প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে আমার মেয়ে তার স্কুলের মেয়েদের দেওয়া একগোছা পেন আমাকে দেয়। মনে করিয়ে দেয় শিক্ষক দিবসের কথা। আমি শিক্ষকতা করলেও নিজেকে শিক্ষক বলে আজও ভাবতে পারলাম না। কারণ অনেকদিন ধরে প্রমথ চৌধুরী মশায়ের একটা কথা আমার মনে শিকড় বিছিয়ে আছে — ‘প্রত্যেক সুশিক্ষত মানুষই স্বশিক্ষিত’। তাহলে শিক্ষকের ভূমিকাটা ঠিক কি? সে কথা ভাবলেই আমার মনে পড়ে যায় ডিরোজিওর কথা। তিনি কি পড়িয়েছিলেন হিন্দু কলেজে, সেটা গৌণ; মুখ্য ব্যাপারটা হল ছেলেদের মনের ভেতরকার আগুনটাকে তিনি উসকে দিতে পেরেছিলেন। হয়তো এটাই শিক্ষকের ভূমিকা। কিন্তু যিনি উসকে দিতে পারবেন, তাঁকেও যে স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে আনতে হবে। তার মানে শিক্ষককে প্রথমত ও প্রধানত ছাত্র হতে হবে। কেননা ‘জ্ঞান’ জিনিসটা নিত্য বহমান। সেখানেই আমার সংকোচ। কতটুকু জেনেছি আমি, কতটুকু জানার চেষ্টা করেছি! এম এ পাশ করলে বা পি এইচ ডি পেলেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে নিষ্কর্মা ও সর্ববিদ্যাবিশারদ বলে ঢাক পেটানো যায়, হাততালিও মেলে, কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসার হাত থেকে রেহাই মেলে কি?…
আমার এই পোস্টটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁদেরই একজন আমাকে ফোন করে বললেন, ‘৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস কেন মেনে নেব আমরা! এর পেছনে আছে একটা কলঙ্কিত, বিতর্কিত, অমীমাংসিত ইতিহাস।’ অকপটে বলছি, — এই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সেদিন রাতেই একটা ইউটিউব আমার নজরে এল। দু-একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালন না করার কথা। এই প্রসঙ্গে এসে যাচ্ছে ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের নাম, যিনি এক সময় আমাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন; এসে যাচ্ছে বীরভূমের ভূমিপুত্র যদুনাথ সিংহের নাম, যাঁর গবেষণাপত্রের পরীক্ষক ছিলেন রাধাকৃষ্ণান। এসে যাচ্ছে plagiarism-এর কথা; ভদ্রবাংলায় যা হল কুম্ভীলকবৃত্তি, আর গোদা বাংলায় যা হল চুরি। কিন্তু সেসব বিষয়ে যাবার আগে অন্য দু-একটি আলোচনা সেরে নিতে হবে।
গুরু / গুরু পূর্ণিমা
ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষায় গুরুর বিশিষ্ট স্থান আছে। আমরা ইহলোক থেকে পরলোকের ভাবনা বেশি ভাবি, ভাবি মোক্ষ বা মুক্তির কথা। গুরু সেই মুক্তির দিশারী। তাই আমাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় সেই মন্ত্র : —
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বর
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ
ঋকবেদের ৪, ৫, ৬ শ্লোকে; ছান্দোগ্য উপনিষদের ৪.৪ অধ্যায়ে, কঠোপনিষদের ১, ২, ৮ শ্লোকে; তৈত্তরীয় উপনিষদের ৩য় অধ্যায়ে আছে গুরুর কথা। শিক্ষক দিবস বা গুরু দিবস পালনেরও পরম্পরা ছিল আমাদের দেশে। সেই দিবসটির নাম ছিল গুরুপূর্ণিমা। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে গুরুপূর্ণিমা পালন করা হত। শুধু হিন্দুধর্মে নয়, বৌদ্ধধর্মেও গুরুপূর্ণিমার গুরুত্ব ছিল। উত্তরপ্রদেশের সারনাথের কথা প্রসঙ্গত মনে পড়ে। এখানেই আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় বুদ্ধদেব তাঁর প্রথম উপদেশ দেন।
‘দ্য স্ট্রেঞ্জ মিনিং অব টিচার্স ডে ইন ইণ্ডিয়া’ প্রবন্ধে রতনেশ কাটুলকর বলেছেন, — আমাদের দেশের গুরুরা ছিলেন ব্রাহ্মণ; দ্রোণাচার্য, বশিষ্ট, কৃপাচার্য, মনু, গৌতম প্রভৃতিরা তারই উদাহরণ। অব্রাহ্মণদের শিক্ষকতার বৃত্তিতে নিযুক্ত না করার কারণ হিসেবে রতনেশ বলেছেন যে তাহলে জাতিভেদ প্রথা বিঘ্নিত হবে : “The Brahmin’s complete domination of teaching was of course not without reason. The teaching profession is directly related with knowledge which is the key to human development and progress; in such a situation it is natural that the Brahmins restricted the teaching positions to themselves alone. Allowing non-Brahmins to teach would lead to the collapse of their sacred fourfold societal division : so how could they accept as teachers?”
