কৃষ্ণনগর ষষ্ঠীতলার কুমোরপাড়ার চেহারাটা বদলে গেছে অনেকখানি ঠিকই। কিন্তু আজও সেখানকার শিল্পীরা আড়ালে নীরবে নির্জনে প্রতিমা তৈরি করে চলেছেন। কথা হচ্ছিল আমার অনেক দিনের চেনা নিতাই পালের সঙ্গে। বিশিষ্ট শিল্পী শৈলেন পালের পুত্র নিতাই পাল। অপর দুই ছেলে সঞ্জীব পাল এবং নিমাই পাল। নিতাই পাল আজও কুমোরপাড়াতে ছোটো আকৃতির দুর্গা মূর্তি তৈরি করে চলেছেন, সেগুলি কাচের ফ্যানের মধ্যে থাকে। আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের দুর্গাপ্রতিমার চাহিদা রয়েছে আজও। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে উঠে এলো অনেক কথা। একসময় কয়েকজন হাতেগোনা শিল্পী এই ধরনের সূক্ষ্ম কাজ করতেন কিন্তু আজ কৃষ্ণনগর ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গাতেই এ ধরনের কাজ শুরু হয়েছে, তার ফলে সব সময় যে মানুষ এখানেই আসেন এমনটা নয়। উঠে এলো তার বাবার কথা। শ্রদ্ধেয় শৈলেন পালকে আমিও দেখেছি আমার স্কুলজীবনে। তখন ষষ্ঠীতলা কুমোরপাড়ায় জায়গার অভাব থাকা সত্ত্বেও রাস্তার পাশে অসংখ্য দুর্গা প্রতিমা তৈরি করতেন তিনি। ছেলেরাও তাঁর সঙ্গে হাত মেলাত। পাশাপাশি পাটনার সঙ্গে একটা সংযোগ রয়েছে তাঁদের পরিবারের। সঞ্জীব পাল, নিমাই পাল পুজোর তিন মাস সময় কাটান পাটনায়। সেখানে বেশ কিছু ক্লাবের পুজোর প্রতিমা নির্মাণ করেন। বংশপরম্পরায় তারা এই কাজ করে আসছেন।
মনে পড়ে যাচ্ছে কৃষ্ণনগরের খ্যাতিমান শিল্পী কানাই পালের কথা। কানাই পালের দুই ছেলে প্রদীপ পাল এবং চঞ্চল পাল প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। বড়ো বড়ো প্রতিমা তৈরিতে তাদের মতো দক্ষতা কৃষ্ণনগরে খুব কম জনেরই আছে। প্রদীপ পালের দুই ছেলে সুদীপ পাল এবং সুমিত পাল। সুদীপ পাল বাবার সঙ্গে প্রতিমাশিল্পের কাজে যুক্ত হয়েছেন। প্রদীপ পাল কুমোর পাড়া ছাড়িয়ে একটু দূরে তৈরি করছেন দুর্গা প্রতিমা। চঞ্চল পাল উৎসবের দিনগুলোতে ব্যস্ত থাকেন খুব। তাঁর মূর্তির চাহিদা আমাদের কৃষ্ণনগরের বারোয়ারি গুলিতে খুবই বেশি। পাশাপাশি চঞ্চল পালের তৈরি মূর্তি পৌঁছে যায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করি ষষ্ঠীতলা কুমারপাড়া এলাকায় মূর্তি তৈরির জন্য বিস্মৃত জায়গার বড় অভাব তার ফলে এখানকার বেশিরভাগ শিল্পী বিভিন্ন পূজোমণ্ডপ অথবা বারোয়ারিতে গিয়ে মূর্তি তৈরি করেন।

মনে পড়ে যাচ্ছে কুমোরপাড়ার সুধীর পালের কথা। কুমোরটুলিতে মৃৎশিল্পকেন্দ্র ছিল তাঁর। কুমোরপাড়ার রাম পাল, শ্যাম পালও উল্লেখযোগ্য শিল্পী ছিলেন।
কৃষ্ণনগরের ছুতোর পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরি করেন অক্ষয় পাল। আমার প্রিয় এই মানুষটি। খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছি। একসময়ে এই পাড়াতেও আমি বহুদিন ছিলাম। তার ছোট্ট ঘরে দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি ছোট-বড় বেশকিছু প্রতিমা তৈরি করেন প্রতি বছর। তাঁর কালী, সরস্বতী এবং জগদ্ধাত্রীর চাহিদা খুব বেশি। কৃষ্ণনগরে কিছু পুরোনো বারোয়ারি এবং বাড়ির পুজোর দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করেন সাবেকিঘরানায়। একচালির প্রতিমায় তিনি সিদ্ধহস্ত। প্রতিমার টানা টানা চোখ, জরি চুমকির ঝকমকি আমাদের আকর্ষণ করে খুব।
কৃষ্ণনগরের নতুন বাজার অঞ্চলে প্রতিমাশিল্পীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের মধ্যে মহেশ পাল, সোমনাথ পাল, সুবল পাল, দেবেন পাল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাজবাড়ীর দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করেন সাধন পাল। নতুন বাজারের শিল্পীদের মধ্যে বেশ নামডাক সুবল পালের। তাছাড়া একসময় বিখ্যাত প্রতিমাশিল্পী বদ্রীনাথ পালের কথা উল্লেখ করতে হয়। অলোক পাল, প্রবীর পাল প্রতিমা নির্মাণে বিশেষ দক্ষ।

কৃষ্ণনগরের প্রতিমা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুবল পাল। সুবল পাল আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।তাঁর সুসন্তান রাজীব পাল প্রতিমা নির্মাণে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় পুরোনো দিনের বহু কথা শোনা গেল। বাবার কাছ থেকেই তাঁর এই কাজ শেখা। সুবল পাল সারা ভারতবর্ষে প্রতিমাশিল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পেরেছিলেন, সম্পূর্ণ মাটির তৈরি (সাজও মাটির) তার প্রতিমার চাহিদা ছিল ভারতবর্ষজুড়ে। কুমোরটুলিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন তিনি। তারপর কৃষ্ণনগর পালপাড়া অর্থাৎ রথতলায় এসে প্রতিমা তৈরি করতে শুরু করেন। ওই অঞ্চলে তিনিই প্রথম প্রতিমা নির্মাণ করতে থাকেন পরবর্তী সময়ে আরও অনেকে ওই অঞ্চলে প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই অঞ্চলে মূলত এক সময় মাটির তৈরি ব্যবহার্যসামগ্রী তৈরি হতো অর্থাৎ মাটির সরা, কলসি, হাঁড়ি নানা ধরনের পাত্র। এই মুহূর্তে অনেকগুলি পরিবার প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। পুজো এলেই এই পাড়া আনন্দে মেতে থাকে। রাজীব পালের সঙ্গে কথাবার্তায় জানতে পারলাম এই দু-বছর প্রতিমা বিশেষ তেমন চাহিদা নেই। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ক্লাব বারোয়ারির জন্য প্রতিবছর তাঁর স্টুডিওতে অন্তত ৫০/৬০টি দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয়। এই কাজের সাথে যুক্ত থাকেন প্রায় ১০০ জন কর্মচারী। পাশাপাশি এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য নিয়োজিত থাকেন অসংখ্য শিল্পী। কাঠামো তৈরি, মাটির জোগান দেওয়া, ছাঁচ তৈরি, মাটি শুকোনো, রং করা ইত্যাদি কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। কৃষ্ণনগরের প্রতিমার মাটির সাজের বিশেষত্ব ঠাকুরের চালায় বিভিন্ন ধরনের কল্কার ব্যবহার। যেহেতু ঠাকুরের অলংকার (হার, কানের দুল, মাথার মুকুট, বালা, চুরি প্রভৃতি গহনা) তৈরি হয় মাটির সুতরাং কাজের সূক্ষ্মতা বজায় রাখতে হয়। পাশাপাশি প্রতিমার চুলও মাটির তৈরি। বিভিন্ন ধরনের ছাঁচ প্রস্তুত থাকে আগেই। ছাঁচে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন। বিশালাকৃতির চালায় নানান ধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ মাটির কল্কা ব্যবহার করা হয়। খুবই পরিশ্রমের কাজ। মনে রাখতে হবে ছাঁচ এই সমস্ত ডিজাইন তৈরি হলেও তা কিন্তু কাঁচা অবস্থাতেই লাগানো হয়। সুতরাং বহু আগে থেকে তা তৈরি করে রাখা যায় না।

