The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
এশিয়া মাইনরের পতন
আবুল কাশেম নিকাইয়া ফিরে যাওয়ার পরেই চরম দুর্যোগ ঘনিয়ে এল। সম্রাটের সঙ্গে আমীর যেভাবে চুক্তি তৈরির আলাপ-আলোচনা চালিয়েছেন, তার রাজ্যের প্রবীণ অভিজাতদের সে তরিকা পছন্দ হয় নি — তারা আবুল কাশেমের পতন দেখার জন্যে অপেক্ষা করছিল। খবর পাওয়া গেল বুরসুক আবার আরও বড় বাহিনী নিয়ে অভিযানে আসছে। ২০০ অভিজাত আবুল কাশেমকে নিয়ে নতুন সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন আলাপ আলোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়ে। আবুল কাশেমকে বাগে পেয়ে গলায় সুলতানের লোকজন ফাঁস জড়িয়ে হত্যা করা হল।
আবুল কাশেমের হত্যাকাণ্ড সম্রাটের পক্ষে আবারও একটা বড় বিপর্যয়ের সংবাদ। আলেক্সিওস মরিয়া হয়ে শহরের দখল নেওয়া আবুল কাশেমের ভাই বুলদাগির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং তাকে সরাসরি প্রস্তাব পাঠালেন — কোনও রকম রাজধানীতে প্রমোদ ভ্রমণ নয়, ঘোড় দৌড় নয়, উপাধি দেওয়া নয় — কিন্তু সরাসরি চুক্তি নিয়ে বার্তা। সম্রাট সরাসরি তার বার্তা পাঠালেন তিনি নিকাইয়া কিনতে চান (৫৬)।
এবারেও ঘটমান বর্তমান সম্রাটের পক্ষে গেল না। নিকাইয়ায় যখন তুর্কিরা ছন্নছাড়া অবস্থায়, সে সময় নতুন এক মানুষের আবির্ভাব ঘটল হঠাতই। কিলিজ আরসালান বাগদাদের কারাগার থেকে ১০৯৪-এর শেষে বা ১০৯৫-এর প্রথমে মুক্ত হয়ে সরাসরি শহরে ফিরলেন। তিনি শহরে ফিরিতেই তুর্কি নাগরিকরা ‘আনন্দে উদ্বেল হয়ে’ তার হাতে শহরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিল। এটা যে একেবারেই অবাক হওয়ার মত ব্যাপার ছিল, এমন নয়। যতই হোক তিনি প্রয়াত সুলেইমানের পুত্র (৫৭)। পারিবারিক ক্ষমতাকেন্দ্রে তাঁর ফিরে আসার ঘটনা বারকিয়ারুকের পক্ষে গেল, কারন আরসালানের ওপর তিনি খুবই ভরসা করেছিলেন; ১০৯৭-এর গ্রীষ্মে ক্রুসেডারেরা যখন এশিয়া মাইনর পেরোচ্ছেন, কিলিজ বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে তৈরি (৫৮)। তিনি যে বারকিয়ারুকের পক্ষে নিকাইয়ার প্রশাসক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন, এটা বারকিয়ারুকের অসামান্য চাল হিসেবে আজও গণ্য হয় এবং সেই সময়ে বাইজান্টাইম সাম্রাজ্য বিরোধিতাকে আরও পুষ্ট করে।
পূর্ব প্রদেশগুলির ওপরে বাইজান্টিয়াম পকড় দ্রুত শিথিল হতে শুরু করেছে। ১০৯৭-তে এশিয়া মাইনরে আসা মুসাফিরেরা নিকোমিডিয়ায় পৌঁছে স্বচক্ষে যা দেখেছেন, সে সব ঘটনা যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। সেই সব ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে তারা আতঙ্ক লুকিয়ে রাখতে পারছেন না, তাঁরা লিখছেন ‘হায়! উপত্যকা জুড়ে নিকোমিডিয়ার সীমান্তের বাইরে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত উপত্যকা কাটা মাথা, মৃত মানুষ আর তাদের হাড় গোড় ডাঁই হয়ে রয়েছে! তুর্কিরা তীর ধনুকের নতুন প্রযুক্তিতে অজ্ঞ মানুষদের ধ্বংস করেছে। সহানুভূতিতে মন আর্দ্র হয়ে উঠছে, আমাদের চোখের জল বাধা মানছে না (৫৯)’। এই উচ্চকিত আর্তির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে খারাপ সময়ের ইঙ্গিত এবং কীভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের উচ্চাশা বিনষ্ট হয়েছিল — নিকাইয়া যাওয়ার অব্যবহার্য পথে যে জঙ্গল তৈরি হয়েছিল সেটি পরিষ্কার করে নতুন করে রাস্তার রূপ দিতে ৩ হাজার মানুষকে কুড়ুল আর তরোয়াল হাতে পাঠানো হল (৬০)।
নিকাইয়া নিয়ে অগ্রগতি না ঘটার পাশাপাশি উপকূল অঞ্চলেও বিপর্যয় ঘটছিল ক্রমশ। সেখানে চাকার হাতে বিপুল ধ্বংসলীলা ঘটছিল। যদিও আন্না কোমনেনেকে সূত্র ধরে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বলছেন, তুর্কিদের হুমকি ১০৯২-তেই শেষ হয়ে যায়, আদত ঘটনা সেই বিবৃত করা বাস্তবতার বিপরীতটাই (৬১)। ১০৯০-এর মাঝামাঝি সাম্রাজ্য বাহিনীর অদক্ষতা, অযোগ্যতায় চাকার প্রতিহত অগ্রগতি এবং বিধ্বংসী কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে আলেক্সিওস, ডাইরাক্ষিয়নে এক দশকের বেশি সময় ধরে সার্বদের অগ্রগতি রুখে দেওয়া সম্রাটের শ্যালক জন ডাউকাসকে ডেকে নেন। ডাউকাস সেখানে গেলেন ১০৯৪-তে (৬২)। এই যোগাযোগের নানান নথিপত্র মন দিয়ে পড়লে এবং অন্যান্য ঘটনা নজরে রাখলে বোঝা যাবে সেই সময়ে যে তুর্কি আক্রমন ঘটে চলছিল নিরন্তরভাবে, তাতে সাধারণ মানুষের পথেঘাটে সাধারণ চলাফেরাও অসম্ভব হয়ে পড়ছিল (৬৩)।
চাকাকে উৎখাত করা এবং উপকূল অঞ্চল দখল করার বিস্তৃত বয়ান রয়েছে আলেক্সিয়াদে, যদিও এই বর্নণা বেশ কয়েকটা খণ্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে — কিন্তু এই সবের মধ্যেও আমরা আন্দাজ করতে পারি এই কাজ সম্পন্ন এবং সফলতা অর্জন করতে বেশ কয়েকটা বড় সামরিক অভিযান করতে হয়েছে (৬৪)। বাস্তবে চাকার বিরুদ্ধে বড় দল পাঠানো হয়েছিল জন ডৌকাসের নেতৃত্বে, তিনি বাইজান্টাইন পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, আরেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কন্সট্যান্টাইন ডালাসেনোস নেতৃত্ব দেন নৌবাহিনীর। অভিযান শুরু হয় ১০৯৭-এর গ্রীষ্মে।
অভিযানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার — উপকূল দখল করা এবং এলাকায় সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নতুন করে কায়েম করা। ডৌকাসকে কোনও রকম সমঝোতা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল — উদ্দেশ্য ছিল তুর্কিদের হাতে পতন হওয়া দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়া, শহরগুলি দখল করা এবং সেগুলোর ঠিকঠাক নিরাপত্তাবিধান করা। আমরা দেখব এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যের গায়ে কাঁটা হয়ে বসা স্মিরনার শাসক চাকার উচ্ছেদ সাধন (৬৫)। আমরা আন্নার বর্ণনা খণ্ডন করে দেখলাম ১০৯৭-তেও চাকা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। একটি ল্যাটিন সূত্র পরিষ্কার জানাচ্ছে কয়েক বছর পরে ক্রুসেডে অংশ নেওয়া বাহিনী পৌঁছনোর আগে অবদি সমগ্র সমুদ্র অঞ্চল তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল (৬৬)। নিকাইয়া তখনও অধরা; উপকূল অঞ্চলে সামরিক উদ্যমে ফল ফলছে না। ১০৯০-এর মাঝামাঝি সময়ে বাইজান্টিয়ামের অবস্থা শুধুই বিপজ্জনকই নয় মরিয়াও বটে। (চলবে)