দ্বিতীয় অধ্যায়
সিস্তান এবং হেরাটে হুমায়ুন
১। সিস্তানে সিস্তান
হুমায়ুন সিস্তান প্রদেশে পৌঁছলে, প্রদেশ প্রশাসক আহমদ সুলতান শামলু, কয়েকজন উচ্চঅভিজাতকে তাঁর রাজ্যের সীমান্তে উপস্থিত হওয়া স-বাহিনী হুমায়ুনকে যথাবিহিত স্বাগত জানিয়ে দরবারে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। সিস্তান থেকে হুমায়ুন তখন তিন বা চার লিগ দূরত্বে আছেন। হুমায়ুনের কাছাকাছি আসার সংবাদে স্বয়ং আহমদ সুলতান শামলু উচ্চপদের আমলা সমবিব্যহারে সম্রাটকে রাজার সম্বর্ধনা দিতে এলেন পায়ে হেঁটে রাজ্যের সীমান্ত উজিয়ে। সিস্তানের রাজা এবং প্রজারা রাজ্যহীন সম্রাটকে রাজার সম্মান দিল প্রাণখুলে। আহমদ সুলতান, হুমায়ুন এবং তাঁর জেনানাদের নিজের প্রাসাদে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করলেন শামলু। তাঁর মা এবং স্ত্রীরা হামিদা বানু বেগমের মন দিয়ে পরিচর্যা করলেন [৩]।
সিস্তানে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দিলেন হাজি মহম্মদ, হাসান কোকা। মির্জা আসকরির সঙ্গ ছেড়ে আসা বেশ কয়েকজন সেনাপতিও হুমায়ুনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন [৪]। জামিন দাওয়ারের প্রশাসক আমীর বেগ, বিস্তএর চালমা বেগ এবং বহু গোষ্ঠী প্রধান যারা হুমায়ুনকে সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে মির্জা আসকরিকে ছেড়ে এসেছিলেন, প্রত্যেকেই তাঁকে জামিন দাওয়ার অঞ্চলে অভিবাসিত হওয়ার পরামর্শ দিলেন। তাদের প্রত্যেকের আশা জামিন দাওয়ার শিবির থেকে সকলে এক জোট হলে কান্দাহার উদ্ধার অসম্ভব নয়। কিন্তু বৈরাম বেগ আর আহমদ শাপলুর পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী। তার সকাশে আসা সেনাপতিদের প্রস্তাব এবং পরামর্শ কানে না তুলতে হুমায়ুনকে তাঁরা বিনীতভাবে অনুরোধ করলেন [৫]। হুমায়ুন ঘনিষ্ঠ পারিষদদের পরমর্শ শুনলেন এবং যুদ্ধ করে জমি উদ্ধার করার সেনাপতিদের সঙ্গে কথা না মেনে ইরানের দিকে এগোবার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। আহমদ শামলুর ভাই হুসেইন কুলি মির্জাও সিস্তানে হুমায়ুনকে সম্মান জানালেন এবং দুজনের মধ্যে ধর্মীয় তত্ত্ব আলোচনা হল।।
জৌহর বলছেন হুমায়ুন সিস্তান থেকে পারস্যের সুলতান শাহকে, পারস্য অভিবাসনের কারন বর্ণনা করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দূত মার্ফত। অথচ আমরা দেখেছি হুমায়ুন গার্মসির থেকে বৈরাম বেগের পরামর্শে শাহকে তাঁদের ইরানে প্রবেশের সংবাদ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। বৈরাম বেগের বক্তব্য ছিল, শাহকে আগে থেকে না জানিয়ে সম্রাটের দল ইরান সীমান্তে পা দিলে শাহ মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন। যাইহোক এখান থেকে শাহকে আরও একটি চিঠি পাঠাবার সংবাদ পাচ্ছি। এমনও হতে পারে, হুমায়ুন যেহেতু গার্মসির থেকে পাঠানো চিঠির উত্তর পান নি, সেহেতু তিনি সিস্তান থেকে নতুনভাবে আরেকটি