নদীর ধারে পুতুলপাড়া/আমায় ছুঁয়ে আছে/বন্ধু হয়ে আসতে পারো/এই শহরের কাছে।/তোমায় দেবে লক্ষ্মী ঠাকুর/মাটির অলংকারে/গ্রামের বধূ তুলসীতলা/পদ্মদীঘির ধারে।/দুগ্গা-গণেশ কৃষ্ণঠাকুর/হরেক রকম পাখি/মাটির বুকে প্রাণের ছোঁয়া/চোখ দুটো যেই আঁকি।/বরের পাশে বউ হেঁটে যায়/কলসি কাঁখে মেয়ে/বাউল চলে গ্রামের পথে/মাটিরই গান গেয়ে।
আমি যেখানে থাকি, তার চারপশেই মৃৎশিল্পীদের ঘর। নদিয়া জেলার ঘূর্ণি, বিশ্বের দরবারে মাটির পুতুলের জন্য যার খ্যাতি। সারাবছর ধরেই এখানকার শিল্পীরা নানা ধরনের পুতুল তৈরি করেন যে পুতুলের কদর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।যদিও রিয়ালিস্টিক হিউম্যান ফিগারের জন্য এই ঘূর্ণির মাটির পুতুল অন্য মাত্রা পেয়েছে। চলমান মানুষের জীবন ধরা পড়েছে তাদের শিল্পকার্যে। বিভিন্ন বৃত্তিজীবী মানুষের মাটির অবয়ব মন কেড়েছে সকলের। পাশাপাশি ঘূর্ণি-সহ কৃষ্ণনগরের বেশ কয়েকটি জায়গায় তৈরি হয় প্রতিমা। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে থেকে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত কৃষ্ণনগর পালপাড়া (রথতলা), ষষ্ঠীতলা এবং ঘূর্ণিতে থাকে সাজোসাজো রব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখানকার তৈরি প্রতিমা পৌঁছে যায়, পৌঁছে যায় রাজ্য তথা দেশের নানা স্থানে। মনে রাখতে হবে খুব ছোট আকৃতির প্রতিমা থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির প্রতিমা নির্মিত হয় এখানকার শিল্পীদের হাতে। মাটির সাজের প্রতিমা, ডাকের সাজের প্রতিমা, শোলার সাজের প্রতিমা থেকে শুরু করে ফাইবার গ্লাসের তৈরি প্রতিমারও চাহিদা থাকে। পূজাকে ঘিরে যে ব্যস্ততা শিল্পী থেকে শুরু করে প্রতিমাশিল্পের সাথে যুক্ত থাকা অসংখ্য মানুষের। বিশ্বকর্মার হাত ধরে বাঙালির দুর্গাপুজোর সময় হয়। খড়ের ওপর মাটির প্রলেপ পড়ে, সেই মাটির প্রতিমার অঙ্গ সেজেও ওঠে শোলার সাজে, ডাকের সাজে। বাগদী পাড়ায় বাঁশের চালিগুলোও দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো থাকে। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় তাও হয়ে ওঠে মায়াবী। পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের মেয়েদের কাছে পৌঁছে যায় কাগজ, আঠা, চুমকি, জরি। দুর্গার পরেই লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী। নানারূপে সেজে ওঠে প্রতিমা, পুতুলনগরী কৃষ্ণনগরের প্রতিমাশিল্প এবং সাজশিল্প যে বাংলার অহংকার।

পুজোর আগে আগে ছবিটা পাল্টে যায়। আমাদের পুতুলনগরীতে দিনরাত এক করে কাজ করে শিল্পী-কারীগরেরা। বারোয়ারিগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছি খড়ের উপর মাটির প্রলেপ পড়ে। কৃষ্ণনগর থেকে বহু শিল্পী কুমোরটুলিতে প্রতিমার কাজে ছুটে যান। কুমোরটুলির বিভিন্ন স্টুডিওতে জিজ্ঞাসা করলে আপনারা জানতে পারবেন আমাদের শহরের শিল্পীরা সেখানে গিয়ে কাজ করছেন। প্রথমে ভাবলে একটু অবাক হতে হবে কিন্তু মনে রাখতে হবে কলকাতায় প্রতিমার বিপুল বাজার। আর আমাদের দক্ষ কারিগরদের সেখানে প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় এখানকার প্রখ্যাত শিল্পীদেরও। এ প্রসঙ্গে জানাই কুমোরটুলির সঙ্গে কৃষ্ণনগরের যোগ কিন্তু বহুদিনের। কৃষ্ণনগরের অনেক শিল্পীরই মৃৎশিল্পকেন্দ্র ছিল কুমোরটুলিতে। কোলকাতার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রেখে তাঁরা কাজ করতেন।পাকাপাকিভাবে অনেকেই থাকতেন কুমোরটুলিতে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি একসময়ের প্রখ্যাত শিল্পী নিতাইচরণ পাল তিনি এন সি পাল নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন কৃষ্ণনগর কুমোরপাড়াতে কিন্তু কুমোরটুলিতে বিশাল জায়গা জুড়ে এন সি পালের শিল্পকেন্দ্র ছিল। তিনি তখন কলকাতা কৃষ্ণনগর যাতায়াত করতেন। এর ফলে কুমোরটুলি এবং কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের মধ্যে একটা দেওয়া-নেওয়া চলতে থাকে। আজো এই দেওয়া-নেওয়া চলছে। কৃষ্ণনগরের অনেক চিত্রশিল্পী কুমোরটুলির বিভিন্ন স্টুডিওতে ডাক পান। উৎসবে পুরো সময়টাই অনেক শিল্পী কাটান কোলকাতায়।
কৃষ্ণনগরের প্রতিমা শিল্পের ইতিহাস বহু প্রাচীন। গোপেশ্বর পাল, ভোলানাথ পাল, সত্য পাল, শিব পাল, অশ্বিনী পাল প্রমুখের কথা এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে। জানা যায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘দেবী’ সিনেমায় বলাই পাল ও কানাই পালের তৈরি দেবীমূর্তি ব্যবহার করেছিলেন। আর সত্যজিৎ রায়ের মাকে মাটির পুতুল তৈরি করতে শেখাতেন নিতাইচরণ পাল অর্থাৎ এন.সি পাল।
নদিয়া জেলার একটি প্রাচীন জনপদ কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগর বিশ্বের দরবারে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে তার মৃৎশিল্পের জন্য। কৃষ্ণনগরের রাজারা পূর্ববঙ্গের নাটোর থেকে মৃৎশিল্পীদের এনেছিলেন এবং কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি অঞ্চলে তাঁরা জায়গা পেয়েছিলেন। কুমুদনাথ মল্লিকের ‘নদীয়া কাহিনী’তে লেখা আছে —

“কৃষ্ণনগরের প্রচলিত জনশ্রুতি যে নদীয়ারাজ- পোষকতায় এখানে মৃৎ শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোন তথ্য প্রমাণ নেই। কৃষ্ণনগরের কোনও মৃৎশিল্পী পরিবারই নদীয়ারাজদের দানভাজন নন। নদীয়ারাজ পরিবার বিষয়ক প্রামাণ্য আকর-পুঁথি ও গ্রন্থসূত্রেও নদীয়ারাজ-পোষকতা সমর্থিত নয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকা মতান্তরে নাটোর থেকে মৃৎশিল্পীরা এখানে আসেন। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে এই মত প্রামাণ্য নয়।… দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায় তাঁর ‘ক্ষিতীশবংশাবলিচরিত’ গ্রন্থে লিখেছেন যে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের পূর্বপুরুষেরা নদীয়ারাজদের উৎসাহ পেয়েছেন।”
প্রাবন্ধিক বিদ্যুৎ হালদার ‘জীবনকুচি’ পত্রিকার ‘শিল্পকলা’ সংখ্যায় ‘কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের সদর অন্দর’ শীর্ষক একটি মূল্যবান তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিদ্যুৎ হালদার আমার শিক্ষক। তিনি কৃষ্ণনগরের ষষ্ঠীতলা কুমোরপাড়ার শিল্পীদের অনেককেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে প্রকাশ পাল, বীরেন পাল, মুক্তি পাল, শম্ভু পাল, পশুপতি পাল, জীতেন পাল, করুণাপ্রসাদ পাল প্রমুখের কথা। তিনি তাঁর প্রবন্ধ লিখেছেন — “এঁরা সকলেই আজ আর বেঁচে নেই। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের মৃৎশিল্পে স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রেখে গিয়েছেন। দেবদেবীর মূর্তি নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবসম্মত নানা বৃত্তি বা পেশার মানবরূপ নির্মাণ করে এবং প্রাচীনের সঙ্গে নতুনকে মিশিয়ে তাঁদের শিল্পকাজে নতুন নতুন রূপ এনে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছেন এই সব দক্ষ মৃৎশিল্পীরা। এমনকি রিলিফ, ম্যুরাল ইত্যাদি শিল্পের সব বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁদের নির্মাণশিল্পে।”

কৃষ্ণনগরের প্রতিমা শিল্পের ইতিহাসে যাঁর কথা শুরুতেই উল্লেখ করতে হয় তিনি প্রয়াত শম্ভু পাল। কৃষ্ণনগরের মাটির প্রতিমা নির্মাণে তিনি অদ্বিতীয়। তাঁকে যাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তাঁদের অনেকের সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচয় রয়েছে। তাঁদের মুখ থেকে শুনেছি প্রতি মুহূর্তে তিনি প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তিনি কৃষ্ণনগরে মাটির প্রতিমা মাটির সাজের দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। অর্থাৎ সম্পূর্ণ প্রতিমাটি নির্মিত হবে মাটি দিয়ে। তাঁর স্টুডিওতে মানুষের ঢল নামত। কালী প্রতিমা নির্মাণে তাঁর অভিনবত্ব আজও অনেক স্মৃতিতে উজ্জ্বল। প্রতিমার চালায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কল্কার স্রষ্টা তিনি। শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থে (কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্প ও মৃৎশিল্পী সমাজ) লিখেছেন, “সতীশচন্দ্রের প্রথম পুত্র নির্মলকৃষ্ণ ভাল মৃৎশিল্পী ছিলেন কিন্তু তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর দুই পুত্র মুক্তিনাথ ও শম্ভুনাথ। সাম্প্রতিককালে কৃষ্ণনগরে দেবদেবীর মূর্তি পরিকল্পনায় শম্ভু পালের নাম সর্বোচ্চ কৃতিত্বে সমুজ্জ্বল।”
শম্ভু পালের এক আশ্চর্য আবিষ্কার প্রবীর দত্ত। অসম্ভব ভালো ছবি আঁকেন পাশাপাশি এই সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর তিনি। প্রতিমা শিল্পী হিসেবে প্রবীর দত্তের সুনাম বিশেষ উল্লেখ্য। প্রবীর দত্ত প্রতিমাশিল্পে অনন্য নজির রেখেছেন। চিন্তায় আধুনিকতার ছাপ থাকে সবসময়। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের যুগলবন্দিতে গড়ে ওঠে তাঁর প্রতিমা। (চলবে)
অমৃতাভ দে, ‘কথার ঘর’ শিবতলা লেন, ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।