পূর্ববাংলায় মুসলমানদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে ১৮৮২ সালে। সে দাবি খুব জোরালো না হলেও তদানীন্তন শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর মহমেডান কনফারেন্সের ২০তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। এই সম্মেলনে নবাব সলিমুল্লার নেতৃত্বে গঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লিগ। সম্মেলনের অনারারি জয়েন্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার খান সাহেবজাদা আফতাব আহমেদ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ফরাসগঞ্জের হিন্দু জমিদার, নবাবের বন্ধু, মোহিনীমোহন দাসও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন জানান।
নবাব সলিমুল্লার আকস্মিক মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শিথিল হয়। নবাব সলিমুল্লার সুযোগ্য পুত্র সৈয়দ নওয়াব আলি চৌধুরী তারপরে হাল ধরেন।
পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা ঘোষণা করেন লর্ড হাডিঞ্জ, ১৯১১ সালে। কিন্তু ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে স্মারকলিপি দেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, বিপিনচন্দ্র পাল, ব্যোমকেশ চক্রবর্তী, পেয়ারিমোহন মুখোপাধ্যায়, অম্বিকাচরণ মজুমদার প্রভৃতি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আর একজন বিরোধী। ‘ঢাকার স্মৃতি’ বইতে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি সরাসরি আশুতোষবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন। শেষ পর্যন্ত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি নতুন প্রফেসর পদ সৃষ্টির বিনিময়ে বিরোধের অবসান ঘটান। ‘প্রতিষ্ঠাপর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে হিন্দু জমিদাররাও হাত লাগিয়েছিলেন। মোহিনীমোহন দাসের কথা আমরা উল্লেখ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন ঢাকার বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল চৌধুরী এবং জগন্নাথ হলের নামকরণ হয় তাঁর পিতার নামে।
তখনকার বেশ কিছু নামজাদা হিন্দু যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন তার প্রমাণ স্পষ্ট। কিন্তু এই বিরোধী দলে কি করে জড়িয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের নাম। যেটা আগে গুঞ্জন ছিল, সেটা লিখিতভাবে এল ২০০০ সালে। প্রকাশিত হল সাবেক এনএসআই প্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল এম এ মতিনের ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’ নামে একটি বই। মতিনসাহেব লিখলেন, —“১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। এখানে বলা প্রয়োজন যে কবি রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্বও সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথ তখন ছিলেন হিন্দু সমাজ তথা হিন্দু মানসিকতা ও হিন্দু চেতনা ও হিন্দু ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ একজন হিন্দু স্বভাব কবি।”
তারপর ২০১১ সালের ১ জুলাই ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় আলি নিয়ামত এবং ‘নিউ এজ’ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবিরও একই অভিযোগ করলেন। তাঁদের সঙ্গে সুর মেলালেন ফারহাদ মজহার, সাদ কামালি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগ হল রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগ। আর চতুর্থ অভিযোগ হল চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। যেমন রবীন্দ্রনাথের যে গান বাংলা দেশের জাতীয় সংগীত, তা রবীন্দ্রনাথ চুরি করেছিলেন গগন হরকরার কাছ থেকে। শোনা যাক অভিযোগকারীর মজার বক্তব্য : —
গগন হরকরার জন্ম শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রামে। কাজ করতেন ডাক বিভাগে, ডাক হরকরা হিসেবে। তিনি একজন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই গগন হরকরাকে কাছারিতে ডেকে নিয়ে আসতেন গান শোনার জন্য। গগন হরকরাও সানন্দে গান শুনিয়ে যেতেন তাঁদের জমিদারবাবুকে। গ্রামের এই সহজ সরল বাউল তখনও ভাবেন নি যে জমিদারবাবুর মনের মধ্যে কি রয়েছে। গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ এই গানটার অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখেন ‘আমার সোনার বাংলা’ বলে। শুধু এই গানের কাঠামো অনুসরণে কবিতা রচনা করেই ক্ষান্ত হন নি তিনি। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ‘আমার সোনার বাংলা’তে হুবহু গগন হরকরার সৃষ্ট সুর বসিয়ে দেন। আমাদের জানা মতে গগন হরকরা সেই সময়ে জীবিত থাকার পরেও তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বা তাঁকে জানানোর প্রয়োজনটুকুও তিনি বোধ করেন নি। এ যেন তাঁর নিজের লিখিত ‘দুই বিঘা জমি’র সেই জমিদারর মতো। রাজা হয়েও ‘যার হস্ত করে কাঙালের ধন চুরি’। এত বড় একজন কবি ও সংগীতকার হয়েও গ্রামের একজন দরিদ্র ব্যক্তির মেধাপ্রসূত সম্পদকে চুরি করতে তাঁর বিন্দুমাত্র বাধে নি। যোগাযোগের অপ্রতুলতা এবং এখনকার মতো তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেই সময়ে না থাকার কারণে কারও পক্ষে এত বড় একটা চুরি ধরা সম্ভবপর হয় নি। পরে যখন বিষয়টা জানা গেছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ পরিণত হয়ে গিয়েছেন মহাকাশস্পর্শী এক মহীরূহে। তাঁর বিশাল এক স্তাবকবাহিনী তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই স্তাবকবাহিনী তাঁদের পূজনীয় ঠাকুরকে বাঁচানোর জন্য গালভরা এক শব্দ ‘অনুপ্রেরণা’কে বেছে নিয়েছেন, ভাঙা গানের ভরাট ঢালের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে নিয়ে গিয়েছেন শতাব্দীর সেরা চৌর্ষবৃত্তিকে।
[‘রাস্তা থেকে বলছি। wordpress.com // Tagore without Illusion—Mukto-Mona Archive]
শতাব্দীর সেরা চৌর্ষবৃত্তি!!
রবীন্দ্রনাথ এক মহা চোর!!
সেই যে বলেছি, বলতে বলতে বলার আর কিছু বাকি থাকে না।
বলা হল রবীন্দ্রনাথের ‘মহামায়া’, ‘গুপ্তধন’, ‘নিশীথে’ ‘সম্পত্তি সমর্পণ’ প্রভৃতি গল্প মার্কিন লেখক এডগার অ্যালানপোর গল্প থেকে চুরি। সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিণ্ডবার্গ থেকে ভাব চুরি করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্প ও ‘রক্তকরবী’ নাটক। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক