The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
কন্সট্যান্টিনোপল উদ্ধার
কন্সট্যান্টিনোপল শহরের ব্যাপ্তি প্রথম আসা মুসাফিরকে বিষ্ময়ে হতবাক করিয়ে দেওয়ার মত ব্যাপকতাময়। ভ্রমণকারীর মনে প্রাচীন রোম যেমন স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়, ঠিক তেমনি কর্তৃত্বব্যঞ্জক প্রভাব ফেলে সাগরতীরের কন্সট্যান্টিনোপল শহর। শহরে ঢোকার মুখটিতে ভ্রমণকারীকে সবার আগে আমন্ত্রণ জানাবে বিশালকায় শহরের প্রতিরক্ষা তৈরি করা প্রাচীর আর সেই প্রাচীর ভেদ করে শহরেরে হৃদিঅক্ষে প্রবেশ করা বিশাল বিশাল জল নলির সারি। ১২ মিটার উঁচু পাঁচিলের ডানা ছড়িয়ে ছিল গোল্ডেন হর্ন থেকে মারমারা সমুদ্র অবদি। পঞ্চম শতে সম্রাট থিওডোসিওস নতুন করে গড়ে তোলেন এই সুবিশাল প্রাচীর। পাঁচিল এতই মজবুত ছিল যে পাঁচিল ভেদ করে শহরে ঢোকার ভাবনাতেই আক্রমনকারীরা হতাশ হয়ে যুদ্ধ থামিয়ে দিত। ৫ মিটার মোটা এই দেওয়ালে জোড়া ছিল ৬৯টা বুরুজ, বুরুজগুলো থেকে পশ্চিম থেকে উত্তরের দিগন্ত অবদি দেখা যেত। শহরে ঢোকার জন্যে ছিল ৯টা সুরক্ষা দরজা। তবে দরজা দিয়ে সে সব মানুষোই ছোকার নির্দেশ ছিল, যারা বাইরের দেওয়াল পার হয়ে আসত। শহরে ঢুকতে চাওয়া মুসাফিরকে আসতে হত গভীর পরিখা পেরিয়ে দাঁড়ানো আরও একটা সুরক্ষা দেওয়াল ভেদ করে। দ্বিতীয় দেওয়াল আর চৌকির কড়া নজর পার হয়ে শহরের হৃদয়অক্ষে ঢোকার মূল সড়কে পা রাখা যেত।
অন্যদিকে সমুদ্রপথে ঢোকার সময় শহরটা আরও দৃষ্টিনন্দন ছিল। ইওরোপ এবং এশিয়া মাইনরের মধ্যে মারমারা সমুদ্রের উত্তর তীরের সব থেকে সরু খাতে অবস্থিত ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল শহর। জাহাজের পাটাতন থেকে স্পষ্ট দেখা যেত শহরের স্মৃতিস্তম্ভ, চার্চ এবং প্রাসাদ। সেই দৃশ্য প্রথম দর্শনেই সম্ভ্রম জাগিয়ে তুলত। শহর ছড়িয়েছিল চোখের দৃষ্টি যতদূর যেতে পারে ততদূর, ৩০ হাজার হেক্টয়ার (৩০০ বর্গ কিমি — অনু)। শহরে লাখো লাখো মানুষ বাস করত, ইওরোপের সব থেকে বড় শহরের থেকেও বেশি পরিমানে জনসংখ্যা ছিল কনস্যান্টিনোপলে।
কন্সট্যান্টিনোপলের মূল প্রসাদগুলোও ছিল আরও বিষ্ময়কর। সব থেকে দৃষ্টিনন্দন ছিল হাগিয়া সোফিয়া চার্চ। তৈরি করেছিলেন ষষ্ঠ শতকে সম্রাট জাস্টিনিন। বিপুল ঝুলন্ত গম্বুজটি ৩০ মিটার দৈর্ঘে আর ৫৫ মিটার চওড়ায় — দূর থেকে দেখলে মনে হবে ‘আকাশের গায়ে বিশাল একটা তাঁবু’ ঝুলে রয়েছে। এটি প্রযুক্তির এক বিপুল বিষ্ময় এবং সৌন্দর্যে অপার। কাঁচ দিয়ে মেঝেতে আলো পড়লে স্বর্ণালী মোজাইকগুলো চকমক করে (১)। এছাড়াও কন্সট্যান্টিনোপলে ছিল অসামান্য সব বিষ্ময়কর স্থাপনা — শত শত চার্চ, মঠ, ঘোড়া এবং ঘোড়ায় টানা রথের প্রতিযোগিতার জন্যে স্টেডিয়াম হিপ্পোড্রোম, স্নান করার জন্যে হামাম, বিশাল বিশাল প্রাসাদ এমনকী একটা চিড়িয়াখানাও। একটি কবিতায় বলা হয়েছে বিশ্বের সাতটি পরম আশ্চর্য আছে, কিন্তু শুধু কন্সট্যান্টিনোপলেই দেখার মত সাতখানি বিস্ময় রয়েছে (২)।
এইরকম ব্যস্ত শহরের জন্যে প্রয়োজন ছিল নিয়মিত এবং প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের পরিকল্পনাও। এপার্চ নামক দপ্তর নজর রাখত বিকিকিনির বাজারের ওপর। কন্সট্যান্টিনোপলের প্রশাসক তার শহরব্যাপী ছড়ানো কর্মচারী মার্ফত প্রমিতকৃত ওজন এবং বাটখারা ইত্যাদির ওপর নজর রাখত। কারিগরদের সংগঠন মার্ফত পণ্যের গুণমান নির্ণীত হত — শস্য বিক্রেতা থেকে মাছ বিক্রেতা থেকে কসাই থেকে ঝাড়বাতি বিক্রেতা থেকে রেকাব বিক্রাতা থেকে সবার উৎপাদনে নিজস্ব প্রমিতিকরণের নীতি, আইন এবং ব্যবস্থাপনা থাকত। মূল্যবৃদ্ধি রোধ করার জন্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কে কোন দামে বিক্রি করতে পারবে তারও বিশদ নির্দেশিকা ছিল। এর ফলে বাজারে ফল এবং তরকারি, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাছ মাংস ছাড়াও যে সব পণ্যের জন্যে বাইজান্টিয়াম প্রসিদ্ধ ছিল, মশলা, মোম, রৌপ্য বাসন এবং রেশমের সরবরাহ সুপ্রতুল ছিল।
একাদশ শতকের এক মুসাফির কন্সট্যান্টিনোপল শহরের বিভিন্ন দেশের নাগরিক এবং প্রাসাদ দেখে হতবাক হয়েছেন। এছাড়াও তিনি শহরে নানান ধর্মীয় মিছিল দেখছেন। ভাগ্যবান মুসাফিরটি ব্লাখেরনাই-এর থিওটোকাস চার্চে ভারজিন মেরি উত্থিত হয়ে তার মুখের আবরণটি খুলে আবার শায়িত হওয়ার অবাক হওয়ার মত ঘটনাটি দেখেন (৪)। একাদশ শতকের শেষে আসা এক মুসাফির লিখছেন ‘আহা, কন্সট্যান্টিনোপল শহরটি কী মহান আর সৌন্দর্যময়। অসামান্য দক্ষ স্থপতি দল মঠ আর প্রাসাদ দিয়ে শহরট সাজিয়েছেন। শহরের মূল রাজপথ, এমন কী ছোট পথগুলিতেও নানান রকমের মনোমুগ্ধকর জিনিস দেখতে পাই। শহরে সোনা, রূপো, নানান ধরনের আংরাখা এবং পবিত্র ধ্বংসাবশেষের স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে আছে। মানুষের প্রয়োজনীয় নানান ধরণের পণ্য সারাক্ষণ শহরে প্রবেশ করছে। আমার ধারনা শহরে ২০ হাজার খোজা বাস করে (৫)।‘
বছরের পর বছর কন্সট্যান্টিনোপল শহর সওদাগর, ভাগ্যান্বেষী আর খ্যাতিসন্ধানীদের চুম্বকের মত আকর্ষণ করেছে। ১০২০তে আইসল্যান্ড থেকে বোল্লি বোল্লাসন শহরের প্রখ্যাতির কারন খুঁজতে এবং নিজের চোখে দেখতে পৌঁছেছিলেন। তিনি জন্মভূমির সতীর্থদের বলছেন, ‘আমি বহুকাল ধরে দক্ষিণভূমিতে পৌঁছবার পরিকল্পনা করছিলাম, মানুষ যদি তার জন্মদেশ থেকে দূরে না যায় তাহলে যে অজ্ঞই থেকে যায় (৬)’। হাজার মাইল দূর থেকে ঘুরতে ঘুরতে তিনি কন্সট্যান্টিনোপল শহরে পৌঁছন। তিনি সেখানে রুশ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলির সেনাদের নিয়ে তৈরি সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দল ভ্যারানজিয়ান গার্ডে যোগদান করেন। একাদশ শতকের জনৈক লেখকের ভাষায়, ‘তাদের খেপিয়ে দিলে তারা পাগলের মত লড়াই করে, তারা নিজেদেরও ছাড়ে না, দেহে গভীর ক্ষত তৈরি হলে সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে আনে না (৭)’। বোল্লি যখন আইসল্যান্ডে ফিরে গেলেন তার বেশভূষা পাল্টে গিয়েছে, ‘তিনি গার্থ-রাজার (বাইজান্টাইন সম্রাট) দেওয়া আংরাখা পরেছিলেন, তার ওপরে ছিল টুকটুকে লাল রঙএর ঝালর; কোমরে ঝোলানো থাকত অসামান্য দৃষ্টিনন্দিত সোনার তরোয়াল, হাতলটিও সোনায় কাজ করা; মাথায় চকচকে শিরস্ত্রাণ, সঙ্গে লাল রঙের ঢাল, তারওপরে সোনাদিয়ে নাইট আকা। বিদেশিদের মত তার হাতে থাকত একটি ছুরি। বোল্লি যেখানেই যেতেন মহিলারা তাঁকে আর তার বসনকে দেখতে থাকত (৮)’।
