আনুমানিক ১৬ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে মানুষের সঙ্গে পাখির বসবাস শুরু। পরে পাখিকে পোষ মানিয়েছে মানুষ। ফলস্বরূপ একই ছাদের তলায় মানুষের সাথে পাখির বসবাস শুরু। নিরীহ এই প্রাণীটি এতটাই মানুষের আপন হয়ে উঠেছে যে মেটাফোরিকে মানুষ তার প্রিয়কে ‘পাখি’ নামে ডাকতে বেশ ভালোবাসে। পাখি কখনো শান্তির দূত কখনো বা প্রেমের পয়গম্বর।
কত রকমের, কত নামের পাখি পাওয়া যায় এ জগত সংসারে। নিখুঁত ভাবে দেখলে, মানুষের জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাখির জীবনের অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। একটু দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা যাবে।
বাদামী রঙের ছোট্ট একটা পাখি— চোখের উপর কাজলের মতো কালো রঙের দাগ, ঠিক যেন ঘরের ওই শ্যামলা ছোট গরনের মেয়েটার মত — কাজলপাখি। যাকে দেখলেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে ‘ওগো কাজল নয়না হরিণী’।

রিজেন্ট হুইসলার
ভোরের আলো ফোটায় পাখির কলরব জানান দেয় ভোর হয়েছে, জাগার সময় হলো। কিন্ত এই পাখির শিষে লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক বিষ। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সম্প্রতি পাপুয়া নিউগিনির গহীন বৃষ্টি অরণ্যে খোঁজ মিলেছে রিজেন্ট হুইসলার (Regent Whistler) আর রুফাস-নেপ্ড বেলবার্ড (Rufous-naped Bellbird) নামক দুই বিষধর পাখির। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে এই জঙ্গলেই সন্ধান মিলেছিল বিশ্বের প্রথম বিষাক্ত পাখি হুডেড পিটোহুইয়ের (hooded pitohui)।
এই তিন পাখির পালকে আর চামড়ায় নিউরোটক্সিন জমে থাকে, অথচ এর জন্য তাদের নিজেদের কোনো ক্ষতি হয় না। মানুষ, শিকারি পাখি-সহ আক্রমণকারীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার্থে এই বিষ ব্যবহৃত হয়। এই বিশেষ বিষকে বলা হয় ব্যাট্রাকোটক্সিন (batracotoxina)। বিষাক্ত পোকামাকড় খাওয়ার ফলে তাদের শরীরে এই বিষ তৈরী হয়। মাংসপেশির যে ভোল্টেজ-গেটেড সোডিয়াম চ্যানেলে ব্যাট্রাকোটক্সিন জুড়ে বসে (বাইণ্ডিং), এদের শরীরে জেনেটিক মিউটেশনের ফলে বেশ কিছু বদল আসে যার ফলে ব্যাট্রাকোটক্সিন এদের শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে না। প্রকৃত অর্থেই এরা যেন নীলকন্ঠ।

রুফাস-নেপ্ড বেলবার্ড
গবেষক পক্ষী বিশারদরা জানিয়েছেন, এই গহীন জঙ্গলে নরখাদক আদিবাসীরা প্রায় সর্বভূখ হলেও তারা এই দুই পাখিকে কখনো মেরে খান না। এতেই সন্দেহ জাগে গবেষকদের। অবশেষে ফাঁদে ফেলে ধরে ফেলেন এই দুই বিষধর পাখিকে।
পালকের স্যাম্পেল নেওয়ার সময় ঘটে বিপদ।এদের পালকে হাত দিলে নাক-চোখ জ্বলতে শুরু করে ও কিছুক্ষণ বাদে প্রবল জল গড়াতে থাকে ঠিক যেমন পেঁয়াজ কাটার ঝাঁঝে হয়। এখানে পিয়াঁজের ঝাঁঝের সাথে ঘটেছে নার্ভ এজেন্টের সংমিশ্রণ। তাছাড়া ব্যাট্রাকোটক্সিন কর্মরত স্কেলিটাল মাসেলের মধ্যে থাকা সোডিয়াম চ্যানেল বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে স্প্যাজম বা মাংসপেশির খিঁচুনি এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
শত্রুদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে বিবর্তনের এক অদ্ভুত কৌশলে নিজেরা বিষধর হয়ে উঠেছে। আসলে শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খোঁজে সকলেই, সে মানুষ হোক কিম্বা পাখি।
কত বিচিত্র ধরনের পাখিই না আছে দেশে-বিদেশে আমাদের আনাচে-কানাচে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগপাই (magpie) পাখি তাদের বাসার আশপাশে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মানুষজন দেখলে তাদের রীতিমত চেঁচামেচি করে। এমনকি আক্রমণ করতেও ছাড়ে না।

হুডেড পিটোহুইয়ের
অস্ট্রেলিয়ান ম্যাগপাইকে (Australian Magpie) পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র এবং বিপজ্জনক পাখি বলা হয়। প্রজনন ঋতুতে এরা লোকালয়ে চলে আসে। তখন এরা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। পাখিগুলোর আক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রশাসন আলাদা নিয়ম তৈরি করেছে ।
বোঝা যাচ্ছে আমরা যারা অনেকে পাখিকে নির্বোধ মনে করে থাকি, পাখিরা মোটেও নির্বোধ নয়। শুধু তাই নয় মানুষের মতো এদেরও মান অভিমান রাগ আছে।
আসলে আপন-পর ভেদাভেদ মানুষের সৃষ্টি। যিনি বিশ্বের নিয়ন্তা তাঁর কাছে একটি পক্ষিসাবক ও মানব শিশুর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। এ কথা আমরা ভুলেই যাই। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়–বনফুলের ছোট গল্প আত্মপর যেন তারই দৃষ্টান্ত।
“সারা সকালটা খেটে খুটে দুপুরবেলায় দক্ষিণ দিকের বারান্দায় একটু বিছানা পেতে শুয়েছি। তন্দ্রাটি যেই এসেছে — অমনি মুখের ওপর খপ করে কি একটা পড়লো। তাড়াতাড়ি উঠে দেখি একটি কদাকার কুৎসিত পাখির ছানা লোম নেই–ডানা নেই কিম্ভূতকিমাকার। রাগে ও ঘৃণায় সেটাকে উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। কাছেই একটা বেড়াল যেন অপেক্ষা করছিল-টপ করে মুখে করে নিয়ে গেল। শালিক পাখীদের আর্তরব শোনা যেতে লাগল।

অস্ট্রেলিয়ান ম্যাগপাই
আমি এপাশ ওপাশ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
তারপর চার পাঁচ বছর কেটে গেছে!
আমাদের বাড়ীতে হঠাৎ একদিন আমারই বড় আদরের একমাত্র ছেলে শচীন হঠাৎ সর্পাঘাতে মারা গেল। ডাক্তার- কবরেজ-ওঝা-বৈদ্যি কেউ তাকে বাঁচাতে পারলে না। শচীন জন্মের মত আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
বাড়ীতে কান্নার তুমুল হাহাকার।
ভিতরে আমার স্ত্রী মূৰ্ছিত অজ্ঞান। তাকে নিয়ে একজন লোক শশব্যস্ত হয়ে উঠেছে। বাইরে এসে দেখি দড়ির খাটিয়ার ওপর শুইয়ে বাছাকে নিয়ে যাবার আয়োজন হচ্ছে।
তারপর বহুদিন পরে — কেন জানিনা— সেই পাখির ছানাটার কথা মনে পড়ে গেল ।
সেই চার পাঁচ বছর আগে নিস্তব্ধ দুপুরে বেড়ালের মুখে সেই অসহায় পাখীর ছানাটা, আর তার চারদিকে পক্ষীমাতাদের আর্ত হাহাকার। হঠাৎ যেন একটা অজানা ইঙ্গিতে শিউরে উঠলাম।”
নিদারুণ অভিজ্ঞতা এই ভুলে যাওয়ার কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। জীবনে চলার পথে কত কিছু আসে কত ভাবনা চলে যায়। যেমন শূন্যতাবোধ, পরশ্রীকাতরতা হীনমান্যতা একাকিত্বের মতো গভীর অসুখ। পাখিদের কথা লিখতে গিয়ে চরিত্রের গভীর স্তরে এই অনুভূতির মুহূর্তগুলি কোথায় যেন জড়িয়ে যায়। ফলে গল্পপাঠে উঠে আসে সমাজের বৈষম্য ও অলীক সুখ, পাখির জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের জীবনের সাদৃশ্য।
পাখি*কত কিছু জানালেন,খুব ভালোলাগলো “পাখি কখনো শান্তির দূত বা প্রেমের
পয়গম্বর”। ভোরবেলাটা ওরাই শান্ত শীতল মুখর করে রেখে ডাক দেয়,-“দেখোরে
নয়ন মেলে জগতের কি বাহার” রোজ উঠে আসি ব্যালকনিতে চেয়ারে বসে ডাক
শুনি,দেখি,খেতে দিই,জল দিই ওরা আর আমাকে ভয় পায় না।এই রুটিন আমি
রোজ ফলো করি,নইলে আমার সারাদিন খুব কষ্টে কাটে।মেয়ের নাম রেখেছি–
“তিতির” এখানে অনেক তিতির পাখি আসতো এখন অনেক কমে গেছে বিকাশ
অথবা বিনাশের কারনে। ভালোবাসার অন্য নাম পাখি,ভালোলাগার অন্য নাম
পাখি,প্রেম প্রণয়ের অন্য নাম পাখি,সুখ শান্তির অন্য নাম পাখি।তুমি আছো তাই
আজও খুঁজে পাই নিজের নিজেকে ভোরবেলা,সুরে সুরে গানে,ভীষণ আকর্ষণে
ভরাও জীবন খেলা* চমৎকার প্রতিবেদনে মুগ্ধতা ভালোলাগা ভালোবাসা।
কত সুন্দর করে কত কিছু বললেন। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয় ????
।
অসাধারণ ! খুব মূল্যবান লেখা। ঋদ্ধ হলাম পড়ে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
বাপড়ে! এরকম পাখিও হয়!
কত বিচিত্রতে ভরপুর এই জগৎ