| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

লাইব্রেরি — চলমান জীবনপথে সঞ্চয়ের শস্যক্ষেত্র : অমৃতাভ দে

Reporter
অমৃতাভ দে / ৪৭১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

ছোটোবেলা থেকে বই আমার বন্ধু ছিল… গ্রামের বাড়িতে আমাদের ছোট্ট একচিলতে ঘরে বই সাজিয়ে রাখার তেমন কোনো জায়গা ছিল না…চুনখসা দেওয়ালের ছোট্ট ঘরে আমরা চারটি প্রাণী বাস করতাম… গ্রন্থাগারিক বাবা চাকরি করতেন জলঙ্গি নদীতীরের লোকসেবা শিবিরের শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারে… সেই পাঠাগারটি ছিল বইয়ের এক বিরাট ঘর… তারপর কৃষ্ণনগর শহরে বাসাবদল হয়েছে বারবার… কলকাতায় কলেজবেলায় টিফিন খরচা বাঁচিয়ে একটা একটা করে বইকেনা… কলেজস্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকান… পুরনো বইয়ের গন্ধ মায়ায় ডুবিয়ে রাখত আমাকে… প্রেসিডেন্সি কলেজ লাইব্রেরি আমার কাছে ছিল বইয়ের বিশ্ব… হোস্টেলের ছোট্টঘরের ছোট্ট খাট সেজে উঠেছে কতনা বইয়ে… পড়াশোনা শেষ হতেই চাকরি পাওয়া… চাকরির প্রায় পুরো টাকাটাই বই কিনতে চলে যেত… তারপর শিক্ষক দিবসে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বই… জন্মদিনে প্রিয়জনদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে চেয়ে নেওয়া বই… বিয়েতেও উপহার হিসেবে প্রিয়জনদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম পছন্দের বইগুলি… আজ কথার ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কতনা বই… ‘কথার ঘর’ ভালোবাসায় গুছিয়ে রাখে কথার মা, স্বস্তিকা… বারান্দা ডাইনিংরুম ড্রইংরুম বেডরুম সিঁড়িঘর ছুঁয়ে আমার উপরের স্বপ্নের ঘরেও উপন্যাস কবিতা গল্পেরা নিজেদের মতো বেঁচে আছে…আর প্রতিমুহূর্তে বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের…

শিক্ষকতা জীবনের এই মধ্যবর্তী পর্যায়ে এসে পুরোনো অ্যালবাম ওল্টাতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। বড় আন্দুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই মাধ্যমিক দিলাম আমি। একটি বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার কত সম্পদশালী হতে পারে তা বুঝেছিলেন। একটা বাড়তি ভাবাবেগ আমার ভিতর সব সময় কাজ করে এই স্কুল তৈরি পিছনে আমার দাদু তারাপদ ওদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং তিনি ছিলেন এই বিদ্যালয়ের করণিক তারপর আমাদের বাড়ির তাই সকলেই পড়েছেন স্কুলে বাবা ছিলেন এই বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র পরবর্তীকালে তিনি গ্রন্থাগারিক হিসেবেই কাজ করে গেছেন জেলার বিভিন্ন গ্রন্থাগারে। বড় আন্দুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শ্রদ্ধেয় বিকাশ ঘোষ মহাশয় পরম যত্নে গ্রন্থাগারটি সাজিয়ে তুলেছিলেন। অসংখ্য বই ছিল এই গ্রন্থাগারে। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাস এর রেফারেন্স বই তো ছিলই ছিল উল্লেখযোগ্য রচনাবলী গল্প উপন্যাস পত্র-পত্রিকার বিপুল সমাহার। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকা নেওয়া হতো স্কুল লাইব্রেরীর জন্য। ক্লাস অফ থাকলেই ছুটে যেতাম। কোন কোন দিন ক্লাসও ফাঁকি দিয়েছি। মনে পড়ে যাচ্ছে হেড মাস্টার মশাই সুকুমার বাবু কথা। সুকুমার বাবু তো একদিন বলেই ফেললেন অমৃতাভর বেশি সময় কাটে লাইব্রেরিতে। একজন লাইব্রেরিয়ানকে আমার দেবতা বলেই মনে হতো। কৃষ্ণনগর শহর থেকে বিকাশ বাবু এসে যখন লাইব্রেরির দরজা খুলতেই তখন ছুটে গিয়ে তার জন্য এনে দিতাম জল তাড়াতাড়ি করে লাইব্রেরিঘর পরিষ্কার করে দিতাম টেবিল চেয়ার মুছে দিতাম আলমারির বই গুলো সাজিয়ে দিতাম। আলমারির কোথায় কোন বই থাকত তা আমার জানা ছিল। তাই টিফিনের সময় যারা বই নিতে আসতো স্যারের সঙ্গে আমিও লেগে পড়তাম। একটা বিষয় জেনে আপনাদের সকলের ভাল লাগবে হাতের লেখাটা ছোট থেকেই ভালো ছেলে বলে স্কুলে একটা আলাদা গুরুত্ব পেয়েছিলাম। লাইব্রেরি বুকরেজিস্টারে অসংখ্য বই আমার হাতের লেখাতেই আজও লিপিবদ্ধ আছে।

পরবর্তীকালে কিছু সময়ের জন্য এই স্কুল এই আমি শিক্ষকতার চাকরি করি। একটু অন্যরকমভাবে পেলাম তখন গ্রন্থাগারকে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে এই গ্রন্থাগার ছিল এক স্বপ্নের মায়াময় জগত। কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে ওই গ্রন্থাগারের আনাচে-কানাচে। বিকাশবাবু প্রতিবছর যে সমস্ত নতুন বই কেনা হতো সেই বইগুলি একটির প্রদর্শনী করতেন। এক সপ্তাহ এই নতুন বইয়ের প্রদর্শনী চলত। সকলে নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে ছুটে আসত। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম বাবা চাকরি করতেন লোকসেবা শিবিরের শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারে। বেশিরভাগ দিন সন্ধ্যেটা আমার কাটতো সেই লাইব্রেরিতে। একটি গ্রামীণ লাইব্রেরী যে কত সমৃদ্ধ হতে পারে তা যারা এই লাইব্রেরী ব্যবহার করেছেন তাঁরা জানেন কেননা পাশেই ছিল বড়ান দুলিয়া প্রাইমারি বেসিক ট্রেনিং কলেজ এই বেসিক ট্রেনিং কলেজের যারা ট্রেনিং নিতেন শিক্ষক হবার পরবর্তীকালে তাদের বহু জনের মুখে শুনেছি বাবা কি নিষ্ঠাভরে এই লাইব্রেরি সামলাতেন। বিভিন্ন বিষয়ের অসংখ্য বই ছিল এই লাইব্রেরীতে। একটি লাইব্রেরী ফুল ফুটে ছিল সংস্কৃতির কেন্দ্র একে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গান আবৃত্তি নাটকের চর্চাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই গ্রন্থাগার। বাবার লেখায় সেটা উঠে এসেছে অনেকখানি। আমার বড় হয়ে ওঠার পেছনে আমার লেখালিখি আমার স্বপ্ন কল্পনার জগত আমার সৃজনশীলতায় এই গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। ২০০০ সালের বন্যায় বিপুল ক্ষতি হলো এই গ্রন্থাগারের মন খারাপ হল খুব তারপর আসতে আসতে আবার সেজে উঠেছে এই গ্রন্থাগার।

১৯৯৯-এ এলাম কৃষ্ণনগর। ভর্তি হলাম কবি বিজয়লাল এইচএস ইনস্টিটিউটে। জেবি জলাল চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল বড় আন্দুলিয়া গ্রামের লোক শিবিরের শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার সেই বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত স্কুলেই কাটলো দুটো বছর।এই স্কুলের গ্রন্থাগারে ছিল টেক্সট বইয়ের বিপুল সমাহার। গ্রন্থাগারিক ছিলেন রবিবাবু। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম ঘনিষ্ঠভাবে। পরবর্তী সময়ে স্বপ্নের প্রেসিডেন্সি কলেজ। এই কলেজ গ্রন্থাগার বিশ্বের দরবারে বিশেষভাবে পরিচিত একটি নাম। এখানেই গ্রন্থাগারিক হিসেবে পেলাম প্রখ্যাত গ্রন্থাগারিক দেবনারায়ণ বাবুকে পেলাম বিশিষ্ট লেখক অসিতাভ দাশকে এবং কবি বিজয় দে-কে। তাদের আন্তরিকতা হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজের বিভাগীয় গ্রন্থাগারও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। আর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার — তার কথা আর কত বলব। অনেকটা সময় কেটে যেত গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে। মনে হতো বিশ্ব পৃথিবীটা আমার হাতের মুঠোয়। হাতের লেখা ভালো হবার সুবাদে সেখানেও একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাই, গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ব্রিটিশ পিরিয়ডের দলিল নানা চিঠিপত্র দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। মুক্তোর মতো সেসব লেখা। প্রিন্সিপালের কাছে চিঠি আসতো ভাইসরয়দের। দেবনারায়ণ বাবু একদিন ডেকে দেখিয়েছিলেন সেসব। সংরক্ষিত ঘরে ছিল বহু প্রাচীন পত্রপত্রিকা, সেসব দেখারও সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। ১৮৫৭ সালের ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকার পাতায় যখন ‘নদীয়া রাজ’ নিয়ে দীর্ঘ লেখা চোখে পড়ল তখন শিহরিত হয়ে ছিলাম। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে কৃষ্ণনগরের অসম্ভব সমৃদ্ধশালী একটি গ্রন্থাগারের কথা — দ্বিজেন্দ্র পাঠাগার। গ্রন্থাগারিক অপূর্ব কুন্ডু আমার প্রাণের প্রিয় মানুষ। কলেজ থেকে কৃষ্ণনগরের বাড়িতে ফেরার পথে কৃষ্ণনগর স্টেশন সংলগ্ন এই পাঠাগার আমার চলার পথকে মসৃণ করেছে অনেকখানি। প্রয়োজনীয় বইপত্তর রেডি করে রাখতেন অপূর্ব কাপুর গ্রন্থাগার খুলে রাখতেন অনেকটা সময় আমি ফিরবো বলে বই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে তারপর বাড়ি ফেরা।

কলেজ ছুটি থাকলে কৃষ্ণনগরের এই গ্রন্থাগারিক কেটে যেত ঘন্টার পর ঘন্টা। মনে পড়ছে কৃষ্ণনগর সংলগ্ন শিমুলতলা লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান দেবব্রতকাকুর কথা। অনেক সাহায্য পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে।তিনি নিষ্ঠাভরে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর গ্রন্থাগার।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিভাগীয় গ্রন্থাগার আমার হাতে তুলে দিয়েছে অসংখ্য প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। যেহেতু হোস্টেলে থাকতাম তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে অনেক রাত পর্যন্ত লাইব্রেরি ব্যবহার করে হোস্টেলে ফিরতাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম দেখি বইয়ের জন্য আলাদা লিফট্। অবাক হয়েছিলাম প্রথম দিন। রিকুইজিশন জমা দিতে হতো সকাল-সকাল। তারপর দেখতাম রিকুইজিশন লিফট করে চলে যাচ্ছে উপরে। বইও আসত লিফট চেপে। একবার দুষ্প্রাপ্য একটি বই এলো আমার চাহিদা মত। কিন্তু ৫০ বছরের বেশি পুরনো বই বাড়িতে দেওয়া যাবে না বলে জানালেন কর্তৃপক্ষ। হাতে নিয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম বইটিকে পেয়ে।এর আগে বইটি কেউ নেয়নি। প্রথম আমিই দেখলাম কিন্তু ছুঁয়ে গন্ধ নিয়েই স্বাদ মেটালাম! কতনা বইয়ের মাঝে ডুবে থেকেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। প্রসঙ্গ জানাতে ইচ্ছে করছে বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লোকসংস্কৃতি বিভাগের গ্রন্থাগারের গ্রন্থসম্ভার দেখে।

কলকাতায় পড়াশোনার সময় যেখানে আমি বারবার ছুটে যেতাম সেটি হল লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাগার। কর্ণধার শ্রদ্ধেয় সন্দীপ দত্ত। তাঁর সান্নিধ্য আমার জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। কবি বিজয়লাল এইচএস ইনস্টিটিউটে আমরা যখন ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র তখনই আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একটি লিটল ম্যাগাজিন যা আজও প্রকাশ পেয়ে চলেছে আসলে খুব ছোট থেকেই লিটল ম্যাগাজিন বাড়িতে আসত, বাবা দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন, তাই লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল বিশেষভাবেই।যখন কলকাতায় পৌঁছালাম তখন লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাগার আমার সামনে লিটল ম্যাগাজিনের এক বিরাট জগত তুলে ধরল। কত দুষ্প্রাপ্য লিটল ম্যাগাজিন আমার হাতে তুলে দিয়েছেন সন্দীপ দত্ত। আজ ভাবতে ভালো লাগে আমার নিজের বাড়িতেই একটি ছোটখাটো গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে লিটিল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে। বাবা যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থাগার কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন তাই নদিয়া জেলার বিভিন্ন গ্রন্থাকারে বিভিন্ন সময়ে যাবার সুযোগ পেয়েছি আমি। নদিয়া জেলা গ্রন্থাগার, যেখানে দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন আমার বাবা সেই গ্রন্থাগার সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলবার নেই। আমি দেখেছি বাবা কী কঠিন পরিশ্রম করে এই গ্রন্থাগারটিকে নতুন রূপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিটি মুহূর্তে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বইপত্র নিয়েছে যে উঠেছিল নতুন বিভাগ। সুযোগ পেয়েছি প্রতিটি ঘরের প্রতিটি কোনায় থাকা আলমারি ছুঁয়ে দেখবার। কতনা দুষ্প্রাপ্য বই এই লাইব্রেরিতে আছে। সাহিত্য ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতেন যাঁরা, তাঁরা নিয়মিত হাজির হতেন এই গ্রন্থাকারে।

কৃষ্ণনগরের পাবলিক লাইব্রেরির ইতিহাস তো বিরাট। এই গ্রন্থাকারে বসেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কোনরকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে গড়ে ওঠা কৃষ্ণনগর শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার স্বমহিমায় আজও বিরাজমান। সকলের মাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় প্রয়াত দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন সকলের আইকন। এই গ্রন্থাগার তাঁর নেতৃত্বেই সৃজন করেছিল এক নতুন ইতিহাস। খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে এই গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। বিপুল বইয়ের সম্ভার রয়েছে এই গ্রন্থাকারে। ছোটদের গ্রন্থাগারমুখী করে তোলবার জন্য এই গ্রন্থাগারের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এই গ্রন্থাগারের। এই গ্রন্থাকারে সঙ্গে যুক্ত হবার সুবাদে বুঝেছি একটি পাঠাগারকে ঘিরে মননশীল পরিবেশ কী করে নির্মিত হতে পারে।আমরা তিন প্রজন্ম এই পাঠাগারকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছি। কোনরকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই কৃষ্ণনগরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পাঠাগার তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, কৃষ্ণনগর শিশু উদ্যান পাঠাগার। এই পাঠাগারের গ্রন্থসম্ভারও কম নয়, ছোটোরা এই পাঠাগারের সদস্য হয়ে নানান সৃজনাত্মক কাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখতে পারে।আমরা ‘সুজন বাসর’-এর অনেকে মিলে চেষ্টা করেছি কৃষ্ণনগরের নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য বাড়িতে (গ্রেস কটেজ) একটি নজরুল গবেষণাগার ও সুজন পাঠাগার গড়ে তোলবার। আগামীদিনে এটি একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাগার হয়ে উঠতে পারে। কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরিতে গড়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত বিরাট লাইব্রেরিকক্ষ। ডাক্তার বাসুদেব মন্ডলের তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণনগরে গড়ে উঠেছে নদিয়া সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালায় রয়েছে অসংখ্য বইপত্র। গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে আন্তরিকতার সঙ্গে।

ছাত্র-ছাত্রীরাও এখন গ্রন্থাগার মুখী নয় — এ কথাটা মেনে নিতেও বোধ হয় খুব একটা অসুবিধা নেই। একটি গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করি। স্কুলে গ্রন্থাগার গড়ে তোলবার চেষ্টা অনেকদিন ধরেই করে চলেছি।আগেই বলেছি, ছোটবেলায় যে স্কুলে পড়তাম, গ্রামের সেই স্কুলে ছিল অসাধারণ একটি গ্রন্থাগার ছিল, ছিলেন গ্রন্থাগারিক। আজও অনেক স্কুলে গ্রন্থাগার আছে গ্রন্থাগারিকও আছেন, ছাত্র ছাত্রীদের উৎসাহ কমেছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার থাকলেও গ্রন্থাগারিক নেই অথবা একটি গ্রন্থাগারের গুরুত্ব কতখানি সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বুঝেও হয়তো বোঝেন না। বিভিন্ন সূত্রে যেটুকু জেনেছি তাতে পশ্চিমবঙ্গের সরকার পোষিত গ্রন্থাগারগুলিতে বই আছে অনেক, পরিকাঠামো আগের থেকে অনেক উন্নত কিন্তু কর্মীসংখ্যা খুবই কম। তাছাড়া আজকের স্মার্টফোনের যুগে একটা বোতাম টিপলেই যেখানে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায় পাওয়া যায়, পাওয়া যায় বিভিন্ন বইয়ের ডিজিটালাইজড রূপ, তাতে অনেকেই গ্রন্থাগারে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না। এ কথাও আগে বলেছি, আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন বিভিন্ন গ্রন্থাগারে-গ্রামে এবং শহরে, গ্রন্থাগারের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা আমাকে বিস্মিত করত। আমিও নিয়মিত লাইব্রেরিতে যেতাম। বহু পাঠকের সমাগমে গ্রন্থাগার হয়ে উঠত প্রাণময়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের উপরেই নির্ভরশীল ছিল আমাদের পড়াশোনা।

সম্প্রতি এলাহাবাদ গিয়ে অ্যালফ্রেড পার্কের ভিতর দেখলাম বহু প্রাচীন একটি গ্রন্থাগারে (এলাহাবাদ পাবলিক লাইব্রেরি) সন্ধে ছটার সময়েও এই প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী বসে বই পড়ছেন। আজ ভাবতেই খুব কষ্ট হয় যে গ্রন্থাগারে পাঠক নিয়ে আসতে প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়। আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করে বই। গ্রন্থাগার আমাদের সামনে খুলে দেয় একটা বিরাট পৃথিবীকে। সরকারের এই যে পদক্ষেপ আমার মনে হয়, একে কার্যকরী করতে হলে প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এই বার্তা-‘গ্রন্থাগারে এসো, বই পড়ো, তোমার বাড়ির পাশের লাইব্রেরিটি তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, কিছু সময় লাইব্রেরিতে কাটাও, বই পড়ো, নিজেকে সমৃদ্ধ করো।’ ছাত্রছাত্রীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার থেকে বই নেওয়ার সুবিধা তো পেয়ে থাকে, পাশাপাশি তাদের কাছেও এই খবরটি পৌঁছে দেওয়া খুব দরকার বলে আমার মনে হয়। এরকম একটি প্রকল্পের সাথে তারাও যেন যুক্ত হয়। স্কুল-কলেজের প্রতিটি অভিভাবকের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া দরকার তাঁরা যেন তাদের ছেলে মেয়েদের বাড়ির পাশের লাইব্রেরির সদস্য করেন এবং নিজেরাও সদস্যপদ গ্রহণ করেন। প্রমথ চৌধুরীর সেই কথাগুলি আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক — “লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়; তার কারণ আমাদের শিক্ষায় বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।”

সম্পাদক:’জীবনকুচি’ পত্রিকা, লেখাটি ‘জীবনকুচি’ গ্রন্থাগার সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “লাইব্রেরি — চলমান জীবনপথে সঞ্চয়ের শস্যক্ষেত্র : অমৃতাভ দে”

  1. Prosenjit Das says:

    পড়েছি আগে।খুব ভালো লেখা।।।????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev