‘সংস্কৃতি’ মানে যদি কৃষ্টি বা Culture হয়, তবে গ্রাম বাংলার এক একটা হাট সংস্কৃতির এক একটা অঙ্গ। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি সম্-√কৃ+ক্তি(তি), যার অর্থ সংস্কার বিশুদ্ধিকরণ বা অনুশীলন লব্ধ দেহ-মন-হৃদয় ও আত্মার উৎকর্ষ বা কৃষ্টি। ইংরেজি ‘Culture’ শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হল ‘সংস্কৃতি’, যা ল্যাটিন শব্দ ‘Cultura’ থেকে এসেছে। যার অর্থ এক কথায় কর্ষণ বা চাষ করা বোঝায়। অর্থাৎ মানসিক, বুদ্ধিভিত্তিক এবং দৈহিক চাহিদা পূরণের জন্য চর্চার মাধ্যমে প্রাপ্ত বিষয়বস্তুর নির্যাসই হল সংস্কৃতি।ড.রবীন্দ্রনাথ শাসমল তাঁর ‘লোকসাহিত্যের আঙিনায়’ গ্রন্থে সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে মেলভিল জে হারস্কোভিটসের সংজ্ঞাটি উদ্ধৃত করেছেন — “Culture is the man made part of the environment.”অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষ বস্তুগত ও ভাবগত যা কিছু তৈরি করেছে এবং নিজেকে ও তার প্রতিবেশীকে যা কিছু দিয়ে বদলে নিয়েছে, সবই তার সংস্কৃতি। আবার বরুণকুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’ গ্রন্থে ব্যাসদেব ঘোষ লিখছেন — “সংস্কৃতি হল মানব সমাজের বৈশিষ্ট্য। এমন বৈশিষ্ট্য যা একেবারে অন্তরের। তার নিজের কথা। বাইরের সমস্ত কর্মযজ্ঞের চালিকাশক্তি। আমাদের চারিপাশের সমস্ত কিছু অর্থাৎ ঘরবাড়ি,খাদ্যাভ্যাস,পোশাক পরিচ্ছেদ থেকে শুরু করে সাহিত্য, দর্শন, জীবনযাপন এ সমস্তই বাইরেকার। কিন্তু এ সমস্তের ভিতরে রয়েছে এমন কিছু মূল সূত্র যা এগুলির চালিকা শক্তি। তার অভ্যন্তর প্রাণ। তাই হল সংস্কৃতি।”
ব্রিটিশ নৃ-বিজ্ঞানী E.B.Tylor তাঁর ‘Primitive Culture’ গ্রন্থে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে — “Culture is that Complex whole which includes knowledge, belief, art, moral, law, custom, and any other capabilities and habits acquired by man as a member of society.”

সহজ কথায় সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি মানুষের আচার-আচরণ, জ্ঞান, রীতিনীতি, অভ্যাস, শিল্প ইত্যাদির যোগফল। সংস্কৃতি হল সভ্যতার প্রাণ। ঠিক অনেকটা ফল্গুধারার মতো।উপর থেকে বোঝা না গেলেও এই চালিকাশক্তিটি কিন্তু ঠিক ভিতর ভিতর কাজ করে। এবার আসা যাক হাট সংস্কৃতির আলোচনায়।
হাট সংস্কৃতিঃ
গ্রাম বাংলার প্রত্যেকটা হাটের একটা আলাদা সংস্কৃতি আছে। সেই সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে সেখানকার মানুষজন বেঁচে থাকার একটা রসদ পায়। সংস্কৃতির চোরা স্রোত গ্রাম বাংলার হাটের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। হাটের বিনোদন,পাঁচ রকম মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা, তাদের আচার-আচরণ, চাল-চলন এগুলির মধ্য দিয়ে সেই অঞ্চলের ‘Culture’ বা সংস্কৃতিকে চেনা যায়।যেমন- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাহাড়ের নীচে হাট’ রচনায় দেখি- ”একটা গ্রামে পাহাড়ের নীচে হাট বসেছে।” মিস্টার সিং কে নিয়ে সেই গ্রামের ক্ষুদ্র হাটে বেড়ানোর দৃশ্য, কী কী জিনিস বিক্রি হচ্ছে তার দৃশ্য, হাটের আমোদ-প্রমোদ সবই চোখে পড়ে। তিনি লিখছেন — “জিনিসপত্র কিনুক না কিনুক, ভালো সাজগোজ করে এদেশে সবাই হাটে আসবেই। হাট ওদের উৎসবের জায়গা। এখানেই সাতদিন পরে পরে পাঁচ গাঁয়ের লোকজনের সঙ্গে দেখাশোনা হয়, গল্প গুজব হয় — হাটের দিন ওদের কাছে একটা আমোদের দিন।”
আবার
“মেয়েদের চুলে প্রচুর করঞ্জার তেল, খোঁপা ঢিলে ও বাঁকা, তাতে বন্যফুল গোঁজা। পুরুষদের প্রায় সকলেরই হাতে তীর ধনুক। তীর ধনুক না নিয়ে কোনো যুবক বা বৃদ্ধ পথ চলে না।”
শুধু তাই নয়, আরও একটা আমোদের বিষয় আছে তাদের কাছে — সেটা মোরগের লড়াই।
