অনেকদিন পর খোলা হাওয়ায় নিকোলাসের ভাবনারা ডানা মেলল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে পরপর টাইপ হতে লাগল ভাবনার নির্যাস থেকে উঠে আসা বাছাই করা শব্দ। ইংরিজি সাহিত্যের লেখক নিকোলাস মিলানোর জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি সহজ শব্দে গভীর অতলে ডুব দেওয়া। তাঁর প্রিয় পাঠকরা বুঝতেই পারে না হাসতেখেলতে কখন তারা এক জীবনবোধের আয়নার মুখোমুখি হয়ে যায়। এই সুদর্শন ইতালিয় যুবকটির লেখা তাদের কাঁদায়, ভাবায়, চেতনা জাগায়।
নিকোলাসের লেখায় এখন বারবার ফিরে আসছে তার নিজের জীবন, ছোটোবেলা। এখনই কেন পিছন ফিরে তাকানো? এ কিসের ইঙ্গিত? নিকোলাস চুপ করে খানিকক্ষণ বসে থাকে। তার মাথায় টুপটাপ করে ঝ’রে পড়ছে পাকা অ্যাপ্রিকট। বাতাসে তার সুগন্ধ। একজোড়া কৌতুহলী চোখ তাকে অনবরত লক্ষ্য করে । কে জানে মনের ভুল ও হতে পারে।
সদালাপী, হাসিমুখ নিকোলাস অল্পদিনেই গ্রামের লোকের মন জয় করে ফেলেছে। কে বলবে যে এই মানুষটার লেখা বই বেস্ট সেলার!
সে পাহাড়ি কাঠকুড়ুনিকে বলে, “দাঁড়াও তোমার মাথায় কাঠের বোঝাটা তুলে দিই”। বাচ্চাদের খেলার দলে দিব্যি মিশে গিয়ে ফুটবলে লাথি মারে।
পাথরের দাওয়ায় বসে যে সুন্দরী ঠাকুমা রং বেরঙের পাথরের মালা জপে, নিক তাকে ঠাট্টা করে, “বলো তো ঠাকুমা, তুমি যৌবনে কতটা সুন্দর ছিলে?” সে বুড়ি ফোকলা দাঁতে হেসে নিকের গলা জড়িয়ে ধরে। নিক সেই ছোঁয়াতে নিজের ঠাকুমার স্নেহস্পর্শ পায়।
হোমস্টের মালিক মুশার রান্নাঘরে ঢুকে আজকাল নিকোলাস যবের রুটি বানাতে শিখছে। সেদিন বানিয়েছিল খেতের টাটকা সবজি দিয়ে স্যূপ। সে স্যূপ খেয়ে মুশার বৌ কানির আব্দার, “মাঝেমাঝে এরকম স্যূপ বানিয়ে আমাদের খাইও নিকোলাস”। মুশা, তার ছেলে তাহাও দু-বাটি চেয়ে চেয়ে খেল। চোখের ইশারায় তারিফ করল মুশার মেয়ে নিন্নি। সেই চোখ যেখানে সবুজের হাতছানি।
আজকাল নিন্নির কারণে অকারণে নিকোলাসের আশপাশে ঘুরঘুর। নিকোলাসের চোখে ভ্রূকুটি। মনে দ্বন্দ্বের জাল। এমনটা নয়, নিকোলাস নারী সম্পর্কে উদাসীন। তবে তার মনে হয়, ভালোবাসায় বোধহয় বাবার মত তারও অভিশাপ আছে।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় দুটি সম্পর্ক অনেকদূর গিয়েও শেষ পর্যন্ত টেঁকেনি। নিন্নিকে দেখে নিকোলাসের লিন্ডা আর মলির কথা আবার মনে পড়ল। নিন্নি এবং সেই দুই মেয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক ।
সেই পালিশ করা সুন্দরীরা শিক্ষাদীক্ষায় উজ্জ্বল। কথায় তুখোড়। স্মার্টনেসে টগবগে ঘোড়া। ছোটোবেলায় মা-বাপ হারা নিকোলাস শেষ পর্যন্ত মনের আশ্রয় সে সম্পর্কে খুঁজে পায় নি। ইতালির ছোট্ট গ্রামে অশিক্ষিত ঠাকুমাই ছিল তার নিবিড় ছায়া। আমেরিকা থেকে বারবার দৌড়ে যেত সেই আশ্রয়স্থলে। ঠাকুমা চলে যাবার পর সে ভালোবাসাও ছিন্ন হয়েছে। এখন শিকাগোর অ্যাপার্টমেন্টে একলা জীবন আর মনের সঙ্গে তার বসবাস।
এসব ভাবতে ভাবতেই স্বয়ং নিন্নি তার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে সদ্য গাছ থেকে পাড়া আপেলের ঝুড়ি। “তুমি দুটো নাও”, বলে ভাব জমানোর চেষ্টা করল। লজ্জা কমে সে এখন অনেক সপ্রতিভ। নিন্নির সবুজ চোখে প্রণয়, গোলাপি গালের অনুরাগ পড়ে ফেলতে পারে লেখক নিকোলাস। এ পর্বতকন্যা যে পাহাড়ি নদীর মতই স্বচ্ছতোয়া। তবু ঘনিষ্ঠ হতে দ্বিধা নিকোলাসের। নিজেকে নিয়ে। ব্রোকপাদের অনুশাসন ঘিরেও। এদের সমাজ বহিরাগতকে মেনে নেয় না!