একলব্যের বলিদান ও একালের একলব্যরা
মহাভারতে আছে একলব্যের গল্প। গঙ্গাতীরস্থ শ্রিংভারপুরের (বর্তমানের এলাহবাদ) আদিবাসী এলাকার হিরণ্যধনু ও সুলেখার ছেলে একলব্য (অন্য নাম অভিদ্যুম্ন, অভয়)। আদিবাসী পরিবারের গুরুকুল থেকে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করেন একলব্য। দক্ষ তিরন্দাজ হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু জ্ঞানের অসীম ক্ষুধা ছিল তাঁর।
তাই তিনি ঠিক করেন ধনুর্বিদ্যায় আরও জ্ঞানলাভের জন্য তিনি যাবেন গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে। কিন্তু তাঁর বাবা বাধা দিলেন। বললেন, — ‘দ্রোণাচার্য তোমাকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করবেন না।’ একলব্য জানতে চান কারণ। তখন হিরণ্যধনু বলেন যে দ্রৌণাচার্য শুধু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ছাত্রদেরই শিক্ষা দেন।
বাবার কথা মনঃপূত হল না একলব্যের। তিনি ভাবলেন নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা তিনি জয় করে নেবেন গুরুর মন। কিন্তু দ্রোণাচার্য তাঁকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তখন একলব্য অরণ্যে গুরু দ্রোণাচার্যের মূর্তি স্থাপন করে নিজেই ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করতে লাগলেন। একেই বলে স্বশিক্ষা।
একদিন একলব্যের সাধনার জায়গায় ঘটনাচক্রে উপস্থিত হলেন দ্রোণাচার্য। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর কিছু শিষ্য ও একটি কুকুর। কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে বিরক্ত করছিল। তাই একলব্য অসামান্য দক্ষতায় একটি তির নিক্ষেপ করে কুকুরের মুখ বন্ধ করে দিলেন অথচ এতে কুকুরের কোন ক্ষতি হল না। অবাক বিস্ময়ে দেখলেন দ্রোণাচার্য। এবং জানতে পারেন যে একলব্য তাঁকেই গুরু মেনে সাধনা করেছেন।
শুধু বিস্ময় নয়, দ্রোণাচার্যের মনে দেখা দিল উদ্বেগ।
আরে, এ ছোকরা যে গুরুমারা বিদ্যা আয়ত্ত করে ফেলেছে। এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রিয় শিষ্য অর্জুন যে গোল্লা পাবে। একজন আদিবাসী ছোকরার এই কৃতিত্ব মেনে নেওয়া যায় না। একলব্যকে নিষ্কর্মা করে দেবার জন্য দ্রোণাচার্য তাঁর কাছে গুরুদক্ষিণা হিসেবে চাইলেন তাঁর বুড়ো আঙুল। এটি কেটে ফেললে আর তির ছুঁড়তে পারবেন না একলব্য।
সেকালের গুরু আদিবাসী ছাত্রের শুধু বুড়ো আঙুল কেটে নিয়েছিলেন। সভ্যতাগর্বী আধুনিক যুগে নিম্নবর্গের দলিত, মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া হয়। চুনি কোটাল, রোহিত ভেমুলা, দর্শন শোলাংকি, অনিকেত আমভোবে, পায়েল তাদভি প্রভৃতিরা তারই উদাহরণ। হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা যতদিন থেকে এই দেশের ক্ষমতায় এসেছেন, ততদিন থেকে অ-হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নানা অবিচার শুরু হয়েছে। (আগামীকাল)