বীরেন পাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন শিল্পী ছিলেন। রিয়ালিস্টিক হিউম্যান ফিগার তৈরিতে, প্রতিমা নির্মাণে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখ্য। ইউরোপীয় ঘরানাকে বীরেন পাল নিপুণভাবে ব্যবহার করেছিলেন মূর্তিশিল্পতে। সুবীর পাল আলাপচারিতায় বলছিলেন,বীরেন পাল ছিলেন অলরাউন্ডার। বীরেন পাল মনে করতেন একজন শিল্পীর উচিত একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা। অন্যান্য শিল্পীদেরও সম্মান করতেন বীরেন পাল। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার নরেন্দ্রনাথ পালের চার ছেলে রবীন পাল, কার্তিক পাল, গণেশ পাল এবং বীরেন পাল প্রত্যেকেই খ্যাতনামা শিল্পী ছিলেন। ভাবতে ভালো লাগে বীরেন পাল এর উত্তরসূরী সুবীর পাল সারা পৃথিবীতে তাঁর বাবার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন তাঁর বাবার কাছে তিনি একেবারেই ক্ষুদ্র একজন শিল্পী। কিন্তু আমরা জানি বিশ্বের দরবারে সুবীর পালের রিয়েলিস্টিক হিউম্যান ফিগার উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শিল্পমিউজিয়ামগুলিতে স্থান পেয়েছে সুবীর পালের শিল্পকর্ম। সুবীর পালের তৈরি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শারদোৎসবের সময় সুবীর পালের স্টুডিওতে তৈরি হয় অসামান্য কিছু দুর্গাপ্রতিমা। সুবীর পালের সৃজন একেবারেই অভিনব। তাঁর মনন চিন্তন মুগ্ধ করে আমাদের। সুবীর পাল খুব আনন্দের সঙ্গে কিছু পুজো উদ্যোক্তাদের বিশেষ অনুরোধে প্রতিমা নির্মাণ করেন। তাঁর কাজে যুক্ত থাকেন অনেক কজন কারিগর। সুবীর পাল নিজেও মনে করেন এই শিল্প সম্মিলিতভাবে সম্পূর্ণতা পায়।

আমার প্রতিবেশী শিল্পী জুয়ান পালের বাড়ি পৌঁছে গেলে মন এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে ওঠে। জুয়ান পালের ভালো নাম বাসুদেব পাল। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিমা তৈরি করেন এই শিল্পী। বাড়িতে জায়গার অভাব, তাই শিবতলার রাস্তাতেই দাঁড় করানো থাকে তাঁর বিভিন্ন প্রতিমা। ছোট্ট বাড়িটির নাম ‘নন্তু ভিলা’। ঠাকুরদাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নামটি খোদাই করে রাখা আছে বাড়ির একটি স্তম্ভে। নন্তু পাল ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী। এই বাড়িতে প্রবেশ করলেই একজন মানুষের দিকে দৃষ্টি চলে যেত। পুজোর সময়গুলোতে তিনি তাঁর সূক্ষ্ম হাতে তৈরি করতেন প্রতিমার মুখ, বুড়ো পাল, জুয়ান পালের বাবা। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল অনেক কথা। বুড়ো পালের ভালো নাম নিমাই পাল। কিন্তু সবাই তাঁকে চিনতেন বুড়ো পাল বলেই কেননা, কৃষ্ণনগর ষষ্ঠীতলার আরেক প্রখ্যাত শিল্পী ছিলেন নিমাই পাল। এই নিমাই পালের সঙ্গে কাজ করেছেন একসময়। যেহেতু সেখানেও ছিলেন নিমাই পাল নামে একজন শিল্পী, তাই হয়তো তাকে সবাই বুড়ো পাল নামেই ডাকতেন। বুড়ো পাল শান্তিপুরে থাকতেন খুব ছোটবেলায়। তারপর চলে আসা কৃষ্ণনগর ঘূর্ণিতে প্রখ্যাত শিল্পী তাঁর পিসতুতো ভাই বীরেন পালের কাছে। অল্প বয়স থেকেই প্রখ্যাত শিল্পী শম্ভু পালের সঙ্গে কাজ করেছেন। মুক্তি পালের ওয়ার্কশপে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। সে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আবক্ষ মূর্তি তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন বড়ো বড়ো মডেল তৈরি করেছেন শম্ভু পালের সঙ্গে। শম্ভু পালের প্রতিমার কদর ছিল খুব, তাঁর কথায় উঠে এসেছিল ফেলা-আসা দিনের কথা। প্রতিমা গড়ার কাজে অনেকটা পরেই এসেছেন তিনি। আমাদের ঘূর্ণির বহু প্রাচীন পুজো ‘আগুনেশ্বরী’র শরীর বিরাট কালীমূর্তি তাঁর হাতে নির্মিত হয়। বিশেষ করে বুড়ো পালের হাতের তৈরি ঠাকুরের মুখ সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁরা পাঁচ ভাই প্রত্যেকেই প্রায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বড়ো। তাঁর আরেক ভাইয়ের নাম বিশেষভাবে করতে হয়, তিনি সুধীর পাল, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী। বুড়ো পালের ছেলে জুয়ান পাল প্রতি বছর অসংখ্য ঠাকুরের বরাত পান। মনে রাখতে হবে শুধু দুর্গাপ্রতিমাই নয়, ঘূর্ণির প্রতিমাশিল্পীরা গণেশ, বিশ্বকর্মা, দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, শনিঠাকুর, মা মনসার মূর্তিও তৈরি করেন। বিশেষ করে কালী ঠাকুরের চাহিদা প্রায় সবসময়ই থাকে। বাসুদেব পাল অন্য জেলায় গিয়ে মণ্ডপের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে আসেন। তবে আমাদের একটা ভালোলাগা থেকেই যায় যখন দেখি শিল্পী বাসুদেব পালের ছোট্ট ছেলেটি দুর্গা প্রতিমা তৈরিত ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবাকে দেখে সেও শেখার চেষ্টা করছে।

ভাবতে ভালো লাগে আজও আমাদের ঘূর্ণির বিভিন্ন শিল্পী সম্পূর্ণ মাটির সাজের প্রতিমা নির্মাণ করে চলেছেন। ঘূর্ণির খুব বড়ো স্টুডিও শংকর পালের স্টুডিও। খুব ছোটো থেকে আমাকে আকর্ষণ করতো শংকর পালের স্টুডিও। বিশাল বিশাল আকৃতির দুর্গাপ্রতিমা আজও তৈরি করেন শংকর পাল। খুবই মূল্যবান সেইসব প্রতিমা অনেক আগে থেকেই বায়না করে যান পুজো আয়োজকরা। একসঙ্গে বহু কর্মচারী কাজ করেন এখানে। প্রাবন্ধিক বিদ্যুৎ হালদার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “ঘূর্ণির প্রতিমাশিল্পীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে ব্যস্ত শিল্পী শংকর পাল। কিছুদিন যামিনী পালের কাছে ছিলেন আবার কিছুদিন কুমোরটুলিতে। কৃষ্ণনগরে বসে এখন তিনি বেশ কয়েকটা বড় বড় দুর্গা মূর্তি নির্মাণ করেন। মূর্তি প্রায় সবই বাইরে যায়। যেসময়ে এইসব মূর্তি তৈরি হয় সেসময় তাঁর কাছে এত মানুষ কাজ করে যে দেখলে, একটা বড়োসর ইন্ডাস্ট্রি বলে মনে হবে। শিল্পীরা যখন প্রতিমা তৈরীতে ব্যস্ত থাকে তখন প্রকৃতপক্ষে মৃৎশিল্প একটা যৌথ শিল্প-কাজের রূপ পায়। নানা সম্প্রদায়ের মানুষ তখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিমরাও বাদ যায় না। শংকর পালের আগে বাড়ি ছিল কুমোরপাড়া এখনকার ষষ্ঠীতলায়।”
এই ষষ্ঠীতলাতেই থাকতেন প্রখ্যাত শিল্পী নিমাই পাল। মার্কিনমুলুকে বেশ কয়েকবার প্রতিমা তৈরি করে এসেছেন তিনি।

একসময় আমি অনেকদিন ছিলাম ষষ্ঠীতলায় পাল পরিবারের মাঝে। নিমাই পালকে কাছ থেকে দেখেছি। ষষ্ঠীতলার প্রখ্যাত শিল্পী অলোক পাল। জলঙ্গী নদীর ধারে এই পাড়ায় পুজোর গন্ধ লেগে থাকত সবসময়। অলোক পালের প্রতিমার চাহিদা সারা ভারতবর্ষ জুড়েই। ডাকের সাজ শোলার সাজের প্রতিমা নির্মাণে অলোকদার জুড়ি মেলা ভার। এবছরে এ পাড়াতেও প্রতিমা নির্মাণের তেমন তোরজোর নেই। শ্রদ্ধেয় দীপক পালের পুত্র অলোক পাল খোকন পাল এবং ঝলক পাল। অলোকদা বিভিন্ন বারোয়ারীর দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। খোকন পাল এবং ঝলক পালও মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
প্রসঙ্গত আবারও বিদ্যুৎ হালদারের লেখাটির কথা বলতে হয়। আসলে বিদ্যুৎ হালদার আমার খুব কাছের মানুষ এবং তিনি এই প্রবন্ধটি আমার সম্পাদিত ‘জীবনকুচি’ পত্রিকাতেই লিখেছিলেন খুব পরিশ্রম করে। প্রবন্ধটির কথা এর আগেও আমি উল্লেখ করেছি। বিদ্যুৎ হালদার এই কুমোর পাড়াতেই থাকতেন ফলে খুব ছোট থেকেই কুমোরপাড়ার শিল্পীদের তিনি কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁর চোখে ধরা পড়েছে বিবর্তনের ছবিটাও। তাঁর ‘কৃষ্ণনগরে মৃৎশিল্পের সদর-অন্দর’ প্রবন্ধটি আমাদের কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন — “কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হলো ষষ্ঠীতলার কুমোরপাড়া শিল্পীদের। একসময় প্রতিমা বিক্রির যে বাজার এই পাড়ায় ছিল তাঁর পুরোটাই চলে গিয়েছে পালপাড়া নতুনবাজার অঞ্চলে। আগে কৃষ্ণনগরের বেশিরভাগ পাড়ারই বারোয়ারি বা ক্লাবের প্রতিমা তৈরি হতো ষষ্ঠীতলায়। পুজোর আগের দিন বিকেলে বা রাতে পাড়ার ছেলের দল মোটা মোটা বাঁশে বেঁধে তাদের প্রতিমা নিয়ে যেত পূজোমণ্ডপে। প্রতিমাবাহী ছেলেদের ঘন ঘন চিৎকার-চেঁচামেচিতে পাড়া কেঁপে উঠত। এখন সে চিৎকার শোনা যায় না। এখন এই পাড়ায় যে কয়েকজন প্রতিমাশিল্পী প্রতিমা গড়ে তারা নিজেরাই চলে যায় অন্য পাড়ায়। সেখানেই মাটি মেখে রঙ গুলে ভ্যান রিক্সায় চাপিয়ে নিয়ে যায়।” (চলবে)
অমৃতাভ দে, ‘কথার ঘর’ শিবতলা লেন, ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।