কন্সটিনোপলে সম্পদের নজর রেখে শহরে আসা হাজারো ভাগ্যসন্ধানীর মধ্যে বোল্লি একজন। হারাল্ড হার্দরাদা, আগামোতে নরওয়ের রাজা, যার কথা আমরা পড়ি হেইমসক্রিংলায় (স্নোরি স্টুরলাসনের লেখা নর দেশের প্রাচীন রাজাদের কাহিনী — অনুবাদক), তিনি জাহাজের গ্যালিতে কাজ করেছেন, জলদস্যুদের তাড়া করে এজিয়ান অবদি গিয়েছেন এবং ১০৪০ দশকে সিসিলি আক্রমন করেছেন। সাম্রাজ্যের সেবায় থাকার সময় উড়ন্ত বোমের আবিষ্কর্তা তিনি — তিনি যে শহর অবরোধ করতেন, বাচ্চা পাখিকে পাইনের রজনের সঙ্গে মোম আর সালফার মাখিয়ে তার মধ্যে পাঠিয়ে দিতেন। কন্সট্যান্টিনোপল নর ভাষায় মিকলেগার্থ।
আর ছিলেন স্টিগান্ডের ওডো। ওডো যুবা ডাক্তার এবং পশু চিকিৎসক নরমান, বহুভাষী, এই শহরে ছিলেন। তার ভাই রবার্ট শহরে আসতেন সোনা, দামি পাথর এবং সন্ত বারবারার স্মৃবিজড়িত নানান বস্তু নিয়ে (১০)। সেনা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাইটদের শহরে খুব চাহিদা ছিল। বিদেশিরা সাম্রাজ্যের বাহিনীতে উচ্চপদে কাজ করতেন। ১০৬৬-র হেস্টিংসের যুদ্ধের উইলিয়ামের বিজয়ের পরে এংলো-স্যাকসন নেতা ইংলন্ড থেকে পালিয়ে বাইজান্টাইমে যান (১১)।
একাদশ শতকের শেষে সাম্রাজ্যের অন্যান্য জায়গার তুলনায় কন্সট্যান্টিনোপলে অনেক বেশি নানান দেশের নাগরিকের দেখা মিলত। আরমেনিয়, সিরিয়, লোম্বার্ড, ব্রিটিশ, হাঙ্গেরিয়, ফরাসি, ইহুদি, আরব এবং তুর্কিরা এই শহরে হয় বাস করত না হয় ব্যবসা বা অন্য কাজে আসত (১২)। ইতালির আমালফির ব্যবসায়ীরা শহরে বসতি বানিয়েছিল (১৩)। তাদের একজন সম্রাটের এতই প্রিয়তা অর্জন করে যে সম্রাট তাকে সাম্রাজ্যের কারখানায় ঢালাই তামার দরজা তৈরি করে আমালফির সন্ত এন্ড্রুজের ক্যাথড্রালের ঢোকার দরজা তৈরি করার অনুমতি দেন (১৪)। বাইজান্টিয়াম ছিল বৈচিত্রওয়ালা বহু দেশিয়দের রাজ্য এবং এর যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত ছিল — বিশেষ করে বাণিজ্য শৃঙ্খল এবং দৌত্য যোগাযোগ বা অভিবাসিত মানুষদের আসার জন্যে রাস্তা – এর থেকে প্রমান হয় দূর দেশের মানুষদের কাছে এই শহরটি খুবই প্রসিদ্ধ ছিল।
শহরে বিশাল পরিমানে বিদেশির আগমন এবং বসবাসের তথ্য আমদের জানায় শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা, যে সমৃদ্ধি তৈরি হয়েছিল প্রখ্যাত সেনাপতিদের বেশ কিছু সফল সেনা অভিযানের ফলে। এজিয়ান সমুদ্র এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর এলাকায় যে জলদস্যু সমুদ্রপথ দখল করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের ঘাঁটিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। বলকান এবং পূর্ব সীমান্ত বিজয় করে অসামান্য যোগ্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনানায়কেরা সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। (চলবে)