তৃতীয় অধ্যায়
হেরাট থেকে সাফাভি দরবারে
৩। হুমায়ুন জাম শহরে পৌঁছলেন
মশদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে কিছু দিনের মধ্যেই হুমায়ুন জামে পৌঁছলেন। সিস্তানের প্রশাসক আহমদ সুলতান শামলু এত দিন ধরে হুমায়ুনের সঙ্গে ছিলেন, তিনি এবারে হুমায়ুনের সঙ্গ ত্যাগ করে নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন। হুমায়ুন জামে পৌঁছলেন ৫ মহরম ৯৫১, ২৯ মার্চ ১৫৪৪-এ। বেভারেজ বলছেন আবুলফজলের ৫ জিলহজ্জ্ব ৯৫০ ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৫৪৪টি ভুল ৫ মহরমই ঠিক তারিখ। তিনি মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত নওরোজ উৎসবে যেহেতু ব্যস্ত ছিলেন, তাঁর পক্ষে জিলহজ্জ্ব মাসের শুরুতে হেরাট ছাড়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম [২]। জামে হুমায়ুন শাহ কাশিমইআনোয়ারের মাজারে গেলেন, উপাসনা করলেন [৩]। আহমদুলজামির মাজারে আমীর তৈমুরও মাথা ঠেকাতে এসেছিলেন। আমরা জানি আমীর তৈমুর হুমায়ুনের স্ত্রী হামিদা বানু বেগম আর মা, পাদিশা বেগম মাহাম বেগমেরও পূর্বজ ছিলেন। হুমায়ুন নিজের হাতে আহমদুলজামির মাজারে বসে কবিতা লিখেছেন। মসিরইরহিমির লেখক আবদুল বাকি ১০২০ আলহজ্জ্ব, ১৬১১য় মাজারে হুমায়ুনের লেখা কবিতাটি পড়েন। কিন্তু বইটি লেখার সময় কবিতাটি যেহেতু তাঁর স্মৃতিতে ছিল না, তিনি হুমায়ুনের নামের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটা মনে থাকা শব্দ আর শেষ স্তবকটা উল্লেখ করেছিলেনমাত্র যা পরে আমরা রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকার ১৮৯৭-এর এন [নরবার্ট] এলিয়াসের কাজে দেখি [৪]। আবদুল বাকি বলছেন বৈরাম বেগও মাজারে কবিতা লিখেছেন। তিনি বলছেন রাজধানীর রাস্তায় যাওয়ার পথে হুমায়ুন কবিতাটি লেখেন। তারিখ লিখছেন ১৪ শাওয়াল ৯৫১ ২৯ ডিসেম্বর ১৫৪৪। কিন্তু আমরা আগেই দেখিয়েছি এই তারিখটা ঠিক হতে পারে না। হয় মাজারে হুমায়ুনের লেখা তারিখ ভুল না হয় বেভারেজের বক্তব্য ঠিক, হুমায়ুন জামে আবার ৯ মাস পরে দ্বিতীয়বার যান।
৪। মশদে হুমায়ুন
কয়েক দিন জামে কাটিয়ে ১৫ মহরম ৯৫১, ৮ এপ্রিল ১৫৪৪ হুমায়ুন মশদে পৌঁছন। শহরের সীমান্তের কাছাকাছি আসা মাত্রই বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি দুই তিন লগ এগিয়ে এসে তাঁকে রাজকীয় সম্বর্ধনা জানান। মশদের প্রশাসক শাহ কুলি সুলতান ইসতাজু সেই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন [২]। শহরে তাঁকে রাজকীয় প্রাসাদ চাহার বাগে রাখা হল, তাঁর সঙ্গীদের উপযুক্ত বাসস্থান দেওয়া হল। জৌহর বলছেন মশদে হুমায়ুন চল্লিশ দিন কাটান [৩]। প্রায়শই তিনি ইমাম রিজার [৪] সমাধিতে যেতেন, সারা রাত উপাসনায় কাটাতেন এবং ইমাম আর অন্যান্য কর্মচারীকে মনভরানো উপহার দিতেন [৫]। শোনা যায় সন্তের প্রতি শ্রদ্ধায় মাজারের দরজায় শাহী ধনুক ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্রাট হুমায়ুন। মশদেই তিনি কাজভিনের দিকে যাওয়ার নির্দেশের চিঠি পেলেন শাহের দরবার থেকে [৬]।
৫। মশদ থেকে কিলা দার্স
জৌহর বলছেন মশদে চল্লিশ দিন কাটিয়ে হুমায়ুন ২৬ সফর ৯৫১, ১৯ মে ১৫৪৪-এ নিশাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান মুঘল দল নিয়ে [৭]। নিশাপুর শহরের প্রশাসক তাকে যথাযোগ্য সমাদর দেখালেন। সেখানে তিনি প্রখ্যাত ফিরোজা খনি দেখতে যান [৮]। নিশাপুরে কয়েক দিন থেকে তিনি সাবজাওয়ারের দিকে রওনা হলেন কুদর্শন পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে বহু পরিশ্রমে রাস্তা চলতে হচ্ছিল। ছ’দিনের মাথায় সাবজাওয়ারে পৌঁছলেন [৯]। জৌহর বলছেন সম্রাট সেখানে চল্লিশ দিন বাস করবেন [১০]। সবজাওয়ারের প্রশাসক শামসুদ্দিন আলি সুলতানের আত্মীয় আমীর বারকার সঙ্গে হুমায়ুনের বহুকালের অন্তরঙ্গতা ছিল। সেই কারনেই হয়ত সেখানে হুমায়ুন একটু বেশিই দিন থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন [১১]। হুমায়ুনের সম্মানে সবজাওয়ারের প্রশাসক রাজকীয় ভোজ আর সম্মাননার আয়োজন করেন — খুরাসানের সোনার কাজ করা হাজার পেয়ালায় পনীয় দেওয়া হল। আমরা জানি না নিশাপুরে তিনি ক’দিন ছিলেন [১]। যদি ধরেই নি তিনি সেখানে ৬ দিন থেকেছেন, তাহলে হুমায়ুন সবজাওয়ার ছেড়েছেন ২৪ রবিউসসানি ৯৫১, ১৫ জুলাই ১৫৪৪। মনে হয় না হুমায়ুন নিশাপুরে বেশি দিন থেকেছেন, তাহলে জৌহর উল্লেখ করতেন। জৌহর বহু ব্যতিক্রমী বিষয় উল্লেখ করেছেন।
সবজাওয়ার ছেড়ে শাহী দল সম্রাটের সঙ্গে চলল সুফিয়াবাদের দিকে। আবুলফজল এবং হুমায়ুনেরর সঙ্গী ঐতিহাসিকেরা বলেছেন দামাঘান আর বিস্তাম পেরিয়ে দল পৌঁছল সুফিয়াবাদে। কিন্তু বেভারজের যুক্তি, শামনান আর বিস্তামের থেকে আরও পূর্ব দিকে সুফিয়াবাদের অবস্থান তাই হুমায়ুন শামনান আর বিস্তামের আগেই সুফিয়াবাদে পৌঁছেছেন। সুফিয়াবাদে গিয়েছেন হয় সবজাওয়ার হয়ে না হয় নিশাপুর হয়ে। মনে হয় যেহেতু সুফিয়াবাদ সবজাওয়ারের কাছে, তিনি নিশাপুর নয়, সবজাওয়ার থেকেই সুফিয়াবাদ গিয়েছেন [৩]। তারিখ-ই-ইব্রাহিমি বলছে হুমায়ুন সুফিয়াবাদে পৌঁছন ৯৫১-র রবিউসসানি মাসের শেষে সপ্তাহে অর্থাৎ ১৫৪৪-এর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে এবং আমরা যে সময়ক্রম তৈরি করছি, সময়টা তার যাত্রা পথের সঙ্গে খাপ খেয়ে যাচ্ছে [৪]।
সুফিয়াবাদ থেকে মুঘল দল দামাঘানে পৌঁছলে হুমায়ুন অত্যাশ্চর্য ঝরণা দেখে দুদিনের মধ্যে বিস্তামে পৌঁছলেন। এখানে তিনি শেখ বাজায়িদ বিস্তামির মাজারে গেলেন মাথা ঠেকাতে। বিস্তাম থেকে হুমায়ুনের যাত্রাপথ হল খুরকান, সেখানে তিনি আবদুল হুসেন খুরকানির মাজারে গেলেন, উপাসনা করলেন [৬]। খুরকান থেকে সমনামে পৌঁছে শেখ আলুউদৌলা সমনামির মাজারে শ্রদ্ধা জানালেন [৭]। সমনাম থেকে কাজভিনের মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় হুমায়ুন থেমেছেন, সে সব জায়গার নাম ইতিহাসে উল্লেখ করা থাকলেও অধিকাংশ জায়গা আজ চেনা দায়, তাছাড়া খুব একটা বিখ্যাতও নয়। তবুও কয়েকটা উল্লেখ করা গেল — আঘজাওয়ার কেল্লা [১], আলহক ঝরণা [২], মাইমানা কেল্লা [৩], সুক বিলাক [৪] আর দারাস কেল্লা। এগুলোর মধ্যে সুক বিলাক সৌজ বুলাঘ হওয়া সম্ভব — রায় এবং কাজভিনের [৫] মধ্যবিন্দুতে। দারস, রায়ের [৬] কাছের এলাকা। কবিতায় লেখা হুমায়ুননামায় বলা হয়েছে তিনি কাজভিনে গিয়েছেন সাভা হয়ে – কিন্তু অন্য কোনও উপাখ্যানে সাভার নাম উল্লেখ করা হয় নি। (চলবে)