চার
এখন কল্পনা যদিও একটি বিশিষ্ট মানবীয় শক্তি তবু উপাদান-সংগ্রহ এবং সক্রিয়তার জন্য তাকে মানুষের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, অনুভব, বৃত্তি এবং ভাবের উপরে নির্ভর করতে হয়। নানা ধর্মের মধ্যে মানবকল্পনার যেসব বিচিত্র প্রকাশ চোখে পড়ে তা থেকে দু’একটা সম্ভাব্য সূত্রের এবং সেইসব সূত্রের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নের উল্লেখ করে এই আলোচনায় আপাতত ইতি টানব।।
সন্ত্রাসবোধ এবং তা থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা সম্ভবত সব প্রতিষ্ঠিত ধর্মেরই একটি সামান্য লক্ষণ। এই সন্ত্রাসবোধ স্বাভাবিক, এবং এ থেকে কোন মানুষই যে কোনদিন সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবেন এমন আশা আমার অন্তত নেই। মানুষের তুলনায় যে বিশ্বপ্রকৃতিতে তার বাস তা এতই বিরাট যে অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তার সম্পর্কে কোন নির্ভরযােগ্য ধারণা করাই কঠিন আংশিকভাবে ছাড়া এই বিশ্বপ্রকৃতির মানবীয় নিয়ন্ত্রণ অকল্পনীয়। ভূমিকম্পে, প্লাবনে, ঝড়ঝঞায় প্রকৃতির প্রবল এবং উদ্দেশ্যহীন শক্তি বারবার ব্যক্ত হয়, এবং এই অভিজ্ঞতার ফলে মানুষের অসহায়তা হ্রাসচিহ্নিত হয়ে ও ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা ছাড়াও মানুষের সন্ত্রাসের অন্য বহু কারণ আছে। মৃত্যু প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই অনিবার্য; যৌবনের পরে জরাকেও কেউ ঠেকাতে পারে না; অধিকাংশ মানুষের জীবনের ব্যাধি প্রায় নিত্যসঙ্গী। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, দুর্বলের উপরে প্রবলের অত্যাচার, আহার এবং আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা—পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এইসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষে পরিচিত। দেহের ঘেরের দ্বারা আমরা প্রত্যেকেই অপর থেকে বিচ্ছিন্ন, অথচ বাঁচবার প্রয়ােজনে আমাদের যেমন আহার এবং আশ্রয় দরকার তেমনি দরকার স্নেহ-ভালোবাসা-বন্ধুত্বের নির্ভরযােগ্য পারস্পরিক সম্পর্কের। এই সবই দুর্লভ, কিন্তু যদিবা তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা যে টিকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাধি এবং মৃত্যু প্ৰিয়জনকে সরিয়ে দেয়; মনের নানা মর্ষকামী এবং ধর্ষকামী গঢ়ে বন্ধুতাকে রূপান্তরিত করে শত্ৰুতায়, নৈকট্যের জায়গায় আনে অনতিক্রম্য ব্যবধান। ভয় তাই মানুষের অস্তিত্বের অংশ এবং এই ভয় থেকে মুক্তি মানুষ মাত্রেরই কাম্য।
আর এই ভয়ের সর্বজনীন অভিজ্ঞতা এবং তা থেকে উদ্ধারের এই যে সার্বজনিক কামনা—উভয়কে নিজের অঙ্গীভূত করে বলেই কি ধর্মের আবেদন এত ব্যাপক এবং গভীর? যে-সংসারে সবই অনিশ্চিত, সেখানে রবীন্দ্রনাথের মতো আশ্চর্যভাবে সৃষ্টিশীল প্রতিভা বহু সময়ে মনে করেন তার জীবনে “কিছুই তো হল না, সেখানে সব মানুষের না হোক বেশিরভাগ মানুষেরই চাই এমন কোন নিশ্চয়তা যা অবলম্বন করে সে বাঁচতে পারে। এই অনাক্রম্য নিশ্চয়তা শুধু ধৰ্মই দিতে পারে, কারণ ধর্ম যে কল্পনাকে রচনা করে তা অপ্রতক্য কিন্তু নিরাসক্ত নয়। তাকে বিচার করা যায় না, কিন্তু তার উপরে নির্ভর করা যায়। ধর্ম একদিকে মানুষের ভয়, অসহায়তা, যন্ত্রণা এবং ব্যর্থতার একটা ব্যাখ্যা দেয়, অন্যদিকে ধর্ম এই দশা থেকে উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি আনে। প্রতিশ্রুতির আবেদনকে প্রবলতর করার জন্য প্রায় সব ধর্মের মানুষের আত্মপ্রত্যয়কে ক্ষীণ করে হীনতাভাবকে বাড়াবার চেষ্টা হয়। মানুষ মােহমুগ্ধ জীব, অথবা আদিম পাপে তার জন্ম—জাগতিক দুঃখের এই ধরনের ব্যাখ্যার পর আশ্বাস দেওয়া হয় বুদ্ধ, শিব, বিষ্ণু, মহম্মদ অথবা খ্রীস্টের শরণ নিলে আর ভয় থাকবে না। এঁরা প্রত্যেকেই শাহরণ ও দুঃখহরণ—এঁরা করুণা করলে পাপ-তাপ দূরীভূত হয়। যাঁরা হয়তোবা ঐতিহাসিক চরিত্র ধর্মের জাদুতে তারাও দেবতা হন, এবং যেহেতু ভয় থেকে উদ্ধারের ভরসাটাই আসল কথা সেকারণে এই দেবত্বারোপে ভক্তদের আপত্তি কচিৎ উচ্চারিত হয়।
প্রশ্ন হল, ভয়ের অভিজ্ঞতা এবং ভয় থেকে উত্তরণের কামনা যদি মানব অক্তিত্বের সাধারণ লক্ষণ হয় তাহলে ধর্মীয় প্রত্যয়ের উচ্ছেদ কি আদৌ কল্পনায় ? আমরা জানি যে জ্ঞান, কর্ম, শিল্পসাধনা অথবা সেবার সূত্রে কিছু মানুষ ভয়কে সংযত করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা পারে কিযদি না পারে তাহলে ধর্মপ্রত্যয়ই কি তাদের একমাত্র অবলম্বন? ঈশ্বরোনাস্তি সত্ত্বেও ঈশ্বর এবং তার ছাপােষাদের উদ্ভাবন কি মানুষের পক্ষে অবশ্যম্ভাবী যাঁরা প্রচলিত অর্থে ধর্মবিশ্বাসী নন সেই কম্যুনিস্টরাও যখন ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিকতায় এক ধরনের ঐশী সংকটতারণের নিশ্চয়তা আরোপ করেন তখন তার দ্বারা তারা কি মানবীয় দুর্বলতারই প্রমাণ দেন না? ধর্মের স্তোভবাক্য ছাড়া মানুষের চলবে না এ-প্রস্তাব আমার মতো যারা মানুষের আত্মসৃজনক্ষমতায় বিশ্বাসী তাদের পক্ষে অবশ্যই গ্রহণযােগ্য নয়। কিন্তু প্রত্যয় প্রমাণ নয়, এবং ফলে মনের মধ্যে এ-সম্পর্কে জিজ্ঞাসা থেকে যায়।
ভয় যদি মানুষের অস্তিত্বের একদিক হয়, বিকাশের উৎকাঙক্ষা তার অন্যদিক। মানুষ শুধু স্মৃতি আর বর্তমানের ভিতরে নিজেকে নিবদ্ধ রাখে না, তার অতীত এবং সমকাল ভবিষ্যতের কল্পনার সঙ্গে যুক্ত। কোন অবস্থাই মানুষের কাছে শেষ অবস্থা নয়, তা থেকে প্রকৃষ্টতর অবস্থার কথা সে ভাবতে পারে, এবং সেই অবস্থার দিকে যাবার চেষ্টা করতে পারে। এই উৎকাঙক্ষা মানুষের সহজাত বৃত্তি, কোন স্তোভবাক্য বা ঐশ্বরিক-ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির উপরে এটি নির্ভর করে না। মানুষের ইতিহাসে নানাভাবে এই উৎকাঙক্ষা প্রকাশিত হয়-শিল্পসাহিত্যে, অন্বেষণ-উদ্ভাবনে, সমাজসংস্কার ও সমাজবিপ্লবে, ধৰ্মকল্পনায়। এই উৎকাঙক্ষার স্বাক্ষর চক্রযান ও অর্ণবপােতের উদ্ভাবনে, ইলোরার কৈলাস মন্দিরে, নভশূক ক্যাথিড্রালে, স্যার টমাস মােরের “ইউটোপিয়া” গ্রন্থে, নানা দেশের লোকগীতিতে, সমাজতান্ত্রিক এবং নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন এবং আদর্শে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী পরিকল্পনায়। ধর্মের ক্ষেত্রে এই উৎকাঙক্ষা যে কদাচিৎ নয় তার প্রচুর উদাহরণ মেলে। তাহলে যে হীনতাবোধ, নির্বেদ, বস্তুরতি এবং মর্ষকাম বেশিরভাগ ধর্মে প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ তার প্রকরণে এই উৎকাঙক্ষা কি করে টেকে? হয়তো একদিকে সন্ত্রাসবোধ আর তা থেকে অভয়ের স্তোভবাক্য এবং অন্যদিকে বিকাশের উকাঙক্ষা ও উদ্যম প্রতি ধর্মের মধ্যেই বিরাজমান; হয়তো এই বৈপরীত্য ধর্মের মধ্যে গতি সঞ্চার করে।
প্রবলভাবে মানুষের ক্ষতি করে যখন ভয় এবং তা থেকে মুক্তির সংবেশনী প্রতিশ্রুতি ধর্মে প্রাধান্য পায়। অপরপক্ষে, যে ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে বিকাশের সততাবৃত্ত আকল্প সক্রিয় তাদের অগ্রাহ্য করা অসংগত।
কিন্তু বিকাশের উৎকাঙক্ষা যদি কোন ধর্মে প্রাধান্য পায় তাহলে সেই ধৰ্ম কি আর ধৰ্মরূপে বহুজনকে আকৃষ্ট করতে পারে ? শ্রুতি অথবা ধর্মপ্রতিষ্ঠাতার অপ্ৰতর্ক প্রাধিকার, নীতিনির্দেশের পিছনে অতিপ্রাকৃতের সংস্থান, পূজাপ্রকরণের দ্বারা লোভনীয়কে লভ্য করার প্রত্যাভূতি এবং ভয়কে জয় করার আশ্বাস অর্থাৎ ধর্মের লোকসমর্থন যেসব সুত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়—বিকাশের উৎকাঙক্ষা বৃদ্ধি পেলে তার চাপে এগুলির কি অবক্ষয় ঘটবে না? যদি ঘটে তা নিয়ে মাথাব্যথা তাদেরই যাঁরা ধর্মের ক্ষেত্রে মাতব্বর, এবং সেই মাতব্বরীর জোরে সমাজে বিত্ত এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। অপরপক্ষে যাঁরা ধর্মের আদিব্যিক প্রকল্পকে অগ্রাহ্য করেও ধর্মের মধ্যে উৎকাঙক্ষীয় বৃত্তির কিছুটা প্রকাশ দেখে তার কোন কোন রূপকে তারিফ করে থাকেন, তারা এই ঘটনাকে স্বাগত করনে বলেই মনে হয়। প্রেমে, সেবায়, সৃষ্টিতে, সততায় এবং পারস্পরিক সহযােগে এই মানবীয় উৎকাঙক্ষা যদি উৎসারিত হয় তাহলে প্রতিষ্ঠিত ধর্মসমূহের অভিক্রান্তি আদৌ কোন শূন্যতা সৃষ্টি করবে এমন আশঙ্কার কারণ দেখি না। (চলবে)