বেশ কিছুদিন ধরেই বাজার অগ্নিমূল্য। টমেটোর দাম সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। কয়েকদিন তো দাম একশো ছাড়িয়ে দেড়শোর কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল। একই পথে দাম বেড়েছে সব রকমের আনাজের। বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ হারে। কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে দ্বিগুন থেকে তিনগুন। কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা ৩০০ টাকা কেজি। টমেটো, উচ্ছে, বরবটি, বেগুন, কাঁকরোলের দাম ১০০ টাকার ওপরে। গাজর, ঢেঁড়শ, ঝিঙে, পটল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আদা, কাঁচালঙ্কার দাম ৩০০ টাকা কেজি উঠেছিল। এককথায় গরিব-মধ্যবিত্ত পরিবারে ভয়ানক সঙ্কট। প্রতিদিন এই সঙ্কটের আঁচে জ্বলছেন মানুষ।
এই হারে আনাজের দাম বাড়লে উচ্চবিত্তের গায়ে তেমন লাগে না। তারা সামলে নিতে পারেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তদের নাজেহাল অবস্থা হয়।কারণ, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত যাদের সংখ্যা এদেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, তাদের আয়ের বেশির ভাগটাই খরচ হয় পেট ভরে খেতে। ফলে সেই খাওয়ার জোগান দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়েই আর অন্য প্রয়োজনীয় খরচের টাকা আর থাকে না। যদিও আমাদের মতো দেশে সরকারের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হল খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যাতে খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে নাজেহাল না হন সেদিকে খেয়াল রাখাই সরকারের অন্যতম দায়। কিন্তু এসব কথা বহুকাল আগেই অধিক চর্চায় ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। বাস্তবে কি কেন্দ্রে, কি রাজ্যে সরকার সেই দায় অস্বীকার করছে। সরকার বরং এসব দায় জগেড়ে ফেলে দিতেই চায় কারণ, সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি রাখা বা নিয়ন্ত্রণের জন্য হস্তক্ষেপ করার কোনও হাতিয়ারই সরকারের হাতে নেই।
গত এক বছর ধরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উচ্চ হারে মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে মাঝে মাঝেই সুদের হার বাড়িয়েছে আবার তাড়াহুড়ো করে সেটা স্থগিত রেখে কর্পোরেট দুনিয়ার বাহবা কুড়িয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের ফানুস আকাশে উড়তে না উড়তেই গ্যাস ফুরিয়ে গিয়ে ফের মাটিতে নেমেছে। যে কারণে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও নিশ্চিত হতে পারছে না যে মূল্যবৃদ্ধি স্থিতিশীল হবে কি হবে না। সরকারের এ ধরণের ব্যর্থতা-অপদার্থতা যদিও খুব দ্রুত মিলিয়ে যায় যায়। কেউ কেউ দায় এড়াবার জন্য এমনটাও বলার চেষ্টা করেন, সব দেশেই তো মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তাহলে শুধু আমাদের দেশের সরকারকে গাল দেওয়া কেন? কিন্তু তারা কি এটাও জানেন না, ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশের মূল্যবৃদ্ধি আর ভারতের মূল্যবৃদ্ধিকে এক পাল্লায় ফেলে মাপা যায় না। কারণ আমেরিকা-ইউরোপে মূল্যবৃদ্ধি হলে তেমন ভাবে মানুষের গায়ে লাগে না। সেসব দশের মানুষের আয় এতটাই বেশি যে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মতো তাদের দুঃসহ অবস্থায় পড়তে হয় না।আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের যা আয় তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই সামান্য দাম বাড়লেই সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এবার দাম বাড়ার প্রসঙ্গ। টমেটোর দাম সেঞ্চুরি করলো কেন ? আমাদের দেশে রবি ও খরিফ, দুই মরশুমেই টমেটো চাষ হয়। রবি মরশুমে দেশের প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়। আর, রবি মরশুমে টমেটো চাষ হয় প্রায় ৮ থেকে ৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে। মহারাষ্ট্রের জুন্নার, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অংশে রবি মরশুমে টমেটো জন্মায়। যে টমেটো মার্চ মাস থেকে আগস্টের মধ্যে বাজারে চলে আসে। আগস্টের পরে খারিফ মরশুমে, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রের নাসিকে যে টমেটো চাষ হয় তা দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ হয় তার পরেই। তাহলে এই বছর সমস্যাটা কী হল? উল্লেখ্য এপ্রিল-মে মাসে টমেটোর দাম হঠাৎ কমে গিয়েছিল। তার জেরে বহু কৃষক তাঁদের ফসল ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু তার থেকেও বড় কারণ মার্চ-এপ্রিল মাসের অস্বাভাবিক তাপ আর কীটপতঙ্গের আক্রমণ ঘটে। কীটপতঙ্গের আক্রমণে থেকে টমেটো বাঁচাতে কৃষকদের অতিরিক্ত পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। সেজন্য খরচও বেশি হয়, তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হন।তারপরও টমেটো চাষের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। যে কারণে ব্যবসায়ী আর চাষিদের বক্তব্য, কিছু দিনের মধ্যে এই দাম কমার কোনও আশা নেই।
আদার দামও রেকর্ড করেছে। দেশের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি যেমন সিকিম-মণিপুর থেকে এ রাজ্যে প্রচুর আদা আসে।তাছাড়া এ রাজ্যে আদার চাষ হয় মূলত উত্তরবঙ্গে। উত্তরে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং মণিপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠার জন্য আদার জোগানে টান পড়েছে। এই ঘাটতির জন্যই আদার দাম এবার কেজিতে ৪০০ টাকা ছুঁয়েছে। প্রসঙ্গত, এ বছর অতিরিক্ত গরমে অনেক সব্জিরই ফলনই তুলনায় কম। গরম এবং বৃষ্টি সে ভাবে না হওয়ায় বহু ফসল শুকিয়ে নষ্ট হয়েছে। বৃষ্টির জলের অভাবে ঘটলে সেচের মাধ্যমে জল দেওয়ার দরকার হয়।কিন্তু সব কৃষকদের পক্ষে পাম্প চালিয়ে সেই অতিরিক্ত খরচ টানতে পারেন না। ফলে ফলন কম হয়েছে। আর তার জেরে দাম আকাশছোঁয়া।
সব্জির দাম অগ্নিমূল্য কেন,খানিকটা বোঝা গেল। এই প্রতিবেদনের জন্যে লেখককে ধন্যবাদ।