The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
এশিয়া মাইনরের পতন
কিন্তু নিকাইয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা সহজ কাজ ছিল না। নিকাইয়া শহররের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট দূর্গের মত কঠিন; এর প্রতিরক্ষা ভেদ করা কঠিন। জনৈক ল্যাটিন পঞ্জিকাকার লিখছেন, ‘নিকাইয়া খুবই উপযোগী রক্ষণভূমি; এটি সমতলেভূমিতে অবস্থিত, অথচ পাহাড় থেকে খুব দূরে নয়, সব থেকে বড় কথা পাহাড় দিয়ে ঘেরা… শহররের পাশে এবং পশ্চিম সীমান্ত একটি বিশাল স্বাভাবিক হ্রদ দিয়ে ঘেরা; শহরের এর থেকে বড় নিরাপত্তা আর কীই বা হতে পারে। এর অন্যদিক ঘিরে রয়েছে একটি পরিখা এবং দেওয়াল; পরিখার জল ঝর্ণার এবং অন্যান্য জলস্রোতের জলে পরিপূর্ণ (৪৩)’।
আলেক্সিওস জানতেন নিকাইয়া শহর বলপ্রয়োগ করে দখল করার সম্ভাবনা কম (৪৪)। অন্যান্য সমস্যা বাদ দিলেও ততদিনে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী অতিরিক্ত লড়াইএর ভারে ন্যুব্জ। জন দ্য অক্সাইট বলেছেন নরমান এবং পেচেনেগেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে বাহিনী ক্লান্ত এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতিও স্বীকার করতে হয়েছে সাম্রাজ্যকে (৪৫)। এছাড়া কন্সট্যান্টিনোপলের উত্তর অঞ্চলের অবস্থাও দিনেদিনে সংকটজনক হয়ে উঠছিল। ড্যানিউব এলাকার কুমান স্তেপ যাযাবরদের আক্রমন যে কোনও সময় আছেড়ে পাড়ার আশংকা তো ছিলই, এরই পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে সার্বরাও আক্রমনের হুমকি দিচ্ছিল (৪৬)।
এমতাবস্থায় বড় বাহিনী তৈরি করে নিকাইয়া উদ্ধারে পাঠানো খুবই সমস্যার ব্যাপার হয়ে উঠছিল সাম্রাজ্য কর্তাদের সামনে। বিশেষ করে শহরের নিরাপত্তার ওপরে যথাযোগ্য আঘাত হানার বিষয়টাই মাথায় রাখতে হচ্ছিল। পশ্চিমের তুলনায় বাইজান্টাইন যুদ্ধ প্রযুক্তি অনেকটা পিছিয়ে ছিল। পশ্চিমে সাত শতকেই নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটে গিয়েছে। তাছাড়া শহরের ওপর আক্রমনের দায়িত্ব কাদের ওপরে দেওয়া হবে, সেটা নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার ছিল। এশিয়া মাইনর অঞ্চলে আলেক্সিওসের নীতির ব্যর্থতা এবং সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যের ওপরে যে চাপও তৈরি হচ্ছে তার ফলে বিশাল বাহিনীর দায়িত্বভার সেনানায়ককে দিলে সেই সুযোগে বাহিনী ব্যবহার করে সাম্রাজ্যের সিংহাসন দখল করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়াও অসম্ভব নয়।
এমতাবস্থায় আলেক্সিওস, তার বাল্যবন্ধু, তার আনুগত্য বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে টাটিকিওসকে সেনাপতি নির্বাচন করলেন। ১০৯৪-এর মাঝামাঝি সময়ে টাটিকিওস নিকাইয়ায় বাহিনী উপস্থিত হলেন। টুকটাক সামরিক সাফল্য মিললেও বড় সাফল্য অধরাই থেকে গেল। তুর্কিদের বাহিনী নিকাইয়ার দিকে আসার খবর পেয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে কন্সট্যান্টিনোপলে পশ্চাদাপসরণ করলেন (৪৭)। নিজের নামে খুতবা পড়িয়ে নিকাইয়ায় তুর্কি বাহিনী পাঠিয়েছিলেন ১০৯৪-এর ফেব্রুয়ারিতে বাগদাদের সিংহাসনের লড়াইতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে জয়ী হয়ে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করা মালিক শাহের অন্যতম পুত্র বারকিয়ারুক (৪৮)।
বারকিয়ারুকের হস্তক্ষেপের ফলে এই অঞ্চল উদ্ধার করা আলেক্সিওসের পক্ষে খুবই সমস্যাজনক প্রকল্প হয়ে উঠল; কারণ এবারে নতুন সুলতানের লক্ষ্য এশিয়া মাইনরের অধিবাসীদের কাছে শুধুই কর্তৃত্ব চাওয়া নয় নিকাইয়া দখলও তার অন্যতম লক্ষ্য। হিংস্র চরিত্রের সেনাপতি বুরসুকের নেতৃত্বে যে সুলতানি বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে সেটা শুধুই সম্রাটের মাথা ব্যথার কারন হয়ে উঠল না, ‘[নিকাইয়ার] বাসিন্দারা আর আবুল কাশেম দেখলেন তাদের অবস্থা সত্যিই হতাশাজনক — বাস্তবিক, বুরসুকের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহর দখলে রাখা অসম্ভব।’ আলেক্সিয়াদ সূত্রে জানিতে পারছি, আবুল কাশেম চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘সম্রাটকে দূত মার্ফত সাহায্য চেয়ে বললেন বুরসুকের অধীনে থাকার থেকে তার [পক্ষে সম্রাটের] দাস হয়ে থাকা উত্তম। বিলম্ব না করে রৌপ্য রাজদণ্ড এবং নিশান সহকারে যতটা পারা যায় সর্বদক্ষতা সম্পন্ন বাহিনী পাঠানো হোক (৪৯)’।
নিকাইয়ার শাসক আবুল কাশেমকে সাহায্য করা নিয়ে আলেক্সিওসের একটা অঙ্ক কষা পরিকল্পনা ছিল যদিও তার পরিকল্পনাগুলো বহুকাল ধরেই বাইজান্টিয়ামকে সমস্যার আবর্তে হাবুডুবু খাইয়েছে। আন্না কোমনেনে লিখছেন ‘তিনি অঙ্ক কষে দেখলেন এই আবেদনে সাড়া দিয়ে সাহায্য পাঠানোর অর্থ হল আবুল কাশেমের বিনাশ নিশ্চিত করা। রোমান সাম্রাজ্যের দুই শত্রু যখন পরস্পরের মধ্যে লড়াতে যাচ্ছে, তখন দুর্বলকে সাহায্য করাই তার প্রধানতম লক্ষ হওয়া উচিৎ। সামরিক সাহায্য পাঠানোর অর্থ তাকে শক্তিশালী করা নয়, বরং সে যাতে ক্ষমতাবান শত্রুকে হারাতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নিকাইয়া বর্তমানে রোমান শাসনাধীন নয়, কিন্তু একমাত্র এই পরিকল্পনাতেই শহরটা রোমানদের দখলে আসতে পারে। (৫০)’ যদিও নিকাইয়ার নিরাপত্তা বলয়ে ধাক্কা সামলাতে না পেরে বুরসুক পিছু হঠলেন, কিন্তু এই পিছু হঠার ফুরসতটা খুবই সাময়িক ছিল, খবর এল আরেকটি বিশাল বাহিনী ‘তুর্কি সাম্রাজ্যর গভীর ভিতর থেকে উঠে এসে’ নিকাইয়া অভিযানে আসছে (৫১)। আবুল কাশেম বুঝলেন তার নতিস্বীকার এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, তিনি সম্রাটের প্রস্তাব মেনে, নিকাইয়া রোম সামাজ্যের হাতে তুলে দিতে সম্মত হলেন।
কন্সট্যান্টিনোপলে বহুকাল ধরেই বিভিন্ন বিদেশি দূত এবং উচ্চপদস্থ আমলা আসেন। দশম শতকে সঙ্কলিত দ্য বুক অব সেরিমনিজ নামে একটি বইতে বলা হচ্ছিল এই সব উদ্ভুত সমস্যা সাম্রাজ্য কর্তৃপক্ষ কীভাবে সামলাবে, যে দেশটা মাথ্যাব্যথা হয়ে উঠেছে, সেটির তুলনামূলক গুরুত্ব মাথায় রেখে সম্বর্ধনায় অতিপ্রাচুর্য প্রদর্শন করা জরুরি (৫২)। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর আড়ম্বর দেখিয়ে সাম্রাজ্যের কৃষ্টিগত, রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন করা। আলেক্সিওস এই পরীক্ষিত এবং সুফলওয়ালা তত্ত্ব আবুল কাশেমের ওপরে ব্যবহার করলেন। ১০৯৪-এর শেষের দিকে তুর্কি সর্দারকে রাজধানীতে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলেক্সিওস আমীরকে প্রভাবিত করার জন্যে এই সময়ের উপযোগী বেশ কিছু পরিকল্পনা উপস্থাপন করে ইঙ্গিত দিলেন সাম্রাজ্যের সহযোগী হলে তার কী কী সুবধে হবে।
