প্লীজ এখানে পাঁচ সেকেন্ড একটু ইন্টারাপ্ট করছি।
বল।
আচ্ছা এখানে যদি শিব আর সতীর ব্যাপারটা স্বামী-স্ত্রীর খুনসুটি হিসাবে ধরি।
ধরতেই পারিস আমি কি গেড়ো দিয়ে রেখেছি।
তুমি রাগ করছো।
রাগ করছি না। বল।
আমাদের মধ্যেও তো এরকম হয়। বৌ যখন বলে বাপের বাড়ি যাব আমি গেঁই-গুঁই করি। বউ যখন তেন্ডাই-মেন্ডাই করে নাচা নাচি শুরু করে তখন বাধ্য হয়ে বলি ঠিক আছে যাও।
একচ্যুয়েলি পুরানটা গল্প। গল্প যখন লেখা হয় মন থেকে লেখা যায় না। কিছুটা তার বাস্তব উপাদান থাকে।
এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই।
লোভ সামলাতে না পারলে মাঝে মাঝে ইন্টারাপ্ট করবো। এবার বলো।
এরপর সতীদেবী পারিষদদের নিয়ে যজ্ঞ স্থলে উপস্থিত হলেন। কিন্তু পিতা দক্ষ সতীকে দেখে গালমন্দ শুরু করলো। কেন সে নিমন্ত্রিত না হয়েও এখানে এসেছে। শিবের গুষ্টির তুষ্টি পূজো করলো।
অতো লোকের মাঝে পতিনিন্দা শুনে সতীর মুখ চোখ লাল হয়েগেল। যজ্ঞস্থলেই সতী দেহত্যাগ করলেন।

সদাশিব তার দুই চেলা নন্দী-ভিরিঙ্গির মুখে সতীর দেহত্যাগের কথা শুনে খেপে লাল হয়ে গেল।
বীরভদ্রাদি অনুচরদের নিয়ে শিব দক্ষের যজ্ঞশালায় উপস্থিত হলেন।
সতীর মৃত মুখ দেখে শিব আর স্থির থাকতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে অনুচরদের বললেন যজ্ঞ লণ্ড-ভণ্ড করে দাও আর দক্ষকে হত্যা করো।
শিবের আজ্ঞা পেয়ে অনুচরেরা সব লণ্ড-ভণ্ড করে দিল। ধর থেকে দক্ষের মথা আলাদা করে দিল।
দক্ষরাজের স্ত্রী শিবের শ্বাশুড়ী জামাই-এর কান্ডে হতবাক। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে উঠলেন। তিনি শিবের কাছে স্বামীর প্রাণভিক্ষা করে স্তব স্তুতি করতে শুরু করে দিলেন।
শেষে শিব ছাগলের মুন্ডু কেটে দক্ষের মাথায় বসিয়ে দিয়ে তাকে জীবনদান করলেন।
এরপর শিব অনুচরদের কৈলাসে পাঠিয়ে সতীর দেহ নিয়ে ত্রিভুবন দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করলেন।
শিবের এই উন্মত্ত আস্ফালনে ত্রিভুবনে প্রলয়কান্ড শুরু হয়েগেল।
ব্রহ্মা ভয়ে তটস্থ হয়ে সৃষ্টি রক্ষার তাগিদে বিষ্ণুর কাছে উপস্থিত হলো।
যেহেতু উনি এই ধরাধামের পালনকর্তা।
সতীর শবদেহ চিন্ময়বস্তু। শিবগাত্র স্পর্শে তার মহিমা হাজার গুণ বেরেগেছে।
জগৎপালক বিষ্ণু তখন জগতের মঙ্গলকামনার্থে তাঁর সুদর্শন চক্রের সাহায্যে ধীরে ধীরে একান্ন খন্ডে বিভক্ত করলেন। দেবীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধরাধামের যেখানে যেখানে পরলো সঙ্গে সঙ্গে তা পাথরে পরিণত হলো। সেই সব স্থান পবিত্র মহাপীঠ রূপে প্রসিদ্ধ লাভ করলো।
এই একান্নটা মহাপীঠ ছাড়াও ছাব্বিশটা উপপীঠ রয়েছে।
এবার একটু ইন্টারাপ্ট করি।
বল।
কামরূপে মায়ের মাতৃ যোনি পতিত হয়েছিল।
হ্যাঁ।
এবার আমার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি মারছে। প্রথমে তিনটে প্রশ্ন করবো তোমাকে।
বল।
এক। কমরূপ নাম হলো কেন? দুই। দেবীর নাম কেন কামাখ্যা? তিন। পাহাড়টার নাম নীলকণ্ঠ কেন?
এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর দিলে তোর সব জানা হয়ে যাবে।
না না আমার মনে হলো তাই বললাম তুমি তোমার মতো করে বলো না।
আগের যে কাহিনী বললে সেটা সকলে জানে। কিন্তু তার মধ্যেও কয়েকটা নতুন উপকরণ পেলাম এক, একান্নপীঠ ছাড়াও ছাব্বিশটা উপপীঠ রয়েছে। দক্ষের স্ত্রীর নাম। আর দক্ষের কাটামুন্ডে ছাগলের মুন্ড বসানো।
তুই বহুত ঝামেলাকর ছেলেতো।
লোকে তাই বলে।
যে স্থানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল সেই স্থান হচ্ছে তীর্থচূড়ামণি।
সেটা আবার কিগো।
মা-বাবার মুখে শুনিস নি। সব তীর্থ বার বার গঙ্গাসাগর একবার। কেন? তখনকার সময় সাগরতীর্থে যাওয়াটা ভীষণ বিপদ সঙ্কুল ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র এই বিষয়কে নিয়ে সাগরসঙ্গমে লিখে ফেলেছিল।
পরেছি।
তীর্থচূড়ামনির অর্থ হলো। সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থ স্থান।

