সাত.
লুটের বাখান :
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তথা গণহত্যার নাম। ১১৭৬ বঙ্গাব্দে ( খ্রি. ১৭৭০) এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে একে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বলা হয়। পলাশীর পর ১৭৬৫ সালে এসে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস ক্রমান্বয়ে পাল্টে যেতে থাকে। নবাবের হাতে থাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, আর রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় কোম্পানি। এতে বাংলার নবাব আসলে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে আর এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়।সে বছর অনাবৃষ্টি কারনে ফসলের উৎপাদন অনেক পরিমাণ কমে যায়। তদুপরি ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের ফলে অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। ‘বাংলাপিডিয়া’র সূত্রে আগেই বলা হয়েছে, ব্রিটিশরাজের কোম্পানি শাসকরা পুরো বিষয়টিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে দাবি করে। কিন্তু ভিন্ন সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ১৭৬৮ সনে আদায়কৃত রাজস্ব দেড় কোটি রুপির চেয়ে ১৭৭১ সনের আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ৫,২২,০০০ রুপি বেশি ছিল, অথচ এর আগের বছরেই ঘটে যায় দুর্ভিক্ষ। এভাবে, কোম্পানি শাসনের সহযোগিতায়, খাদ্যশস্যের বাজার থেকে মুনাফা লুট এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কারণে জনমানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। পরিণতিতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলি হয়ে পড়ে জনশূন্য। জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, প্রায় ১ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির খাজনা আদায়ের নামে সীমাহীন শোষণ আর লুণ্ঠন ১৭৭০ সালে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এক কোটি মানুষ খাবারের অভাবে মারা যায়, তাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।কারণ পলাশী পর্যন্ত-ক) জঙ্গলভূমিতে রাজস্ব ছিল না; খ) চাষী ফসল না ফলালে রাজস্ব দিতে হত না; গ) রাজস্বমুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৫০% [হয়ত আরও বেশি]; ঘ) হকার কারিগর চাষী ছোট ব্যবসায়ীর ত্রাতা ছিল পাল-সেন-সুলতানি-মুঘল-নবাবি আমল; ঙ) নারীরা বর্ণ নির্বিশেষে রোজগার করত, সামাজিক ব্যবস্থাপক ছিল, মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার ছিল। চ)২৭-৩০ শতাংশ ছিল কৃষি আর বাকিটা সেবা আর শিল্প। বাংলায় মাল বওয়ার জন্যে ৩ লক্ষ মালবাহক ছিল। কয়েক লক্ষ টাকার মসলিন শুধু মুঘল দরবারে ঢাকা থেকে যেতো প্রতি বছর। সপ্তগ্রাম, পরে হুগলীতে সায়ের শুল্ক ছিল ২.৫%। আদায় ছিল সে যুগে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা। বাংলায় মোটা কাপড় বিক্রি হতো ৬ কোটি টাকার। ছ) ১ লক্ষ বিদ্যালয়, মক্তব, মাদ্রাসা ছিল। পলাশীর পর এসব কেড়ে নেওয়া হয়, উৎপাদন ব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা হলো।
পৃথিবীতে যুগে যুগে মন্বন্তর নামক বহু গণহত্যায় মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়েছে। ১৭৭০ সালের আগে পরে কয়েকশ কোটি মানুষের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার সূচনা ১৭৭০ সালে ১ কোটি মানুষকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে হত্যা করার মধ্যে নিহিত।
বিশ্বেন্দু নন্দের একটি মন্তব্য স্মরণীয়-‘লুঠেরা ব্রিটিশ এল। ১৭৫৭ সালের পর আর লন্ডন থেকে রূপো আনতে হল না। বাংলা লুঠের ঐশ্বর্যে ইওরোপিয় ব্যবসা, আন্তর্জাতিক দাদাগিরি আর শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি তৈরির কাজ চলতে শুরু করল। কয়েক হাজার বছরের অধমর্ণ ইউরোপ, চিরতরে পলাশীর ধাক্কায় উত্তমর্ণে পরিণত হল। তার প্রধান উদ্দেশ্য শিল্পবিপ্লবের ভর্তুকি জোগাড়। এ কম্মে বাংলার থেকে ভাল এলাকা কিই বা হতে পারে।
ক্রিস্টোফার বেইলি বলছেন ১৭৭২ সালে (ছিয়াত্তরের গণহত্যার সময় — সে সময় গণহত্যার কবলে পড়া বাংলা সুবা থেকে সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করে কোম্পানির কর্মচারীরা) হেস্টিংস, রবার্ট লিন্ডসেকে সিলেটে কোম্পানির প্রতিনিধি করে পাঠায়। যে অঞ্চলটা বহুকাল ধরে প্রায় রাজস্বসীমার বাইরে ছিল, সেটি থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় হয় এবং লিন্ডসে কলকাতার বাজারে হাতি আর কমলালেবু বিক্রি করে বিপুল সম্পদ লাভ করেন — রাজস্ব আদায় থেকে লুটের বখরা আর ঘুষের কথা ছেড়েই দিচ্ছি। গোটা টাকাটা কিন্তু লন্ডনে শিল্পবিপ্লবের কাজে ব্যয়িত হয়। বেইলি লিখছেন, A further bonanza for the Company and its servants ensued. When in 1772 Warren Hastings allowed European officials into the hinterland as revenue collectors, they were able to exploit the market in rights and privileges to the full. So, for instance, the Hon. Robert Lindsay became revenue farmer of the district of Sylhet. Aided by the local monopoly of catching elephants and supplying the bazaars of Calcutta with oranges, he was able to acquire a large fortune during the 1770s. (ক্রিস্টোফার বেইলি, ইন্ডিয়ান সোসাইটি এন্ড মেকিং অব ব্রিটিশ এম্পায়ার)
পলাশী (১৭৫৭) থেকে ছিয়াত্তরের (১৭৭০) গণহত্যার পরে, জমির থেকে রাজস্ববৃদ্ধির তাড়নায়, এবং বশংবদ জমিদারকূল তৈরির জন্য, ১৭৯৩-তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর প্রবর্তন।‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রপাত’ প্রবন্ধে রণজিৎ গুহ লিখেছেন — ‘১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পরেই শুধু ইংরাজের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাংলাদেশের মৌল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হল, রাষ্ট্রবিপ্লব কলমের চারার মতো একটু দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত শিকড় গাড়ল বাংলার মাটিতে- তার আদিম অর্থনীতিতে এবং তিরিশ বছরের মধ্যেই আধুনিক প্রাচ্যের প্রথম ভূমিবিপ্লবে পরিণত হল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।’ (রণজিৎ গুহ রচনাসংগ্রহ ১, ২০১৯, পৃ ২৯)
সুমিত চৌধুরী লিখেছেন — ‘ব্রিটিশরা শাসনে দায়িত্ব নেয়ার পর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে আমরা ইতিহাসে যেটুকু পড়েছি, বিশ্বেন্দুরা সরাসরি তাকে গণহত্যা বলে চিহ্নিত করেছেন। পরিসংখ্যান থেকে নথি থেকে বিশ্বেন্দু তুলে এনে বলেছেন, তা কেবল প্রাকৃতিক কারণে খরাজনিত মন্বন্তর ছিল না। কোম্পানির লাগাম ছাড়া লুট সুবে বাংলার মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত শর্তকে তছনছ করে দিয়েছিল। তার পরিণতিতেই এই বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড বাংলার বুকে। …বিদেশি পর্যটকরা বলছেন সেই সময় বাংলাতে বাইরে থেকে যা সোনা রুপা আসতো তা আর বেরোতো না। উল্লেখ্য, সেই সময় বিদেশি বণিকদের নিজের দেশ থেকে সোনার বা রুপোর বাট এখানে নিয়ে এসে তার বিনিময়ে ভারতবর্ষের মুদ্রা সংগ্রহ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হতো। বিশ্বেন্দুরা হকার কারিগরদের সঙ্গে মিটিং করতে করতে শোনাচ্ছে, প্রাক পলাশী সেই সময়কার কথা, যখন পঞ্চাশ শতাংশ জমি রাজস্ব মুক্ত ছিল।‘তাকভি’ নামক ঋণ দেওয়া হতো সরকারি কোষাগর থেকে কৃষক কারিগরদের। এক আধ টাকা নয়। বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকুল্য পেত কৃষক ও কারিগরেরা। এই গোটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটা ভেঙে তছনছ করেছিল ব্রিটিশরা। তারই পরিণতিতে ছিয়াত্তরের গণহত্যা। যার ফলে বাংলার একটা বড় অংশ জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। এসব কথা তাত্ত্বিকদের গম্ভীর আবরণের মধ্য থেকে মুক্ত করে নিয়ে এসে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারে নিয়ে যেতে চাইছে বিশ্বেন্দুরা।’
তাঁর মতে, উপনিবেশ ও কর্পোরেট লুট বিরোধী চর্চা কেন্দ্রের এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে গুরুত্ববহ।
এই প্রবন্ধটি ২১ এপ্রিল ২০২৩ থিওজফিক্যাল সোসাইটি হলে উপনিবেশ বিরোধী ও কর্পোরেট বিরোধী চর্চা, তৃতীয় মধুমঙ্গল স্মৃতি বক্তৃতায় পঠিত।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com