সাহিত্যের পরে আসে ভাষার প্রশ্ন। পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রচারকরা বাংলা ভাষার প্রতি বীতরাগ। তবে ভাষা বিতর্কের জন্ম অনেক আগে। মধ্যযুগের মুসলমান শাসকরা হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি বাংলায় অনুবাদ করিয়েছিলেন। সেই সব শাসকদের কেউ কেউ ‘শাহে বাঙ্গালিয়ান’ উপাধিও ধারণ করেছিলেন, কিন্তু বাংলাকে দরবারি ভাষায় পরিণত করেন নি। বাংলা ভাষায় লেখালেখির ব্যাপারে মোল্লাদের মতো কট্টর ছিলেন ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরা।
‘বাংলা ভাষার উদ্ভব ও অন্যান্য’ বইতে গোলাম মুরশিদ (Ghulam Murshid) বলেছেন, ‘মুসলমানদের মধ্যে এমন একটি ছোট জনগোষ্ঠী থেকে যান, যাঁরা কখনও বাংলা ভাষাকে নিজেদের ভাষা এবং বঙ্গভূমিকে নিজেদের দেশ বলে মেনে নিতে পারেন নি’। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মুসলমানদের একাংশের ধারাবাহিক অবজ্ঞার আলেখ্য আমরা পাই আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে।

গোলাম মুরশিদ
তবে বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমানদর বিরূপতা বর্ধিত করে বিভাজনকামী ইংরেজরা। ফলে শিক্ষিত ও অভিজাত মুসলমানরা বাংলাকে কেবলমাত্র বাঙালি হিন্দুর ভাষা বলে মনে করতেন। মাদ্রাসার মৌলবি-মউলানারা ছিলেন উর্দু-ফারসির কট্টর সমর্থক। আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলি, আবদুর রহিম, আবদুল জব্বার খান, সৈয়দ শামসুল হুদা প্রভৃতি নব্য শিক্ষিত মুসলমানও বাংলা ভাষাকে বাঙালি মুসলমানের ভাষা বলে স্বীকার করেন নি। এঁরা উর্দু ফারসির সঙ্গে অবশ্য ইংরেজি ভাষার চর্চা করেছেন। হুগলি মাদ্রাসার রিপোর্টে আবদুল লতিফ আরবি-ফারসি শিক্ষার পক্ষে যে সব যুক্তি প্রদর্শন করেন তাতেই সেকালের শিক্ষিত মুসলমানদের ভাষা সম্পর্কিত মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তখনকার ইংরেজ রাজপুরুষরাও মুসলমানদের এই মত সমর্থন করেছিলেন। কলকাতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এডওয়ার্ড ডেনিশন রস (Edward Denison Ross) বলেছিলেন, ‘মক্তবে উর্দু ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হইবে। কেননা বাঙ্গালা ভাষায় শিক্ষা দিলে মুসলমানের জাতীয়তা অর্ধেক বিনষ্ট হইবে এবং বাঙ্গালা ভাষা মুসলমানদিগকে হীনবীর্য করিয়া ফেলিবে’। (‘মিহির ও সুধাকর’ ১৩ আষাঢ়, ১৩০৯)।

