আষাঢ় মাসে আকাশে মেঘের ঘনঘটা, গুরু গুরু তান্ডবের ‘ঘন গৌরবে নব যৌবন বরষা’য় আকাশ বাতাস মুখরিত। জীবজগৎ উন্মুখ হয়ে পান করছে সেই অবিশ্রান্ত বারিধারা। এ যেন সুদুর থেকে ভেসে আসা কোন আশীর্বাদ। আষাঢ়-এর নবধারা স্নান শেষে শস্যশালিনী হয়ে ওঠে পৃথিবী। এরই সুখছায়ায় পরিপূর্ণ দিনে শুরু হয় অম্বুবাচী ব্রত।
৫১ শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম পীঠ কামরূপ কামাখ্যায় নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে অম্বুবাচী পালন করা হয়। শিব পত্নী সতী দক্ষযজ্ঞে যখন দেহত্যাগ করলেন, ক্রুদ্ধ শিব তখন পত্নীর দেহটি নিয়ে তাণ্ডবরত হলেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম দেখে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে ধীরে ধীরে ছেদন করলেন দেবীর দেহ। কামাখ্যা মন্দিরে দেবীর গর্ভ ও যোনি পতিত হয়; তাই এই স্থানকে যোনিপীঠ বা তীর্থচূড়ামণি বলা হয়। কামরূপ যোনিপীঠ তন্ত্রসাধনার শ্রেষ্ঠ স্থান। প্রসিদ্ধি আছে দেবী কামাখ্যাও অম্বুবাচীর দিন রজঃস্বলা হন। একটি ত্রিকোনাকার শীলা খন্ড ভেদ করে গৈরিক জলস্রোত প্রবাহিত হয়। এই কল্পনার উৎস এক অলৌকিক জলপ্রবাহ। দেবিকা কামাখ্যা রজঃস্বলা হন — এই ধারণাকে কেন্দ্র করে সমস্ত দেবী এই তিন দিন রজঃস্বলা অবস্থায় বিশ্রাম করেন। ফলে সমস্ত ভারত জুড়ে মন্দিরে মন্দিরে দেবী মূর্তির মুখের ওপর আবরণ প্রদান করা হয়। এই সময় কোন পূজা গ্রহণ করা হয় না কারণ দেবীদেহ যে অশুচি। এই ব্রতের মাধ্যমে পৃথিবী, দেবী ও নারী যেন একাকার হয়ে যান।

প্রতি বছর ৭ই আষাঢ় সূর্য যখন মিথুন রাশিতে প্রবেশ করে সেই সময় অম্বুবাচীর প্রবৃত্তি শুরু হয় এবং ১০ ই আষাঢ় ব্রতের নিবৃত্তি। অর্থাৎ ইংরেজির ২২শে জুন শুরু হয়ে ২৬ জুন, সোমবার দুপুর ২টো ৫৬ মিনিটে ব্রত শেষ হবে।
কামরূপে অম্বুবাচীকে বলা হয় আমতি। অম্বুবাচীর প্রথম দিন থেকেই বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। প্রথম দিনটিকে বলা হয় পহিলি রজ, দ্বিতীয় দিন থেকে শুরু হয় মিথুন মাস বা মিথুন সংক্রান্তি এবং তৃতীয় দিনটি হল বাসি রজ। চতুর্থদিনে পালিত হয় বসুমতী স্নান।
অসমে বিধবা ও ঋতুমতী নারীরা এই ব্রত পালন করে। বিশ্বাস করা হয়, অম্বুবাচীর তিন দিন জননী বসুমতি রজঃস্বলা হন বলে তিনি অসুস্থ থাকেন। এই সময় মাটি কাটা নিষেধ। কৃষকদের জমিতে হাল চাষ করতে নেই অর্থাৎ মাটি বা বসুমতি পৃথিবীতে কোন আঘাত করতে নেই। মাটিতে বীজ ছড়াতেও নেই। বিশ্বাস করা হয়, উই পিঁপড়ে কেঁচো বা শুয়োর এই ধরনের কোন জীব যারা মাটি খোঁড়ে, তারা অব্দি মাটি খোঁড়ে না। বীজবপন, পিতৃতর্পন, ভূমি কর্ষণ এই সময় নিষিদ্ধ।
নারীরা অত্যন্ত নিয়ম ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করেন। এই তিন দিন আগুন জ্বালানো হয় না এবং বিধবারা রান্নাকরা বা আগুন স্পর্শজনিত খাবার খান না। কাঁচা দুধ ফল, সাবু ইত্যাদি খান। বিশ্বাস করা হয় এই সময় দুধ খেলে সাপে কাটার ভয় থাকে না। এই তিন দিন অতিক্রান্ত হলে প্রত্যেকটি গৃহ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়। বাড়ির সমস্ত জামা কাপড় কেচে ধোয়ার পর শুচিতা লাভ করে।

