ঝালাইদারঃ
এছাড়াও হাটে বসে দুজন ঝালাইদার। রাঙ্ দস্তার ঝালাই। ফুটো-ফাটা বালতি, বা লোহার যে কোনো ফুটো-ফাটা জিনিস সারাই করার ঝালাইদার। কেরোসিন তেলের ল্যাম্প, ঝাঁটার গুল্ম, বালতির খুরো সারাই করা থেকে শুরু করে টিনের বা লোহার তৈরি উনুন তৈরি জরা বা সারানো সবই করে এরা। বিড়ির পাতা কাটবার ছাঁচ বা ফর্মা, মুড়ি রাখার টিন এসবই পাওয়া যায় তাদের কাছে।

ছুরি-কাঁচি শান দেওয়াঃ
বেতাই এর মূল কুটির শিল্প মূলত বিড়ি শিল্প। মেয়েরা অনেকেই বিড়ি বেঁধে সংসার চালানোর মত টাকা রোজগার করেন। বিড়ির পাতা কাটতে কাঁচি ব্যবহার করা হয়। আর এই কাঁচি শান দেওয়ার জন্য বেতাই হাটে বসে একজন শানদার।সাইকেলের মত একটা যন্ত্র নিয়ে বসে শান দেওয়ার জন্য। প্যাডেল করার সঙ্গে সঙ্গে পাথরের চাকাটি ঘুরতে থাকে ও তার সাহায্যে ছুরি-কাঁচি শান দেওয়া হয়।

কলার হাটঃ
বেতাই এর আর একটি ঐতিহ্যবাহী হাট হল কলা হাট এবং কাঁচামালের হাট। কাঁচামাল বিশেষ করে পেঁপে, পটল, বেগুন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লঙ্কা এগুলি পাইকারি বিক্রির জন্য হাট বসে সোম ও শুক্রবার সকালে বেতাই-পলাশী মোড়সংলগ্ন অঞ্চলে।
আশেপাশের অঞ্চল থেকে ও কলকাতা, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর থেকে প্রচুর ক্রেতা আসে পাইকারি কলা বা সবজি কেনার জন্য। যারা বাইরে মালপত্র চালান করে তারাও আসেন এবং এখান থেকে নিজের পড়তা মতো মালপত্র কিনে গাড়ি ভর্তি করে বাইরে চালান করেন। পাশাপাশি বেতাই-পলাশী মোড়ের পূর্ব দিকে ফাঁকা জায়গায় আগে কলার হাট বসত। উল্লেখ্য এখানে দু-থেকে তিনটি কলার আড়ত ছিল। যার যেখানে পছন্দ বিক্রেতারা তার আড়তে মাল তুলত। তাদের কলার গাদাতে একটি করে কাগজের চিরকুট বিক্রেতার নাম লিখে গুঁজে দেওয়া হতো। তারপর বিকেলের দিকে শুরু হতো নিলাম বা ডাক। একজন আড়তদার খাতা হাতে নিলাম করতে আসত। ক্রেতারা দাঁড়াত তার চারপাশে। নিলামদার মোটামুটি একটা দাম বলতো ক্রেতাদের। তারপর থেকে শুরু হতো দাম বাড়ানোর পালা। চোখের ইশারাতে চলতে দাম বাড়ানোর খেলা। সর্বোচ্চ দামে যে নিতে রাজি হতো তাকেই বিক্রি করা হতো সেই কলার গাদা।এতে ক্রেতারা নিজের ইচ্ছে মতো মাল পছন্দ করে কিনতে পারতো। তবে অনেক সময় অনেকে ঠকেও যেত। চলতো নিলাম নিয়ে রেষারেষি। দুজন ক্রেতার মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়াও বাধত। সবমিলিয়ে একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব ছিল। বর্তমানে বেতাই-পলাশী মোড়ে আর কলার হাট বসে না। এখন হাট বসে বেতাই নতুন কাঠমিল সংলগ্ন অঞ্চলে। সেখানেও এই একই নিয়ম বলবৎ আছে। প্রচুর পাইকারি ক্রেতা এখান থেকে গাড়ি গাড়ি মাল কিনে গাড়ি বোঝাই করে বাইরে চালান করে। আগে কলার কাঁদি-সহ গাড়ি লোড হতো। এখন অবশ্যই এভাবেই পাঠানো হয় না। কাঁদি থেকে কলার ছড়াগুলো কেটে প্লাস্টিকের ক্রেটে সুরক্ষিত অবস্থায় গাড়ি লোড করা হয়। সেগুলো বাইরে পাঠানো হয় এবং বাইরের বাজারে আড়তের মাধ্যমে খুচরো বা পাইকারি বিক্রি করা হয়।

