The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
কন্সট্যান্টিনোপল উদ্ধার
সিংহাসনে আরোহন করার শুরু সময় থেকেই সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ অধস্তনের হাতে না দিয়ে, তার পূর্বজদের দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজের হাতে নিলেন সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোস। সিংহাসনে আরোহন করার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নেতৃত্ব দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ে এপিরাসে নরমানদের বিরুদ্ধে আক্রমন শানালেন কিন্তু ১০৮১র অক্টোবরে আলেক্সিওসের বাহিনী ডাইরাক্ষিয়নে বিশ্রীভাবে হেরে গেল। পরের দুবছর নরমানদের ম্যাসিডনিয়া এবং থেসালি অঞ্চলে আক্রমনের প্রতিরোধ খাড়া করে সম্রাট একে একে নিজে প্রতিআক্রমন শানাতে শানাতে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দিয়ে ইতালিতে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করেন। ১০৮৪তে নরমানেরা সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে নতুন করে আক্রমন করলে, সম্রাট এলেক্সিয়াস নিজে কন্সট্যান্টিনোপল থেকে বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে এই আক্রমন আগের তুলনায় অনেক বেশি সবলভাবে প্রত্যাঘাত করেন। রসদ এবং যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নরমানেরা ক্ষুধা আর রোগভোগে সাম্রাজ্যের কাছে অবনত হয়। সমকালীন নরমান এক লেখক লিখছেন, ‘শত্রু কবল থেকে মুক্ত হয়ে গ্রিস মুক্তির নিশ্বাস নিল (৪১)।’
সিংহাসনের নবতম অধিকারী আলেক্সিওসের দুর্দমনীয় সামরিক সাফল্য, সাম্রাজ্যে তার কর্তৃত্বকে আরও বেশি দৃঢ় করল। সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর বেশ কয়েকটা সামরিক সাফল্যের দরুন সাম্রাজ্যের অনেকেই আলেক্সিওসের সময়কে নতুন দিনের শুরুর কাল হিসেবে আখ্যা দিলেন। যদিও নরমানদের বিরুদ্ধে তার সামরিক সাফল্য প্রশ্নাতীত ছিল না অথবা সব ক’টি যুদ্ধে সাফল্য তার করায়ত্ত্বও হয় নি, কিন্তু সিসিলির মুসলমানেরা, ইংলন্ডের রাজা হ্যারন্ড যে অভিযানে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছেন, সিংহাসনে আরোহনের পর সেই অঞ্চল জয় করে আলেক্সিওস দেখালেন বিশাল অপ্রতিরোধ্য নরমান অভিযান থামিয়ে দিতে পারেন তিনি।
নতুন সম্রাট এবারে তার নজর ফেরালেন পেচেনেগেদের দিকে, ১০৮৩-তে আলেক্সিওস ক্ষমতায় আসার পর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সফলতা সত্ত্বেও, সাম্রাজ্যজুড়ে পেচেনেগেদের নিরন্তর চোরাগোপ্তা আক্রমন থামানো যাচ্ছিল না। সাফল্য বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ সর্বাধিনায়ক এক সফল যুদ্ধের পরে লিখলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আমার মৃতুর বহু বছর পরেও সর্বশক্তিমান যে ধরণের অলৌকিক কাজ সম্পন্ন করালেন, তার সেই দিকনির্দেশ ব্যর্থ হবে না (৪২)।’ কিন্তু তিনি ভুল ভেবেছিলেন — ১০৮০-র দশকে পেচেনেগেরা সাম্রাজ্যের মাথাব্যথার কারন হয়ে উঠে নিয়মিত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে আঘাত হানতে থাকে। সমসাময়িকদের লেখায় পাচ্ছি, ‘তাদের আক্রমন বিদ্যুতের মত, তারা কখোনো দ্রুত, প্রয়োজনে কখোনো স্লথভাবে অন্তর্হিত হয়… স্লথ কারন তাদেরা লুঠের মাল বয়ে নিয়ে যেতে হয় আর দ্রুত কারন তারা আলোর মত ক্ষণস্থায়ী। দানিউবের ওপর যদি একটা সেতুও বানানো যায় তাহলেও তাদের ধরা দুঃসাধ্য (৪৩)।’
আলেক্সিওস শত্রু আক্রমনের অভিঘাত রোখার জন্যে স্বয়ং বাহিনীতে নেতৃত্ব দিতেন, কিন্তু তাতে খুব বেশি কাজের কাজ হয় নি। ১০৯০-এর শীতে নিয়মিত আক্রমনের হুমকির মুখে সাম্রাজ্যের অবস্থা আরও সঙ্কটাকীর্ণ হয়ে দাঁড়াল। বিশাল বাহিনী নিয়ে পেচেনেগ যাযাবরেরা সাম্রাজ্যের অক্ষস্থলে দক্ষিণের থ্রেসে আক্রমন করে আইনোস নদীর মুখে পশুচরাবার জন্যে অত্যন্ত উর্বর জমিতে উপনিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করে। কুড়িয়েবাড়িয়ে বিশাল বাহিনী তৈরি করে সম্রাট লেবাউনিয়ন পাহাড়ের তলায় যুদ্ধের মুখোমুখি হলেন।
লড়াই চলল ১০৯১-এর এপ্রিল অবদি। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ইতিহাস সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ জয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে আলেক্সিওসের অধাইনে। আন্না কোমনেনে লিখলেন ‘[আমাদের] যুদ্ধ ছিল অসামান্য সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন, এক লক্ষের বেশি মানুষ তাদের দারাপুত্র নিয়ে সেই দিন পৃথিবী থেকে মুছে গেল’। ২৯ এপ্রিল, মঙ্গলবার বাইজান্টাইনেরা গান গাইল “এক দিনের জন্যে তারা [পেচেনেগ] মে মাস দেখল না’’ (৪৪)। সেই এক যুদ্ধেই পেচেনেগেরা ধ্বংস হল। যুদ্ধের পরেও যারা বেঁচে রইল তাদের হত্যা করা হল। বাকিদের বলকানজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হল। এরপরে আর তারা সাম্রাজ্যের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি (৪৫)।
আলেক্সিওসের ক্ষমতায় আসার প্রথম দশক মোটামুটি সাফল্যের খতিয়ান। দুই বিপজ্জনক আগ্রাসী প্রতিবেশীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের রাজ্যে, এদের মধ্যে পেচেনেগেদের স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সম্রাটের সিংহাসন ঘিরে তার নিজের পরিবারের মানুষজনের দ্বারা সুরক্ষিত, তাঁরা জানেন সম্রাটের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ সুরক্ষাও। সাম্রাজ্যের মধ্যে থেকে কোনও রকম বিদ্রোহের ইঙ্গিত ছিল না, ১০৮১-তে যারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তাদের থেকে অথবা সিংহাসনের অন্য প্রতিযোগীদের থেকেও নয়। আলেক্সিওস অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছিলেন, এসবই তার প্রতিফলন বলে মনেহচ্ছিল। কন্সট্যান্টিনোপল থেকে বেশ কিছু দূরত্বের সামরিক অভিযানে, গুরুত্বপূর্ণ বিরোধীদের তার বাহিনীর সঙ্গে নিয়ে চোখে চোখে রাখতেন (৪৬)। রাজধানীতে আলেক্সিওসের অবর্তমানে ভাই আইজাক সিংহাসন পাহারায় থাকতেন এবং রাজপরিবারের বিরুদ্ধে কোনও রকম বিরোধিতার সমুচিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া থাকত তার ওপরে (৪৭)। সিংহাসনের নিরাপত্তা নিয়ে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ দলের স্নায়ুচঞ্চলতা সত্ত্বেও আলেক্সিওস খুবই গ্রহনযোগ্য সম্রাট ছিলেন এবং সাম্রাজ্যজুড়ে যে বদ্ধ বাতাস জোটবদ্ধ হয়েছিল তার সময় এসব সরে গিয়ে নতুন মুক্ত বাতাস বইতে থাকে।
সম্রাটের শাসনের তরিকা কিন্তু অসংযত ছিল না, বিশেষ করে তার বেশ কয়েকজন পূর্বসূরী যেমন রাষ্ট্র চালানোর কথা ভুলে খাওয়া পরা ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন – যেমন ছিলেন সপ্তম কন্সট্যাইন (১০২৫-৮)। তিনি দরবারের কাজকর্মের থেকে অনেক বেশি সময় কাটাতেন রান্না ঘরে খাদ্যের রঙ আর গন্ধ নিয়ে পরীক্ষানীরিক্ষা চালাতে (৪৮)। বিপরীতে আলেক্সিওসের সামরিক অভ্যেস — সাধারণ পছন্দ এবং বিলাসিতা থেকে দূরে থাকার ইচ্ছে তাকে অন্যধাতুতে গড়ে তুলেছিল। ঝাঁঝালো এবং গম্ভীর, ছোটখাটো কথায় সময় ব্যয় না করা বা বয়স্যও না রাখা, জনমানসে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল (৪৯)। জামাই নিকেফোরোস ব্রেইন্নিওসের লেখায় পাচ্ছি, তিনি আয়নাকে পদদলিত করারমত অদম্য মানুষ ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষ এবং যোদ্ধার জন্যে অস্ত্র, সরলতা এবং জীবনযাত্রার প্রতি পবিত্রতাই অলঙ্কার (৫০)’। ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রেও বিশুদ্ধবাদী নীতি তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। বড় মেয়ে তার সময়ের সাম্রাজ্যের ইতিহাস লেখার পরিকল্পনা করছে, এই বার্তায় তিনি মোটেই খুশি হন নি, তিনি তাঁকে বিষাদগীতি এলিজি বা সমাধি দেওয়ার সময়ের গান লিখতে নির্দেশ দেন। স্ত্রী যখন ভবিষ্যতের প্রজন্মের শিক্ষার জন্যে সম্রাটের জীবনী লিখতে ইতিহাসকার ঠিক করছেন, তিনি আরও কাঠকাঠ স্বরে বলেন ‘খুব ভাল হয় তাদের দুঃখ দাও আর তাদের দুর্ভাগ্য বর্ণনা কর (৫১)।’
আলেক্সিওস পবিত্রিতার মূর্ত প্রতিভূ। তিনি একমাত্র বাইবেলেই আত্মচিত্তবিনোদনী মশলা লাভ করতেন। মাঝ রাত অবদি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নীরবে নানান শাস্ত্র পাঠ করতেন, স্ত্রীও তাকে একইভাবে সঙ্গ দিতেন এবং একই উৎসাহের মানুষ ছিলেন (৫২)। উপাসনার সময়টা ভাগ করে নিতেন পরিবারের সাথীদের সঙ্গে; ভাই আইজাককে পুরোহিতেরা কঠোর ধর্ম বিশ্বাসের জন্যে খুবই পছন্দ করতেন (৫৩)। তার মা একই ধরণের পবিত্র মানুষ ছিলেন। রাজধানীতে গোল্ডেন হর্ণের কাছে একটি চার্চ আর একটি মঠ তৈরি করার পাশাপাশি সম্রাটের মা সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মনেতা আর সন্ন্যাসীদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। বহু সময় তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তাদের সঙ্গঠনগুলিকে রাজস্বমুক্ত করার জন্যে সচেষ্ট হতেন। তার পাঞ্জায় শুধু যে তিনি সম্রাটের মা লেখা থাকত না, তিনি যে সন্ন্যাসিনী তাও উল্লিখিত থাকত। সম্রাটের কন্যা লেখেন, আন্না ডালাসিনেই ‘পুত্রের মনের গভীরে সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়ের ধারণা রোপণ করে গিয়েছেন (৫৪)।’
এলেক্সিওসের শাসনকালে বাইজান্টিয়াম গভীর ধর্মচর্চা যুগে প্রবেশ করল। ১০৮১-তে ক্ষমতায় এসে বিদ্রোহের সময় শহরে তার বাহিনীর কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ খসখসে কাপড়ের পরিধেয় (হেয়ার শার্ট) পরতে এবং পাথরের মেঝেতে শুরু করেন। চার্চের অব্যহৃত সম্পদ ব্যবহার করে যাযাবরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে পুরোহিতদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন ভবিষ্যতে এরকম কাজ আর হবেনা। আগের প্রজন্মের শাসকেরা প্রাসাদে যেভাবে ধর্মীয় গায়কদের বঞ্চিত করেছিলেন, তিনি দুপুরের খাবার সময় কড়া নিয়মে তাদের ফিরিয়ে আনলেন (৫৫)।
সম্রাট গোঁড়া ধার্মিক ভাবনা সাম্রাজ্যের ওপর চাপিয়ে দিলেন। রাজত্বের শুরুর সময় থেকেই বিধর্মীদের কাজকর্ম এবং তাদের ধর্ম বিশ্বাস ইত্যাদির প্রতি কঠোর শাস্তি নামিয়ে আনা হত, বিচারের সময় স্বয়ং সম্রাট উপস্থিত থাকতেন এবং দোষীদের শাস্তি নির্ধারণ করতেন। চার্চের স্বার্থ দেখা এবং তাকে যে কোনও রূপে সাহায্য করা রাষ্ট্রের নীতি ছিল, বিশেষ করে ক্ষমতাকেন্দ্রে যিনি বহিরাগত, যিনি বলপ্রয়োগে শাসনভার কেড়ে নিয়েছেন, তার পক্ষে এই নীতি অনুসরণ করা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আলেক্সিওস মন দিয়ে আন্তরিকভাবে ধর্ম চর্চা করতেন। (চলবে)