অম্বুবাচীতে প্রবল বর্ষণ শুরু হলে পৃথিবী জলসিক্তা হন। অসমে বৃষ্টিপাতের হার অধিক। তাই কামরূপে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলসিক্তা সবুজ ধরণী রজঃস্বলা হয়েছেন ভক্তের দৃষ্টিতে। নারীর মতো পৃথিবীও ঋতুমতি হন। হবে নাই বা কেন! ধরিত্রী যে মা — সৃষ্টির আধার। তার উদর থেকেই সমস্ত জীবকূলের সৃষ্টি, আবার সেখানেই লয়। প্রাচীন ঋষি ও শাস্ত্রকরগণ বসুমাতার মধ্যে বিশ্ব রহস্যের ছায়া দেখে বিস্মিত হয়েছেন। আর সেই বিস্ময় ও শ্রদ্ধা থেকে সৃষ্টি হয়েছে নানারূপ কল্পনা, উৎসব, অনুষ্ঠান ও ব্রতকথা।
অম্বুবাচীর কয়েক দিন ফলাহারের যে নিয়ম আছে তার পিছনে যে কারণটি সর্বাধিক যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয় তাহলো প্রবল বৃষ্টির সময় চারিদিকে জলপূর্ণ হয়ে থাকে। সেই সময় জ্বালানি কাঠ সিক্ত হয়ে যায়। ফলে রান্না করা প্রায় অসম্ভব। এর জন্যই ফলাহারের ব্যবস্থা। এবং এই জন্যই আগুন জ্বালানো বা মাটিতে রেখে কিছু গ্রহণ করা হয় না।ঋতুমতী অবস্থায় মেয়েদের শারীরিক কষ্ট হয়, সেসময় তাদের বিশ্রাম ও ঠিকমত খাওয়া দরকার। তাই হয়তো এই নিয়মের সৃষ্টি।
কিন্তু এই ব্রতের সৃষ্টির সঙ্গে বৈধব্যের কোন যোগ নেই। তবু একসময় এত কঠোরভাবে এই প্রথা বাংলার বিধবা মেয়েদের উপর প্রযুক্ত হতো যা নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
৭ই আষাঢ় সূর্যের দক্ষিণায়ণ শুরু হয়। এই সময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে অসমে বৃষ্টিপাত আরম্ভ এবং পরে অন্যত্র। কিন্তু দক্ষিণায়নের দিনটি ধীরে ধীরে পিছুতে থাকে। এই নিয়ম অনুসারে প্রাচীনকালে আষাঢ়ে অম্বুবাচী হতো না। এটি কখনো শ্রাবণে, ভাদ্রে বা আশ্বিন মাসে হতো। সূর্যের গতিপথের পরিবর্তন এখনো কিছু কিছু রীতির মধ্যে অম্বুবাচী ব্রতের ছায়া রেখে গেছে। যেমন শ্রাবণের সংক্রান্তিতে মনসা পূজা — এই সময় উনুনের মধ্যে সিজ বা মনসা গাছের ডাল পুঁতে দেবীকে দুগ্ধ দানের রীতি রয়েছে।
বর্ষায় সাপের গর্ত জল ঢোকে। তাই তারা আশ্রয়ের জন্য গৃহস্থের নিভন্ত উনুনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। সর্প ভয় থেকে মুক্তি লাভের জন্যই সর্প পূজা করা হয়।
তেমনি বর্ষায় রন্ধনের অসুবিধা থেকে অরন্ধন ব্রতের সৃষ্টি। এই অরন্ধন ব্রতটি অম্বুবাচীরই আরেক রূপ।

ভাদ্র মাসেও বিশেষ অঞ্চলে অরন্ধনে নিয়ম প্রচলিত আছে। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি বাঁকুড়া অঞ্চলে একটি অনুষ্ঠান পালিত হয় সেই অনুষ্ঠানটির নাম ‘খই ধারা।’
বর্ধমানে এই অনুষ্ঠানটির নাম হল ‘খই দই।’ লোকে সেদিন বাড়িতে কোন অন্ন-ব্যঞ্জন রাঁধে না। খৈ, মুড়ি মুরকি, চিঁড়ে, দই ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। এই আচারটিও প্রাচীনকালের অম্বুবাচীর স্মৃতি বহন করে চলেছে।
পন্ডিতদের মতে শ্রাবণ সংক্রান্তিতে অম্বুবাচী হয়েছিল প্রায় ৩৫০ বছর আগে। ভাদ্র মাসে অম্বুবাচী হয়েছিল তারও প্রায় হাজার বছর আগে অর্থাৎ সূর্যের অয়নপথের তারতম্যের জন্য বর্ষার আগমনের সময়টিতে তারতম্যের সৃষ্টি হয়েছে। যখনই বর্ষা আসে তখনই বসুমতী মাতা বর্ষার নতুন জলে সিক্ত হয়ে ওঠেন তখন তাকে ঋতুমতী নারী রূপে আরাধনা করেন শাস্ত্রকারগণ। আর তখনই অম্বুবাচী পালিত হয়। সূর্যের অয়নপথের এক বিশেষ ক্ষন এই কয়েকটি দিন।
