বৈদিক যুগে শেষভাগে আর্যধর্ম ক্রমশ উপনিষেদের গভীর দার্শনিক তত্ত্বের পথ থেকে সরে এসে কতগুলো বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হলো। কেবল বেদের কর্মকান্ডের দিকে মানুষের উৎসাহ বাড়তে লাগলো। ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা হয়ে উঠলো সমাজের একমাত্র রক্ষক। ধর্মের নামে হিংসা, হানাহানি, কঠোরতা, জটিল অনুষ্ঠানপদ্ধতি, অবাধে পশুহত্যা চলছিল চারিদিকে। বিশেষ করে যাগযজ্ঞাদিতে ধর্মের নামে পশুবলি ক্রমশ বেড়ে উঠেছিল। প্রেমহীন আচার সর্বস্ব যাগযজ্ঞের ধোঁয়াশায় জাতির আকাশ যখন আচ্ছন্ন, এমনই এক তমসাঘন মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রেমের বাণী শোনাতে শাশ্বত আধ্যাত্মিক দ্যুতিতে চিরজ্যোতির্ময় রূপে আবির্ভূত হলেন ভগবান তথাগত বুদ্ধ।
বুদ্ধের জন্মকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতানৈক্য আছে। অনুমানিক ৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে তাঁর জীবনকাল হিসেবে নিরূপণ করা হয়। পৌরাণিক ধারণায় তথাগত বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার বলে মনে করা হয়। বর্তমান নেপালের লুম্বিনিতে তাঁর জন্ম। শাক্য বংশের রাজকুমার সিদ্ধার্থ অজস্র ভোগ বিলাসের মধ্যে থেকেও অনুভব করেছিলেন রোগ, শোক, জরা, ব্যাধিকে। তিনি অবাক হতেন এত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও মানুষ কি করে সামান্য অনিত্য ভোগের বস্তুর জন্য লালায়িত হয়? এর বাইরে কি এমনই কিছু নেই যা নিত্য, সত্য, চির-আনন্দময়!
এসব জিজ্ঞাসাই তাঁকে রাজসিংহাসন, অতুল ঐশ্বর্য, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ত্যাগ করে ধারণ করিয়েছিল পরিব্রাজকের বেশ। দীর্ঘ ছয় বছরের কঠোর তপস্যার ফলে তিনি লাভ করেছিলেন এক দিব্য শাশ্বত আনন্দ। সেই দিব্য জ্যোতির উদ্ভাসিত জ্ঞানে তিনি হয়েছিলেন বোধিসত্ত্ব বুদ্ধ।
এই জ্ঞানের আলোয় শুধু তিনি নিজে আলোকিত হননি, সেই দিব্য জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আর্ত, পীড়িত, দুঃখী মানুষের হৃদয়ে। শাক্য বংশের রাজ সিংহাসনে নয় তিনি প্রতিষ্ঠিত হলেন মানুষের হৃদয়ের প্রেমের সিংহাসনে।
তথাগত মানব প্রেমের কোন জটিল দার্শনিক দিক তুলে ধরেননি বরং বলেছিলেন ধর্মের সহজ ভাষা, জীবনের প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধরুন যদি কারো পায়ে কাঁটা ফুটে যন্ত্রনায় ছটফট করছে সেই মুহূর্তে তাহলে জরুরি হল কাঁটাটি তুলে ফেলে দেওয়া — বিচার বিশ্লেষণ সেই মুহূর্তে নিরর্থক ও অবাস্তব।
জীবনের দুঃখের মূল কারণ হলো কামনা-বাসনা-তৃষ্ণা। কামনা-বাসনা-তৃষ্ণার নাশই হলো নির্বাণ। এই নির্বান সকলেই লাভ করতে পারে। এর জন্য কোন পুরোহিত বা শাস্ত্রের প্রয়োজন নেই। আমাদের নিজেদের স্বার্থশূন্য কর্ম চিন্তার দ্বারাই নির্বানের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। এর জন্য নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে।

তথাগত অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা বলেছেন যার সার কথা হলো সর্বভূতে মৈত্রী অহিংসা ও নিঃস্বার্থ সেবা। তাঁর মতে ধর্ম হলো “বহুজনহিতায়, বহুজন সুখায়”।
(बहुजन हिताय बहुजन सुखाय च) যার বাংলায় আক্ষরিক অর্থ হল — ‘আরো বেশি মানুষের উপকারের জন্য’ এবং ‘আরও বেশি সংখ্যক মানুষের সুখের জন্য’। বৌদ্ধ ধর্ম একটি বৈজ্ঞানিক ও অত্যন্ত বাস্তবমুখী একটি জীবন দর্শন। ক্ষমা প্রেম পবিত্রতা সংযম ও সর্বোপরি নিঃস্বার্থ সেবা ও মৈত্রী ভাবনায় মানুষকে তিনি প্রেরণা দান করেছেন। বুদ্ধ মধ্যপন্থী, সকল আচার অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে সহজসরল নব্য ধর্মের খোঁজ দেন।
