দ্বিতীয় ঘটনা হলো। সদু ছিলো আমাদের বাল্যবান্ধবী। ভীষণ ঝগড়াটে। কিন্তু খুবই ভাব। সব বন্ধুদের বিয়ে হয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু সদু। সম্বন্ধ আর ঠিক হয় না, বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে সিউড়ি গেছি কয়েকদিনের জন্য। গিয়েই শুনলাম সদুর বিয়ে ঠিক হয়েছে নদিন বাকী। পাত্র কোলকাতার। কাননবালা আর পঙ্কজ মল্লিকের জন্য রবীন্দ্রসংগীতের চল্ হয়েছে। আমরা দলবল নিয়ে ঠিক করলাম, বাসর ঘরে সদুকে দিয়ে একটা রবীন্দ্রসংগীত গাওয়াতে হবে। সদু গান গাইতো ফিল্মি গান ২/৪টে কিংবা ‘শেফালি তোমার আঁচলখানি। বিছাও শারদ প্রাতে,। মন না রাঙায়ে, কাপড় রাঙালে যোগী।’ এই ধরণের গান। সিউড়িতে একজন গানের মাষ্টার ছিলেন, সন্ন্যাসীদা। সাইকেল চেপে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গানের টিউশ্যনী করতেন। সাইকেল চেপে চেপে চেহারাটা হয়েছিল ত্রিভঙ্গ মুরারি। খুবই স্নেহপ্রবণ এবং নিপাট ভালোমানুষ ছিলেন। আমাদের কয়েকজনকে খুবই ভালোবাসতেন। সন্ন্যাসীদাকে আমরা দলবল নিয়ে চেপে ধরলাম—সদুকে একটা রবীন্দ্রসংগীত সাতদিনের মধ্যে শেখাতেই হবে। সন্ন্যাসীদা রাজী হলেন।
বিয়ের দিন আমরা কোমরে গামছা বেঁধে, সন্ধে থেকে খাটছি। রাত্রি ১২টায় বাসর বসেছে। হাত মুখ ধুয়ে আমরা সব জানলা, দরজায় হাজির। সদু গাইবে রবীন্দ্রসংগীত। আমরা কয়েকটি মেয়েকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম, বাসর বসলেই ওরা যেন কনে-কে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে বলে। ঠিক তাই, তারা বলতেই সদু বল্লো—আমি রবীন্দ্রসংগীত বিশেষ জানি না। ওরা বল্লো—আরে বাবা, তুই একটাই গা-না। তারপর অন্য গান গাইবি। সদু শুরু করলো রবীন্দ্রসংগীত—
‘কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলাম না
শুকনো ধুলো যত।
কে জানিত আসবে তুমি গো
অনাহুতের মত।’
এর আগে বরের মুখটা হাসি হাসি দেখেছিলাম। গান শেষ হতেই দেখলাম, মুখটা ভীষণ গম্ভীর। আমরা খুবই উল্লসিত। আমাদের প্ল্যান সাকসেস। সদু রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছে।
অষ্টমঙ্গলাতে মেয়ে—জামাই এলো। ব্যাস্ জামাই আর আসে না। সদুকেও নিয়ে যায় না। দেখতে দেখতে দুমাস কেটে গেল। জামাই—এর দাদা কর্মসূত্রে সিউড়ি আসতেন। তাঁরই মারফত এই সম্বন্ধ। সিউড়ির প্রবীণ কর্তাব্যক্তিরা, উনি সিউড়ি এসেছেন শুনে, কয়েকজন ওঁর কাছে গেলেন, ব্যাপারটা জানতে। উনি বল্লেন—কী করবো বলুন? আমার ভাইতো দেখতে ভালো নয়, তাই ওর ধারণা হয়েছে, বৌমা ওকে উদ্দেশ্য করেই কী একটা গান গেয়েছে, তাতে ও খুব অপমানিত বোধ করেছে। কর্তারা বল্লেন এবার আপনি কতদিন আছেন? উনি বল্লেন—দিন পনেরো।
কর্তারা আমাদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন-কে সদুকে গান শিখিয়েছে? আমরা বল্লাম- সন্ন্যাসীদা। -ডেকে নিয়ে আয় সন্ন্যাসীকে। খুঁজে পেতে সন্ন্যাসীদাকে ধরে নিয়ে এলাম। -কর্তারা জিজ্ঞেস করলেন-কী গান শিখিয়েছো সদুকে। সন্ন্যাসীদা বল্লেন—
কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলাম না
শুকনো ধুলো যত।
কে জানিত আসবে তুমি গো
অনাহুতের মত।
এক কর্তাব্যক্তি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,-হা-রা-ম-জা-দা আর গান খুঁজে পেলে না, যে এই গানটাই শেখাতে হল। সন্ন্যাসীদা কাঁচুমাচু হয়ে বল্লেন-জ্যাঠা, আমি যে এই একটাই রবীন্দ্রসংগীত জানি।
সন্ন্যাসীদাকে সঙ্গে নিয়ে ওরা গেলেন, জামাই-এর দাদার কাছে। সব শোনার পর, উনি বল্লেন-তাতো হল, কিন্তু আপনাদের দুজনকে, কোলকাতায় আমাদের বাড়ী যেতে হবে, আমার বাবা-মা এবং ভাই-এর কাছে, আনুপূর্বিক ঘটনাটা বল্লে, মনে হয়, সুরাহা হবে।
দুজন প্রবীণ সিউড়ি থেকে গিয়েছিলেন জামাই-এর দাদার সঙ্গে। পূর্বানুপর্ব ঘটনা বলায়, জামাই-এর বাবা হেসে ফেটে পড়েন। কপাল চাপড়ে বলেন-কী মহৎ মন নিয়ে, কী উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, আর আমার মহাপণ্ডিত ছেলে তার কী মানে করলো। শুনেছিলাম জামাইও নাকি হেসেছিলো। সদু শ্বশুরবাড়ী গেল।
শিল্পে মার খাওয়া পশ্চিমবঙ্গে, আনন্দবাজার একটি বৃহদাকার প্রতিষ্ঠান, যেখানে কয়েক হাজার পরিবার প্রতিপালিত হচ্ছে। এ হয়েছে অশোককুমার সরকারের বাস্তব বুদ্ধি ও ব্যবসায়িক জ্ঞানের জন্য। কিন্তু কজন বাঙালী এই স্বাধীনতা সংগ্রামী স্থিতধী, নির্লোভ স্মিতহাস্যময় মানুষটিকে জানেন?
তদানীন্তন কংগ্রেসনেতা অতুল্য ঘোষ যাঁকে বঙ্গেশ্বর বলা হতো। জওহরলালের কথামত, বিধান রায়ের সায় নিয়ে অতুল্য ঘোষ, রাজ্যসভার সদস্যপদের জন্য, আবেদপত্রে সই করাতে পারেননি অশোককুমার সরকারকে দিয়ে। রাজ্যসভার সদস্য হওয়া মুঠোর মধ্যে পেয়েও, তাঁর এই নির্লোভ মন, আমাদের দেশে কজনের মধ্যে আছে? সব রকমের খেলাধুলায় তাঁর উৎসাহ ছিলো অপরিসীম। মোহনবাগানের একনিষ্ঠ সমর্থক। মোহনবাগানের মত ফুটবল টিম, রামলালের মত দই, আর শ্যামবাজারের মত ভালো মার্কেট আর হয় না। এই তিনটির সম্বন্ধে, এইরকম একরোখা ছিল তাঁর মন।
তার নম্র মার্জিত সৌজন্য সহজাত ছিল। অকৃপণ মন নিয়ে খাওয়াতে ভালবাসতেন। এ দেশ সে দেশ যে কতবার ঘুরেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু বাঙালীয়ানায় হেরফের হয়নি আজীবন। আমার অনুরোধে কয়েকজনকেই চাকরি দিয়েছিলেন আনন্দবাজারে।
ওঁর বাবা ছিলেন পরমবৈষ্ণব প্রফুল্লকুমার সরকার, আনন্দবাজারের সম্পাদক। মা ছিলেন, রবীন্দ্র স্নেহধন্যা নির্ঝরিণী সরকার। রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র খণ্ডগুলির একটিতে অর্দ্ধখণ্ডই নির্ঝরিণী সরকারকে লেখা। নির্ঝরিণী সরকার ছিলেন সারদা দেবীর কৃপাধন্যা ও ভগিনী নিবেদিতার ছাত্রী। আমাকে এমন ভালবাসতেন যে, যা কিছু আমি করেছি সংগঠন বা অনুষ্ঠান সব কিছুতেই তিনি ছিলেন, প্রধান পৃষ্ঠপোষিকা-যেমন ভারতীয় ললিতকলা কেন্দ্র, নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন প্রভৃতি। আর অশোককুমারের দিদিমা ছিলেন, কুন্তলীন পুরস্কারপ্রাপ্তা লেখিকা বিদুষী সরলাবালা সরকার। নিবেদিতার সহযোগিনী এবং উনিই প্রথম নিবেদিতার জীবনী রচনা করেন। এই প্রসঙ্গে বলি, হয়তো ওঁর শরীর খারাপ লিখতে পারছেন না। আমাকে ডেকে পাঠাতেন। উনি বলতেন, আর আমি লিখতাম। তারপর ওঁকে শুনিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে ‘দেশ’-এ দিয়ে আসতাম। প্রায় ৪/৫টি প্রবন্ধ এইভাবে শুনে কপি করে লিখেছিলাম। সরলাবালা সরকারের গ্রন্থাবলীর সম্পাদিকা তাঁর ভূমিকায় আমার নাম উল্লেখ করেছেন।