বর্ষায় সিক্তা পৃথিবী নতুন বছরে নতুন ফসল উৎপাদনের উপযোগী হয়। হিন্দু ধর্মে নারীকে দেবী হিসাবে সম্মান জানোনো হয়। প্রকৃতিকে রসসিক্ত করে এই সময় শুষ্ক ফলাদি আহার ও সংযম জীবন মানুষের ধর্মজীবনকে অগ্রসর করায়। এই তিথি কেবল বিধবাদের জন্য নয়, এ কৃচ্ছ্রতাপূর্ণ জীবনযাপনে উৎসাহী মানুষের কাছে সমাদরের ক্ষণ বা তিথি।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ডঃ শিলা বসাক, ডঃ পূর্বা সেনগুপ্ত এবং অন্যান্য।
প্রকৃতির আর এক রূপ নারী* নারীর মধ্যেই আমার প্রকৃতি দর্শন এবং মনে করি
নারী শব্দটি ঈশ্বর রূপী এক বিশেষ উপলব্ধি যা আমাদের ধর্ম এবং কর্মকে ভীষণ
ভাবে প্রভাবিত করে রেখেছে।প্রকৃতির সমস্ত লক্ষন গুণ নারীর মধ্যে লক্ষ করা
যায়। হিন্দু ধর্ম এই প্রকৃতির বিশেষ রূপটিকে যথাযোগ্য সন্মান দিয়ে নারীকে দেবীর আসনে বসিয়েছে।সমস্ত পূজা অর্চনা ধ্যান জ্ঞান যেন তাকে কেন্দ্র করেই
সঞ্চালিত। প্রকৃতির প্রতিনিধি নারীর অঙ্গে তাই প্রকৃতির মতোই বিভিন্ন পরিবর্তন
লক্ষিত স্বীকৃত। ঋতু পরিবর্তন প্রকৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য আর ঋতুমতি হওয়াও
নারী দেহের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
নারী শুধু ভোগ্য সামগ্রী নয়,সে রচয়িতা সৃষ্টির প্রকৃত বিশ্বকর্মা সেই,কিন্তু সৃষ্টির
প্রয়োজনেই নারীদেহের গোপনাঙ্গে অনেক পরিবর্তন পরিলক্ষিত যেমন নারীর
ঋতুমতি হওয়া। কিন্তু এই সময় তার দেহ অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়ে
সে পুরুষের কামনার আগুন সহ্য করতে পারেনা তাই বোধহয় মাসের এই কটা
দিন তারা পুরুষের সান্নিধ্য থেকে দুরে থাকে। এই ঘটনাক্রমকে মহিমামন্ডিত
করে বিভিন্ন ব্রত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।অম্বুবাচী,অরন্ধন সেই প্রথা
কেই ব্রত পূজা আয়োজনের দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
ঘৃণা অবহেলা শোষণ প্রভৃতির আঘাতে নারী আজ দলিত মথিত।সমস্ত দেবী সাজ
তাকে রক্ষা করতে অপারগ।আপনার এই প্রতিবেদন নারীদের লজ্জা নিগ্রহের
আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হবে বলে মনে করি।
শ্রীমতি রিঙ্কি আর পেজ ফোরকে এই সুন্দর প্রতিবেদন উপহার দেওয়ার জন্য
ধন্যবাদ।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এত সুন্দর একটা কমেন্টের জন্য।
মেয়েদের পালিত ব্রতানুষ্ঠানের মধ্যে আদিম জনমানুষের ইতিহাস লুকানো রয়েছে ।এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে বৈদিক আচরণ এবং হিন্দুর শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান। ব্রত পালনের সম্ভাব্য লক্ষ্য গুলি হল–উপবাসে থাকলে শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে, পুজো উপলক্ষ্যে বছরে ফল অন্যান্য জিনিস খাওয়া হয়, সংসারের কর্মব্যস্ততার মধ্যে বিশ্রাম হয় ,সর্বোপরি মেয়েদের মনে ভক্তি একাগ্রতা ত্যাগ তিতিক্ষা নিয়ম সংযম ও নিষ্ঠার আদর্শ গড়ে ওঠে।
প্রতিটি বিশেষ দিনে তোমার তথ্যসমৃদ্ধ লেখা পড়তে খুব ভালো লাগে।