বোধিলাভের পর আমৃত্যু দীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি নিজেকে তিলে তিলে ক্ষয় করেছেন মানব সেবায়। প্রতিদিন ৮-১০ মাইল পথ হেঁটে ধর্ম প্রচার করতেন প্রাদেশিক কথ্য ভাষায়। তার প্রতিষ্ঠিত সংঘে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে সমান স্থান পেয়েছিলো সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর মানুষরা। সমাজের চোখে ঘৃণ্য, অবহেলিত গণিকা আম্রপালির নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন রাজপুরুষের নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করে। নারী জাতির প্রতি মর্যাদা ও পরম করুনায় তাদের সন্ন্যাসী সংঘে প্রবেশের অধিকার দিয়েছিলেন।
বুদ্ধের করুণায় দস্যু অঙ্গুলিমাল রূপান্তরিত হয়েছিল শ্রমণ অঙ্গুলিমালে। সুনিশ্চিত মৃত্যু যেনেও দরিদ্র ভক্ত চুন্দেরের গুরুপাক আহার গ্রহন করেছিলেন তথাগত। শুধু তাই নয় মহাপরিনির্বাণের পূর্বে তিনি চুন্দেরের উদ্দেশ্য বলে গেলেন এক সুমধুর মানব প্রেমের অমোঘ বাণী, ‘চুন্দ যেন দুঃখ না করে তার দেওয়া আহার গ্রহণ করে বুদ্ধ প্রাণ ত্যাগ করেছেন বরং আনন্দিত হয় এই ভেবে যে সুজুতার পায়সান্ন ভক্ষণের পর বুদ্ধ নির্বাণ লাভ করেছিলেন তেমনি ‘চুন্দ নিবেদিত আহার্য গ্রহণের পর বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করবেন।’
একবার পথে এক দরিদ্র দাসী পুণ্যার কাছে ভিক্ষাপ্রার্থী হয়েছিলেন বুদ্ধ। পুণ্যার কাছে বুদ্ধকে দেওয়ার মত কয়েকটি পোড়া রুটি ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। অগত্য তিনি শ্রমণকে তাই দিলেন। সন্ন্যাসী চলে যাওয়ার পর বৃদ্ধার মনে সন্দেহ জাগলো। মনে হলো কাক কুকুরকে ওই পোড়া রুটি দিয়ে উত্তম আহার করবেন বুদ্ধ। সন্দেহের বশে তিনি লুকিয়ে দেখতে গেলেন। তিনি অবাক হলেন যখন দেখলেন পথের ধারে চিবরের উপর বসে বুদ্ধ পরমানন্দে তা গ্রহণ করছেন। জাতির বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে বুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রেমের বাণী।
ভিক্ষুকেরা ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় সংঘ স্থাপন করলেন। অন্ন, বস্ত্র, ওষুধপত্র, শিক্ষা, ধর্ম ইত্যাদির জন্য মানব সেবার দ্বার উন্মোচিত হলো। নালন্দা তক্ষশীলার মত শিক্ষায়তন এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হলো অজস্র বৌদ্ধবিহার। সেবা ও মৈত্রী ভাবনার প্লাবন দেশে বয়ে চললো। সমাজ সাহিত্য শিল্প দর্শন আচার অনুষ্ঠান নতুনভাবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। কেবল হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা নয় সেই স্রোত বয়ে গেল জাপান, তিব্বত, চীন, বার্মা, সিংহল সুমাত্রা যবদ্বীপ এককথায় এশিয়া ইউরোপের বহু অঞ্চলে। সঙ্ঘ প্রচার করেছে মানবধর্মের এক অভিন্ন ঐকাত্ম্যের কথা। এই মূল্যায়ন আজকের ভারতবর্ষের কাছে ভীষণ প্রাসঙ্গিক।
সম্রাট অশোক তার রাজ্য শাসনে, বুদ্ধের নীতি-আদর্শ প্রয়োগ করে প্রজাদের প্রভূত কল্যাণ সাধন করতে ও রক্তপাতহীনভাবে রাজ্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। বর্তমানে হিংসা দ্বেষ লোভ-লালসায় ভরা পৃথিবীতে নতুন করে মৈত্রী ভাবনার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে শোষিত-অত্যাচারিত-শৃঙ্খলিত জনগণ বুদ্ধের ন্যায় মানব প্রেমিক অবতারের প্রত্যাশা করেন। বৌদ্ধধর্ম যে পরিপূর্ণ মানবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তির পথ দেখিয়েছে তা চিরন্তন ও শাশ্বত। আজ প্রায় বুদ্ধের জন্মের আড়াই হাজার বছর পরেও তাঁর বাণী বেদনা-বিদুর পৃথিবীর বুকে আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার করে। এখানেই বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপন পরিপূর্ণতা লাভ করে।
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি /ধম্মং শরণং গচ্ছামি /সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি।।
বাহ খুবই সুন্দর।
ধন্যবাদ ????