প্রতিমাশিল্পকে ঘিরে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে সমস্ত স্টুডিওগুলোতে।একটি প্রতিমার কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সম্পূর্ণতাপ্রদান পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। পলিমাটি, এঁটেল মাটি, বালিমাটি, বিচুলি, তুঁশ, শিরিষ কাগজ, আঠা, বাঁশ, রং, পাট কত কিছুরই না ব্যবহার। আমাদের জলঙ্গী নদীর পলিমাটি এই প্রতিমা নির্মাণে বিশেষ উপযোগী।বর্ষার জল নামতেই নদী তীরবর্তী অঞ্চল থেকে পলিমাটি সংগ্রহ শুরু হয়। তাছাড়া চাষের জমির এঁটেলমাটি প্রতিমা গড়ার কাজে খুবই প্রয়োজন। পলিমাটি এবং বালিমাটির মিশ্রণেই ঠাকুরের সারা দেহ তৈরি করা হয়। তাছাড়া মাটির সাজের প্রতিমার ক্ষেত্রে যেসমস্ত গহনাগুলি তৈরি করা হয়, সেই গহনা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় পলিমাটি এবং তার সঙ্গে মেশানো হয় পাট। ঠাকুরের কাপড় তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় পলিমাটির সঙ্গে পাট। মনে রাখতে হবে ঠাকুরের মুখ চুল ইত্যাদি তৈরির জন্য প্রথমত ব্যবহার করা হয় পলিমাটি। ঠাকুরের মুখ তৈরির সময় প্রথমে যে ডাইস তৈরি করে নেওয়া হয় সেই ডাইসে প্রলেপ দেওয়া হয় পলিমাটির, তারপর পাট ও তুঁশ মিশিয়ে একটা স্তর তার উপর চাপানো হয়। তারপর তার উপর দেওয়া হয় এঁটেল মাটি। পরবর্তী সময়ে ডাইস থেকে সেটি তুলে নিয়ে বেলেমাটি দিয়ে মসৃণ করা হয়। তারপর সেটা শুকোতে গেলেই দেখা যাবে সেই মুখ ফেটে যাচ্ছে, তখন আবার বেলেমাটি দিয়ে সেই ফাটা জায়গাগুলি ভরাট করা হয়। তারপর শিরিষ কাগজ ব্যবহার করে জায়গাগুলিকে মসৃণ করে নেওয়া হয়। ঠাকুর দ্রুত রঙ করার জন্য এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়েছে, বিশেষত স্প্রে মেশিনকে কাজে লাগানো হয়, যাতে খুব তাড়াতাড়ি রঙ সম্পূর্ণ করা যায়। আগে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার বেশি থাকলেও বর্তমানে তার ব্যবহার অনেক কমেছে। যদিও এখানকার শিল্পীরা চেষ্টা করেন সিসা-মেশানো রঙের ব্যবহার কম করতে। গোলা রঙের ব্যবহারই বেশি হয়।
কৃষ্ণনগরে প্রতিমাশিল্পের কথা বলতে গিয়ে অবশ্যই উঠে আসে কৃষ্ণনগরের প্রতিমার সাজশিল্পের কথা (মাটির সাজ ছাড়াও অন্যান্য সাজ), সারা পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণনগরের প্রতিমার সাজশিল্পের কদর। (চলবে)
অমৃতাভ দে, ‘কথার ঘর’ শিবতলা লেন, ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।
খুব ভালো লাগলো। অমৃতাভদাকে ধন্যবাদ এই উপস্থাপনার জন্য।