন পর অনুভব করলাম।

  4. Jaya Dey says:

    এমন অভাবনীয় এক গল্পভাবনা…অভূতপূর্ব…!!!!
    কি অসম্ভব মেদহীন ঝরঝরে, কাব্যিক আর সুন্দর!! বহুদিন পর একটা গভীর ও সার্থক ছোটগল্প পড়লাম, যা “শেষ হইয়াও শেষ হয় না”… অনুরণন ও অবকাশ রেখে যায় আরও ভাবনার ও কল্পনার…!!
    খুব ভাল লাগলো…!!!!!

  5. Subhankar Paul says:

    অবাস্তব কিন্তু লেখার গুনে পড়তে ভাল লাগল

  6. Barna Kundu says:

    ভার্চুয়াল মেলবন্ধন কেন যে এমন মানসতমসায় শেষ হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই!

    বড় সুন্দর,সহজ, সিনেমাটিক্ লেখা!
    ????????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev