নারদ দেবতাদের কথা শুনে আনন্দে নেচে উঠলেন। চলে গেলেন হিমালয় রাজের কাছে। গিরিরাজ এবং তার স্ত্রী মেনকা সব শুনে মহা খুশী। তার কন্যার সঙ্গে শিবের বিয়ে হবে। এর থেকে সুখবর আর কি আছে।
অনেক খোঁজা খুঁজির পর মহাদেবের দুর্গম যোগসাধনের স্থান খুঁজে বার করা হলো।
গিরিরাজ হিমালয় এবং তাঁর স্ত্রী মেনকা দেখে এলেন শিবের সেই সাধনের স্থান।
তাঁর রাজপ্রসাদ থেকে সেটা খুব একটা দূরে নয়।
দেবর্ষি নারদের কথা মতো তিনি পার্বতীকে পাঠালেন মহাদেবের পূজা আর সেবা করার জন্য।
পার্বতীও মহা আনন্দে সখীদের নিয়ে প্রত্যহ শিবের পূজা শুরু করলেন।
সতীর মুখের ছায়া পার্বতীর মুখ মন্ডলে।
একবার শিবের ধ্যানভঙ্গ হলে তিনি যদি পার্বতীকে দেখেন তাহলে পার্বতীকে পাওয়ার জন্য তিনি উদগ্রীব হয়ে উঠবেন। মহাদেব নিজেই গিরিরাজের কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাবেন।
কিন্তু মহাযোগী শিব একদিনও পার্বতীর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন না।
ব্রহ্মা বিষ্ণু পরলেন মহা সংকটে।
দেবতাদের সঙ্গে ব্রহ্মা বিষ্ণু মিটিং করে স্থির করলেন, একমাত্র শিবের মধ্যে কামের উদ্রেক জাগাতে পারলেই তার ধ্যানভঙ্গ হওয়া সম্ভব।

ডাক পরলো কাম দেবের। বুঝিয়ে দেওয়া হলো তার কাজ।
যথা সময়ে কামদেব স্ত্রী রতিকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন হিমালয়ের শিখরে।
ফুল শর নিক্ষেপ করে কামদেব মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ করলেন।
ধ্যানভঙ্গ হওয়ার পরই মহাদেবের রোষানলে পরলেন মদন কামদেব। শিবের তৃতীয় নয়নের অগ্নিবর্ষণে কামদেব ভষ্মে পরিণত হলো। রতি মূর্ছাগেল। দেবতারা পরলেন মহা বিপদে।
এক বিপদ যায়, আর এক বিপদ এসে উপস্থিত হয়।
দেবতারা কোনপ্রকারে রতিকে সুস্থ করে বললেন, তুমি ভয় পরিত্যাগ করে এই ভস্মগ্রহণ করো, শিব সুপ্রসন্নহলে আমরা তোমার প্রাণবল্লভকে পুণঃ জীবনদান করবো।
কামদেব ভষ্মীভূত হওয়ার পর শিবের উগ্রচন্ডীভাব কিছুটা স্তিমিত হলো।
পার্বতীর দিকে চোখ পরতেই তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন। খুব চেনা চেনা মুখ। তারপরেই আবার গম্ভীর হয়ে নিজের যোগাসন থেকে উঠে সেই স্থান পরিত্যাগ করলেন।
পার্বতীও ছাড়বার পাত্র নয়। শিবকে পাওয়ার জন্য তিনি তপস্যায় ব্রতী হলেন।
শিব পার্বতীর তপস্যায় গলে জল হয়েগেলেন।
সময় সুযোগ করে মহাধুমধাম সহকারে তিনি পার্বতীকে বিবাহ করলেন।
দেব-দেবাদিদেব সকলেই মহাদেবের বিবাহে উপস্থিত রইলেন। রতিও সেই বিবাহে উপস্থিত হলেন।
নিজের স্বামীকে ফিরে পাবার জন্য তিনি শিবের কাছে কাকুতি মিনতি করতে শুরু করলেন। দেব-দেবীগণ সকলেই শিবের কাছে প্রার্থনা করলেন রতির স্বামী কামদেবকে পুনঃ জীবিত করা হোক।
শিব রতির হস্তে ধরা সেই ভস্মাধারে তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সেই ভস্মাধার থেকে কামদেবের পুনঃ জন্ম হলো। রতি স্বামী পেলেন।
কিন্তু এই কামদেবের রূপের বিপর্যয় ঘটেছে। কামদেবের সেই কাম রূপ স্বরূপ-কান্তি আর নেই।