বাবা-মা ও দিদিমার কাছ থেকে অশোককুমার পেয়েছিলেন রামকৃষ্ণ বীজমন্ত্র। এবং আজীবন তা আঁকড়ে ছিলেন। ডান হাত দিয়ে দান করেছেন, সাহায্য করেছেন কতজনকে কিন্তু জানতে পারেনি বাঁ হাত। সংগীতের প্রতি অনুরাগ ছিলো ছোট বেলা থেকেই। মার্গসঙ্গীত ব্যাকরণে তাঁর দখল ছিলো। একদিন আমাকে বলেছিলেন- সানাই তো বল, মানে জানো? বলেছিলাম-না। বল্লেন-অধিকাংশজনই ভুল উচ্চারণ করে। কথাটা হচ্ছে শাহনাই। ‘শাহ’ মানে বাদশা, রাজা। আর ‘নাই’ মানে হচ্ছে ‘ফুঁ’। অর্থাৎ ফুঁয়ের রাজা। সংগীতের ‘স’-ও জানিনা কিন্তু কথাটা মউকা বুঝে ছেড়েছিলাম দু-এক জায়গায়, উপস্থিত সকলে বুঝেছিলো, আমি একজন সমঝদার।
অশোককুমার সরকারের ছিলো, ষ্পষ্ট করে কথা বলার সাহস। যা ঠিক মনে করতেন, তা বলে দিতেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথাই লেখা যায়। আনন্দবাজার বৃহদাকার প্রতিষ্ঠান। আনন্দবাজার থেকে বের হয় এখন অনেক ইংরেজী ও বাংলা কাগজ। প্রতিষ্ঠানের এই বিরাটত্ব, অশোককুমার সরকারের অবদান।
একসময় অন্নদা মুন্সী ছিলেন, ভারতের শ্রেষ্ঠ কমার্শিয়াল আর্টিষ্ট। সত্যজিৎ রায়, রঘুনাথ গোস্বামী প্রভৃতি তাঁর ছাত্র ছিলেন। কিন্তু মুস্কিল হয়েছিলো, কমার্শিয়াল আটিষ্ট হিসেবে তাঁর পিছনে ছাপ পড়ে যাওয়ায় বহুলোক জানতে পারেননি যে তিনি কতবড় সার্থকনামা একজন উঁচুদরের চিত্রশিল্পী। রবার সলিউশন দিয়ে ছবি আঁকা-তাঁরই অনবদ্য সৃষ্টি। নিজেকে যীশু ভাবতেন, আর আমাকে বলতেন যীশুপুত্র।
বড় পোষ্টকার্ড সাইজের ডজন ডজন ছবি উনি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তখন দৈনিক কৃষক কাগজের পার্টনার, তাই বিজ্ঞাপনের জন্য যেতাম ডি.জে. কিমারে। সেখানে উনি ছিলেন আর্ট ডাইরেক্টার। সেখানেই প্রথম পরিচয়েই প্রেম। বেশ কয়েকবছর পরে একজন এ্যাকাউন্ট একজিকিউটিভ সুভাষ সেনের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়। সুভাষ-ই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে।
অন্নদা মুন্সীকে একবার কয়েকটি ছেলে এসে ধরে। আমাদের ম্যাগাজিনের একটি কভার করে দিন। নিদিষ্ট দিনে ছেলেরা এলে উনি কভারটি তাদের হাতে তুলে দেন। কাঁচুমাচু হয়ে ছেলেরা বলে-স্যার কত দিতে হবে? উনি কভারটি তাদের হাত থেকে নিয়ে বলেন — কত দিতে হবে? এই বলেই কভারটি কুচিকুচি করে ছিঁড়ে দেন। বেরোও শালারা। অন্নদা মুন্সীকে টাকা দিয়ে কভার করাতে পারবে? ছেলেরা ভুল বুঝতে পেরে, ফের হাতে পায়ে ধরে, উনি আবার ফের কভার করে দেন। এই ছিলেন অন্নদা মুন্সী। অনেকেই বলতেন পাগল। কিন্তু আমি দেখেছিলাম এক জাত শিল্পীকে। কত তো শিল্পী দেখলাম, ছবি এঁকেই, ঠিক করে ফেলেন কত দাম। আর মুন্সীজী শিল্প সৃষ্টিতেই খুশি। দাম ভাবতেন তিনি, যিনি ছবিটা নেবেন। (চলবে)