চিঠি পাঠানোর পরিকল্পনা করলেন। উপায়ান্তর না থাকা হুমায়ুন জানেন, দ্বিতীয় চিঠির উত্তর যদি তিনি যথাসময়ে হাতে না পান, হয়ত যথাবিহিত অনুমতি ছাড়াই তাঁদের ইরানে প্রবেশ করতে হবে। জৌহর যে চিঠির কথা উল্লেখ করছেন, সেই চিঠিতে উল্লিখিত কবিতার দুটো স্তবক আবুল ফজল তাঁর রচিত ইতিহাস বইতে উদ্ধৃত উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন। বৈরাম বেগও তুর্কমান গোষ্ঠীপতিদের উদ্দেশ্যে এবং একই সঙ্গে শাহকেও তাদের ইরান যাত্রা বিষয়ে চিঠি লিখলেন — তিনিই কিন্তু শাহের উত্তর পেলেন [১]। বৈরামের পাঠানো বা শাহের থেকে পাওয়া চিঠির নমুনা বা প্রতিলিপি আমরা এখনও দেখিনি।
২। শাহ, হুমায়ুনের পারস্য প্রবেশের সমীক্ষাপত্র পেলেন, তাঁকে যথাবিহিত সম্বর্ধনার ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন
অস্বীকার করার উপায় নেই, শাহের প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়াই হুমায়ুন পারস্যে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। হুমায়ুন পৌঁছনোর পরে পরেই আহমদ শাপলু সংবাদ বাহক মার্ফত শাহের পুত্র সুলতান মহম্মদ মির্জা এবং হেরাট প্রদেশের প্রশাসক মহম্মদ খান শারাফুদ্দিন উঘলি টাকলুকে হুমায়ুনের পৌঁছ সংবাদ জানিয়ে চিঠিতে লিখলেন, —
বাদশাহ হুমায়ুন অসহায় হয়ে আমাদের সম্রাট মহারাজের দরবারে সাহায্যের জন্য যেতে চান। যেহেতু তার সাথে অল্প সংখ্যক লোক আছে, সংখ্যায় পঞ্চাশজনও নয়, সকলেই শক্তিহীন এবং অস্ত্রবিহীন, আপনার মনে যদি অনুগ্রহ জাগ্রত হয়, তাহলে তাঁকে হেরাটে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন এবং সেখান থেকে ক্ষমতায় ফরিদুনের সমান মহামহিম শিবির, মহামহিমের দরবারে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করুন।
King Humayun, being helpless, desires to go for help to the court of His Majesty, our emperor. As there are only a small number of men with him, not even fifty in number, and as all are powerless and without weapon, you would please, if you think it proper, take him to Herat and from there arrange for bis proceeding to the camp of His Majesty, equal in power to Faridun.
এই প্রস্তাবে মহম্মদ খান শারাফুদ্দিন উঘলি টাকলু চিন্তা করলেন, হুমায়ুনকে হেরাট হয়ে শাহের দরবারে পৌঁছনোর দরবারি অনুমতি আহমদ সুলতানই জোগাড় করাই ভাল। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আহমদ সুলতান একজন সংবাদ বাহককে শাহ এবং মহম্মদ খানের উদ্দেশ্যে এবং অন্য এক বাহককে, কারা সুলতান শামলুর [৩] ভাই কামালুদ্দিন শাহ কুলি বাহাদুরের সমীপে পাঠালেন। সংবাদ বাহক শাহকে আবেদন পৌঁছে দিলে, তিনি সেই আবেদনে প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রদান করেন [৪]।
