চতুর্থ অধ্যায়
সাফাভি দরবারে
৫। হুমায়ুন শাহের রাজত্ব ছাড়লেন
সিস্তানের সীমান্ত ছাড়িয়েই হুমায়ুন পা দিলেন ভাই মির্জা কামরানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকা কান্দাহার, কাবুল, গজনি আর বাদাকশন অঞ্চলে। হুমায়ুন পারসিক সেনাকে বিস্ত কেল্লা দখলের নির্দেশ দিলে [৩] ইরানি সেনারা তার নির্দেশ মানতে চাইল না – শাহ তাদের হুমায়ুনের পক্ষে যুদ্ধ করার যে নির্দেশনামা দিয়েছেন, বিস্ত দখল সেই নির্দেশনামার সরাসরি উল্লঙ্ঘন। মার্জিত হুমায়ুন, তাঁর সামরিক নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি শাহকে জানানোর হুমকি দিলে সেনাদল বাধ্য হয়ে গার্মসিরের দিকে রওনা হল [৪]। গার্মসিরের প্রশাসক মীর আবদুল হাই লাকি কেল্লা থেকে বেরিয়ে এসে গুরকানি পরিবারের মাথা, সম্রাট বাবর যাকে সাম্রাজ্যের প্রধান হিসেবে মনোনীত করেছেন, সেই হুমায়ুনের বশ্যতা স্বীকার করলেন।
পারসিকদের যুদ্ধ শুরু হল বিস্ত থেকে। আলি সুলতান টাকলুর নেতৃত্বে বিস্ত কেল্লা অবরোধ করল হুমায়ুনের বাহিনী[৫]। কেল্লায় কামরানের দুই সেনাপতি শাহম আলি জালাইর আর মীর খালাজ কিছুটা প্রতিরোধ করলেন, আলি সুলতান অবরোধের যুদ্ধে শত্রুর মসকেটের গুলিতে আহত হয়ে প্রাণ দিলেন। কিন্তু ততদিনে কেল্লার দুই প্রধান সেনাপতি শাহম আলি জালাইর আর মীর খালাজ স্নায়ুর চাপ রাখতে না পেয়ে আত্মসমর্পণ করে বাহিনী নিয়ে হুমায়ুনের বাহিনীতে যোগ দিলেন [৬]।
খবর এল মির্জা আসকরি কান্দাহারের সমস্ত রাজকীয় সম্পদ নিয়ে গোপনে পালাচ্ছেন। বাহিনীকে তার পিছন ধাওয়া করতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। হুমায়ুনের বাহিনী তাঁকে ধরতে আসার সংবাদে আতঙ্কিত মির্জা আসকরি কাবুলে মির্জা কামরানকে সাহায্যের জন্যে সংবাদ পাঠালে তিনি কাসিম হুসেন আর আমীর জামিলকে হুমায়ুনের বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্যে পাঠালেন [১]। অপেক্ষাই সার হল মির্জা আসকরিকে উদ্ধার করার জন্যে কামরানের বাহিনী পৌঁছল না। ২ মহরম ৯৫২, ১৬ মার্চ ১৫৪৫তে যুদ্ধে হেরে গেলেন আসকরি। এইরকম এক ছোটখাটো যুদ্ধে কামরান তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সেনানায়ক বাবা সিরহিন্দিকে হারাবেন। ৭ মহরম ৯৫২, ২১ মার্চ ১৫৪৫ বিশাল পারসিক বাহিনী নিয়ে হুমায়ুন কান্দাহারের সীমান্তে পৌঁছলেন [২]।
পঞ্চম অধ্যায়ের জোড়াপাতা
সাফাভি দরবারে হুমায়ুনের নানান কর্মকাণ্ড এবং তাঁর নিজের সাম্রাজ্যের উদ্ধারে হিন্দুস্তানে ফেরার দিনক্ষণ তৈরি করার খুবই সমস্যার। দুই সম্রাটের বৈঠকের তারিখ জুমাদাআওল ৯৫১, জুলাই ১৫৪৪ [৩]। আবুলফজল বলছেন হুমায়ুন আর বৈরাম কান্দাহারে যৌথভাবে পৌঁছচ্ছেন ৭ মহরম ৯৫২, ২১ মার্চ ১৫৪৫। বায়াজিদের স্মৃতিকথা ছাড়া অন্য কোনও ইতিহাস থেকে একটাও তারিখ পাই না। বায়াজিদ বলছেন হুমায়ুন মশদে পৌঁছচ্ছেন ইদ রামজানের রাতে ৯৪০-এ; অবশ্যই বছর সংখ্যা ভুল, হবে ৯৫১, ১৫৪৪। তারিখটা জৌহরের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়; তিনি বলছেন মশদে হুমায়ুন যেদিন ঢোকেন, সেদিন থেকে নিয়মিত বরফ পড়ছে [৫]।
বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়া এবং কিছু সময় কাটানোর দিনগুলোকে যদি আমরা একটা সূত্রে বাঁধতে পারি, তাহলে দেখব মিয়ানায় শাহের থেকে বিদায় নেওয়ার পরে প্রায় দেড় মাস কেটে গেছে। জৌহর বলছেন তিন দিনে হুমায়ুন তাব্রিজিতে পৌঁছেছেন। তাব্রিজিতে কত দিন ছিলেন আমরা জানি না। তিনি আরদাবিল পৌঁছলেন ৪ দিনে, থাকলেন ৭ দিন। আদরাবিল থেকে কাজভিন [ক্যাসপিয়ান] সমুদ্রের দূরত্ব ৩০ মাইল, যাতায়াত নিয়ে তার ৩ দিন কেটে থাকবে। মুস্তৌফি সূত্রে আরদাবিল থেকে সারখাবের যাত্রা ছিল ২ দিনের। সারখান থেকে খলখল, তারুম, মঞ্জিল হয়ে কাজভিনের দূতত্ব ২০০ মাইল। দৈনিক গড়ে ৩০ মাইল পার করার হিসেবে তিনি এই রাস্তা ৭ দিনে অতিক্রম করেছেন ধরে নেওয়া যায়। মাঝের জায়গাগুলোতে তিনি আদৌ থেকেছেন কীনা সে তথ্য আজ আর পাওয়া যায় না, কিন্তু আবুলফজল বলছেন, তিনি খারাজবিলে ৩ দিন কাটিয়েছেন। আমরা দেখেছি কাজভিনে তার পক্ষে রাত কাটানো সম্ভব হয় নি। কাজভিন থেকেও তিহারান ৯০ মাইল রাস্তা আর কার্জনের হিসেবে তিহারান থেকে মশদের দূরত্ব ৫৬০ মাইল [১]। ফলে তাঁকে কাজভিন থেকে মশদ আসতে তাঁকে পেরোতে হয়েছে ৬৫০ মাইল। মশদ থেকে তিহারানের পথ কার্জন পেরিয়েছেন হেসেখেলে ৯ দিন, গড়ে দৈনিক ৬০ মাইল। তিনি মনে করেন পারসিক মূল্যমানে এটা খুবই ধীরগতির যাত্রা। তাঁর সময় থেকে হুমায়ুনের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কঠিন, সমস্যাজনক ছিল। আমরা ধরে নিতে পারি হুমায়ুন এই পথ পেরিয়েছেন ২০ দিনে। তাহলে সব মিলিয়ে ৩+৪+৭+৩+২+৭+৩+১০ = ৪৯ দিন। আমাদের ধারণা হুমায়ুন গড়ে দৈনিক ৩০ মাইলের বেশি বেগে চলেছেন এবং সিস্তানের যত কাছে আসবেন তার গতি বাড়বে; তাহলে আমরা ধরেই নিতে পারি তিনি দেড় মাসে এই রাস্তা পেরিয়েছেন।
আমরা আগেই দেখিয়েছি দুই সম্রাট জুমাদাউলআওল মাসের শেষে বৈঠক করেছেন — যেদিন থেকে হুমায়ুন মিয়ানা ছেড়েছেন আর মশদে পৌঁছেছেন, তার মধ্যে কেটেগেছে ৪ মাস। আমরা যদি এর মধ্যে ৪৫ দিন মুছে ফেলি তাহলে আমাদের হাতে থাকছে পুরো দুমাস আর দুই সপ্তাহ। এই সময়ে দুই সম্রাটের মধ্যে মুখ দেখাদেখি ছিল না। জৌহর বলছেন সময়টা দুমাস। ফলে খুব কম সময়, প্রায় দুই সপ্তাহ তিনি শাহের দরবারে কাটিয়েছেন [২]। সাফাভি ইতিহাস সূত্রে পাচ্ছি হুমায়ুনের দরবারে কাটিয়েছেন খুব কম সময়। রাউজাতুসসাফাভিয়া বলছে হুমায়ুন সাফাভি সম্রাটের সঙ্গে চার মাস কাটিয়েছেন [৩]। খুর শাহের মতে হুমায়ুন খুব বেশি হলে এক মাস শাহের সঙ্গী হন [৪]। মসিরইরহিমি শাহের সঙ্গে হুমায়ুন ২-৩ মাস কাটিয়েছেন [৫]। মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখ সময়টাকে ৪ মাস বলছে [৬]।
ষষ্ঠ অধ্যায়
কান্দাহার নিয়ে পারস্য আর হিন্দুস্তানের দ্বন্দ্ব
১। কান্দাহারের প্রথম অবরোধ
যদুনাথ সরকার হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব বইতে লিখছেন ‘পশ্চিম থেকে ভারতবর্ষে আসার রাস্তা এবং দক্ষিণ থেকে কাবুলে প্রবেশের রাস্তায় কান্দাহার শহর অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কান্দাহারের রণনৈতিক গুরুত্ব হল হেরাট আর কান্দাহারের মধ্যে ৩৬০ মাইল ফাঁকা মাঠ আর হিন্দুকুশ পর্বত। পর্বতের পাদদেশে কান্দাহার। শহরের সীমান্ত পেরোলেই হিন্দুস্তানে প্রবেশের রাস্তা খোলা। অর্থাৎ মধ্য এশিয়া বা পারস্য থেকে আসা বাহিনী যদি কান্দাহার থানা পেরোনোর সুযোগ পায়, বা কান্দাহার তার বা তার বন্ধু রাজত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তার পক্ষে ভারতবর্ষ, তৎকালীন হিন্দুস্তানে অবাধ প্রবেশের সুযোগ বেড়ে যায়। সে যুগে কাবুল ছিল দিল্লি সাম্রাজ্যের অংশ, কান্দাহার তার আবশ্যিকভাবে প্রথম সুরক্ষা বলয়’। হুমায়ুনও এই তত্ত্ব ভালভাবেই জানতেন, বুঝতেন। তিনি জানেন হিন্দুস্তান উদ্ধার প্রকল্পে কান্দাহারকে সামরিক লড়াইএর ঘাঁটি বানানো ছাড়া এই বিপুল যুদ্ধে সফল হওয়ার অন্য কোনও উপায় নেই।
হুমায়ুন এবং বৈরাম কান্দাহার কেল্লা অবরোধ করলেন। শত্রুপক্ষের কেল্লায় জোরদার নিরাপত্তা বেড়া তৈরি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েযায় হুমায়ুনদের অবরোধ দীর্ঘকাল গড়াবে [২]। তিন মাস ধরে রোজকার যুদ্ধে দুপক্ষের প্রচুর সৈন্য মারা যেতে থাকে। শুরুতে আহমদ সুলতান শামলু, হায়দার সুলতান শাইবানি আর তার দুই ছেলে আলিকুলি খান আর বাহাদুর খান। মাকসুদ বেগ আখতাবেগী শামলু, দোস্ত বাবা কুরবেগী। হায়দার আলি আখতাবেগী, মিথর ইয়ুসুফ খাজিনাদার, মিরাগ মারস্তানি এবং হায়দার তাবরিজি কেল্লার দেওয়ালে প্রবল আঘাত হেনে দেওয়ালে ফাটল ধরিয়ে দেন। বাবা দোস্ত আর মিথার ইয়ুসুফ মারা গেলেন, আহত সেনার লেখাজোখা নেই [৩]। (চলবে)