দুজনেই আবার শিবের কাছে প্রার্থনা করলেন, ফিরিয়ে দেওয়া হোক তার আগের রূপ।
তখন মহাদেব বললেন। ভারতবর্ষের ঈশানকোনে নীলাচল পর্বত রয়েছে। সেখানে সতীদেহের একান্নটা খন্ডের এখনো একটা খন্ড অনাবিষ্কৃত রয়েছে। সেটি মহামায়ার মহামুদ্রা।
সেখানে গিয়ে দেবীর মহিমা প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা করলে তুমি তোমার আগের রূপ আবার ফিরে পাবে।
কামদেব নীলাচলে এসে মহামায়ার সেই মহামুদ্রা প্রস্তরখন্ড রূপে খুঁজে পেলেন এবং ভক্তি সহকারে পূজা পাঠ করলেন। মহামায়া কামদেব এবং রতির প্রার্থনায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে তার আগের রূপ প্রদান করলেন।

এই যে কামদেব এখানে এসে তাঁর আগের রূপ ফিরে পেলেন তাই জায়গার নাম হলো কামরূপ।
কামদেব তাঁর স্বীয় রূপ ফিরে পাবার পর। দেবীর পূজা যাতে সঠিক ভাবে হয় তাই তিনি বিশ্বকর্মাকে ডেকে পাঠালেন। মহামায়ার জন্য মন্দির তৈরি করতে হবে। বিশ্বকর্মা জায়গা দেখে ভীষণ আনন্দ পেলেন।
সব শোনার পর তিনি মন্দির নির্মান করলেন।
মন্দিরের গায়ে চৌষট্টি যোগিনী, আর আঠারোটা ভৈরব-মূর্তি খোদাই করলেন।
কামদেব এই মন্দিরকে আনন্দাখ্যা মন্দির নামে জগতে প্রচার করলেন। আর মহামায়া মায়ের মহামুদ্রার নাম হয় মনোবভগুহা।
কিরে ঘুমিয়ে পরলি।
না।
তাহলে।
মাথাটা কেমন কেমন করছে।
কেন।
যা ডোজ দিচ্ছ হজম করতে অসুবিধে হচ্ছে।
সব মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তা নয়। সব জড়িয়ে-মড়িয়ে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। তুমি দিয়ে যাও। প্রথমবার গরুর মতো গিলে যাই তারপর না হয় ধীরে সুস্থে যাবর কাটবো।
তাই হোক। এখন থামবো না দিয়ে যাব।
থামবো মানে, খেপেছো। তীর্থের কাকের মতো মনিটারের দিকে চোখ মেলে বসে আছি।
কামরূপের ব্যাখ্যা পেলি।
স্ট্রেইট গল্প মারলে। কিন্তু তার মধ্যে কিছু প্যাঁচ মেরেছো। যেটা বাস্তবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
তোকেতো আগেই বলেছি। পুরাণের গল্প গুলো আমাদের জীবন থেকে নেওয়া। বাস্তবের নির্যাস।
তোমার গল্পবলার ঢঙে তাই মনে হচ্ছে।
এর পর আরও গল্প আছে আমি সে প্রসঙ্গে যাব না। তবে কামরূপের কথা রামায়ণ, মহাভারত, বহুপূরাণে আমরা দেখেছি। কালিদাস তার রঘুবংশে রঘুরাজের দিগ্বিজয়ের প্রসঙ্গ লিখতে গিয়ে কামরূপের কথা বলেছেন।
ইতিহাস ঘেঁটে আরও তথ্য পেয়েছি। কতবার যে এই মন্দির ধ্বংস হয়েছে আবার তৈরি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। হিউ-য়েন-সাঙ যখন ভারতে এসেছিলেন তিনিও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এই মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
সর্বশেষ ব্রিটিশরা ১৮২৫ সালে মান রাজাদের পরাস্ত করে বৃটিশ শাসন কায়েম করেন।
আজ এই পর্যন্ত থাক বুঝলি কাল আবার বাকিটা শোনাব।
না না। তা হবে না। ধরেছো যখন শেষ করো।
কাজলদীঘি এক ফোঁটাও লিখতে পারি নি।
অমনি একখানা খাঁড়া করে দিলে।
কাল কখন আসছো বলো।
এই সময়।
মনে থাকে যেন।
আচ্ছা। (আগামীকাল)