আলেক্সিওস ব্যক্তিগত উদ্যমে আবুল কাশেমের সম্বর্ধনার অনুষ্ঠান দেখাশোনায় রেখেছিলেন। আবুল কাশেমকে রাজধানীর মূল দর্শনীয় স্থানগুলো দেখানো হল, বিশেষ করে, নানান সামরিক অভিযান সফলভাবে সাঙ্গ করা রোমক সেনানায়কদের সম্মানে তৈরি করা মূর্তিগুলোর সামনে তাকে সম্মান জানাতে নিয়ে যাওয়া হল। তুর্কি সর্দারকে ঘোড়দৌড় স্টেডিয়ামের সঙ্গে রথ চালকদেরও দেখানো হল, উদ্দেশ্য ছিল যে সভ্যতায় ঘোড়া নির্ভর করে যুদ্ধের জয় পরাজয় ঘটে, তার এক ধারককে ঘোড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখানো। তিনি সম্রাটের সঙ্গে শিকারে গেলেন এবং হামামগৃহ সহ নানান রোমিয় স্থাপনা আর কাঠামোও দেখলেন। সংক্ষেপে আবুল কাশেমকে চরম ও পরম প্রাচুর্যের সঙ্গে বিনোদিত করা হল এবং অভিনিবিষ্টি সহকারে আপ্যায়িত করা হল (৫৩)।
আলেক্সিয়াস ঠিক যেভাবে তার ঝামেলাদার প্রতিবেশীদের সামলাতেন, ঠিক তেমনিভাবে নিকাইয়া নিয়ে একটা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে জোট চুক্তিতে উপনীত হতে চাইছিলেন; এর মূলে ছিল গালভরা উপাধি এবং সিন্দুক ভরা সম্পদ প্রদান। উদ্দেশ্য শত্রুকে পরোক্ষে কিনে নেওয়ার মধ্যে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া সম্রাটই একমাত্র প্রভু, তাকে সম্মান করা একমাত্র কর্তব্য। নিকাইয়ায় ফেরত যাওয়ার আগে ‘আলেক্সিওস তুর্কি সর্দারকে আরও প্রাচুর্যওয়ালা উপহারে ভরিয়ে দেবেন, সেবাস্তোস উপাধিতে সম্মান জানাবেন এবং তাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি নতুন করে আরও বিশদে আলোচনা করবেন এবং নানান সাম্মানিক প্রথার মাধ্যমে তাকে সমুদ্রপথে বিদায় দেবেন (৫৪)’। সাম্রাজ্যের উচ্চতম উপাধিগুলোর মধ্যে সেবাস্তোস ছিল প্রধানতম; এই উপাধি একমাত্র শাসক শ্রেণীর পরিবারগুলো এবং তাদের ঘনিষ্ঠতমদের বাইরের অভিজাতদেরও অর্পণ করা হত না। এই উপাধি আবুল কাশেমকে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, গত কয়েকদিনে তিনি রাজধানীতে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, সে সব থেকে প্রভুত ফললাভ করা। সম্রাটের পরিকল্পনা যদি সফল হয় তাহলে এই চুক্তির মাধ্যমেই সম্রাট এশিয়া মাইনরে, তিনি শুধু তার হারানো অবস্থানই শুধু ফেরত পাবেন না, উপরন্তু রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবেন এবং তার হারানো এলাকা ফেরত পাওয়ার উদ্যম নেবেন। আর যদি তার পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তাহলে তার সম্মানে প্রভূত আঘাত লাগবে কারন তিনি এমন একজন মানুষকে ডেকে সম্মান দিলেন, যে বহুবার সাম্রাজ্যের সম্মুখ কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। (চলবে)