“কাল তুমি আমাদের উৎসবে আসবে তো?” নিকের হাতে আপেলদুটি দিয়ে জিজ্ঞেস করল নিন্নি। তার সবুজ চোখে সকালবেলার রোদের ছিলিক।
—কিসের উৎসব?
—’বোনো না’ উৎসব। পাঁচদিন ধরে চলবে। ঐযে দূরে মঠের সামনে ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে গ্রামের সবাই জড়ো হবে।ভন্তে মন্ত্রপাঠ করবেন। আমরা সবাই নাচব, গাইব।
—ঠিক আছে। দেখি।
—না, দেখি না। আসতেই হবে তোমাকে …বলতে বলতে ছুটে পালাল নিন্নি জাদুগরী।
পরের দিন উৎসবের আঙিনায় পৌঁছে নিকোলাস দেখে এ’যে ফুলের মেলা। পুরুষনারী সবার মাথায় রঙিন ফুলের বড় বড় টুপি। মেয়েরা পরেছে ঝুলন্ত ফারের পোশাক। পাথর, পুঁতি, কাঠ, ঝিনুকের গয়না। টুপিতে লাগানো রঙবেরঙের রিবন।
শিঙা ফুঁকছে একদল লোক। মাদল বাজাচ্ছে আরেক দল। জোড়ায় জোড়ায় নাচগান, হাসিতে মত্ত তরুণ তরুণী। নিকোলাসকে দেখতে পেয়েই সব লাজলজ্জার মাথা খুইয়ে নিন্নি হাত ধরে টেনে আনল নাচের দলে।
“তিনবছর পর আজ আবার আমাদের খুশির উৎসব। আজ আমরা ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনিই এ পৃথিবীতে জল দেন, ফল দেন। জোড় বেঁধে দেন মনের মানুষের সঙ্গে।” নিকোলাসের সঙ্গে নাচতে নাচতে নিন্নি ফিসফিসিয়ে এসব কথা তাকে বলছিল। সুন্দরী জাদুগরী আজ কোন জাদুমন্ত্রে জয় করে নিল নিকোলাসের হৃদয়! উৎসব মানুষকে কাছে টানে। দূর করে সব ভেদাভেদ।
পাঁচদিনের ‘বোনো না’ পরবের হৈহুল্লোড় শেষে পাহাড়ি মানুষগুলো একটু ক্লান্ত হল। নিকোলাস আর নিন্নির জীবনমন অবশ্য উৎসবের রঙে, প্রেমে ভরপুর হয়ে আছে। বাতাস বয়ে বেড়াচ্ছে অনেক গুঞ্জন। গাছের পাতায় পাতায় ফিসফিসানি।
গাঁয়ের মোড়ল তাসি মোটেই মেনে নিতে পারছেনা তাদের এই ঘনিষ্ঠতা। সে গ্রামবাসীদের উপদেষ্টা।
—আমাদের ব্রোকপা সমাজ খুব তাড়াতাড়ি আধুনিক হয়ে যাচ্ছে। ধরে রাখতে পারছেনা তার পুরনো ঐতিহ্য। এরপর বিদেশীর সঙ্গে মেয়েদের বিয়ে হলে সমাজে আর কোনো অনুশাসন থাকবে না। আমাদের বংশগৌরব হারিয়ে যাবে।
নিন্নির বাবা মুশা দোলাচলে। মা কানির মন বলছে,
—ও ছেলে খারাপ হতেই পারে না। আমাদের নিন্নিকে ও খুব সুখে রাখবে।
পাহাড়ি মানুষগুলোও নীলনয়ন নিকোলাসকে ভালোবেসে ফেলেছে।
—নিক তো আমাদেরই মত। সোনালী চুল, টকটকেরং, খড়্গনাসা, দীর্ঘকায়, নীলনয়ন। ওর শরীরেও নির্ঘাত আর্যরক্ত বইছে। তবে আর কিসের আপত্তি চারহাত এক করার?