“হ্যাঁ, এই একটা আকর্ষণের বস্তু বটে এদের জীবনে। দশ ক্রোশ হেঁটে এরা আসতে পারে মুরগির লড়াই দেখতে।… কেনা-বেচা; ব্যবসা-বাণিজ্য,টাকা রোজগার- এসব জীবনের অতি তুচ্ছ জিনিস।এর কী দাম আছে জীবনে? আসল জিনিস হল, মুরগির লড়াই। গাছের তলায় মাদল বাজচে, গোলাকারে উৎসুক নরনারী ঠ্যাঙে ছুরি-বাঁধা দুটো লড়াইয়ে মোরগের ঝটাপটি দেখছে, টুপটাপ মহুয়ার ফুল ঝরে পড়চে ওদের মাথার আশেপাশে, সামনে দূরে নীল শৈলমালা… জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ-মুহূর্ত।”
সিংভূম অঞ্চলের এই হাটের চিত্রটাই বলে দেয় এ অঞ্চলের হাটের সংস্কৃতিকে। সেখানকার রীতিনীতি, প্রথার অনেক অংশেরই আঁচ পাওয়া যায় এই ক্ষুদ্র রচনাটির মধ্য দিয়ে। পাহাড়িদের জীবনে বৈচিত্র্য এনে দেয় এই হাট। এই সকল মানুষগুলি প্রত্যহ একাকী, দুঃখ দারিদ্র্যক্লিষ্ট। তাদের এই দুঃখ জর্জর জীবনে একটু খুশির ঝিলিক বয়ে নিয়ে আসে হাট। তাইতো দশক্রোশ দূরে হেঁটেও এরা হাটে আসে একটু আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। এদের ভিতর রয়েছে এমন এক নাড়ির টান, যে নাড়ির টানে এরা মোরগের লড়াই দেখতে ছুটে আসে। অপেক্ষা করে আরও একটি হাটবারের। আবার হো নরনারীদের মাথায় করঞ্জার তেল, ঢিলে ও বাঁকা খোঁপা, মাথায় বন্যফুল গোঁজার মধ্যে দিয়ে সেখানকার মানুষদের সংস্কৃতির চিত্রটিও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সুতরাং সংস্কৃতি মানে লোক দেখানো কোন বিষয় নয়, সংস্কৃতি মানসিক, দৈহিক ও বৌদ্ধিক চর্চার মাধ্যমে প্রাপ্ত বিষয়বস্তুর নির্যাস। কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যের আখেটিক খণ্ডের ‘ফুল্লরার সংসার’ অংশে নিদয়া ও ফুল্লরার গোলাহাটে মাংস বিক্রির মধ্য দিয়ে তৎকালীন সময় নারীদের হট্টযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায়। এই ছিল তখনকার সংস্কৃতি।—
“নিদয়া বৈসে খাটে মাংস লইয়া গোলা হাটে
অনুদিন বিচয়ে ফুল্লরা।
শাশুড়ী যেমত ভনে তেনমত বিচে কিনে
শিরে কাঁখে মাংসের পসরা।।
মাংস বেচি ল এ কড়ি চাউল চাল্যাতি বাড়ি
তৈল লোণ কিনয়ে বেসাতি।
শাক বাইগন কচু মূলা আঁঠ্যা থোড় কাঁচকলা
সুসজ্জে পূরিয়া লহে পাথি।।
ফুল্লরা আইসে ঘরে নিদয়া জিজ্ঞাসা করে
কহে রামা হাট বিবরণ।”
এই বিররণ থেকে তৎকালীন সময় নারীদের হট্টযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায়। শুধু তাইই নয় কী কী পাওয়া যেত তখনকার হাটে তার একটা রূপরেখাও স্পষ্ট।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বেতাই হাটঃ
নদীয়া জেলার তেহট্ট মহকুমার বেতাই একটি পরিচিত জনপদ। এটি ৮৯-বেতাই মৌজার অন্তর্গত। এখানকার হাটের একটা সুনাম আছে বহুদিন আগে থেকেই। বেতাই তে এখন যেখানে হাট বসে… ১৯৭০ এর আশেপাশে এই হাটের জন্ম। গবেষক ও শিক্ষক সুপ্রিয় ঘোষ তাঁর ‘নদীয়ার হাট-হদ্দ’ বইতে লিখেছেন — “গত শতাব্দীর সাতের দশকে বাংলাদেশ থেকে আসা ছিন্নমূল আর স্থানীয় মানুষদের সমবেত প্রয়াসে এই হাটের জন্ম হয়। “প্রাবন্ধিক লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস তাঁর ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে — বেতাই’ প্রবন্ধে লিখছেন — “দেশ বিভাগের ফলে ওপার থেকে আগত ছিন্নমূল মানুষরা জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করেন। তারপর, তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একে একে গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, বাজার-হাট, কলেজ ইত্যাদি। বেতাই গ্রাম আজ গঞ্জে পরিণত হয়েছে। তার রূপকার হলেন পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল মানুষেরা।”
বেতাই এলাকার অর্থনীতির মূল কেন্দ্র এই হাট। আমরা জানি যে আজ যেখানে ডক্টর বি আর আম্বেদকর কলেজের প্রশাসনিক ভবন, অতীতে সেটিই ছিল ওয়াটসন কোম্পানির নীলকুঠি।
“এই কুঠির জনৈক সিভিল পদবীধারী কোনো সাহেব ম্যানেজারের পদবী অনুসারে কুঠি সংলগ্ন অঞ্চলটার (বর্তমানে বেতাই বাজার) সরকারি খাতায় নাম হয়েছে সিভিলগঞ্জ।” — লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস। (চলবে)
লেখক : প্রসেনজিৎ দাস, বেতাই অখড়াপাড়া, বেতাই, নদিয়া।