ইরানে হুমায়ুন প্রবেশের সমীক্ষা দরবারে পৌঁছনোর পর, হুমায়ুনের দূত চুলি বেগ, শাহ’র হাতে যথাবিহিত সম্মানে সম্রাটের পাঠানো চিঠি তুলে দিলেন [৫]। শাহর নাম উল্লেখ করে মুঘল সম্রাটের নিরাপত্তা প্রার্থনা করা হুমায়ুনের চিঠি ইরানের দরবারে পৌঁছনোমাত্র বোঝা গেল প্রকাশ্যে শাহ খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠছেন। তাঁর উচ্ছাস প্রকাশের নমুনা দেখি কাজভিনে তিনদিন ধরে অবিশ্রান্ত নাকাড়া বাজানোর নির্দেশ জারির নির্দেশ দানে। হুমায়ুনের দূতকে রওনা করিয়ে দিয়ে বিশেষ সাফাভি দূতের হাত দিয়ে চিঠির উত্তর পাঠালেন। হুমায়ুন এবং তার সঙ্গীদের যথাযোগ্য সম্মান জানানো এবং একই সঙ্গে হুমায়ুন যেখানে যেখানে শিবির পাতার কথা ভাববেন, সে সব জায়গায় তাঁদের যথাযোগ্য শাহী অভ্যর্থনা প্রদর্শন করারও বার্তা প্রত্যেক প্রদেশের প্রশাসককে পাঠানো হল অতি দ্রুত। বলা হল উৎসবগুলোয় সাধারণ জনগণের যোগদান অত্যাবশ্যক এবং প্রত্যেকটি স্থানে আয়োজিত উৎসবের প্রয়োজনীয় রসদ, সম্পদ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হবে। আগত অতিথিরা যেহেতু শাহকে সম্মান জানিয়েছেন, প্রত্যেক প্রদেশের প্রশাসক নিশ্চিত করবেন, উৎসবে অংশ নেওয়া জনগণও যেন প্রকাশ্যে একইরকমভাবে অতিথিদের সম্মান দেখান [৬]।
শাহের প্রশাসন থেকে যে সব প্রদেশ প্রধানকে ফরমান জারি করা হয়, সে সব ফরমানের মধ্যে হেরাটের প্রশাসক মহম্মদ খানের উদ্দেশ্যে পাঠানো ফরমানটি আমাদের হাতে এসেছে। সেই ফরমানে বিস্তৃত আকারে বলা হয়েছে, হুমায়ুনকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্যে আঞ্চলিক প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ নেবে। তাঁর নির্দেশ প্রত্যেকটা জায়গায়, বিশেষ করে হেরাটে তাঁকে রাজার সম্মান দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পারস্যজুড়ে হুমায়ুনকে বিশেষভাবে সম্মান জানানোর অন্যতম উদ্দেশ্য যে সার্বিকভাবে সাফাভি রাজত্বের গৌরব প্রদর্শন, ঐশ্বর্য বর্ণন করা, এই তথ্য অস্বীকার করা যাবে না।
প্রতিটা প্রদেশে হুমায়ুনকে সম্বর্ধনা জানাতে, হুমায়ুনের রাজকীয় টেবলে অন্তত ১২০০ রকমের রান্না সাজানোর নির্দেশ জারি করা হল। হেরাটের প্রশাসককে আলাদা নির্দেশ দেওয়া হয় অন্তত ৩০০০ প্রকার খাদ্য, মিষ্টি, শরবত, ফল পরিবেশনের। পারস্যের শাহ যে ফরমান জারি করেন, তাতে বৈরাম খানকে আমীরইমুয়াজ্জম বা প্রধান অভিজাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্রাটের সঙ্গে তাঁর নাম প্রত্যেকবার উল্লিখিত হয়েছে অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করে। শাহের নির্দেশ ছিল হুমায়ুন যেখানেই উপস্থিত হবেন, সেখানে প্রত্যেক প্রশাসক ৯টি ঘোড়া নিয়ে উপস্থিত হবে, যার মধ্যে ৩টি থাকবে সম্রাটের বিশেষ ব্যবহারের জন্যে এবং একটি আমীর বৈরাম বেগের জন্যে [১]। সিস্তানের প্রশাসক একই নির্দেশ পেলেন। ফরমানটির নকল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে [২]। এই ফরমানে সিস্তান প্রশাসকের নাম দেওয়া হয়েছে আলি কুলি খান শামলু। (চলবে)