বিদ্যাসাগরের প্রথম জীবনীকার হলেন তাঁর সেজভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন। যদিও বিদ্যাসাগর নিজেও তাঁর অসম্পূর্ণ আত্মচরিত লিখেছেন। শম্ভুচন্দ্রের ‘বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত’ প্রথম বেরোয় ১৮৯১-এ। পরে চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাসাগরজীবনীর গালগল্পের জবাব হিসেবে লেখেন ‘বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাশ’। ১৮৯৫-এ চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন বিদ্যাসাগরের বিস্তৃত জীবনীআখ্যান ‘বিদ্যাসাগর’। এইবছর বিহারীলাল সরকারও বিদ্যাসাগরের জীবনী লেখেন। তাঁর প্রথম ইংরেজি জীবনী ‘Isvar Chandra Vidyasagar, a story of his life and work’ লেখেন সুবলচন্দ্র মিত্র, ১৯০২ সালে। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন তাঁর দাদা বিদ্যাসাগরের একনিষ্ঠ অনুসরণকারী ছিলেন। বিদ্যাসাগর যখন যেখানে গেছেন, তাঁর পিছুপিছু তিনিও গেছেন। তাই তাঁর পক্ষেই সঠিক বাস্তবানুগ জীবনী লেখা সম্ভব হয়েছে। তিনি বিদ্যাসাগরের সঙ্গেই থাকতেন কলকাতার বিভিন্ন স্থানে। বড়বাজার, বউবাজারে তো ছিলেনই, সুকিয়া স্ট্রিটেও গেছেন মাঝে মাঝে। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখা জন্যে নির্ভর করেছেন বিদ্যাসাগরের পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্নের উপর। বিদ্যাসাগর তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন, সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন উইলে। যদিও জীবনের অন্তিমলগ্নে মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রী দীনময়ী দেবীর কাতর অনুরোধে বিদ্যাসাগরের ক্রোধ কমেছিল, পুনর্মিলনজাতীয় একটি গল্পও শোনা যায়, তবু ভাঙা আয়নার কাঁচের মতোই সম্পর্ক আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি দু’জনের। তাই নারায়ণচন্দ্র কতটা বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়েছিলেন চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। চণ্ডীচরণ তাঁর বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, —
“এই জীবনী যদি কোনও অংশে বাঙ্গালা সাহিত্যসেবক ও পাঠকদলের সমাদরের জিনিস হয় তবে সে জন্য বিশেষভাবে প্রশংসার পাত্র বিদ্যাসাগর-পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়নচন্দ্র বিদ্যারত্ন। তিনি যেরূপ আগ্রহ ও আকিঞ্চনের সহিত তাঁহার স্বর্গীয় পিতৃদেবের জীবনীবিষয়ক উপকরণাদির দ্বারা আমাকে সাহায্য করিয়াছেন, তাহার বিস্তৃত উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন; কারণ পুস্তক পাঠ করিতে করিতে পাঠক তাহার ভূরি ভূরি পরিচয় পাইবেন। সুতরাং তিনিও আমাকে এইরূপ নানা প্রকারে সাহায্য করিয়া অপরিশোধ্য ঋণজালে জড়িত করিযাছেন।’
চণ্ডীচরণের বিদ্যাসাগরজীবনীতে অনেক কাল্পনিক তথ্যের ঘনঘটা লক্ষ্য করা যায়। সাঁতরে দামোদর পার হওয়ার অতিমানবিক ঘটনার বিবরণ পরবর্তীকালে খণ্ডন করেছেন অনেকে। বিশেষ করে ইন্দ্রমিত্র তাঁর ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’ বইয়ে। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের বইয়েও এই আষাঢ়ে গল্প নেই।
রামকৃষ্ণের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সাক্ষাৎ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্ণব নাগের (পত্রলেখা) মতো কোনও কোনও গবেষক।
চণ্ডীচরণবাবু নিজেও রামকৃষ্ণদেব ও বিদ্যাসাগরের সাক্ষাতের বিবরণ নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজাত নয় বলে জানিয়েছেন। জনৈক শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি সাক্ষাতের ঘটনাটি জেনেছেন বলে স্বীকার করেছেন তাঁর বইয়ে। অন্ধ ও খঞ্জ ফকির অখিলদ্দিনের গান শুনে বিদ্যাসাগরের চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রুপাতের বর্ণনাও কাল্পনিক হতে পারে। কিংবা নারায়ণচন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া ভুল তথ্য এটি। অখিলদ্দিনকে নাকি বিদ্যাসাগর আট আনা না একটাকা দিয়েছিলেন গানটি শুনে। চণ্ডীচরণবাবু নিজেই লিখেছেন, আট আনা না একটাকা সে সঠিক মনে করতে পারেনি, যেহেতু অনেক দিন আগের কথা। অথচ সেই অন্ধ ও খঞ্জ বাউলগায়ক কী অবলীলায় তাঁকে গানটির কথাগুলি নিখুঁতভাবে শুনিয়েছিলেন ভাবলে অবাক হতে হয়। চণ্ডীচরণবাবুর বইয়েই গানটি আছে। অখিলদ্দিনের গানটি হল, —
‘কোথায় ভুলে রয়েছ ও নিরঞ্জন নির্লয় করবে রে কে,
তুমি কোন্’খানে খাও কোথায় থাক রে, মন অটল হয়ে,
কোথায় ভুলে রয়েছ —।
তুমি আপনি নৌকা আপনি নদী, আপনি দাঁড়ি আপনি মাঝি,
আপনি হও যে চড়নদারজী, আপনি হও যে নায়ের কাছি,
আপনি হও যে হাল বৈঠা।
তুমি আপনি মাতা আপনি পিতা,
আপনার নামটি রাখবো কোথা, সে নাম হৃদয়ে গাঁথা,
আমার গোঁসাঞিচাঁদ বাউলে বলে সে নাম ভুলব নারে প্রাণ গেলে।
তুমি আপনি অসার আপনি হও সার, আপনি জড় আপনি মরা,
আপনি হও যে নদীর পাড় আপনি হও সে শ্মশানকর্তা গো
আপনি হও সে জলের মীন ও নিরঞ্জন তোর কোথায় গো সাকিম,
আমি ভেবে চিন্তে হলেম ক্ষীণ!’
তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ বইয়ে চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট লিখেছেন, “আমরা বহু অনুসন্ধানে এই ফকিরকে (অখিলদ্দিন) পাইয়া অনেক সাধ্য সাধনার পর কিছু বেশী পয়সা দিয়া গানটি লিখিয়া লইয়াছি। সে ব্যক্তি বলিল, ‘বিদ্দেসাগরবাবু আমাকে বড়ই ভাল বাসিতেন, আর এই গান শুনিয়া খুব খুসী হইতেন। তাঁহার নিকট অনেক পয়সা পাইয়াছি।”
চণ্ডীচরণবাবু ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা পয়সা দিয়ে যে অখিলদ্দিনের স্মৃতিশক্তি বাড়িয়ে দিতে পারেন, তা আমাদের কল্পনার বাইরে। অনেকদিন আগের কথা বলে যে বিদ্যাসাগর তাকে আট আনা না একটাকা দিয়েছিলেন, সেটাই মনে করতে পারে না, সে যে কী নির্ভুলভাবে গানটির কথাগুলি বল গেল, সেটাই পরমাশ্চর্যের!
মৃত্যুর ১৬ বছর আগে ১৮৭৫ সালে (১২৮২ বঙ্গাব্দ) বিদ্যাসাগর তৈরি করেছিলেন নিজের উইল। সে উইলে ছিল ২৫টি ধারা। সর্বশেষ ধারায় তিনি লিখেছেন, ‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী। এ জন্য ও অন্য অন্য গুরুতর কারণ বশতঃ আমি তাঁহার সংস্রব ও সম্পর্ক ত্যাগ করিয়াছি। এই হেতু বশতঃ বৃত্তি নির্ব্বন্ধস্থলে তাঁহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে…’। নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (নারায়ণ বিদ্যারত্ন) বিদ্যাসাগরের একমাত্র পুত্রসন্তান। তাঁর বংশের ‘প্রদীপ’। তথাপি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্রের এহেন দুরপনেয় মনোমালিন্যের কারণ খুঁজতে গেলে একটি চিঠির দিকে নজর ফেরাতে হবে।
উইল তৈরি করার মাত্র পাঁচ বছর আগে ১২৭৭ বঙ্গাব্দে এই চিঠিটি লিখছেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, এই পাঁচ বছরে কী এমন হল যে পিতার আদরের পুত্র একেবারে খলনায়কে রূপান্তরিত হলেন। বিদ্যাসাগরের উইলটি খুঁটিয় পড়লে দেখা যায় এমন কেউ প্রায় নেই যিনি তাঁর জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অথচ কোনও মাসোহারা বা এককালীন অনুদান পাননি। তাহলে কী এমন হল যে জীবনের সর্বস্ব বিলানো করুণার সাগর নিজে বঞ্চিত করছেন তাঁর একমাত্র সন্তানকে সম্পত্তির ভাগ থেকে?
ঠিক কী ঘটেছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ভিতর যে বিদ্যাসাগরের কাছে নারায়ণ চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন? এই প্রসঙ্গের ধরতাই হিসেবে একটি চিঠি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারিখহীন এই চিঠিটি পুত্রবধূ ভবসুন্দরীকে লেখা। বিদ্যাসাগর লিখছেন, ‘আমি তোমাদের নিকট এ জন্মের মত বিদায় লইলাম। তোমাদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যয় নির্ব্বাহের নিমিত্ত, আপাততঃ মাসিক একশত পঞ্চাশ টাকা নির্দ্ধারিত করিয়া দিলাম’।
১২৮২ বঙ্গাব্দের বৈশাখমাসে শশীভূষণ সিংহকে লেখা বিদ্যাসাগরের চিঠি থেকে জানতে পারা যায় জনৈক মধুসূদন ভট্টাচার্য্যের স্ত্রী বিন্ধ্যবাসিনী দেবীকে তাঁর স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে সমাজের কিছু মাতব্বর উদ্যোগী হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণচন্দ্র। অন্যদিকে সহায়-সম্বলহীন বিন্ধ্যবাসিনীকে মাসোহারা দেন বিদ্যাসাগর স্বয়ং। তিনি চান নিজের অধিকার বলেই ওই বিধবা স্বামীর সম্পত্তি পাক। বিদ্যাসাগর নিজের ছেলে সম্পর্কে এই চিঠিতে লিখেছেন, ‘নারায়ণবাবুও এক্ষণে একজন প্রধান লোক হইয়াছেন। তিনি যে যারপরনাই পিতৃদ্বেষী তাহারই পরিচয় দিতেছেন। নতুবা আমি এবং আমার পিতৃদেব যাহা করিয়াছি তিনি তাহার অন্যথা করিতে উদ্যত হইতেন না’।
পুত্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও কর্তব্যহীনতার কারণে পিতাপুত্রের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বিচ্ছেদের উপর অনেক রকম প্রলেপের চেষ্টা হয়েছে পরবর্তীকালে। যদিও তা ফলপ্রসূ হয়নি।
সম্ভবত নারায়ণচন্দ্র নিজের অনেক অলীক ধারণা বিদ্যাসাগরের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেইসব ধারণার কথা ফলাও করে লিখে গেছেন বইয়ে। এর পেছনে নারায়ণচন্দ্রের স্বকপোলকল্পিত ভাষ্যও থাকতে পারে।
চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর চরিত্রটিকে একটি নিজস্ব ছাঁচে ফেলতে চেয়েছিলেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিদ্যাসাগরের জীবনীকার ব্রায়ান হ্যাচার, তাঁর বই ‘Vidyasagar : The Life and After-life of an Eminent Indian’-এ। তিনি দেখিয়েছেন অখিলদ্দিনের চরিত্রটি চণ্ডীচরণবাবু এনেছেন বিদ্যাসাগরের ধর্মমত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বর্ণনার (যে বর্ণনাটিও পরের মুখে শোনা) লেজুড় হিসেবে এসেছে অখিলদ্দিন ফকিরের গানের বিষয়টি।
এখানে অধম বিদ্যাসাগর-গবেষক হিসেবে আমার কিছু বক্তব্য আছে। আমরা জানতে পারছি, অখিলদ্দিনের গান শুনে বিদ্যাসাগরের চোখে জল এসেছে। তিনি তাকে আবার এসে গান শোনাতে বলেছেন। তাকে আট আনা (মতান্তরে এক টাকা) দিয়েছেন। সবই ঠিক আছে, তবে সে কি গানের মর্মবাণীর জন্যে, নাকি এক অন্ধ ও খঞ্জ ফকিরের বেঁচে থাকার উদগ্র প্রচেষ্টা দেখে?
যে করুণা বিদ্যাসাগরকে প্ররোচিত করত কার্মাটাড়ে দুঃস্থ সাঁওতালদের ভুট্টো দান করতে, শীতবস্ত্র দান করতে, কলেরা রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধ দিতে, সেই একই করুণাই কি তাঁকে প্রবুদ্ধ করেনি অন্ধ ও খঞ্জ অখিলদ্দিনের গান শুনে কাঁদতে, তাকে অর্থদান করতে? খামোখা এই ঘটনাকে বিদ্যাসাগরের হিন্দুধর্মে মতি হওয়ার নমুনা হিসেবে পেশ করা কেন?