আধুনিক কাব্যধারার একজন ব্যতিক্রমী কবি সেলিম মন্ডল।তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘মায়াজন্ম’। কাব্যগ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে। ৫৮টি কবিতায় সাজানো মায়াজন্মের পাতা। দু মলাটের মধ্যে ধরা আছে জীবন সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন —
“হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন,কঠোর গদ্যে আনো
পদলালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো! প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!”
যে সময় দাঁড়িয়ে কবি সুকান্ত এই কবিতা উচ্চারণ করেছিলেন-সেই সময় ঘরেতে অভাব,দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষ, বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়, একদিকে মুহূর্মুহূ সাইরেনের আওয়াজ,ভয়াবহ যুদ্ধের আবহে মানুষ ভীত, সন্ত্রস্ত, তখন পদ্য বা কবিতা রচনা করার সময় নয়, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে তাই পূর্ণিমার চাঁদকেই তখন ঝলসানো রুটি মনে হয়। পূর্ণিমার চাঁদ আর সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে ক্ষুধা নিবৃত্তির অমোঘ উপকরণ। অনেকে মনে করেন কবিতা মানেই রোমান্টিকতা, কবিতা মানেই স্বপ্নবিলাসী মনের অভিব্যক্তি। কিন্তু গদ্য কঠোর বাস্তবকে তুলে ধরে।তাই কবি সুকান্ত কবিতাকে ছুটি দিতে চেয়েছিলেন। আবার ‘মায়াজন্মের’ কবিও ‘অলৌকিক’ কবিতায় বলেছেন —
“কবিতাকে একদিন সপাটে চড় মেরে বলবঃ ভাগ, ভাগ
এই হতদারিদ্র্যের কোন ভিটে মাটি নেই
তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের জীবন
আড়ভাঙ্গা দুপুরের রোদে শুকোই নিজ মৃত্যুখাটিয়া।”
আবার ‘থু’ কবিতায়ও কবি কবিতাকে বিদায় দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা —
“কবিতা এসে দাঁড়িয়ে থাকে
দরজা বন্ধ করে বলি-
যা পালা, আমার কাজ আছে।
নাছোড়বান্দা
প্রবেশ করবেই
কড়া নাড়ে জোরে জোরে
অবশেষে খুলি
বলি, ভাত দিবি?
পালিয়ে যায়
দূর থেকে বলে,”থুতু খা
থু থু থু…”
কবিতা ভাত দেবে না জেনেও তাকে আঁকড়ে ধরেই কবি বেঁচে থাকতে চান।
কবি জানেন কবিতা সব সময় রোমান্টিসিজমকেই তুলে ধরে না, কবিতা দিয়েও কঠোর বাস্তবকে তুলে ধরা যায়।দারিদ্র,অভাব,-দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা-হতাশা আর হাহাকার কবিতার মাধ্যমেও তুলে ধরা যায়। আর সেটা একশ শতাংশ করা যায় যদি কবি নিজে তার মধ্যে অবস্থান করেন,কবি যদি সেই জীবনকে যাপন করেন, বুকের মধ্যে লালন করে চলেন সেই অভাব, দারিদ্র, দুঃখ-কষ্টের জীবনকে। তাই কবির মুখে বলতে শুনি —
“এঁটো বাসন-কোসন মেজে
মা যখন চকচকে থালায় ভাত বাড়ে
হে রাষ্ট্র,তখন তোমার কথা না
মনে পড়ে, খেটে খাওয়া বাবার কথা
বাবা শিল্প বোঝে না
বোঝে, আমরা তিন অভুক্ত প্রাণী
রাষ্ট্র নামক কোনও কুয়োর ভিতর আটকে আছি
আরও অনেক প্রাণীর সাথে।”
যে বাবা মুখে রক্ত তুলে খেটে আসার পরেই আরো দুই অভুক্ত প্রাণীর মুখে হাত ওঠে, তখন রাষ্ট্রের কথা আমাদের মনে আসে না; সেই বাবার চোখের কোণে চিকচিক করা জলটাই মুখ্য হয়ে দেখা দেয়। একদিকে স্বপ্ন, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু আমাদের মনকে হতাশায় দীর্ণ করে তোলে। নিজেকে মনে হয় আস্ত এক ‘শয়তান’। বাবার ইচ্ছে থাকলেও হজ করতে যাওয়া হয় না।ঘরে নেমে আসতে পারে চরম দুর্ভিক্ষ।
তাই না পারি বাবার ইচ্ছে গুলোকে পূর্ণ করতে, আবার সব বুঝেও পারিনা মুখ ফুটে বাবাকে বলতে —
“এই নাও পাথর
শয়তান তোমার সামনে দাঁড়িয়ে
মারো, জোরসে মারো।”
জীবনের চরম একটা ট্র্যাজেডি যেন দানা বেঁধে উঠেছে ‘শয়তান’ কবিতার ছত্রে ছত্রে। তবে এক নির্লিপ্ত কবি জীবনের ছায়া রেখা পাত করেছে প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে। তবে কবি জীবন বিমুখ নন, এ জীবন হয়তো কবিকে কিছুই দেয়নি, কিন্তু দিয়েছে এক মুঠো আশা, বেঁচে থাকার ভরসা। যে চাষির ‘ঋণের খাতায় আত্মহত্যা লেখা থাকে’, সেও যেন বাঁচতে চায়।কবি বলছেন —
“নিজের ভিতর জন্মদিন খুঁজতে খুঁজতে একদিন তোমার কাছে পৌঁছে যাব, এই ধারণা আমায় বাঁচিয়ে রাখে।”
আবার বলেছেন —
“নিজেকে মৃত ঘোষণা করব বলে কতবার মাটি চাপা দিয়েছি বুকের উপর, কিন্তু একের পর এক গাছ জন্মেছে। সেই গাছের ফুল, ফল, ছায়ায় পরিপূর্ণ আমি এখনও রোজ টুকি মারি। তুমি ধ্যান করো। তুমি ঈশ্বর খোঁজো।”
“ঘরেতে অভাব পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া” — একটা অসহায় ছোট্ট সংসার আর ভাঙা চোরা জীবনের চার দেওয়ালের মাঝে দেনা-পাওনার হিসেবটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাই —
“ভাত ফুটতে ফুটতে একসময় ফ্যানের বাষ্পে খিদে মরে”
আবার,
“নবান্ন আসে বুকে ঢেঁকি ভেঙ্গে
সংসার বড় হয়, সামঞ্জস্য আসে না থালা সাজিয়ে।”
‘সামঞ্জস্য’ কবিতায় উঠে এসেছে জীবনের এমনই চরম এক বাস্তবতার ছবি। আবার ‘পুতুল’ কবিতাতেও উঠে এসেছে এক চরম সত্য —
“কবিদের ভিতরে একটা নরম পুতুল থাকে
সেই পুতুলের কান্না পাঠক শুনতে পায় না।
পাঠক দেখে সাজানো ঘর সংসার
কবি অনায়াসেই বুকে ছুরি চালায়
সিরিয়াল কিলারের মতো
মুগ্ধ পাঠক হাততালি দেয়
মুগ্ধ পাঠক শুধু পুতুলের বিয়ে দিতে জানে।”
মুগ্ধ পাঠক কবির কবিতা পড়ে আনন্দ উপভোগ করে, তার চোখে ভেসে ওঠে সাজানো গোছানো ঘর সংসার। কিন্তু কবি যে গোপনে বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হয় সেটা বোঝে না অনেকেই। মোহিতলাল মজুমদার বলেছিলেন —
“কাঁটার উপর বক্ষ রাখিয়া গান গাহে যেই পাখী —
কে বলেছে তার হয় নাক’ সুখ-সেই আনন্দ ফাঁকি?”
চার ফর্মার বইটাতে কবির দারিদ্র পীড়িত জীবন যেন বারবার উঠে এসেছে। কবিতার পর কবিতায় উঠে এসেছে এক চরম অনিশ্চয়তা, বিপন্নতা আর হাহাকার, গোঙানি আর অনেক অভিমানী শব্দেরা। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে চাপা একটা আর্তনাদ,একটা প্রতিবাদ। অস্থির এক সময়ের মুখোমুখি হয়ে চরম এক দাবি উঠে এসেছে কবির জবানিতে। কবি জয় গোস্বামী যেমন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ‘নুন’ কবিতায় দাবি জানিয়েছিলেন সমাজের উঁচু তলার মানুষের কাছে —
“আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।”
কবি সেলিম মন্ডল ‘ভাতফুল’ এর দাবিতে সরব হয়েছেন। এ দাবি যেন সকল অভুক্ত মানুষের দাবি,এ দাবি সহজ ভাবে বেঁচে থাকার দাবি। যে রাষ্ট্র অভুক্ত মানুষের জন্য দুটো অন্ন তুলে দিতে পারে না,সে রাষ্ট্র শোষণযন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়।কবি অর্পণ কুমার মাজি তাঁর ‘দেশলাই’ নামক পকেট কাব্যে বলেছিলেন —
“নিজের বাড়িতে ভাড়াটে থাকার নাম গণতন্ত্র।
আর ধর্ষিতার গায়ে আঁচড় গোণার নাম রাজনীতি।”
দারিদ্র, অসহায়তা আর চরম এক হতাশা থাকা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে প্রেম আসে, উঁকি দেয় মনের গোপনে।তাই মাঝে মাঝেই অঙ্কের দিদিমণিও স্বপ্নে আসে। কিন্তু সেটা বন্ধুরা স্বপ্নদোষ বলেই চালিয়ে দেয়। তাই স্বপ্নে নিজেকে হত্যা করে একটু ছায়ার জন্য কবি গাছ লাগান। কিন্তু আর কোন পাখি আসতে দেন না কাছে। কারণ —
“বাম কাঁধের কিছুটা নিচেই হৃৎপিণ্ড থাকে
এবং আমি পাখি ভালোবাসি ঠিকই
কিন্তু বিশ্বাস করি না
যে কোনো মুহূর্তে ঠোকর মারতে পারে।”
তাইতো অসহায় ভাবে কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত উচ্চারণ করেছিলেন —
“প্রেম বলে কিছু নেই
চেতনা আমার জড়ে মিশাইলে
সব সমাধান পাই।”
অবশিষ্ট যা আছে তা ভালোবাসা। ‘অবশিষ্ট’ নামক কবিতা দুটিতে সেই দৃশ্যটাই ধরা পড়েছে। যখন কবির মুখে বলতে শুনি —
“উড়ে যাওয়াটুকু পাখি হলে
ডানার নির্লিপ্ত অহংকারটুকু ভালোবাসা।”
আর তখনই বুঝতে অসুবিধা হয় না অভাব, দারিদ্র্য, যন্ত্রণাকে হারিয়ে দিতে পারে ভালবাসার সোহাগ চুম্বন। তাই এক সমুদ্র বিষাদ থাকলেও এই সুপ্ত আশাটুকুই মানুষকে জিইয়ে রাখে। চলতে শেখায় জীবনের পথে।
‘মায়া’ শব্দের অর্থ বিভ্রম বা জাদু। মায়া অদ্ভুত একটা জিনিস।সে অনেকটা চোরাবালির মতো। ধীরে ধীরে মানুষ এই মায়াজালের ফাঁদে পড়ে তলিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের ‘মায়া’ কবিতায় বলেছিলেন —
“বৃথা এ বিড়ম্বনা
কিসের লাগিয়া এতই তিয়াষ
কেন এত যন্ত্রণা।”
— এ যন্ত্রণার পিছনেও আছে এক সু গভীর মায়া। জীবনের প্রতি মায়া- মোহেই মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তখনই তার মনে হয় —
“পকেট ভর্তি শীতকাল নিয়ে বাঁচার নাম আত্মহানন
এ জন্ম কোনও আত্মহননের নয়
এ জন্ম মায়াজন্ম;জন্মবীজে লালন করতে হয়।”
কাব্যগ্রন্থের নাম “মায়াজন্ম’। এই নামকরণের পিছনেও রয়েছে জীবনের এক শ্বাশ্বত সত্য।কবি যদি জীবন বিমুখ হতেন তাহলে কাব্যগ্রন্থের নামকরণ ‘মায়াজন্ম’ হত না।আসলে মায়াময় জগতের মধ্যেই কবি র বিচরণ।তাই ঘুরে ফিরে সেই মায়াজন্মকেই কবি বরণ করে নিতে চেয়েছেন।
কবির সঙ্গে আমার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়নি ঠিকই কিন্তু তাঁর কবিতা পড়ে জীবন সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা হয়েছে আমার। কবিতার বই আলোচনা করার পাণ্ডিত্য আমার নেই ঠিকই, কিন্তু যে কোন কবিতার বই পাঠ করে অদ্ভুত এক অনুভূতি আসে আমার। এই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কবিতা লিখতে পারি না তো কী হয়েছে, পাঠক হতে তো ক্ষতি নেই! তাই নিবিড় পাঠ আমার অভ্যেস। পড়ে দেখলাম সহজ সরল ভাষায় ভাবনার চাবুক চালিয়ে কবি জীবনের সুগভীর এক অনুভূতিকে তুলে এনেছেন কবিতাগুলিতে তা ভাবতে অবাক লাগে। চিত্রকল্প, রূপক, উপমা আর গদ্য কবিতার ধীর গাঁথুনিতে তাঁর কবিতা যেন সমান্তরাল, ঋজু একটা গতি পেয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে আরো অনেকটা কথা বলা যেত কিন্তু সে পাণ্ডিত্য আমার নেই। তাই আপাতত কলম থামাতে হল। তবে এটুকু বলতে পারি — “এক নির্লিপ্ত কবিজীবনের কথাকাব্য ‘মায়াজন্ম”।
কাব্যগ্রন্থঃ ‘মায়াজন্ম’, কবিঃ সেলিম মন্ডল, প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারি,২০১৮ প্রকাশকঃ ‘সৃষ্টিসুখ প্রকাশন’, প্রচ্ছদঃ নক্ষত্র সেন, উৎসর্গঃ বাবা-মা কে, মূল্যঃ ৮০ টাকা।