যেখানে সতীর যোনি মন্ডল পতিত হয়েছিল সেই জায়গাটাকে বলে কুব্জিকাপীঠ। যোনিরূপ যে প্রস্তরখণ্ডে মা কামাখ্যা অবস্থান করছেন, সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ মুক্তিলাভ করে।
এই প্রসঙ্গে কালিকাপুরাণের একটা গল্প বলি।
কালিকাপুরাণের ছাব্বিশতম অধ্যায়ে কামাখ্যার বর্ণনা রয়েছে।
পূর্বে এই পর্বতের উচ্চতা ছিল শতেক যোজন। কিন্তু মহামায়া সতীর যোনি অঙ্গ পতিত হওয়ার পর এই উচ্চ পর্বত মহামায়র যোনি মন্ডলের ভার সহ্যে করতে না পেরে কেঁপে উঠলো এবং ক্রমশঃ পাতালে প্রবেশ করতে লাগলো। তখন শিব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রত্যেকে একটা করে শৃঙ্গ ধারন করলেন। তাদের সঙ্গে মহামায়া স্বয়ং সমবেত হলেন। এবং পাতাল প্রবেশ থেকে রক্ষা করলেন এই শৃঙ্গকে। ফলে পর্বতের উচ্চতা একশতো যোজন থেকে এক ক্রোশ উঁচু হয়েগেল।
আর মতৃ যোনি পতিত হওয়ার ফলে পর্বতের রং নীল বর্ণ আকার ধারণ করলো। তাই পর্বতের নম হলো নীলকণ্ঠ পর্বত। অনেকে আবার নীলাচল পর্বতও বলে।
এই মহামায়া নিখিল জগতের প্রকৃতি এবং এই জগতের প্রসব-কারিণী তাই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর তাকে ধারণ করে রেখেছেন।
তুমি তো পুরো খুঁচিয়ে ঘা করে দিলে।
কেন।
মনের মধ্যে এখন হাজার প্রশ্ন কিলবিল করছে।
পরে বলিশ এখন লিখতে দে।
কামরূপ নামটা কেন হলো বলো।
এটাও পৌরাণিক গল্প থেকে বলতে হবে।
তাই বলো।
কালিকাপূরাণে এর বিবরণ পাওয়া যায়। তোর এই কবিতাটার কথা মনে আছে।
কোনটা বলো।
পঞ্চশ্বরে বিদ্ধ করে করলে একি সন্ন্যাসী / বিশ্বময় দিয়েছো তাকে ছড়ায়ে।
হ্যাঁ।
বিষ্ণুতো সতীর সব-ব্যবচ্ছেদ করে ধরাধামের একান্নটা অংশে ফেলে দিয়ে কেটে পরলেন। কিন্তু মহাযোগী মহাদেব, স্ত্রী সতী বিরহে পাগল প্রায় অবস্থা। তাঁর মনে মহাবৈরাগ্যের উদয় হলো। তিনি হিমালয়ের দুর্গম স্থানে গিয়ে তপস্যায় নিমগ্ন হলেন।

সেই মহাযোগীর ধ্যান ভঙ্গ করে কার সাধ্য।
এদিকে দক্ষযজ্ঞে সতীদেবী প্রাণত্যাগ করার পর গিরিরাজ হিমালয়ের গৃহে মেনকার গর্ভে কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করলেন। শিশু কন্যাকে সকলে গিরিজা, পার্বতী আরও নামে ডাকতে শুরু করলেন।
এদিকে পিতামহ ব্রহ্মা তারকাসুর নামে অসুররাজের কঠোর তপস্যায় সুপ্রসন্ন হয়ে তাকে বর দিলেন ত্রিভুবন শিবের ঔরাসজাত সন্তান ভিন্ন কেউই তাকে বধ করতে পারবে না।
ব্রহ্মার বরে বলীয়ান তারকাসুর ত্রিলোক জয় করে দেবতাদের প্রজা বানিয়ে দিলেন।
ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণ ব্রহ্মার শরাণাপন্ন হয়ে তাঁকে সব জানালেন।
ব্রহ্মা সব শুনেটুনে বেশ চিন্তিত হয়ে পরলেন। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর তিনজনে সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়ের কর্তা একজন এইভাবে উদাসীন হয়ে পরলে সৃষ্টিরক্ষা করা মহা মুস্কিল। তার ওপর তারকাসুরের ঝামেলা।
ব্রহ্মা তখন দেবতাদের ডেকে বললেন, সতী দেহত্যাগের পর গিরিরাজের ঔরসে মেনকার গর্ভে স্থান পেয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। একমাত্র শিব বীর্য হতে উৎপন্ন সন্তান তারকাসুরকে বধ করতে পারবে।
সব শুনে-টুনে দেবতারা যেন একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পেল।
প্রথমে শিবের ধ্যান ভঙ্গ করতে হবে, দ্বিতীয় শিবের বিয়ে দিতে হবে।
চলো নারদের কাছে। (আগামীকাল)