অধ্যক্ষ এডওয়ার্ড ডেনিশন রস
‘মিহির’ সম্পাদক শেখ আবদুর রহিম (Sheikh Abdur Rahim) বাংলা ভাষার কোন উৎকর্ষ স্বীকার করেন নি। তিনি লিখেছেন, ‘বাঙ্গালাকে একটা ভাষা বলিতে যাও, তাহাতেই অনেকের আপত্তি আছে। বিশেষ ও পাড়ার নবাব বাহাদুর, খাঁ বাহাদুর, ডাক্তার, কবিরাজ ও অনেক বড় বড় XYZ এঁরা পর্যন্ত ইহাকে এখনও ভাষা বলিয়া স্বীকার করেন নাই। সুতরাং তাহার সাহিত্য এবং তাহার আবার চর্চা, এ সম্পূর্ণ বাতুলতা’। (মিহির, জানুয়ারি, ১৮৮২)।
কেউ কেউ আবার পক্ষপাতী ছিলেন উর্দুর। তাঁরা উর্দুকে lingua franca বলে মনে করতেন। ১৩২৫ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে মোহাম্মদ আকরম খাঁ (Mohammad Akram Khan) বলেছিলেন, ‘উর্দু আমাদর মাতৃভাষাও নহে, জাতীয় ভাষাও নহে। কিন্তু ভারতবর্ষে মোসলেম জাতীয়তা রক্ষা ও পুষ্টির জন্য আমাদের উর্দুর দরকার’। (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মাঘ, ১৩২৫)। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘হজরত মোস্তাফা’ বই-এর ভূমিকায় মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দিন আহমদ (Mohammad Reyazuddin Ahmad) বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়াতে বঙ্গীয় মুসলমান জাতির সর্বনাশ হইয়াছে, তাহারা জাতীয়তাবিহীন, নিস্তেজ, দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে’। তবে এইসব মতামতের বিরুদ্ধতা যে ছিল না তা নয়। উদাহরণস্বরূপ আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মির মশাররফ হোসেনের নাম করা যায়।
অতঃপর শুরু হয় বাংলা ভাষার মুসলমানি চরিত্র রক্ষার প্রয়াস। হান্টার কমিশনকে প্রদত্ত উত্তরে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন আবদুল লতিফ। তিনি বলেন যে বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের মিশ্রণ ঘটালে নিম্নশ্রেণির মুসলমানের পক্ষে ধর্মশিক্ষা সহজ হবে। ১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ভার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল’ বইতে সৈয়দ নবাব আলি চৌধুরী (Syed Nawab Ali Chowdhury) বিদ্যালয়ের পাঠ্যগ্রন্থে সংস্কৃতবহুল বাংলা শব্দের বিরোধিতা করেন। ‘নূর-অল-ইমান’ পত্রিকায় লেখা হয় : ‘বাঙ্গালা পাঠশালায় হিন্দু শিক্ষকের নিকট হিন্দুর প্রণীত পাঠ্যপুস্তক পাঠ করিয়া যাঁহারা বাঙ্গালা শিখিয়াছেন, তাঁহারা তোতাপাখির মতো সংস্কৃতমূলক সাধু বাঙ্গালা শিখিয়াছেন। বলিবার সময় ও লিখিবার কালে সংস্কৃত পণ্ডিতগণের এস্তেমালি সাধু ভাষা প্রয়োগ করিয়া থাকেন। এসলাম ধর্মের সহিত অপরিবর্তনীয় সম্বন্ধবদ্ধ ওজু, গোসল, ফরজ, ওয়াজেব, হালাল, হারাম, আল্লাহ, রসুল ইত্যাদি শব্দগুলিও যাবনিক বলিয়া ঘৃণা করিয়া থাকেন এবং তৎসমুদয়ের সংস্কৃতমূলক সাধু বাংলায় তর্জমা করিয়া ব্যবহার করিয়া থাকেন’।

সৈয়দ নবাব আলি চৌধুরী
ভাষা সম্পর্কে মুসলমানদের এই দ্বিধা-দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতাত্ত্বিকরা। তাঁরা প্রচার করেন যে আরবি-ফারসি-উর্দু মিশ্রিত মুসলমানি বাংলা ভাষাই হবে বাঙালি মুসলমানের ভাষা। পাকিস্তান প্রস্তাব এবং তারপরে দেশভাগের পরে উর্দুকে বাঙালির ভাষা করার ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠেন একদল মানুষ। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝতে পারেন শাসকের অভিপ্রায়।
সে অবস্থায় সতর্ক প্রহরীর মতো জাগ্রত ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতো মানুষেরা। ড. শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, — ‘কতগুলি অসাহিত্যিক, গোঁড়া রাজনীতিক বাংলা অক্ষর ও ভাষাকে গায়ের জোরে বা আইনের জোরে রাতারাতি বদলাইতে চাহিলেও বাংলা ভাষা প্রবল নদীর ন্যায় নিজের মর্জি মতো আপনার গতিপথ বাছিয়া লইবে। বাহিরের কোন শক্তি তাহাকে বাধা দিতে পারিবে না। ভাষা পরিবর্তনশীল সুতরাং পরিবর্তন আসিবেই। কিন্তু তাহা ভাষাতত্ত্বের নিয়ম অনুসারে, কাহারও হুকুম বা ইচ্ছানুসারে নয়’। (মুক্তির দিশারী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ / আ.জ.ম. তকিয়ুল্লাহ )।
এভাবেই তৈরি হয় ভাষা আন্দোলনের পটভূমি। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
মাতৃভাষায় শিক্ষাদান নিয়ে ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশন বসে। সেই কমিশনে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মুসলমানের মাতৃভাষা উর্দু এবং নিন্মবিত্ত, ,বা নিন্মশ্রেণির মুসলমানের মাতৃভাষা আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দবহুল বাংলা বলে মত দেন আব্দুল লতিফ। এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু এই প্রবন্ধের মতো বিস্তারিত ভাবে জানতাম না। জেনে সমৃদ্ধ হলাম। প্রণাম দাদা।
প্রণাম-ট্রনাম বলে তুমি আমাকে বারবার ঋণী করছ । সম্পর্কটা প্রীতির হবে । সেখানে প্রণামের জায়গা নেই । প্রণাম করলেই দূরে সরে যেতে হবে যে !
দাদা তাই হোক।
আপনার এই লেখা মুক্তবোধ চর্চার মানুষদের কাজে লাগবে। অন্তত আমি তো ভীষণ ভাবে উপকৃত। পূর্বের বেশ কিছু ভুল ধারণা অপসৃত হতে আপনার এই ধারাবাহিক খুব সাহায্য করছে।
প্রীতি সর্বব্যাপী।