বই পরিচিতি
[সুকুমার রায় হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস উপাখ্যান লিখতে যে সব বইএর সাহায্য নিয়েছেন, তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। শুরু করছেন ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাসগুলো থেকে। তারপরে আসবে পারসিক সাফাভি দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা ইতিহাস, শেষে ইওরোপিয় বইপত্র।]
ভারতবর্ষীয় বই
১। তাজকিরাতুলওয়াকিয়াত, জৌহর আফতাবাচি
৯৯৫ আহ/১৫৮৭তে লেখা। হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস পর্ব বিষয়ে সব থেকে বিশ্বাসযোগ্য স্মৃতিকথা, কারন একমাত্র তিনি, জৌহর আফতাবাচিই নিজের চোখে সব ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। সম্রাটের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পারস্যে সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। মাত্র কিছুটা সময়, শিশু আকবরকে কান্দাহারে নিয়ে যাওয়ার পর্বের ছোট্ট সময়টা ছাড়া তিনি সে সময়ের ঘটমান বর্তমানের প্রত্যক্ষ্যদর্শী। তিনি হুমায়ুনের দলের সঙ্গে যোগ দেন হেরাটে। তাজকিরাত শুধু সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা নয়, এটি একমাত্র প্রত্যক্ষ্যদর্শী বিবরণী যা কোনও ঘটনাকেই অতিরঞ্জন বা অপলাপে পর্যবসিত করে না; বইতে সম্রাটের বদনাধারকের সত্য বয়ান সরাসরি আত্মকথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে; তিনি কোনও ঘটনাকেই বাড়িয়ে চড়িয়ে বর্ণনা করেন নি, বরং যা ঘটছে, সে সবকে যথাযথ উপায়ে লিপিবদ্ধ করতে সাহায্য করেছেন। জৌহরের মত ঐতিহাসিকও ইরাণে হুমায়ুনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ডের এত নির্ভরযোগ্য বয়ান লিখে যান নি। জৌহর ছাড়া মুঘল দৃষ্টিভঙ্গীওয়ালা একজনও ঐতিহাসিক সাফাভি দরবারে সম্রাট হুমায়ুনের ওপর ঘটে যাওয়া অবিচার লাঞ্ছনা লিপিবদ্ধ করেন নি।
তবে জৌহরের বর্ণনায় বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে। যেমন জৌহর ঘটনাক্রমের সাল তারিখের ম্রম ঠিক মত রাখেন নি। তাঁর লেখায় ঠিকঠাক তারিখের উল্লেখ পাই না; কোথাও কোথাও ভুল তারিখও উল্লেখ করেছেন তিনি। মাথায় রাখতে হবে তিনি যে ইতিহাস বয়ান করেছেন, সেটি লিখিত হয়েছে হুমায়ুনের মৃত্যুর ৩০ বছরের পরে। কোন ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনও ঘটনা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেটা তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় নি হয়ত। বহু ঘটনা তিনি বিশদে আলোচনা করেন, যা অতি বিশদে আলোচনা করার যোগ্য ছিল না, আবার এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তিনি আলোচনা করেন কয়েক স্তবক, যা বিশদে আলোচনার যোগ্য ছিল। জৌহরের লেখা নিয়ে আলোচনায় একটা মহা সমস্যা রয়েছে — সেটা হল অনুবাদ। অনুবাদক স্টুয়ার্ট, জৌহরের লেখার বিশ্বস্ত অনুবাদও করেন নি বা ঠিক অনুবাদও করেন নি। আমাদের মনে হয় এ ক্ষেত্রে এরকসিনের মর্মভেদী সমালোচনা যথাযথ হয়েছে ‘মেজর স্টুয়ার্টের অনুবাদটি বিন্দুমাত্র অনুবাদ হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য নয়। প্রচুর ভুল করেছেন। নিজের মন্তব্য যোগ করেছেন, বাদ দিয়েছেন এবং পরিবর্তনও করেছেন। স্টুয়ার্ট অনুবাদ বিশ্বস্ত নয়, ভৌগোলিক স্থানগুলোর উচ্চারণ ঠিকমত করেন নি, কারন তিনি ভুগোলটাই জানেন না, ভাষা জানেন না, অনুবাদকের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নন [১]।
জৌহরের পাণ্ডুলিপি নিয়ে যেহেতু সমস্যা আছে, আমি তিনটে পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি — স্যর যদুনাথ সরকারের আলিগড় ইউনিভার্সিটির নকল, পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির নকল এবং ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি নকলগুলোর মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। যদুনাথ সরকার অনেকটাই পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিরটির পাণ্ডুলিপিটির তথ্যের সঙ্গে একমত কিন্তু ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি পাণ্ডুলিপিটির তথ্যের সঙ্গে একমত নন — সমস্যা হল স্টুয়ার্টের অনুবাদ তিনটের থেকেই আলাদা। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি পাণ্ডুলিপিটির তারিখ ১০৬০/১৬৫০ পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়েরটির তারিখ ১২৮৭/১৮৭১। পাটনারটাও তুলনামূলকভাবে আধুনিক ১২৭৮/১৮৬২। সব থেকে পুরোনোটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ১০১৯/১৬১০। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ফটোস্ট্যাটটি আগস্টের ১৯৩৯-এ চেয়ে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু যুদ্ধের পরিবেশের জন্যে সেটি নিয়ে কাজ করতে পারি নি।
২। মুখতাসর, বায়াজিদ
১০০০/১৫৯১-এ লেখা। সম্রাট হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস বিষয় আলোচনায় জৌহরের তাজকিরাতুলওয়াকিয়াতএর পরের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকথাটি হল বায়াজিদের মুখতাসর। বায়াজিদও অনেকটা সময় হুমায়ুনের সঙ্গে ইরানে ছিলেন। ফলে বায়াজিদের স্মৃতিকথার একাংশ প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বিবরণ হিসেবে গণ্য হয়। হুমায়ুন যখন তখতইসুলেইমানের কাছে শাহের সঙ্গে শিকার করছিলেন, সেই সময় থেকে বায়াজিদ হুমায়ুনের ছায়াসঙ্গী। হুমায়ুন যখন তাব্রিজি আর আরদাবিলে গেলেন সেখান থেকে বায়াজিদ আলাদা হয়ে যান, আবার হুমায়ুনের সঙ্গে মশদে যোগ দেন, কান্দাহার পর্যন্ত থাকেন। বায়াজিদ জৌহরের মত হুমায়ুন সংক্রান্ত ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণ লেখেন নি। বায়াজিদ হুমায়ুনের সাফাভি দরবারে যাওয়া এবং পারস্য দরবারে তার কাজকর্ম খুবই সংক্ষেপে বলেছেন। শাহের সঙ্গে হুমায়ুনের কাটানো শেষ কয়েক দিন, বিশেষ করে তখতইসুলেইমানে আয়োজিত শিকার উৎসব, অন্যান্য উৎসব পরব সম্বর্ধনা এবং কান্দাহারে ফিরে আসা পর্যন্ত সময় তাঁর বইতে বিশদে আলোচনা আছে। হেরাটের প্রশাসককে শাহ যে ফরমান পাঠিয়েছিলেন হুমায়ুনের অভ্যর্থনা উৎসব আয়োজনের বিশদ বিবরণ লিখে, সেটা নিজের লেখায় উল্লেখ করেছেন, এবং যতদূরসম্ভব বায়াজিদের থেকেই আবুলফজল সেই ফরমান নিজের লেখায় নিয়েছেন। কান্দাহারের প্রথম অবরোধের বর্ণনা বায়াজিদের তুলনীয় কারোর লেখায় নয়। তবে উত্তম স্মৃতিকথা হিসেবে তাজকিরাতুলওয়াকিয়াতের তুলনায় মুখতাসর মোটেই উৎকৃষ্ট নয়। ঘটনাগুলো বিক্ষিপ্তভাবে এসেছে, মূল ঘটনার সঙ্গে নানান ছোটখাট ঘটনাকে মেলানোর উদ্যোগ ছিল না; অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তাঁর লেখায় বহু সময় ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনের ছাপ অনাবশ্যকভাবে উঠে এসেছে। ঘটনার ৫০ বছর পর বায়াজিদ এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন ৯৯৯/১৫৯০-৯১তে। বৃদ্ধাবস্থায় পক্ষাঘাতে প্রায় অবশ মানুষটা স্মৃতিকথা নথিকরণ করতে চেয়েছেন। ফলে ঘটনাবলী নিজের হাতে লিখতে পারেন নি। তাঁর স্মৃতিকথা ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে মাত্র একটাই আছে। আমি সেটা ব্যবহার করেছি। ড হিদায়েত হোসেইন রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের জন্যে বইটি সম্পাদনা করেছেন।
৩। হুমায়ুননামা, গুলবদন বানু বেগম
১০০০/১৫৯১তে বইটি লেখা হয়। সৎ ভাই হুমায়ুনের সঙ্গে গুলবদন বানু বেগম ইরাণে যান নি। সখী, বৌদিদি, হুমায়ুনের সঙ্গে পারস্যে যাওয়া, ঘটোনাবলীর প্রত্যক্ষ্যদর্শী হামিদা বানু বেগমের থেকে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন। গুলবদনের পক্ষে হুমায়ুনের পারসিক প্রবাস জীবন খুব বিশদে নথি করণ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাঁর লেখা সংক্ষিপ্ত, বিশৃঙ্খল এবং তারিখবিহীন। গুলবদনের স্মৃতিকথা পক্ষপাতদুষ্ট, ভাইয়ের প্রতি তিনি তীব্র সহানুভূতিশীল, ফলে ঐতিহাসিক মূল্য হিসেবে এই স্মৃতিকথার গুরুত্ব হ্রাস হয়েছে। এই সব কারনে হুমায়ুননামা ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে খুব বেশি মান্যতা পায় নি। ওরিয়েন্টাল ট্রান্সলেশন ফান্ডের সহায়তায় শ্রীমতি এ এস বিভারেজ বইটি অনুবাদ করেছেন। তাছাটা লক্ষ্ণৌ থেকেও বইটি প্রকাশিত হয়েছে।
৪। তারিখ-ই-হুমায়ুনশাহ, শেখ ইলাহাদাদ ফৈজি শিরহিন্দি
বইটি সম্রাট আকবরের সময়ে লেখা হয়। জৌহরের স্মৃতিকথার মত ফৈজী চোখে দেখা ঘটোনা লেখেন নি — কিন্তু একে আমরা জৌহরের বইএর সংশোধিত সংস্করণও বলতে পারি। যদিও তিনি জৌহরের বইতে উল্লিখিত ঘটনাবলী সংশোধন করেছেন, কিন্তু সে সংশোধনীগুলো মূল লেখাকে অনেকাংশেই বদলে দিয়েছে। পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী সূত্র ধরে তাঁর বর্ণনাকে বাড়ানো হয়েছে। তবে জৌহরের বর্ণনায় বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় বুঝতে সহায়ক হয় এবং মাঝেমধ্যে তিনি বেশ কিছু নতুন তথ্যও জূড়েছেন। যেহেতু আগেই বলেছি জৌহরের তিনটে পাণ্ডুলিপি একে অপরের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা, ফৈজি সিরহিন্দি থেকে সাহায্য নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত জায়গা আমরা নতুন করে বুঝতে পারি, ভৌগোলিক এলাকার নাম পরিষ্কার হয়। আমি খুব সুন্দর অবস্থার ইন্ডিয়া অফিস পাণ্ডুলিপিটা ব্যবহার করেছি।
আকবরনামা, আবুলফজল
১০০৪/১৫৯৬তে লেখা। বইটিতে বহু খুঁত থাকা সত্ত্বেও, এটি ইসলামিক সময়ে লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাস গ্রন্থ। ভারতবর্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা অন্য যে কোনও বর্ণনা/আত্মকথা থেকে, অবশ্যই তাজকিরাতুলওয়াকিয়াতকে বাদ দিলে, ইরানে হুমায়ুনের প্রবাসকালের সব থেকে বেশি, নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আবুলফজলের আকবরনামায় পাই। ইতিহাস তৎকালীন সময়ের লেখার পদ্ধতি মেনে এবং সময়ক্রম মান্যকরে বইটি লেখা হয়েছে। এতে হুমায়ুনের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য জায়গায় ঘোরা, সাফাভি দরবারে শাহের সঙ্গে কথাবার্তা, বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠান আর শিকারপর্বের বিশদ বিবরণ পাই। আমাদের ধারণা তিনি বায়াজিদের লেখা থেকে হেরাটের প্রশাসককে পাঠানো শাহের ফরমানটা নিয়েছেন। কিন্তু আকবরনামার সমস্যা হল পারস্যে হুমায়ুনকে যে সব সমস্যা, অপমান, তকলিফ ইত্যাদি সহ্য করতে হয়েছে সে সব ঘটনা তিনি স্রেফ বাদ দিয়েছেন। পারস্যে থাকাকালীন সময়ে শাহ যে হুমায়ুনকে তার ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছেন, সে সব তিনি উল্লেখমাত্রও করেন নি, বরং হুমায়ুন শাহের দরবারে কত সম্মানজনকভাবে দিন কাটিয়েছেন, শাহের আপ্যায়নের তিনি কত সুখী ছিলেন, সে সব বর্ণনা আবুলফজল লিখেছেন। ফলে হুমায়ুনের পারস্য প্রবাস ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় আকবরনামাকে খুব তৌল করে পড়া দরকার। আমি সাধারণভাবে বেভারেজের অনুবাদ করা বই অনুসরণ করেছি, মাঝেমধ্যে প্রয়োজন পড়লে এশিয়ায়টিক সোসাইটি বা লখনৌ-এর সংস্করণটিও ব্যবহার করেছি। (চলবে)