গাঁয়ের মোড়লের সব ওজর আপত্তি সত্ত্বেও বাজনা বাজিয়ে, আলো জ্বেলে, নেচে গেয়ে, মাথায় ফুলের টুপি পরে নিন্নি-নিকোলাসের বিয়েটা হয়েই গেল। সে রাতে ঠাকুমাকে আবার মনে পড়ল নিকের। মনে মনে বলল,
—তুমি যা চেয়েছিলে, সেই খাঁটি আর্যবংশ ঠাকুমা! এবার খুশি তো!
বিয়ের পর বেশ কিছুদিন নিন্নির নিবিড় ভালোবাসায় তরতরিয়ে দিন কাটে। এরপর নিকের ভিসার মেয়াদ শেষ। এ দেশ, এই ভালোবাসার উপত্যকা ছেড়ে চলে যাবার সময় এবার বড্ড তাড়াতাড়ি চলে এল।
নিক কথা দিল, “খুব তাড়াতাড়ি আবার ফিরব আমি। বিশ্বাস রেখো আমার ওপর”।
নিন্নি জানত, একথা মিথ্যে নয়। তার আদরের নিক তাকে ছেড়ে কিছুতেই চলে যেতে পারে না। সন্তানের মুখ দেখার জন্যে ফিরতে তোমায় হবেই।
নদীর জল,পাখির ডাক তার ভাবনার প্রতিধ্বনি করল।
—ফিরবে সে আবার ফিরবে।
শিকাগো ফিরতেই নিকোলাস ভেসে গেল তার নিজের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসের খ্যাতি আর অভিনন্দনের স্রোতে।
—আশ্চর্য আমার সাদামাটা জীবনের কথা পাঠক এমনভাবে শুনতে চায়? এ’সব কিছুই ঠাকুমার আশীর্বাদ আর ঐ জাদুগরীর প্রেমের মাহাত্ম্য!
নিকোলাসের আর তর সইছিল না। ভারতে আসার জন্যে তাড়াতাড়ি ভিসার আবেদন পাঠাল।
নিক আবার ফিরে এল তার জাদুগরীর টানে লাদাখের দা হানুর সবুজ উপত্যকায়। নিন্নি তখন আঁতুরঘরে। সদ্য একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে।
নিকের পিতৃহৃদয় উদ্বেল হয়ে আছে কখন দৌড়ে গিয়ে মেয়ের মুখ দেখবে!
কি আশ্চর্য সে ক্ষুদ্র মানবীটি যেন কৃষ্ণমহাদেশের আদিম অরণ্য থেকে উঠে আসা কালো পাথর কোঁদা মূর্তি! তার কালো কোঁকড়ানো চুল, মোটা ঠোঁট, চ্যাপ্টা নাক, মুষ্টিবদ্ধ হাতে খেটেখাওয়া মানুষের দৃঢ়তার প্রতিশ্রুতি। তার জাত নেই, ধর্ম নেই, কুল নেই, দেশ নেই। এ কালো মাটির পুতলি পৃথিবীতে মানবতার জয়গান গাইতে এসেছে!
নিক নিন্নিকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। নিন্নির সবুজ চোখে তখন বৃষ্টির ধারা। মেয়ের মুখচুম্বনে আনন্দে উদ্বেল নিকোলাস। জীবনে এই প্রথম তার অচেনা অদেখা কালো মায়ের কথা মনে পড়ল। সেই মায়ের জন্যে তার বুকের মধ্যে মন কেমনের চিনচিনে ব্যথা আর মেয়ের জন্যে নীল নয়নে স্বপ্ন!
তার এই কালো মেয়ে বেঁচে থাকবে, বড় হবে তার নিজের শর্তে। দেশকাল, সাদাকালোর সমস্ত ভেদাভেদ অতিক্রম করে!