খাবারের দোকানঃ
শীতকালে বেতাই হাটে অনেকে আসে খেঁজুরের ঝোলা গুড়, পাটালি গুড় কিংবা তিলে খাঁজা, বাদাম পাটালি এসব লোভনীয় খাবার বিক্রি করতে। তাছাড়া সুজি ও মিষ্টি দিয়ে তৈরি এক ধরনের বরফি এখানকার হাটে বিক্রি হত। আমাদের প্রিয় খাবার ছিল এই বরফি। ওজনেই বিক্রি হতো। কিন্তু এসব আর চোখেই পড়ে না। তবে তিলে খাঁজা মাঝে মাঝে দেখা যায়। আর শীতকালে চিনির তিলে খাঁজার পাশাপাশি খেঁজুরের গুড়ের তিলে খাজা মাঝে মাঝে বসে। তাছাড়া লালবাজারের এক ময়রা বসে কদমা, বাতাসা, জিলিপি, নিমকি, ইত্যাদি নিয়ে। তাছাড়া আছে তেলেভাজা, ল্যাদার ঘুগনি (বেতাই এ এই নামেই পরিচিত। যেমন-আড়ার সিঙ্গাড়া, ক্ষুদিরামের মিষ্টি), ফুলুরি, ঝাল মুড়ি, সিদ্ধ ছোলা মাখানো চাট আর স্পেশাল নিরামিষ বা আমীষ ঘুঘনি। বিশেষ করে শীতের সময় এসবের জনপ্রিয়তা তো তুঙ্গে ওঠে। মুখ পোড়া গরম চপে বা ফুলুরিতে কামড় বসিয়ে মানুষ যেন খুঁজে পায় স্বর্গসুখ। তাছাড়া বেতাইতে খুব সম্প্রতি নতুন আবিষ্কার মোমো, এটাও হাটের এক আকর্ষণের বস্তু বটে। আছে গোটা দুয়েক ফুচকার দোকান। বসে ফলের দোকান। তাছাড়া হাটে বসে অনেকে ওজনে মচমচে পাউরুটি টোস্ট বেচে। এটাও বেতাই এর হাটের নতুন সংযোজন।
কবিতার হাটঃ
আপনারা কখনও কি শুনেছেন হাটে কবিতা বিক্রির কথা? আমরা বই এর হাটের কথা জানি, গরুর হাটের কথা জানি, তাঁতের শাড়ির হাটের কথাও জানি, কিন্তু কবিতা? আজ্ঞে হ্যাঁ। হাটে কবিতাও বিক্রি হয়। এমনই এক হাটের কবির সন্ধান পেয়েছেন ‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ সাহিত্য পত্রিকা। সম্প্রতি ২০২২-এর ডিসেম্বরে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যার বিষয় ছিল ‘হাট’। তাতে একজন হাটের কবির সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তাঁর নাম সেখ আরেজুল্লা। তাঁর বাড়ি নদিয়ার করিমপুরের নিকটবর্তী জয়রামপুরে। তাঁর কাজ কবিতা ছেপে হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা। তাঁর কথাতেই উঠে আসে নস্টালজিক সেসব মুহূর্ত।
“হাটে আমার লেখা কবিতা ছেপে নিয়ে যাই। সবাই যেমন নানা পসরা নিয়ে হাটে বসেন, আমি কিন্তু কবিতা নিয়ে বসি। কবিতাই আমার পসরা। আর সঙ্গী একটা মাইক্রোফোন, বাক্স আর ব্যাটারি। ছাপানো কবিতা হাটের এক কোণে বসে পাঠ করি। তাতে অনেকেই এসে শোনেন। পয়সা দেন। আমি তাদের আমার ছাপানো কবিতা দিই। বিনামূল্যে আজও কাউকে কবিতা দিই নি। এভাবেই যা আয় হয় তাতেই যথেষ্ট মনে হয়েছে।” একসময় তিনি বেতাই এর হাটে আসতেন, ছাপা কবিতা বিক্রি করতে। কিন্তু আজ সমস্তটাই অতীত।
তবে বর্তমানে হাট সংস্কৃতির পাট ক্রমে ক্রমে উঠেই যাচ্ছে। অপসংস্কৃতির অন্ধকার ক্রমে জাঁকিয়ে বসেছে সমাজের গায়ে। তাই মুরগির লড়াই, সাপখেলা দেখানোর করসত কিম্বা জাদুকরের জাদুর বদলে এখন জায়গা করে নিচ্ছে লটারি, লোটো কিংবা তিন তাস খেলার আসর। এগুলো এখনকার সংস্কৃতি। তাই এখন রবীন্দ্রজয়ন্তী কিংবা স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের মঞ্চের ডিজে বাজিয়ে উদ্দাম নাচ দেখা যায়। সংস্কৃতি আজ অনেকাংশে বিপন্ন। তাই মনে হয় বাংলার হাটও যেন তার নিজস্ব সংস্কৃতি হারাতে বসেছে।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীঃ
১) ‘বাংলা ভাষার অভিধান’,সাহিত্য সংসদ–জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস।
২) ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতিকোষ’–বরুণ কুমার চক্রবর্তী।
৩) ‘লোকসাহিত্যের আঙিনায়’–ড. রবীন্দ্রনাথ শাসমল।
৪) ‘Primitive Culture’- E.B.Tylor (উৎস-উইকিপিডিয়া)
৫) ‘পাহাড়ের নিচে হাট’- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বিভূতি রচনাবলী’।
৬) ড. ক্ষুদিরাম দাস সম্পাদিত ‘কবি কঙ্কণ চন্ডী’।
৭) ‘চলন্তিকা’- রাজশেখর বসু।
৮) ‘তেহট্ট মহকুমার পুরাসম্পদ’-লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস, ‘রামধনু পত্রিকা’-২০১৬, ‘নদিয়ার সংস্কৃতি-চর্চা’, সম্পাদনা-মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল।
৯) ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে-বেতাই’ প্রবন্ধ,’স্বপ্নের ভেলা’ পত্রিকা,প্রথম সংখ্যা।
১০) ‘নদিয়ার হাট হদ্দ’- সুপ্রিয় ঘোষ।
১১) উইকিপিডিয়া।
১২) ক্ষেত্রসমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য।
১৩) ‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ সাহিত্য পত্রিকার ‘হাট’ সংখ্যা।
লেখক : প্রসেনজিৎ দাস, বেতাই অখড়াপাড়া, বেতাই, নদিয়া।
ধন্যবাদ।।