গত ২৯ জুন, ২০২৩। সদ্য অতিক্রান্ত মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাপ্রয়াণের সার্ধশতবর্ষ (১৮৭৩-২০২৩)। আগামীতে দ্বিশতবর্ষ অতিক্রম করলেও মধুসূদন চর্চা যে থিতিয়ে পড়বে না ত্রিপুরা হিতসাধনী সভাঘরে সম্প্রীতি আকাদেমি গত ২৮ জুন তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শ্রুতকীর্তি অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে ও ধীমতি অধ্যাপিকা মুনমুন চট্টোপাধ্যায়ের মধুসূদন বিষয়ক বক্তৃতায় উপস্থিত সুধীজনদের আবহমান কালের মধুসূদন পাঠের ভিত নড়ে উঠেছিল বৈকি। শ্রীমিদ্দে তাঁর পল্লবগ্রাহী প্রতিভায় দীর্ঘবাচনে যেভাবে মধুসূদন বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন উত্থাপন করছিলেন সেগুলি যে গবেষণার নতুন দিক উন্মোচন করে থাকে শোতৃমণ্ডলী তা ঢের বুঝে থাকবেন।
অপরদিকে শ্রীমতি চট্টোপাধ্যায় ভাবয়িত্রী প্রতিভাবলে সর্বভারতীয় অনুবাদ সাহিত্য ধারায় মধুসূদন ও তাঁর সৃষ্টি-সম্ভার কতখানি প্রভাব ফেলেছে সে বিষয়ে এক অনালোকিত দিকের হদিশ দেন। মিতবাক হলেও তাঁর পরিশ্রমী মনন তথ্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাগর্ভ। প্রাজ্ঞজনের মন কেড়ে নেয়। তবে সভামুখ্যের দু-চারটি নজির মধুসূদন চর্চায় নতুন মাত্রা সংযোজন করে। উক্ত আলোচনাসভা থেকে শ্রীমিদ্দে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নামাঙ্কিত রাস্তা ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সোচ্চার হন। উপস্থিত সকলেই উনার প্রস্তাবকে করতালির দ্বারা সাধুবাদ জানিয়ে সহমত পোষণ করেন।

অনুষ্ঠানের মধ্যভাগে ‘ইচ্ছে ডানা’র তিনমূর্তি (রনজিৎ মৈত্র, মধুকর মৈত্র ও মনীষা আচার্য)-এর সমবেত কন্ঠে মাইকেলের গানের সুরারোপে যে গায়কী, সভাঘরকে তা মুগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে।
তবে উক্ত সভার প্রধান আকর্ষণ ছিলেন শ্রীসমীরণ দাস মহাশয়। হোমার, বাল্মীকি, ভার্জিল ও কালীদাসের মতো সব বিশ্বমনীষার চিত্ত-ফুলবন-মধু আহরণ করে মাইকেল যে অনিন্দ্য সুন্দর মধুচক্র রচনা করেছিলেন, শ্রীদাস তাতে বিস্ময়, প্রেম ও কল্পনা মিশিয়ে তিন খণ্ডে প্রকাশ করেছেন “মধুময় তামরস”। পাঠকের কাছে অনন্য ও অভিনব সে জীবনভিত্তিক উপন্যাসের আস্বাদন। সেজন্য তিনি “পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি-২০২৩” পুরস্কার পেলেও সম্প্রীতি আকাদেমি তাঁকে “সম্প্রীতি সম্মান-২০২৩” প্রদানের মধ্যে দিয়ে সম্প্রতি ও ভাবীকালের মধুসূদন চর্চায় গতিবেগ সঞ্চার করে থাকে। তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণও সকলের চিত্ত আকষর্ণ করে থাকে। এই পর্বে প্রান্তিক স্তর থেকে তুলে নিয়ে এসে দু-জন ছাত্রকে — গৌতম অধিকারী ও গণেশ যোদ্দারকে তাদের গবেষণার দৃষ্টিকে আরও স্বচ্ছ করে তোলার লক্ষ্যে পুরস্কৃত করা হয়। যে উদ্যোগ নজিরবিহীন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল পুস্তক প্রকাশ। মনোজ মণ্ডল, সুশীল সাহা, সমীরণ দাস ও সুরঞ্জন মিদ্দে প্রমুখের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে সম্প্রীতি আকাদেমির প্রথাগত রীতি অনুযায়ী ফুলের পাপড়ির আবরণ উন্মোচনে প্রকাশ পায় মুফতি তাহেরাজ্জামান সম্পাদিত ‘সাগর দাঁড়ি স্টুডিও’ থেকে প্রকাশিত ‘মহাকবি মধুসূদন স্মৃতি অ্যালবাম’। মধুসূদন গবেষণার যা নবদিগন্ত।
সার্বিকভাবে আলোচনা সভাটি কতখানি মনোজ্ঞ তা উপলব্ধ হবে শ্রোতা ছিলেন কারা তা জানলে। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কবি সুশীল সাহা ও সুপরিচিত লেখক ও সংগ্রাহক নিরঞ্জন মণ্ডল। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মিল্টন বিশ্বাস, কলকাতার কে.সি দাস কলেজের অধ্যাপিকা শম্পা ভট্টাচার্য, খিদিরপুর কলেজের অধ্যাপক মনোজ মণ্ডল, হিঙ্গলগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ শেখ কামালউদ্দিন, চন্দ্রকোণা কলেজের অধ্যাপিকা সোনা মণ্ডল, বিদ্যাসাগর কলেজ ফর উইমেন-এর অধ্যাপক গণেশ হেমব্রম, অধ্যাপক সঞ্জীব হাঁসদা এবং আরও অনেক কৃতবিদ্য অধ্যাপক-অধ্যাপিকা ও গবেষকবৃন্দ।

যে কথা না বললেই নয়, সঞ্চালকদ্বয়ের কণ্ঠের জাদু ও ভাষাচয়নের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা সার্বিকভাবে হয়ে উঠেছিল মধুময় ও মগ্ননিষ্ঠ।
পুনশ্চ বলতেই হবে, একদিকে আকাদেমির সম্পাদক শ্রীমিদ্দে মহাশয়ের সম্যক প্রীতিময় খ্রিস্টীয় চৈতন্য, অন্যদিকে সভাপতির নির্বাণলব্ধ বৌদ্ধিক বিবেকের সাধু উদ্যোগ শুধু যোগ্যজনদের সম্মান প্রদানে নয়, দর্শক, শ্রোতা তথা বুধমণ্ডলীর সারস্বত-কর্ষণাকে আরও একবার শানিত করলেন উক্ত আলোচনা সভা আয়োজন করে। একটু সংযোজন করা যাক, সরকারি উদ্যোগে অন্তত এই সময়ে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত গবেষণাগার ও চর্চা কেন্দ্র স্থাপনের বাস্তবায়ন আশু কর্তব্য।